আগুনের পুরানা বয়ান
আগুনকে পোষ্য করে রাখি শীতে
মালসায় কিংবা মনে
তুমি যা বলছ, সেটা দাবানল
কখনো কখনো জাগে সুগভীর বনে।
বিপুল আগুন নিয়ে বড় মনোবেদনায় সন্ধ্যায় নক্ষত্র আসে
তার আলোশোভা ধীরে আসে এই পৃথিবীতে
তুমি যা বলছ, সেটা পরাজিত কথা
একদিন গান হবে আমাদের স্মৃতির সংগীতে।
আগুনকে পোষ্য করে রাখি
ক্ষুধায়, উনুনে আর রান্নাবান্নায়
তুমি যা বলছ, সেটা প্রেম
কাগুজে নৌকার মতো ভেসেছে কান্নায়।
সেবা ও শুশ্রূষা পেতে তাকে ঘুমমগ্ন রাখো
বারুদে বারুদে কিংবা ম্যাচের কাঠিতে
তুমি যা বলছ, সেটা ঝলসানো মুখ
ছাই ও ধোঁয়ার মধ্যে ত্রস্ত ঘর ভিটার মাটিতে।
একটা ঘুঘু কেবল ডাকে
মধ্যরাতের নির্জনতায় জিকিররত জায়নামাজে
ওইখানে ঠিক খুশবু ছড়ায় চোখ থেকে আর যায় না মা যে।
একটা ছবি রইল আঁকা ঘোমটা মুখে তসবি হাতে
জাদুর চাদর বিছিয়ে দিলাম একটুখানি বসবি তাতে?
কোন সুদূরের সীমার কাছে হারিয়ে গেলি, কী দরকারে
সেই অসীমে কেউ কি আবার আমার মতো আদর কাড়ে?
ডাঁটা তো লাল, পাপড়ি সাদা, শিউলি ফুল ঝরছে ভোরে
কোন কারণে ভোরের বেলা আকুল মনে পড়ছে তোরে।
গল্পটা আর ফুরায় না তো পথ কিংবা নদীর বাঁকে
দুপুরবেলা মায়ের ভাষায় একটা ঘুঘু কেবল ডাকে।
বনভাষা বয়ে যায়
যেতে যেতে উঁকি দিয়ে বনের প্রান্ত দেখি, তোমাকে দেখি না।
সুদীর্ঘ যানবাহনের ত্রাসে সচকিত হরিণীর দল তন্দ্রাচ্ছন্ন অলসতা ভেঙে
একটু গহিনে গিয়ে কৌতূহলী চোখে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছে
দ্রুতগামী ট্রেনের কোলাহল।
অচেনা স্টেশনে নেমে তুমিও তাকিয়েছিলে বনবাসীদের মতো।
আমি বনভাষার কিছুই বুঝি না।
কোনো কি গল্প ছিল পাথরের মহিমার মতো
গৌরবের যাত্রাপথে যা তুমি বলতে পারোনি?
কোনো কথা ছিল স্পর্শের মতো
অস্পষ্ট হাওয়ার অক্ষরে লেখা পাতার ওপর?
পর্যটকের পিঠের লাগেজের মতো
বুকে ভারী হয়ে আছে দুরূহ দুর্বোধ্য বনভাষা।
বরফে ঢেকে আছে পথ।
ঢালু উপত্যকায় ফুটে আছে নাকফুল।
পাকদণ্ডী বেয়ে যেতে যেতে
পর্বতের নির্জন শূন্যতার কাছে
অকস্মাৎ শুনতে পাই নদীর প্রাক্–জন্মগাথা।
তোমার সমস্ত কথা ঝরনার ধ্বনির মতো
বয়ে যাচ্ছে লাচুংয়ের বুকের ওপর।
বরফের গায়ে লেখা
হয়তো আমি নই।
আমার শেষ বিকেলের ছায়া একদিন দীর্ঘ হতে হতে পৌঁছে যাবে
তুষার-আবৃত পথের চিহ্নের মতো তোমার দীর্ঘশ্বাসের খুব কাছাকাছি।
কখনো না-লেখা ভ্রমণকাব্যের মতো গোধূলি নেমে এলে
লাচুংয়ের আকাশ থেকে একটি নতুন তারা
অনর্থক আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়ে জানিয়ে দেবে
আমি কিংবা আমার ছায়া এসে গেছে সারদার চুম্বনবলয়ে।
গ্রান্ডালার ঘন নীল পালকের গায়ে
সত্যিই কোনো বেদনা লেখা নেই।
তারা অপরাজিতার আনন্দ বিলি করে পর্ণমোচী গাছের শাখায়।
আমি তবু একটা বেদনার কথা
পাথুরে বরফের গায়ে উৎকীর্ণ করেছি সমতলের জটিল দুর্বোধ্য বর্ণমালায়।
তুমি তার সারমর্ম বোঝার আগেই
চোখের জলের মতো গলে গলে মিশে গেছ তিস্তার সরল প্রবাহে।
আরামের অন্তরালে
আমি তো তোমার আরামের অন্তরালে আছি
আনন্দের অন্দরমহলে ওত পেতে গেরিলার নিপুণ কৌশলে।
তোমার উল্লাসে বেগবান জলোচ্ছ্বাস, নাচি পতাকামুদ্রায়।
সৌরভের কাছে ভ্রমরের গুঞ্জনের মতো,
রাত্রিজুড়ে আসন্ন প্রসন্ন প্রণয়ের মতো
তোমার সকল গানে বেহালায় সুর তুলি নেপথ্য বাদক।
তোমার জন্মকে তুমি ফেলে এসেছিলে বহুকাল আগে।
আর যারা চলে যেতে চেয়েছিল তাদের জন্যও
তুমি খোলা রেখেছিলে নিভৃত কপাট।
আমি আছি, আমি আছি
তোমার শরীরজুড়ে লেপটে অনন্ত ক্ষুধায়।
আমি নীল নিয়তির মতো
ওই অসীমের রহস্যের শূন্যতায় দিগন্তবিহীন ঘন নীল
শুধু নীল।