শিরোনাম দেখে অবাক হচ্ছেন...তাই না? তবে আসুন গল্পটাই জেনে নিই।

মায়ের কাছ থেকে শুনেছি, যেদিন আমার জন্ম, সেদিন নাকি বাবার মালয়েশিয়া যাওয়ার ফ্লাইট ছিল, তাই জন্মের পরপরই বাবার কোলে চড়ে বসে রাজকন্যার মতো ভালোবাসা পাওয়া হয়ে ওঠেনি। তার ওপর পরিবারের তৃতীয় কন্যা হিসেবে আমার জন্ম, যেখানে সবাই ধরেই নিয়েছিল এবার বুঝি পুত্রসন্তানের আগমন হবে। মাসহ বাড়িসুদ্ধ সবাই আশাহত। তবে মায়ের মুখে শুনেছি, বাবা যখন আমার পৃথিবীতে আসার খবর শুনেছেন, তখন কষ্ট না পেয়ে বরং খুশি হয়েই বলেছিলেন, ‘সবাই তো ফুলের মালা পরে, আমি না হয় কন্যামালা পরব।’ আমার কাছে বাবা মানেই ছিল কয়েকটা ফটোগ্রাফ, যাতে দেখতে পেতাম একজন লম্বা, চওড়া, সুদর্শন মানুষ আর মাসে একবার টেলিফোনে দূর-বহুদূর থেকে ভেসে আসা একটা শ্রুতিমধুর কণ্ঠস্বর। জীবনের ছয় বছর অবধি বাবার গল্পটা আমার এমনই ছিল।

ছোটবেলায় যখন বাচ্চারা অক্ষর শেখে অধীর আগ্রহ নিয়ে, সে বিষয়ে আমি ছিলাম একেবারে অনাগ্রহী, তখন মা আমায় বলতেন, ‘পড়ালেখা না শিখলে বাবাকে চিঠি কী করে লিখবি।’ সেই থেকে আমি অক্ষর শিখতে শুরু করলাম। মনে আছে, আমার খাতাগুলোতে পড়ালেখার বদলে বাবাকে চিঠি লেখার চেষ্টাই বেশি করতাম। আমার বয়স যখন ছয়, তখন একদিন হঠাৎ মামা এসে বলল, পিংকু, তোর বাবা আসবে আজ রাতে। ঠিক শব্দ দিয়ে সেই অনুভূতিটা প্রকাশ করার মতো শব্দ আমার কাছে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি অত্যধিক খুশি হয়েছিলাম। তারপর এল সেই প্রত্যাশিত সময়—বাবা এল...আমার বাবা এল, আমার সেই স্বপ্নে দেখা বাবা। ঘরভর্তি মানুষ, একান্নবর্তী পরিবারের ছোট-বড় সবাই বাবাকে ঘিরে ধরেছে, তবে সেই ২০-৩০ জন মানুষের ভিড়ে এক জোড়া চোখ কেবল বাবাকেই দেখছিল, বাবা তা টেরই পায়নি। ছোটবেলা থেকে ফটোগ্রাফে দেখা মানুষটাকে কাছে পেয়েও কেন জানি বাবা বাবা লাগছিল না। সেদিন এক বুকভরা অভিমান নিয়ে কান্না চোখে সরে গিয়েছিলাম সবার অগোচরে।
খুব কষ্ট হচ্ছিল, এত মানুষের মধ্যে বাবা আমাকে চিনলই না—কাছে টেনে নেওয়া তো দূরের কথা। পরিবারের সবার সঙ্গে সময় কাটানোর পর বাবা যখন আমাদের কাছে এল, আপুরা কাছে গেলেও আমি যাইনি। এখনো মনে আছে, আমি একদমই তাঁর কাছে যেতাম না, শতচেষ্টাতেও স্বাভাবিক হইনি। বাবা-মেয়ের ওই প্রথম দেখায় তৈরি হওয়া দেয়ালটা ভাঙতে পুরো মাস লেগেছিল। ধীরে ধীরে আমি স্বাভাবিক হতে লাগলাম আর বাবা চরিত্রটার সঙ্গে পরিচিত হতে লাগলাম। একটু একটু করে আমাদের সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়েছিল, তবে কোথাও যেন একটা অদৃশ্য দেয়াল কাজ করত, ঠিক অন্য আট-দশটা বাবা-মেয়ের মতো অতটা সাবলীল ছিলাম না আমি। নিজেকে গুটিয়ে রাখতেই বেশি ভালোবাসতাম। এভাবেই চলছিল ২০১২ সাল অবধি।

