আনিসুল হকের আত্মপ্রতিকৃতি অবলম্বনে কোলাজ
আনিসুল হকের আত্মপ্রতিকৃতি অবলম্বনে কোলাজ

আমার শৈশব মানে রংপুরে শীতভোর, কুয়াশার সাদা চাদরে মোড়া। টিনের চালে সারা রাত শিশির পড়ত, গাছের পাতা থেকে টুপটুপ করে, আমরা আসলেই শিশিরের শব্দ শুনতে পেতাম। আমার কৈশোর মানে সকাল ১০টা, আঙিনায় মাদুর পেতে কবিতা পড়া, সামনের খোলা মাঠে চোরকাঁটার রাজ্যে ফড়িংয়ের মেলা; কাঁটাগুল্মে হলুদ ফুল; তাতে সাদা প্রজাপতি পাতা মেলে আর বন্ধ করে, ছটফট, চোখের পাতার মতো। আমার বয়ঃসন্ধি মানে সকাল ১১টা, বাড়ির সামনের কাঁঠালগাছ থেকে ঝরছে এঁচোড়, বাতাসে মুকুলের ঝরে পড়া মাদকতাভরা গন্ধ, আর আমি শজনেতলায় ছোট্ট টুলে বসে চিৎকার করে পড়ছি, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও মুকুল গুহের অনুবাদে ‘দুয়িনো এলিজি’। পাশের বাড়ির মহিলা আমাকে দেখিয়ে বলছেন, এই বাড়ির একটা ছেলে পাগল!
আমাদের কৈশোরে আমি সত্যি সত্যি রোদ্দুরের গন্ধ পেতাম হেমন্তের বিকেলে, রোদের রং ছিল হলুদ, মাঠে বাঁকা হয়ে হেলে পড়ত রোদ, সেই রোদের গন্ধ আমি আজও হেমন্ত এলে পাই। গোঁফের আভাস নাকের নিচে, আর কবিতার কামড়ে অস্থির হয়ে আছি। কাকে বলে কবিতা, বসন্তে শিমুলডালে আগুন লাগে, তারপর সাদা তুলা উড়তে থাকে বাতাসে, কাকে বলে কবিতা? ছবি আঁকতে বসি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দিই, ছবি যে আঁকব, রং কই? আমার একটা শার্ট, একটা প্যান্ট, একজোড়া বাটার স্যান্ডেল, বাহুল্য বলতে সংসারে কিছু ছিল না; লাউয়ের খোসা কাজে লাগত; সেই সব দিনে পুঁইশাকের বিচি দিয়ে রং বানাতাম, আর হলুদ গাঁদার মতো একটা ফুল, যার পাপড়ির সারি মাত্র একটা, নাম জানি না, তাতে খুব ভালো হলুদ রং হতো, সেসব দিয়ে লেখার খাতায় ছবি এঁকে রাখতাম।
কে অভিশাপ দিয়েছিল? সেই পড়িশিনী? যিনি আমাকে বলেছিলেন পাগল! একটা ছেলে একা একা বিড়বিড় করে, একা একা কবিতা পড়ে রোদ্দুরে টুল পেতে বসে, চিৎকার করে, কে, যদি আমি চিৎকার করে উঠি, দেবদূত অনুশাসনের মধ্যে আমার কথা শুনবে? ‘দুয়িনো এলিজি’। এখন গল্প লিখি, উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি, একটা করে শব্দের সঙ্গে এক ফোঁটা করে রক্ত মিশিয়ে দিই, আর কবিতার প্রতি অক্ষরের সঙ্গে মিশিয়ে দিই এক দিনের আয়ু, খানিকটা দীর্ঘশ্বাস, কয়েক ফোঁটা অশ্রু, আর অনেকগুলো স্বপ্ন থেকে নিংড়ে আনা রং।

বিজ্ঞাপন

আমি শিল্পী নই, কিন্তু ছবি–রংতুলি দেখলে হাত আপনিই ছুটে যায়; আমি লেখক নই, কিন্তু লিখতে লিখতে লিখতে আয়ু ক্ষয় করে ফেললাম, আমি কবি নই, কিন্তু আমার স্বপ্নগুলোকে আকার দিতে জীবনপাত করে যেতে রাজি আছি। একটা জীবন কিছুই করলাম না, নিজের মতো করে জীবনটাই যাপন করলাম না। বড় দুঃখী একটা মানুষ আমি। আমার সেই দুঃখ আমি ভুলে যাই, যখন আমি লিখি, যখন আমি আঁকি! লেখা আর আঁকা আসলে মেডিটেশন। আমি জানি কিছুই হয় না। আমার না-হওয়াগুলোকেই এইখানে কবি তারিক সুজাতের হাতে ধরে জার্নিম্যানের দুই মলাটে খানিকটা রেখে দিই।

