১.
এসো প্যাঁচা, ত্রিকালদর্শী, আবির্ভূত হও
এখন মধুকুঞ্জেও ষড়যন্ত্র ও অসুখ
হিংসা, দ্বেষ ও মারী জনপদে জনপদে
তুমি অন্ধকারে, গাছের কোটরে, কটাক্ষে
এখন মানুষমাত্রে দু পয়সার কাকাতুয়া
ঊনমানুষ, চারিদিকে শালিক–বন্দনা
শ্মশানের ভিতরও ধড়িবাজ, হঠকারী
তোমার ঠোঁটে পৃথিবীর প্রথম মন্ত্র
আমিও বিকৃত নখর, উবু হয়ে আছি
গলায় মুণ্ডের মালা, গলিত হৃৎপিণ্ড
অতিদূর ধানখেত, আর তুমি লক্ষ্মীর
বাহন, ঠিক যেন পিতামহী খেতের আলে
কাঠের নৌকায় এই ইড়া ও পিঙ্গলা
আর প্রতি রাতে তুমি অস্থির জবাগাছ
কুষ্ঠরোগীর পাশে স্নেহশীতলে
তুমি পুনরায় এসো ভূমাজলে, এই দেশে।
২.
নাভি ঝরে গেছে বাদামগাছের নিচে
চারিদিকে সাপের কুণ্ডলী, আর অদ্ভুত
তাঁত কারা বুনে চলেছে সবার অলক্ষে
তুমিও কাঁদছ স্ত্রী–গর্ভে, অস্ফুট স্বরে
পথে পথে মানুষের মুণ্ড, খুলি ও হাড়
নদীর তলায় নৌকার বিধ্বস্ত দেহ
ঝিনুকের ভিতর সর্পিণীর বিষক্রিয়া
তুমি অগ্নিজিহ্বা, অরুন্ধতী, মৃত্যুর ওপারে
এখন রাত, মহিষেরা বাথানে শুয়ে
সন্তানের সৎকার করে দ্রাবিড় পুরুষ
আশ্রয় খুঁজেছে স্ত্রীর নির্জন অন্ধকারে
চরাচরে জ্যোৎস্না আর তোমার বিলাপ
সুপারিগাছঘেরা এই কুঁড়েঘরে বৃক্ষজট
শিয়াল ও ইঁদুরের সাথে আমি অশ্রুরুদ্ধ
তুমি জগজ্জননী, দেবীচক্ষু, জেগে আছ
ঘরের ঈশান কোণে, কঙ্কালের পাশে।
৩.
আমরা সকলে সমাহিত শুক্র গ্রহে
ব্যর্থ জীবন, ব্যর্থ সন্ন্যাস নিয়ে
রাহু রাহু আর রাহুর বিস্তার
এই জড়জীবন, নাড়িচক্র পূর্ববৎ
তুমিও মূকবধির আতাগাছ
সদ্যোজাত বাছুরের পাশে
মাতৃধ্যান কুমারী মাতার
দেহের ভিতর সৎকারস্মৃতি
এখানে ঢোল আর করতালের
শব্দে মাছেদের ঘুম ভাঙে
আর অর্ধস্ফুট হরিণা দৌড়ায়
শৃঙ্গারের নীল দংশনে
আমি ছাইমাখা খড়ের বিছানায়
অন্য মৃতদেহের পাশে প্রাণীরূপে
রক্তে ভেসে গেছে গর্ভগৃহ
তুমি মাতৃবর্ণা, কিঞ্চিৎ হলুদ নিয়ে এসো।
৪.
এই ডোরাকাটা সাপ এই কালনাগিনী
তার ঠোঁটে তার জিহ্বায় এই মৃত্যুচুম্বন
এই প্রেম এই সখ্য ভান্ডে ও ব্রহ্মাণ্ডে
আমি প্রস্তাব করি জগতের এই নিয়ম
তোমার পাঁজর কারা সেলাই করে গেছে
কালচক্রে, পৃথিবীর বিষধর সাপ জানে
হেঁয়ালিতে উড়ে শিবনৌকা নিশাকালে
আর তুমি গোয়ালঘরে গাইগরুর পাশে
হিংসা ও প্রেমের মতো মানুষের গন্ধও
টের পায় বনের প্রাণী, তাই সদ্যোজাত
ফড়িংও পালায় মানুষের নিকট থেকে
তুমি শুধু শব্দহীন, জোড়াচোখ, শঙ্খলাগা
আমার সারা শরীরে বাঘের আঁচড়
জবা ফুল আমার নারী, সেও উড়ে গেছে
বাতাসে, শুধু পদ্মিনী শঙ্খিনী চিৎ–চরাচর
তুমি কালী, বাঁশবাগানে জবা হয়ে ওঠো।
৫.
কোজাগর এই রাতে চূর্ণচুলে গর্ভসিঁদুর মেখে
যেসব স্ত্রীরা হারিয়ে গেছে অনশ্বর নদীর বাঁকে
তাদের চোখে দ্যাখো অশ্রুর দাগ লেগে আছে
তুমি কুণ্ডলিনী, তাদের করো দয়া, ব্রহ্মজ্ঞান দাও
পাঁজর দিয়ে বানানো এই নৌকা একদিন
পানিতেই ডুবে যাবে, তবু সম্মুখে শীর্ণ পথ
ভাঙা ষড়রিপু নিয়ে টুপটাপ পড়ে এই রমণ
স্ত্রী–হারানো পুরুষের গর্ভবতী শামুকের স্মৃতি
পদ্মপাতায় জমে থাকে রক্ত আর দীর্ঘশ্বাস
বীজখেতে শৃঙ্গার ও লবণ, ঘন নীল অন্ধকারে
শঙ্খচূড় আমিও, তৃষাতুর ঠোঁট নিয়ে মৃত্তিকায়
মৃত নারীর শয্যায় হাঁটুমুড়ে কাঁদছি স্পর্শহীন
কুয়াশায় ভিজে গেছে মাঠ, শ্মশানে শীৎকার
রুদ্রাক্ষের মালা হাতে নবীন নারী আর তাদের
পদ্মযোনি, বটের গাছের নিচে বংশী বাজিতেছে
মাতৃদুগ্ধে তুমি পুরুষের চোখ ধুয়ে দিয়ে যাও