২০১২ সালে ছোট আপুর বিয়ের পর থেকে বাড়িতে কেবল মা, বাবা আর আমি। নতুন শুরুটা তখনই হয়েছিল। সেই থেকেই আমাদের বন্ধুত্বের শুরু, হয়ে গেলাম তাঁর ছায়াসঙ্গী, তাঁর সঙ্গে চায়ের আড্ডায় মেতে ওঠার সঙ্গী। সেই থেকে সম্পর্কটা একদম পাল্টে গেল। বাবা যখন খেতে বসতেন তখন নিজের খাওয়া বন্ধ করে আমার প্লেটে তাকিয়ে থাকতেন। স্বভাবতই আমি একটু কম খাই, তাই আমাকে খাওয়ানোর জন্য বায়না ধরতেন কৌশলে। বলতেন, আমরা সমান ভাগে ভাগ করে খাব আর তুই না খেলে আমিও খাব না। খাব না বলেই থেমে থাকতেন না, সত্যিই খেতেন না। তাই বাধ্য হয়েই আমায় খেতে হতো। যতক্ষণ আমি কলেজ থেকে না ফিরতাম, বাবা স্বস্তি পেতেন না। কোথাও যাওয়ার আগে বলতেন, আজ কোন পাঞ্জাবিটা পরলে ভালো হবে বল তো? ঝগড়াঝাঁটি, খুনসুটি, তর্কবিতর্কে কেটে যেত এক অসম বয়সী বন্ধুত্বের গল্প।

আমার রান্নার হাতেখড়িটাও বাবার জন্যই। আপুদের বিয়ের পর মাকে বেশির ভাগ সময় আপুদের কাছেই থাকতে হতো, বাড়িতে কেবল আমি, বাবা আর সুমনা। তাই রান্না নিজেদেরই করতে হতো। ওহ, ভুলেই গেছি...সুমনার কথা বলা হয়নি।ও আমার সব থেকে প্রিয় ছোট বোন। অনেকেই বলে বাবার দত্তক নেওয়া কন্যা, আমাদের তৃতীয় সঙ্গী। যখন প্রথম কাঁপা হাতে রান্না শুরু করলাম, বাবা বললেন, ‘ভয়ের কী আছে, বড়জোর রান্না খারাপ হবে! তাতে কী? বরং জানা হবে কেন খারাপ হলো। পরের রান্নায় সেই ভুলটা না হলেই হলো, এভাবেই ভুল থেকে শেখা যাবে, তা ছাড়া আমি তো আছিই।’ সেই থেকে আমি রান্না নিয়ে আর ভাবিনি, তবে ভুল হলে বাবা ধরিয়ে দিতেন। এখন সবাই বলে আমার রান্না নাকি ভালোই। আমাদের মধ্যে যে ব্যাপারটা ভীষণ কমন ছিল, তা হলো চা। আমরা দুজনেই চা-খোর। চা নিয়ে বাবার মধ্যে একটা অদ্ভুত ছেলেমানুষি ছিল। তিনি বরাবরই আমার চায়ের কাপে ভাগ বসিয়ে বেশি আনন্দ পেতেন। আর অন্য কারোর করা চা খেয়ে তৃপ্তি পেতেন না। বলতেন, আমার ছোট মেয়ের চায়ের মতো স্বাদ পাওয়া যায় না কারোর চায়ে, এমনকি আপুদেরও। যেকোনো রান্নার ক্ষেত্রেও বাবা বলতেন, আমিই নাকি ভালো জানি বাবা কোন খাবারটা কীভাবে খেতে ভালোবাসেন। কিন্তু আমাদের পরিবারের সবার রান্নাই ভালো, মা-আপু সবার। তাও বাবা কেন এই ছেলেমানুষিটা করতেন, তার কারণ আমার অজানা। একদিন আমার খুব কাছের একজন বন্ধু প্রশ্ন করেছিল, কার সঙ্গে চায়ের আড্ডায় বেশি আনন্দ পাস কিংবা এক কাপ চায়ে কাকে চাই’—সেদিন আমি কোনো সময় ব্যয় না করেই বলেছিলাম ‘বাবাকে’! এই ছিল আমাদের ‘এক কাপ চায়ের গল্প’।

