আমরা আর কতকাল উদাসীন থাকব?

বিজ্ঞাপন
default-image

সকাল সাড়ে ৯টায় চাঁদপুরগামী ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় ৫০ যাত্রীসহ ফরাশগঞ্জ ঘাটে ডুবে যায় মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা মর্নিং বার্ড। বিকেল ৫টার দিকে যখন এই লেখা লিখছি, নৌবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ দিনভর উদ্ধারকাজ চালিয়ে ৩২ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। এর মধ্যে ৩টি শিশু, আর বাকি লাশের মধ্যে রয়েছে ৮ নারী ও ১৯ জন পুরুষ। মিটফোর্ড হাসপাতালে মারা গেছেন আরও দুজন। সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ঘটনাটি দেখে তাঁর পরিকল্পিত মনে হয়েছে। নিহত প্রত্যেক পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ দেড় লাখ টাকা করে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। আটক করা হয়েছে ময়ূর-২। চালক পলাতক।

আমার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে। লঞ্চেই যাতায়াত। লঞ্চডুবিতে কোনো এক বা একাধিক সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন, এমন কয়েকটি পরিবার আমার পরিচিত। সাংবাদিকতার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বেশ কয়েকটি লঞ্চডুবি কাভার করেছি। লঞ্চডুবিতে উদ্ধার অভিযান মানে মূলত ডুবুরিদের লাশ উদ্ধার, উদ্ধারকারী যান আসতে কত ঘণ্টা বা কত দিন লাগবে তার অপেক্ষা, পাড়ে সারি সারি লাশ থেকে কোনটা নিজের স্বজনের লাশ, তা মিলিয়ে দেখার দুঃসহ অভিজ্ঞতা, পরের কয়েক দিন দূরদূরান্ত থেকে লাশ উদ্ধারের খবর পেয়ে স্বজনদের দক্ষিণের নদীর দিকে ছোটা, একপর্যায়ে আর লাশ দেখে চেনা যায় না, তখন পরনের পোশাক দেখে চেনার চেষ্টা।

২০০৩ সালের ৮ জুলাই রাত ১১টার দিকে চাঁদপুরের মেঘনা মোহনার ঘূর্ণিতে ডুবে যায় এমভি নাসরিন-১ লঞ্চটি। মধ্যরাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখি তখনো স্থানীয় লোকজন ও প্রশাসন নৌকা দিয়ে ভেসে ওঠা লাশ তুলে তীরে জড়ো করে রাখছে। মোট ৮০০টি লাশ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ ছিলেন কমপক্ষে ৩০০ জন। লঞ্চটিতে ধারণক্ষমতার বেশি যাত্রী ছাড়াও টিনসহ বিভিন্ন মালামাল বহন করা হয়েছিল। এই দুর্ঘটনায় ৪০২টি পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য মারা যান। পরিবারগুলোকে ২০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয়েছিল ট্রাস্ট ফান্ড থেকে। সেই ট্রাস্ট ফান্ডে টাকা আসত যাত্রীভাড়া থেকে ২০ টাকা আর ঢাকা সদরঘাট টার্মিনালে ঢোকার টিকিট থেকে ২ টাকা করে। তখন নৌযাত্রীদের জন্য বিমার ব্যবস্থা ছিল না।

মনে আছে, পরের দিন ৯ জুলাই মাঝরাতে হোটেল থেকে ক্যামেরাম্যান মধু ত্রিপুরাকে সঙ্গে নিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখি একটা ১০–১২ বছরের ছেলে বসে ফুঁফিয়ে কাঁদছে। জিজ্ঞেস করে জেনেছিলাম এই লঞ্চে তার মা, বাবা আর ছোট বোন ফিরছিল। খবর শুনে সে লালমোহন থেকে এসেছে চাচাকে সঙ্গে নিয়ে। মা, বাবা, বোনের লাশ তখনো পাওয়া যায়নি। জানতাম, উদ্ধারকারী যান হামজা-রুস্তম বরিশালে ছিল তখন। প্রবল স্রোতের কারণে আসতে আরও দেরি হবে। কত দেরি হবে, তা-ও নির্দিষ্ট নয়। তাকে পেছনে ফেলে টার্মিনালের দিকে গিয়ে দেখি একটা তিনতলা লঞ্চ দাঁড় করানো। তাতে উঠে দেখলাম, কাপড়, চাটাইমোড়া লাশের সারি রয়েছে প্রতি তলায়। লাশে পচন ধরেছে, পরদিনই ভোলায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

>যখন একটি লঞ্চ দুর্ঘটনা হয়, একের পর এক মানুষগুলো লাশ হয়ে ফেরে, আমরা সরব হই। তারপর আবার চুপ। নীরবতা। এই লঞ্চ দুর্ঘটনার কথাও কি আমরা কাল বা পরশু ভুলে যাব?

