একাকিত্বের কোনো পারপত্র লাগে না

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

কোনো একদিন

কোনো একদিন—
ইস্তাম্বুলের ভাঙা সিঁড়িতে বসে

বসফরাসের জল দেখব।
রোমে হাঁটব সন্ধ্যের দিকে,
যেখানে পাথর জানে

কীভাবে সময় ধরে রাখতে হয়।
আর দূরে কোথাও
যাব লিসবন—

রোদে পোড়া ট্রাম, নোনা হাওয়া,
সন্ধ্যায় গিটার ভেজা ফাডো।

ফাডোর সুরে
দিনের ক্লান্তি ধীরে ধীরে নামবে।

পরে মনে হলো,

কিয়োটোর গলিপথও মন্দ নয়—
চেরি ফুল ঝরে পড়ার শব্দ,

চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠা ভোর।
একদিন যাব মরক্কোর রাস্তায়,
মসলার গন্ধে মাথা ঘুরবে,

চোখ ভরে রং দেখব।
হাভানার পুরোনো বারান্দায় দাঁড়িয়ে

হাসব অকারণে।
এখন সেই হাসিটুকুও তুলে রাখি।
বুকের ভেতর কেউ কোনো দিন জানবে না

কোন সুর রাতদুপুরে
আমার ভেতর গুঞ্জন তুলে

আমাকে তাড়িয়ে ফেরে...
এই খাতার পাতায়
সব পথের ঠিকানা লেখা নেই,

শুধু কিছু নাম...
জানি, একদিন যাব।
সব দেনা শোধ হলে,

সব হিসাব মিটে গেলে
হালকা পায়ে বেরোব।

সেদিন একা থাকব না।

সেদিন একাকিত্বও
পেছনে পড়ে থাকবে।

পাখির দেশে একলা

একদিন ভেবেছিলাম পাখির দেশে যাব—
বৃষ্টিস্নাত টোকিও, কফিশপের প্যারিস,

বরফে ঢাকা ভিয়েনা।
কিন্তু যেখানেই যাই,

আমি একা।
আহা! একাকিত্বের কোনো পারপত্র লাগে না—

সে সর্বত্র পৌঁছে যায়, সর্বময়।

হিমালয়ের নিচে নিঃশব্দতা

হিমালয়ের কাছে গিয়েছিলাম—

পাহাড় কিছু বলে না,
না বলেও সে বোঝায়।

আমি মনে মনে বলেছিলাম—

ক্লান্ত শরীর,
অবসন্ন মন,

তবু বেঁচে আছে জীবন
কারণ, এখনো না–বলা রয়ে গেছে অনেক কিছু।

কোনো কোনো দৃষ্টি

টরন্টোর কোনো এক মেট্রোয়
একজন অপরিচিত লোক

আমার চোখে তাকিয়ে ছিল।
সে কিছু বলেনি,

তবু সেই তাকানোয় কী যে ছিল!
কোনো কোনো তাকিয়ে থাকা
দৃষ্টির চেয়েও গভীর হয়...

আমার শীতলক্ষ্যা

ছোটবেলায় একদিন
পা ডুবিয়ে নেমেছিলাম শীতলক্ষ্যায়।

সাঁতার না–জানা আমি
ডুবতে বসেছিলাম সবার অলক্ষ্যে।

নদী যেন মায়ের মতন
আমাকে কোলে তুলে

পাড়ে দিয়ে গেল...
ওই যে দূরে কুশিয়ারা ছোট ছোট গ্রাম
ঘন নীলকণ্ঠ পাখির মতো বসে আছে

এখনো আমার চোখে,
আমার উননব্বইয়ের চোখে।

আকাশে উড়ত শালিখ আর চড়ুই,
হাতের তালুতে খেলত গঙ্গাফড়িং।

আমার বয়স তখন উনিশ।
নীলকণ্ঠ পাখি,
তুমি কি চলে গেছ অন্য কোথাও,

নাকি এখনো একা বসে
সেই একই গান গাও?

আমার নদীর কি এখনো ভরা যৌবনে

নাকি আমার মতোই বিস্মৃতিপরায়ণ?
গ্রামগুলো কি নগরের রূপ নিয়েছে,

নাকি আমিই বদলে গেছি
ভেতরে–ভেতরে?

আমি হাঁটছি গুলিস্তানের দিকে,
বাসটা নিশ্চয়ই পেয়ে যাব,

তবু হঠাৎ কী যেন হলো!
মনটা ছুটে গেল

কালীর বাজারের গলির ভেতর,
যেখানে ছোট্ট আমি একদিন হারিয়ে গেছিলাম

নদী আর পাখির সঙ্গে,
জন্মের স্মৃতি মিশে থাকা সেই সেই শহরে...

কেউ জানবে না,

আজ আমি চলে যাব
চারারগোপ পাঁচ নম্বর ঘাটে।

গল্পের মতো, হেঁটে হেঁটে।
হয়তো আবার হারিয়ে গেছি

নগরের ভিড়ে।
হয়তো আবার

আমাকে হারিয়ে আমাকেই খুঁজি
এই দহনের কালে।

শীতলক্ষ্যা,
তুমি কি আগের মতোই আমার নদী,
নাকি শুধু স্মৃতির জলে ভেসে যাও?

এখনো ডুবে গেলে
ভাসিয়ে পাড়ে এনে দাও?

আমি কেন আর খুঁজে পাই না

সেই বাসের ঠিকানা—
যে বাসটা একদিন

আমাকে ঠিক
তোমার কাছেই নামিয়ে দিত!