এইখানে ধরে রাখা দীর্ঘশ্বাসগুলো, রোদের রংটুকু, শিশিরের শব্দটুকু আমার পরিত্রাণ, আমার নির্বাণ। এতটুকুনের জন্য আমি ইঞ্জিনিয়ারিং ছেড়ে এসেছি, কিন্তু বহু কিছু যে ছাড়িনি, তার শাস্তিও তো আমাকে পেতে হবে।

default-image

মিরোস্লাভ হোলুবের এই কবিতাটা আমি শিরোধার্য করে রেখেছি: শিল্পী হওয়া মানেই ব্যর্থ হওয়া, আর শিল্প মাত্রই ব্যর্থতার বশংবদ—যেমনটা বলেছেন, স্যামুয়েল বেকেট—কবিতা তবুও মানুষের শেষ কাজগুলোর নয়, প্রথম কাজগুলোর অন্যতম। (অনুবাদ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকের সংলাপ:
অধ্যাপক। তত্ত্বের ওপর রাগ করা মিছে। সে ভালোও নয়, মন্দও নয়। যেটা হয় সেটা হয়। তার বিরুদ্ধে যাও তো হওয়ার বিরুদ্ধে যাবে।
নন্দিনী। এই যদি মানুষের হওয়ার রাস্তা হয়, তাহলে চাইনে আমি হওয়া—

দুই.
সারা ডেনিজ আকন্ত আমার এই কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন। তিনি নিউইয়র্কের কবি। ২০১০ সালে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা যখন লেখক কর্মসূচিতে যাই, তাঁর ওপরে ভার পড়েছিল আমার কবিতা অনুবাদের। তিনি ছিলেন এমএফএ ক্লাসের শিক্ষার্থী। তিনি বাংলা জানেন না। আমার ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি’ কবিতাটা নিয়ে গিয়ে সারা রাত ইউটিউবে আবৃত্তি শুনেছেন, আর গুগলের মাধ্যমে শব্দের অর্থ খুঁজেছেন।

কে অভিশাপ দিয়েছিল? সেই পড়িশিনী? যিনি আমাকে বলেছিলেন পাগল! একটা ছেলে একা একা বিড়বিড় করে, একা একা কবিতা পড়ে রোদ্দুরে টুল পেতে বসে, চিৎকার করে, কে, যদি আমি চিৎকার করে উঠি, দেবদূত অনুশাসনের মধ্যে আমার কথা শুনবে? ‘দুয়িনো এলিজি’। এখন গল্প লিখি, উপন্যাস লেখার চেষ্টা করি, একটা করে শব্দের সঙ্গে এক ফোঁটা করে রক্ত মিশিয়ে দিই, আর কবিতার প্রতি অক্ষরের সঙ্গে মিশিয়ে দিই এক দিনের আয়ু, খানিকটা দীর্ঘশ্বাস, কয়েক ফোঁটা অশ্রু, আর অনেকগুলো স্বপ্ন থেকে নিংড়ে আনা রং।

পরের দিন আমাকে বললেন, তোমার এই যে বারবার হবি, হবি, বি, বি—এটা আমি কবিতায় আনতে চাই। কী সুন্দর করে অনুবাদ করলেন, উইল ইউ বি, উইল ইউ বি...আমি তাঁকে বললাম, তুমি এত কষ্ট কোরো না। আমি তোমাকে আমার মতো করে ইংরেজি করে দিই, তুমি শুনে শুনে পারফেক্ট অনুবাদ তোমার মতো করে করো।

আমরা রোজ বসতাম একটা কফি শপে। আমি খেতাম হট চকলেট। তিনি কিছু খেতেন না। এইভাবে এই কবিতাগুলো অনুবাদ করা। পরে যখন তাঁদের ক্লাসে সবার সামনে এগুলো তিনি পড়ে শোনালেন, আমি আমেরিকান তরুণ শ্রোতাদের জিজ্ঞেস করলাম, কোনটা তোমাদের সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে। ওরা বলল, ওই যে তোমার মায়ের কবিতাটা, তুমি খাও, আর খাবার তোমার মায়ের স্টমাকে গিয়ে ল্যান্ড করে। আমাদের মায়েরাও এমনই। আমরা বাড়ি গেলে খেতে দিয়ে আমাদের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন।
সারা পৃথিবীর মা কি একই রকমের হয়?

বিজ্ঞাপন
default-image

তিন.
আমার কবিতা, সারা ডেনিজ আকন্তের অনুবাদ, আর আমার কিছু আঁকা নিয়ে তারিক সুজাতের কল্যাণে এই বই। রবীন্দ্রনাথের আলোচনায় একটা সুন্দর শব্দ পেলাম—ছবিতা। আমার বেলায় কি আর এত সুন্দর শব্দ ব্যবহার করা সংগত হবে! আপনাদের প্রশ্রয় আমি সব সময় পেয়ে এসেছি, এইবারও পাবার আশা আমার যাচ্ছে না। সেই ভরসায় আমার এই ‘না-হওয়াগুলো’কে আপনাদের সামনে কুণ্ঠিতচিত্তে হাজির করছি।
(জার্নিম্যান বুকস থেকে প্রকাশিতব্য ‘তুই কি আমার দুঃখ হবি— Will You be My Sorrow’ শিরোনামের কবিতা ও ছবির বইয়ের ভূমিকা)


অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন