সোনার হারের রঙে
জানালা খুলে দেখি সব শান্ত, ঝাড়বাতির নিচে সমবেত লোকেরা পরিপাটি, চকচকে সু পায়ে পুরুষলোকেরা, মহিলারা জামদানি পরে আছে যেন জামের বাগান। সেগুনগাছের মতো দামি পুরুষেরা এলায়িত বৈভবের নিচে। চমত্কার এক পৃথিবী! পলিশ করা প্রতিটা মুহূর্ত!
বাছা বাছা গানগুলি বেজে উঠতেছে খানিক পরপর। প্রতিটা বস্তু প্রাণময়। ছোঁয়া লেগেই নেমে পড়ছে কাজে।
দরজাটা জানে অভিবাদনের ভাষা, চামচের খাঁচিটা স্বভাবতই বেজে উঠতেছে আঙুলের টাচে, সোফার ফোম নিজেই নরম হয়ে উঠতেছে ভারী নিতম্বের টানে, আলো উন্মুখ মেলতে চোখ, খাবারের প্লেটগুলি আহারের জন্য মুখের নিকটে উঠে আসছে যেন, হাওয়া এসে বসতেছে ফুলের মজমায়, সুগন্ধি ভরে যাইতেছে শরীরের ঘ্রাণে—এমন স্বয়ংক্রিয় নেয়ামত সুখের সহযোগী হয়ে বিরাজ করতেছে এখানে। ভবনের প্রতিটা থান কারুকাজে মোড়া, স্বেচ্ছা পুলকিত। দেয়ালে দেয়ালে খোপে জগৎ সেরা বই শোভা পাইতেছে, প্রার্থনার জায়গাগুলি একেকটা তাঁবুর মতো বাহিরানার দিকে, যে যার মতো নত হইতেছে, কোথাও আনন্দ-ক্রন্দন, কোথাও হাস্যরস, কেউ গড়াগড়ি যাইতেছে সুখে। মোলায়েম সদর দরজা দিয়ে লোকে ঢোকে আর পরম তৃপ্তিতে বার হয়ে যায়। কেউ কাউকে তাড়ায় না, কাউকে মাড়ায় না, ধীরপায়ে, মাটিও কষ্ট না পায় এমন আলতো পদব্রজে ফিরে আসছে, যাচ্ছে।
এরা এসেছে নদীতীর ধরে, বহু শ্রমের পরে, সোনার হারের রঙের গ্রাম পার হয়ে, শুদ্ধ হাওয়ার প্রেমে, এসেছে জরামুক্ত এই পরাজগতে।
সৃজিত বর্ষায়
একবার বিপদসংকুল বর্ষায় কন্যারা বাহানা ধরল ছাতা কিনে দেওয়ার! চারিদিকে ব্যাধি-জরা, ভয়! ওদের শিশুমন সে সব
বুঝল কি না কে জানে! গোলাপি, লাল দুটি ছাতা কিনে আনি ওয়াদামতো।
কী যে খুশি তারা!—উল্লাস করল, গাইল, নাচল।
ঘরটাকেই বানায়া ফেলল বর্ষাঋতু।
ঘরের আসবাবগুলোকে বানাল জঙ্গল—কাঁথাপত্র, জামা, বালিশ, কুশন।
ছাতাকে গামছায় ঢেকে তৈয়ার করল তাঁবু—যেন ক্যাম্প ফেলতেছে কোথাও কোন নিবিড় বনে।
থালাবাটিকে ঝনঝন করে বাজাল যেভাবে বৃষ্টির শব্দ হয়।
ওই কল্পনার বিষ্টির ধ্বনি আর বাইরের সাচ্চা বিষ্টির ধ্বনি একাকার হয়ে ঘরকে করে তুলল বুনো জঙ্গল—বর্ষা প্রকৃতির ।
নিজ সৃজিত সুরলহরীর মধ্যে ওরা ঘুমায়া পড়ল;
একদিন এই ছাতা থাকবে না, পিতাও না—
শুধু থাকবে ছাতার স্মৃতি,
দুঃখ ও বেদনার গভীর ব্যক্তিগত বর্ষায় ওদের মনে ভরসা জোগাবে ছাতার অনুভূতি।
আম্মার ব্যাগ
আমার বাসা তিন রুমের। মাঝেমধ্যে আম্মা বেড়াতে আসেন। এক রুমে থাকেন। আম্মার ব্যাগ পড়ে থাকে তারই কোণে। প্রতিদিনের ব্যবহারের কাপড় প্রতিদিনই গুছিয়ে ব্যাগে পুরে রাখেন। আম্মা হয়তো ভাবেন, যেকোনো সময় আসতে পারে যাওয়ার ডাক। আমার বাসায় পালঙ্ক, সোফা, টিভি, আলমিরা, মেটশিফ আরও কত কী! আম্মা শুধু জড়োসড়ো হয়ে থাকেন একটা ব্যাগের ভিতর—এক কোণে।
বহু বছর আগে আম্মার ছিল বড় একটা ঘর—অজস্র তৈজসপত্রে ঠাসা। চাবির গোছা বাতাসে ঝনঝন করে বাজত সম্রাজ্ঞীর ঘুঙুরের মতো। কী রহস্যে যে সেসব মোড়ানো!—ঘর লাগোয়া ঘাট, আকাশ, জমিন, হাঁস, মোরগ, বিড়াল কত কিছুর ওপর ছিল তাঁর অধিকার।
সেই সাম্রাজ্যের প্রান্ত ছোট টেবিল, একসেট বই, একটা চায়নিজ তালার চাবি আর ওয়াল হ্যাঙারে ঝুলানো কয়েকটা জামাসমেত আমি ছিলাম সামান্য।
এখন আমার রাজ্যের ভিতর আম্মা, গুছিয়ে রাখা একটা ব্যাগ কেবল। যেকোনো সময় চলে যাওয়ার।
সামনে ছুটি-ঈদ-কোনো উত্সব—আম্মা ব্যাগ নিয়ে চলে যাবেন। থইথই আসবাবের ভিতর কেবল দুলতে থাকবে একটা ব্যাগের ছায়া, ক্রমে ঘনায়মান মায়া—আম্মার।
বুকের বোতাম খুলে
বিকালের পালক উড়ছে। পাথরের বেঞ্চিতে গা হেলাইয়া আছি। এখন রোদ কম।
রিকশাঅলারা ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। তাদের গামছা থেকে মুখ মোছার ঘ্রাণ তরকারির স্বাদের গন্ধের মতো ছড়াল।
তাকে জানাও, নদীর দিকে ছায়া ক্রমশ কোমল, মাটি এঁটেল, পানি স্বচ্ছ কাচের রং।
তাস পেটানো যুবকেরা কাজে গেছে। তাদের বসার দাগ এখনো অবলুপ্ত নয়।
একটা ফল পেকে থাকতে দেখি, পাতা আড়াল করতে চাইছে প্রাণান্ত, পতনের নিয়তিতে তারা সমান্তরাল।
ঢোঁড়া সাপ ছোট বকথুরিনার পিছে ছুটে ছুটে সূর্যাস্তের দিকে গেল,
অপুষ্ট কাণ্ড থেকে বহু শ্রমে যে কুঁড়িটা বার হলো বাতাস তাকে দাইমার মতো আদর করে বেড়ায়
‘স্নেহ দাও, স্নেহ দাও পথহারা শিশুদের’
যখন সকলই নিস্পৃহ, যত্নহীন
একটু দম দাও নিভন্ত কুপিবাতিটারে—
সন্ধ্যা আরও পষ্ট, তোমার সকল কথা এখন বোধগম্য হয়ে উঠতেছে
পাতায় ঘষা লেগে লেগে গানের আবহ পেতে শুরু করে খালের পেছনভাগের বাগান
ধোঁয়া উড়ছে কলার কাঁদির ফাঁক দিয়ে
কেতলিতে পাতি দিয়ে দোকানি কথা বলছে নিজের সাথে,
বুকের বোতাম খুলে পাঁজরগুলিকে হয়তো গুনে নিতে সুবিধা হয়
মহীপাল
মেঘের চাঁইয়ের নিচে মানুষের বাগান। ঘামের ও ফলের গন্ধে ভুরভুর সরু গলি—পাহাড় পা দুটি গুটায়া আনছে এখানে। ঠেকনা দিয়ে আছে ফালি ফালি ধানি জমিগুলা, আঠালো তীরের নদী। মানুষের গা শুঁকতে শুঁকতে রোদেরা ঢোল হয়ে আছে। কথা ফুরায় না, তাই লোকেরা দাঁড়ায়, সুরুত সুরুত চা খায়।
কংক্রিটের বোয়াল আসমানের নীলকে ফালি ফালি করছে।
‘তুমি কি বলবা সবুজ টিয়ারা কেন পাতার অন্তরালে থাকে?’—একটা হাত আরেকটার হাতের ভিতর গলে গেল। নাকি রাস্তাটাই তাদের গিলে খেল দুপুরের খিদায়?
ঝাঁ ঝাঁ রোদ...
নোনা হাওয়ার গন্ধে ধ্রুপদি সুর বাতাসের চুলে বিলি কাটতেছে। একটা সোমত্ত পুরুষের মতো হাওয়া সবকিছু জাপটে ধরে আছে।
জন্তুর মতো সার সার লরি পেটমোটা হয়ে ঢুলুঢুলু করে ঢেকে আনছে ঘুম।
ঝিম ধরা দুপুর। দৃশ্যকে গলা টিপে চোখ গড়িয়ে পড়ছে পুকুরের শান্তির ভিতর। এক বাস ভর্তি হাঁস সাঁতার কাটছে চোখের পুকুরে। কোন হাঁসটা তুমি?—তুমি হাঁস ডানা ঝাপটালেই বিষ্টি হয় এ তল্লাটে।
বিষ্টি হয় আমার নিয়তের ওপর, যখন ভুলে যাই, তখন নিজ নামে ডাকো।
ঘর ডাকছে। দয়িতারা কল্লোল তুলতেছে। মুসাফির পাখিরা ইতস্তত...
ডিজেলের গন্ধে বসন্ত মাতাল হয়ে ফুটল, পলাশ পল্লবে কেউ হয়তো নাই, কোনো একটি কথাও বলার মতো।