এখানে বলতেই হবে, ২০০৫ সালের পর ভোলা বা বরিশাল রুটে আধুনিক অনেক জাহাজ চালুর পর সাধারণ যাত্রীদের দুশ্চিন্তা কমেছে। যদিও এর আগের কয়েক বছরে পরপর কয়েকটি মর্মান্তিক লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু নৌরুটে যাঁরা নিয়মিত চলাচল করেন, তাঁরা জানেন নৌযাত্রার নিত্য ঝক্কির ধরন কী! সব খবর তো আর সংবাদমাধ্যমে আসে না। যাত্রী তুলতে কার আগে কে পরবর্তী ঘাটে পৌঁছবে—এই ভয়ংকর পাল্লা পুরো পথেই চলে। আর পন্টুনে অন্য লঞ্চকে বেকায়দায় রাখতে বাঁকা করে রাখা, পেছনের লঞ্চের ধাক্কা দিয়ে জায়গা করার সময় ছোটখাটো দুর্ঘটনা তো নিত্যদিনের। এ ছাড়া কিছু রুটে লঞ্চ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্যবসা ও রাজনীতিগত স্থায়ী শত্রুতাও আছে। ওগুলো নদীর মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও দৌড়ের পাল্লা খেলে। সদরঘাটে গেলে পাঠকেরাও হয়তো লঞ্চগুলোর দেহে এর চিহ্ন খুঁজে পাবেন। আর মুখোমুখি সংঘর্ষ গত বছরও ঘটেছিল। ৭ ডিসেম্বর চর কিশোরগঞ্জে বোগদাদিয়া-১৩-এর পেটে ধাক্কা মারে এমভি মানিক-৪। ফলে তাৎক্ষণিক মৃত্যু ১ জনের, গুরুতর আহত ১৫ জন।

২০০৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি অল্প সময়ের কালবৈশাখীতে নারায়ণগঞ্জের পাগলায় ডুবে যায় এমভি মহারাজ। নানা বয়সের দুই শতাধিক লোকের সলিল সমাধি ঘটে এতে। এ লঞ্চে চাঁদপুর, শরীয়তপুর ও ভোলার যাত্রী ছিলেন। তবে সন্ধ্যার অল্প আলোতে অনেকে সাঁতরে জীবন বাঁচাতে পেরেছিলেন। নদীর পাড়ে তাঁদের মধ্যে বরযাত্রীদের কয়েকজনকে পেয়েছিলাম। তাঁরা শরীয়তপুর ফিরছিলেন। আরেকটু এগিয়ে একটা ছোট মাঠের পাশে শ্রমিকদের সপরিবার থাকার খুপরির মতো কয়েকটা ঘর ছিল। কয়েকজন সাঁতরে উঠে ওখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে বিলাপরত এক নারীর সম্পর্কে জানলাম, সাঁতরে সাঁতরে প্রায় বিবস্ত্র উঠে এসেছেন তিনি, স্থানীয় লোকজন তাঁকে এখানে নিয়ে এসে কাপড় দিয়েছেন। তিনি আমাকে জানালেন, লঞ্চডুবিতে তাঁর স্বামীসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্য হারিয়েছেন। তিনি সদ্য বিবাহিতা। তাঁকে জানালাম, তাঁর পরিবারের কয়েকজনের সঙ্গে বোধ হয় দেখা হয়েছে। ক্যাসেট রিউইন্ড করে দেখাতেই এইটা আমার স্বামী এইটা, আমার স্বামী বলে চিৎকার করে উঠলেন। তাঁর সেদিনের সাদাটে মুখে প্রাণ ফিরে আসার দৃশ্যটা কখনো ভুলতে পারি না।

পরের দিন পাগলার ম্যারি এন্ডারসন এলাকার নদীজুড়ে একটু পরপর ভেসে থাকা লাশের দিকে দৃষ্টি ফেলে দেখে, এমন সাধ্য ছিল কার। তদন্ত রিপোর্টে লঞ্চটির নকশায় ত্রুটি ও ফিটনেস ছিল না উল্লেখ করা হয়েছিল।

২০০৪ সালের ২৩ মে চাঁদপুরে ঝড়ে পড়ে নিমজ্জিত হয় এমভি লাইটিং সান। এখানে যাত্রী ছিলেন শিল্পী ও চিত্রগ্রাহক সুমন শামসের মা আছিয়া খাতুন। তিনি মারা যান। মায়ের মৃত্যু শোক তাঁকে নৌ খাতের দুর্ঘটনা হ্রাস করতে করণীয় ঠিক করতে এবং এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সজাগ করতে ব্রতী করে। তিনি দীর্ঘদিন মনোবৈকল্যে ভোগার পর ২০১০ সাল থেকে ‘নোঙ্গর’ নামে একটি পত্রিকা বের করেন নৌ খাতের বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে। আজকের দুর্ঘটনার পর কথা বলেছিলাম তাঁর সঙ্গে। সুমন শামস বললেন, ‘আমার মা যে লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যান, সেই লঞ্চে ৫৬টি তালি ছিল। তদন্ত রিপোর্টে এসেছিল। আমি মা নিহত হওয়ার তারিখে প্রতিবছর পত্রিকাটি বের করি। আমরা সব সময় বলে আসছি ব্যবস্থাপনা কঠোর করতে হবে। নকশা, নির্মাণ ত্রুটি, ফিটসেসের অভাব আগের দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চগুলোর কমন বৈশিষ্ট্য ছিল। এখনো অধিক যাত্রী তোলা একরকম প্রকাশ্য। আসলে একধরনের আপস হয়ে যায় সবখানে।’

সুমন শামস বললেন, ‘ছোট লঞ্চ বড় নদীতে চলাচল বন্ধ করা জরুরি। আর বিমা বিষয়ে কয়েকজন লঞ্চমালিকের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, নৌযাত্রীদের জন্য বিমাব্যবস্থা এখনো নেই। আগেও ছিল না।’

যখন একটি লঞ্চ দুর্ঘটনা হয়, একের পর এক মানুষগুলো লাশ হয়ে ফেরে, আমরা সরব হই। তারপর আবার চুপ। নীরবতা। এই লঞ্চ দুর্ঘটনার কথাও কি আমরা কাল বা পরশু ভুলে যাব?

লেখাটি শেষ করতে চাই রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা দিয়ে:

‘দূর হতে কি শুনিস মৃত্যুর গর্জন, ওরে দীন,

ওরে উদাসীন—।’

আমরা আর কতকাল উদাসীন থাকব?


অন্য আলোতে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন