ভরা বসন্তে না আছে কোথাও ফুলের সুবাস
না শোনা যায় কোকিলের মধুর কলরব
না ভোমরের মনভোলানো গুঞ্জন,
সবখানে যত সব অচেনা আজব খুনরেজ কীটের আনাগোনা
পচা লাশের গন্ধভরা দক্ষিণের দমকা হাওয়া
বইছে বিরামহীন; কাকেরা কুঞ্জকাননে কুহু কুহু করছে গান;
শিয়ালের হুক্কাহুয়া হাঁক
নেকড়ের ভয়াল গর্জনে মিশে গেছে, কানের পর্দাফাটানো
বীভৎস নিনাদে সাঙ্গ হয়ে যায় ঘুম ঘুম খেলা...
সহসা চেয়ে দেখি
ঘাতকের বুলেটে ছিন্নভিন্ন একটি কচি খরগোশ–শাবক
ধসে পড়া কারখানার লোহার রডের সাথে
নির্মমভাবে গেঁথে থাকা শ্রমিকের লাশের মতো
কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে আছে
তাজা তাজা রক্তে লাল হয়ে গেছে অপলক চেয়ে থাকা
ফসলের মাঠ; আইলের পর আইল উপচিয়ে রক্তের ঢল মিশে গেছে
প্রমত্ত পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ে
রক্তিম হয়ে গেছে সব রুপালি ইলিশ কুবেরের মাছ ধরা কাঠের
কালো নৌকাখানি, মন্দাকিনীর নির্মল জল; মহাসাগরের মতো
নীল চোখ দুটি অস্তগামী সূর্যের মতো লাল হয়ে গেছে
লাল হয়ে গেছে নির্মম নিরর্থ রক্তপাতে উত্তাল মিছিলের বাংলার
সেই দামাল ছেলেটির গতরে লেখা অমর কবিতার প্রতিটি বর্ণ
এক আকাশ মায়াভরা বত্রিশ নম্বর বাড়ি, নিরাপদ জেলখানার নিষ্ঠুর
ইট, রায়ের বাজারের কচি কচি ঘাস, ট্রয়গামী জাহাজে
আর্টিমিসের তৃষ্ণার্ত পূজাবেদি, ভূমধ্যসাগরের সমস্ত জল,
অর্গোসের নীলাম্বর...
রাঙা রক্তে রক্তিম আদি পিতাগণের
প্রথম রাজপ্রাসাদ
অদম্য ভীম রক্তঝরা হৃদয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মাতৃভূমি রক্ষায়
প্রবল প্রতাপে যুদ্ধ করছে
অহিংস ধ্বজাধারী গুরুর নিষ্ঠুর অনুসারীরা তার সব স্বপ্ন ভেঙে
খান খান করে দিয়েছে
চীনের মহা পাঁচিলের মতো দুর্ভেদ্য বাঁশের কেল্লায় টগবগে
একটি যুবক ভিনদেশি হায়েনাদের সাথে প্রাণপণ লড়াই করছে...
লাল হয়ে গেছে
লোভী রানির ভাড়াটে নাবিকের রক্তপিপাসু তরবারির নির্দয় আঘাতে
বিলুপ্ত
অতিথিবৎসল
একটি জাতির পবিত্র ভূমি;
নির্মূল হয়ে গেছে তাদের ইতিহাস-সভ্যতা-সংস্কৃতি
কান্নার রোল এখনো মহাসাগরপাড়ে সাইক্লোন হয়ে আছড়ে পড়ে...
লাল হয়ে গেছে দূর মহাদেশের যাযাবর দলের
বর্বর তাণ্ডবে এ বিশাল জনপদের হারানো নগরের
অনিন্দ্যসুন্দর বিশাল গোসলখানার টলটলে জল
সুরম্য অট্টালিকার সব নান্দনিক ইট; ক্ষতবিক্ষত
কঙ্কালের ককানোর করুণ শব্দ কান পাতলে এখনো শোনা যায়
নির্দয় খুনখারাবি আর জঘন্য গণহত্যায়
রাঙা ওই ফোরাতের মিষ্টি পানি, কুরুক্ষেত্রের প্রতিটি
ধূলিকণা, রুয়ান্ডা, জালিয়ানওয়ালাবাগ, আর্মেনিয়া, বসনিয়া...
আদি সোদরের রাঙা খুনে একেবারে রাঙা হয়ে গেছে
আদি জননীর আদি পৃথিবীর খাঁটি মাটি;
এখনো ঝরে তাজা খুন পৃথিবীর আনাচেকানাচে
মহাকালের পলিমাটির ভাঁজে ভাঁজে নিষ্ঠুর নির্মমতায়
কাতরাতে কাতরাতে ঘুমিয়ে আছে গাদা গাদা কঙ্কাল হয়ে
নাম না জানা অগণিত জনপদ
এখনো মানুষ প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হয়
সাদা কঙ্কালে; এখনো মানুষ শিরদাঁড়ায় বুনো অন্ত্রের দগদগে
ক্ষত বয়ে বেড়ায়...
দিব্যস্তম্ভে এখনো অ্যারিসের শকুনেরা রোদ পোহায়
প্রথম ময়ূখমালীর উজ্জ্বল ময়ূখে
উদ্ভাসিত কলরবমুখর এক জনপদে
মাশরুমের গনগনে আগুনে তাজা তাজা স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে
প্রতিশোধের কড়াইয়ে ভাজা নিষ্পাপ শরীরের
টুকরো মৃত্যুর সাথে নাচ করছে; যুদ্ধবাজ জননেতাগণ
উর্বশীর সাথে
ধ্রুপদি নৃত্যরত সমস্বরে দেবকুল গেয়ে ওঠে
মেয়েলি গীত; হাসপাতালে নিরানন্দ এক বিরাট হিবাকুশা পরানের
ভেতর নিদারুণ যন্ত্রণার ছটফটানি
অপূর্ণ স্বপ্ন ডুকরে ডুকরে কাঁদে; হাজার কাগজের সারস বানাতে হবে
চিরঘুমের আগে, নিপুণ জালি হাতে অকৃত্রিম প্রচেষ্টা তার আপন পণ পূরণের...
বিপুল পৃথিবীর মাঝে গোরের মতোন গোপন ঘরে
বিশাল
বিস্ময়কর
এক বিশ্ববালিকা খাঁচাবন্দী ময়নার মতো ছটফট করছে; অপূর্ব কচি
মিষ্টি মুখ, অথচ জালি অন্তর তার এক নীলনদ বিষাদভরা
ধুঁকে ধুঁকে ফুরিয়ে যাওয়ার আগে
জন্মদিনের উপহারের পাতায় পাতায় লিখে
গেছে ব্যথার কথামালা পঞ্চাশ ও দশ লাখের
শোকগাথা যেন; রক্তরাঙা তুলিতে এঁকে গেছে
ফ্যাসিবাদের কালো থাবার ছবি; এ নরকে তোমার মতো
আরও অনেকে হৃদয়পটে
যন্ত্রণার তুলিতে কত যে অদেখা ছবি আঁকে; কিন্তু, তোমার
টুকরো টুকরো যন্ত্রণার ছবি সবার থেকে একদম আলাদা...
জননীর বিশাল শরীরের একদল সুচতুর ভিনদেশি
নির্দয়ভাবে মানচিত্র এঁকে গেছে
ঘরের মাঝে দেয়াল হেঁশেলের মাঝে
পাঁচিল; শকুনের নখের মতো গোঁয়ারের পেনসিলের
স্বেচ্ছাচারী আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত কোটি কোটি হৃদয়ের
আকাশফাটা আর্তনাদ এখনো কানে বাজে
দ্বিখণ্ডিত ভাষা কাটা কবুতরের মতো
ছটফট করছে; বানের জলের মতো হতভম্ব মানুষের ঢল
মানচিত্রের সীমানায় করছে ছোটাছুটি
একগঙ্গা রক্তে ধান্দাবাজেরা ডুবসাঁতারে মত্ত; মেকি
বিশ্বাসের সাথে মল্লযুদ্ধে মানবতার চরম পরাজয়
ঈর্ষাকাতর
ধূর্ত
ভিখারিরা শেষ কূটকচালে, আত্মার বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে,
হৃদয়মাঝে দিয়েছে তুলে চিরবিষের পাঁচিল; খানিকক্ষণে হাজার বছরের
চির চেনাচিনি রঙিন ফানুসে চড়ে চোখের পলকে উড়ে গেল মহাকাশে;
অতি চেনা সব মুখ মনে হয় এলিয়েনদের মতো...
নির্মম প্রকৃতি পরদেশি ভিখারির লালসার সাথে
কঙ্কালের পালঙ্কে বাসর সাজিয়ে প্রমোদমত্ত
আধমৃত কঙ্কালের কাতরানির করুণ ধ্বনি
আকাশে–বাতাসে অনুরণিত; বিমুখ প্রান্তরে ঢেলা আর
ধুলো; ফসল ছাড়া ফসলের মাঠ ফেটে চৌচির
চতুর্দিকে শুধু বুকফাটা হাহাকার
দূর আকাশে লাগাতার বাজের নাচন
কোথাও নেই কোনো বৃষ্টিবিন্দু
মর্দা হরিণের শিঙের মতো সব গাছ ন্যাড়া; শুকিয়ে যাওয়া
সব জলাশয় শুয়ে আছে মৃত নীলতিমির মতো
শানুকের দু-চারটি নুন ছাড়া পান্তা
সহসা পাখনায় ভর করে আকাশে উড়াল দিল
চারদিকে ভিনদেশি কাকদের ভিড়
দেড় কোটি কঙ্কালে তারা কাবাবের গন্ধ পেয়ে
বুনো উল্লাসে ফেটে পড়ে চাবুকের কষাঘাতে
কঙ্কালের পচা মাংসে ঝটপট কানা থালা ভরে নিচ্ছে;
জননীর বুক রিক্ত করে
দূর সাগরপাড়ে
গড়েছে চকচকে প্রশান্তির প্রাসাদ
সাজিয়েছে ভিখারিনীর মুকুট লুণ্ঠিত যত মণিমাণিক্যে
(গোর্টা মর ব্ল্যাক ফোরটি সেভেন) লাখ লাখ কঙ্কাল
কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যুর কোলে ঢলে
পড়ছে; নানা মহাদেশের কঙ্কালের পচা মাংসে
লোভী কানা থালাটি যেন ভরেই না, মহাবিশ্বের মতো সর্বদা
প্রসারিত হতে থাকে; পিরামিডের পাদদেশে
ক্ষুধার্ত ইগলেরা নিজ বাচ্চাদের পাক করে হাঁকুপাঁকু
করে গোগ্রাসে গিলে খাচ্ছে; মাঠফাটা রোদে বিশাল
নাড়ার ময়দানে শকুন এক অপেক্ষমাণ ভূরিভোজনের
আশায়; সম্মুখে তার প্রাণপ্রদীপ নিভু নিভু, ক্ষুধায় কঙ্কালসার
একটি কালো মানিকের ছানা, যার কচি কলজেটা অনেক আগেই
ছিঁড়ে গেছে; পৃথিবীকে একমরু তিরস্কার করে মুখ থুবড়ে
পড়ে আছে; ছোট মাথাটি তুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার
ব্যর্থ প্রয়াস, ক্ষুধা নিবারণের খাদ্য দূর হতে
মরীচিকার মতো ছলনা করছে; হয়তো ফুরিয়ে যায় রত্নপ্রভা
হয়তো কিছু দিন বাঁচার জন্য বাঁচা...
চকচকে সব প্রাসাদ যেন বুনো
শুয়োরের বাথান
প্রাচুর্যের অলস মগজে সৃষ্টি নয়, ধ্বংসের নেশা খেলা করে
সহসা দাঁতাল শুয়ারের দল লোকালয়ে নির্মমভাবে
তাণ্ডব চালায়; আবালবৃদ্ধবনিতা, কোটি কোটি
বসন্তসৈনিক অবিরাম ছুটছে দিগ্বিদিক
ছুটছে যত সব ছায়াখাকি
কখনো–বা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে, কখনো–বা
চামড়া ঝলসানো চড়া দুপুরে, তপ্ত বালুসাগরে; মরুসাইমুম
চাবুকের মতো আঘাত করছে...
ক্ষুধার্ত পীড়িত তৃষ্ণার্ত মুমূর্ষু, চিতার তাড়া খাওয়া
হরিণের পালের মতো তবু ছুটে চলা, ঝোড়ো হাওয়ায়
সুতোকাটা ঘুড়ির মতো
লক্ষ্যহীন গন্তব্যে; আকাশদানবের ভয়ংকর হুংকারে
ঘুমিয়ে পড়ে কেউ কেউ; বাতাসে বারুদের গন্ধ, মায়ের স্তন
শুকিয়ে গেছে, ক্ষুধার্ত শিশু ক্রন্দনরত, দন্তহীন
রক্তরাঙা মরুফুল বিচারের আর্জি জানায়
বিচারহীন দরবারে; হেক্যুবার মতো লাখ লাখ মায়ের
চোখের সব নোনা জল শুকিয়ে গেছে, অপলক চোখ
যেন কৃষ্ণগহ্বর; দূর হতে সব দানব প্রাসাদ
মুখ টিপে হাসে, কখনো–বা ভেংচি কাটে; অবশেষে
ঊর্মিমালীর নীল জলে
বানের জলে ভেসে আসা প্রাণীদের মতো নিজেদের ভাসিয়ে দেয়...
স্বপ্নের মাঝে স্বপ্নেরা খেলা করে, হঠাৎ দমকা হাওয়ায় সব স্বপ্ন
ভেসে যায়; আকাশে শকুনেরা চক্কর দেয়; সৈকতে ভেসে ওঠে
বাবার বাহুডোরে শক্ত করে ধরে থাকা
একটি নিথর, ফুটফুটে সুন্দর মরুফুল...
খুনি খাটাশের দল জঘন্য
খুনের নিষ্ঠুর ছক কষে, মানুষ যেন এ জনপদে
এক হিমালয় বোঝা; তারা শুধু উর্বর মাটি চায়, কোটি কোটি
মানুষের উর্বর রক্তে আরও উর্বর করতে
চায় এ জনপদ; এ মাটির সোনার ফসলে
ভরতে চায় তাদের লালসার গোলা; ভয়াল কালরাতে
ঘুমন্ত জনপদে, হায়েনার পালের মতোন মেশিনগান গর্জে ওঠে
দাউ দাউ করে জ্বলছে দরদি জননীর শরীর; নিরাপদ
আশ্রয়ের খোঁজে, কখনো ঢেলাভরা মাঠ দিয়ে, কখনো–বা মায়ের
শাড়ির চওড়া পাড়ের মতো মেঠো পথ ধরে
রক্তাক্ত খালি পায়ে ছুটছে মানুষ; শীর্ণ জননীর কোলে রুগ্ণ শিশু
ধুলোমাখা কাদামাখা মানুষের জোয়ার...
জোয়ান যুবকের কাঁধে বাঁকানো বাঁকের
ক্লান্ত
বৃদ্ধ
নর–নারী যেন শীতের সকালে সিউলির বাঁকের খেজুর রসের ভাঁড়
চারতলার মোড়ে উঁচু বাঁশের খুঁটির আগায়
কসাইখানায় টাঙানো ছালছোলা
ছাগলের মতো সারি সারি লাশ; গলিত লাশের ফোঁটা
টপটপ করে পড়ছে; আদূরে সন্তানের লাশের সৎকারের আশায়
বৃদ্ধ প্রায়াম এক আহাজারি করছে; হৃদয়গঙ্গায় তার
প্রবল বেগে রক্তস্রোত বইছে, সারা শরীর থেঁতলানো
থকথকে ক্ষতের ’পর একঝাঁক মাছি ভনভন করছে
হায়েনাকবলিত এ জনপদে প্রায়ামদের এ আশা পূরণ হবে না; প্রতিবাদী
এক ভগ্নি যেন অ্যান্টিগনি
নির্যাতিত
ধর্ষিত
ক্যাম্পের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে মৃত্যুর প্রহর গুনছে; মানচিত্রের সীমানা
পেরিয়ে অচেনা আশ্রয়ে অগণ্য অসহায় মানুষের ভিড়ে
জননী এক রক্তঝরা হৃদয়ে এক পাশে মৃত সন্তান
অন্য পাশে পাণ্ডুবর্ণের
খোকার মুখে একঝিনুক ফেন ঢেলে দিচ্ছে
হাল না ছাড়া টগবগে এক যুবকের বিধ্বস্ত বোমারু
বিমানের আগুনের আঁচে নন্দনকাননের সব ফুল যেন
তারা হয়ে খসে পড়ছে...
ত্রিপথগামিনীর টলটলে যৌবনে দেবতারা সাঁতার কাটে
ধর্ষিত যুবতীর মতো এলোচুলে শুয়ে থাকা বোবা
তিস্তার পাড়ে ফসলের মধুর আদর নেই
ফুল নেই
ফল নেই
কলসি কাঁখে কিশোরীদের কলরব নেই
বৃষ্টিস্নাত মেঘলা বিকেলের মধুর ছোঁয়া নেই
সবুজ ঘাসের নাচন নেই
শুকনো ঘাসেরা করুণ সুরে করছে গান
ক্ষুধার্ত কৃষকের গোয়ালের গাইয়ের ওলানের বোঁট চুপসে গেছে
তবু বৎসতরী বারবার চোষে আর কোমল
গালে গ্যালন গ্যালন গ্যাঁজলা তোলে
খালি গোলায় মহাখুশিতে ইঁদুরের পাল বাসর সাজিয়ে
অফুরন্ত প্রমোদমত্ত...
এখানে আর ধানঝাড়া কুলোর হাওয়ায় কিষানির চুল
কিশোরের শখের ঘুড়ির লেজের মতো ওড়ে না
আউশ ধানের মলন মলতে ঘাড়ে ছান্দ দেওয়া
দামড়া গরুর মালা গোল হয়ে ঘোরে না
ঢেঁকিঘরে অলস ঢেঁকি আজব জানোয়ারের মতো
গর্তে মুখ ঢুকিয়ে সেই কবে থেকেই ঘুমিয়ে আছে
পার্বণে ঢেঁকির চাল কুটার সুরেলা শব্দে
ঘুম ভাঙে না কোনো আদুরে খোকার
অভুক্ত শিশুদের ঘুম পাড়ানোর ছলে মায়েরা পাথরচাপা বুকে
সাদা সাদা হাড় সেদ্ধ করছে...
সিসিফাস উঁকি মারে বড় বড় হাঁড়িঠাসা হেঁশেলে
গৃহিণী মাতাগণ একরাজ্যের নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে
সারাটা জীবন নিরর্থক বেগার খাটে
অচল বাবারা জলভরা চোখে প্রাণের খোকার জমিতে
অর্থহীন জন খাটে
সারা দুনিয়ার আদিবাসীদের আবাস যেন অদৃশ্য দেয়ালে ঘেরা
একটিই বিশাল চিড়িয়াখানা; কোটি কোটি খাঁচাবন্দী জীবনযাপন
অন্তঃকরণে সবার বিরামহীন রক্তক্ষরণ আর আহাজারি
মিলেমিশে একাকার
পৃথিবী তো নয়, যেন মস্ত জেলখানা; অবিরাম নজরদারিতে
অজস্র মানুষ বেঁচে থাকার নিষ্ঠুর ভান করে
নরম ইটের বালিশে বিনিদ্র রাতযাপন; ম্যাকবেথেরা রক্তমাখা
চাকু হাতে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে নাক ডেকে
ঘুম পাড়ে; বাবুর ফিডারের তলানিতে এক সাগরের নুন
রোবট মা ঝলমলে রঙিন স্ক্রিনে কী যেন
হাতড়ায়; এ জনপদে নেই কোনো থিবিসের দরদি
পরিচারক তাজা তাজা অভিশপ্ত কত যে ফুল
ম্যানহোলে ডাস্টবিনে জঙ্গলে যন্ত্রণায় কাতরায়
পাশ দিয়ে নীরব প্রতিবন্ধীরা দ্রুত বেগেহেঁটে যায়
পুতুলনাচের বোধহীন পুতুল যেন; হিপোলিটার প্রমীলা
বাহিনী নয়, নিসাসের রঙিন চুলের গোছার মতো ফুল হাতে
পাল পাল প্রেমিকা পিচঢালা রাস্তায়
জোয়ান মরদের জন্য অপেক্ষা করছে; এক পৃথিবীর
অস্বস্তি নিয়ে পারাবত-সওয়ার কন্দর্প
ঝাঁ করে নীল আকাশে মিলে গেল; মানুষ তো নয়
যেন লাখ লাখ রোবট
অতি সস্তা সব রোবট দিনরাত মেশিনে বৈদেশিক মুদ্রা ছাপে,
অদূর হতে দুধের বাচ্চার কান্নার আওয়াজ
সাইরেনের আর্তনাদের মতো কানে লাগছে
একনর্দমা ফরসা চামড়ার জোঁক রোবটদের রক্ত চুষছে
এঁদো গলিতে গন্ধহীন হাজার হাজার বাসি ফুল
মশা–মাছির খাবার হয়ে ক্ষুধা পেটে নিষ্ঠুর
নিদ্রা যায়, একপাল ধেড়ে ছুঁচো চাঁটি মেরে মায়ের মমতায় চুমু
দিয়ে যায়
অর্থহীন অবাস্তব অভিশপ্ত যত সব
জীবনযাপন!
মহারানির অচ্ছুত বংশধরগণ একডোবা হেলে সাপ
এখনো ফণা তুলে খাবল মারে
মূর্খের রক্তমাখা ডলারে, ভিখারিনীর দেনমোহরের দিনারে
চাকরগণ মজে রঙিন মদের গেলাসে; একরতি
বিষের আশায় বিষহরীকে নির্লজ্জভাবে তোষামোদ করে
ডোবার পাড়ে জিউসের ওক বৃক্ষের মতো একটি বুড়ো গাছ
বাহারি পাতারা দুলে দুলে অজানা
ভাষায় কথা বলে; বেতনভুক্ত পিরালি ব্রাহ্মণগণ মনগড়া
তরজমা করে ঢেঁড়া পিটিয়ে প্রচার করতে
আদেশ করে; একঝাড় গিরগিটি হাওয়া
বুঝে রং বদলায়, তাঁবেদার প্রভু হয়ে গোঁয়ার্তুমিতে জনতার
ঘামের কালিতে তাদেরই ভাগ্য লেখে...
মস্ত ঘরের দরজায় কড়া পাহারারত
একদল নির্দয় সেনা; ঘরের পাকা বাঁশের আড়ায় বসা
ফিলোমিলার করুণ গান হঠাৎই থেমে যায়
পলিমাটির শত শত নগ্ন মূর্তি দুই হাতে বুক চেপে ধরে
উপুড় হয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে
আলো-আঁধারে দ্রৌপদী এক বিয়ের বেনারসি শাড়ি
ক্লান্ত চোখে খুঁজছে, হৃদয় সবার শিলপড়া কাঁচা ফজলি আমের মতো
ফেটে গেছে
দূর প্রাসাদের হেরেমে অচেনা সুলতানের খাসকামরা হতে
অভাগা পিতার আদুরে নন্দিনীর কাতরানির করুণ শব্দ
বাতাসে ভেসে আসছে
অ্যাপোলোর মন্দিরে ক্রয়সা ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে আছে
বর্বর ধর্মযোদ্ধাদের বন্দিশালার
মনোরঞ্জনের বাসি মরুফুলের ক্রন্দন ঘরের দেয়ালে
প্রতিধ্বনিত হচ্ছে; ডেসডিমোনা অবাক চোখে চেয়ে আছে...
আর্মি ক্যাম্পে ধর্ষিত মরুবালিকার পোড়া লাশের গন্ধ
নাকে লাগছে; লজ্জা পেয়ে ফিলোমিলা ফুড়ুৎ করে
উড়ে গেল...
মাঝনদীতে দুঃখিনী বেনাবতীর করুণ আর্তনাদ এখনো
শোনা যায়
নরকনদীতে বেহুলা একাকী ভেলায় এখনো ভেসে বেড়ায়
অপয়া ভিটেয় এখনো জয়গুন লড়াই করে
এখনো বর্বর টিরিউসেরা নির্মম তাণ্ডব চালায়
এখনো ফিলোমিলারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে...
হয়তো
কুয়োর বদ্ধজলের কুনোব্যাঙের মতো বিশ্ববিবেক
নীলতিমি হয়ে মহাসাগরে অবাধে সাঁতার কাটবে
হয়তো
পুব আকাশে নতুন সকালে এক আকাশগঙ্গা রোদ
নিয়ে নতুন সূর্য উঠবে
ঘুচে যাবে ঘুটঘুটে অন্ধকার
হয়তো
মানুষ একদিন স্বাধীনভাবে স্বাধীন হবে
হয়তোবা কখনোই আর হবে না...