যখন মাঝেমধ্যে শাড়ি পরতাম, বাবা বলতেন আমায় নাকি ঠিক তাঁর মায়ের মতো লাগছে। সব বাবারই কি মেয়েদের মধ্যে নিজের মাকে দেখতে পান। একদিন বাবা এক কাণ্ড করে বসলেন, আমি খুব কমই কোথাও যেতাম। কারণ, বাবার একদমই পছন্দ ছিল না। তা ছাড়া আমার তেমন ভালোও লাগত না, তবে বান্ধবী জোর করায় তার সঙ্গে কলেজ শেষ করে ওদের বাসায় চলে গিয়েছিলাম। বাবাকে যখন ফোনে কথাটা জানাই, তিনি কেমন জানি চুপ হয়ে গিয়েছিলেন, বিশ্বাসই করছিলেন না। বারবার বলেছিলেন, আমি নাকি মজা করছি। তিনি মানতেই পারছিলেন না যে আমি তাঁকে না বলে কোথাও যেতে পারি। পরে অবশ্য আমি নিজের ভুল বুঝতে পারি যে আমার বাবাকে না বলে যাওয়া ঠিক হয়নি। যাহোক, চলে যখন গিয়েছি, কিছুই করার ছিল না, ভাবলাম সকালেই তো বাড়ি যাব। অত চিন্তার কী আছে। সেদিন বাবা আমায় প্রতি আধা ঘণ্টায় ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছিলেন। বান্ধবী এবং তার পরিবারের সবাই তো ভীষণ অবাক বাবার আচরণ দেখে, আন্টি তো বলেই বসলেন আর কারোর কি মেয়ে নাই নাকি; এমন কেন করছেন তোমার বাবা!

কোনো রকমে রাতটা শেষ হয়েছিল, তবে সত্যি বলতে আমারও বাবার জন্য ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল এবং আমি সব ভুলে কেঁদেই দিয়েছিলাম। আমাদের বাবা-মেয়ের এই অবস্থা দেখে আমার বান্ধবী বলল, ‘আমার ভীষণ ভুল হয়ে গেছে, আর কখনো তোকে আসতে বলব না।’ রাতটা কীভাবে কেটেছিল মনে নেই, তবে পরদিন সকালে ঘুম ভেঙে দেখি ‘আব্বু’। আমাকে নিয়ে আসার জন্য হাজির।

এভাবেই কাটছিল আমাদের সুখের জীবন, তবে বলে না সুখ বেশি দিন কপালে সয় না। কথাটা একদম সত্যি!
২০১৮ সালে আমার বিবিএ শেষ হলো। পরিকল্পনা অনুযায়ী এমবিএর জন্য ঢাকায় যাব। সময়টা জুলাই মাস। বাবারও ইচ্ছে ছিল আমি ঢাকায় শিফট করলে তিনিও আমার সঙ্গেই থাকবেন। আমরা একসঙ্গেই থাকব, কিন্তু সময়মতো সব গুছিয়ে উঠতে না পারায় আমাকে ভর্তি করিয়েই বাবাকে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল। ও হ্যাঁ, ভর্তির জন্য আমার একাই যাওয়ার কথা ছিল, তবে আমায় বাসে তুলতে এসে কী মনে করে বাস থেকে না নেমে পরার পাজামা-পাঞ্জাবি পরেই আমার সঙ্গে রওনা দিলেন। মনে মনে আমি অনেক অবাক হয়েছিলাম।

এর কয়েক দিনের মধ্যেই আমি সাইফুর’স-এ ভর্তি হয়ে গেলাম। এখন আব্বুর ফেরার সময় ছিল আর আমাকে আপুর বাসায় রেখে আসতে গিয়ে আব্বু এতটা ভেঙে পড়বেন, আমি ভাবিনি। তিনি কেঁদেই দিলেন, সেই সঙ্গে আমি আর আপুও কাঁদছি। তখন যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতাম আমাদের গল্পটা শেষের দিকে, তবে ওভাবে বাবাকে একা ফিরতেই দিতাম না। কিন্তু কথায় আছে না, ‘নিয়তির লেখন না যায় খণ্ডন’। বাবার যে সবটুকু ঘিরে কেবল তাঁর মেয়েরাই, তা সবাই বুঝতে পারত, তবে আমাদের ছেড়ে বাবা এত ভেঙে পড়বেন, তা কখনো ভাবিনি আমরা। কারণ, জানতাম আমাদের বাবা বরাবরই ভীষণ বাস্তববাদী, মজবুত মনের অধিকারী ছিলেন।

আমি চলে যাওয়ার পর বাবা ভীষণ একা হয়ে পড়লেন, ঘর থেকে বের হওয়া কমিয়ে দিলেন, মানুষের সঙ্গে মেলামেশাও কমিয়ে দিলেন। দিনে আমাকে তিন থেকে চারবার ফোন দিতেন, বুঝতে পেতাম, বাবা ভীষণ একাকিত্বে ভুগছেন। এভাবে প্রায় মাস দেড়েক কাটল, দেড় মাস পর আমি বাড়ি এসে চমকে গেলাম। বাবা ভীষণ শুকিয়ে গেছেন, আর কেমন জানি হয়ে গেছেন।

>তাড়াতাড়ি আব্বুকে হাসপাতালে নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত তখন সারা দেশে সড়ক অবরোধ চলছে, কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে একটা রিকশায় করে আমি আর ছোট আপু আব্বুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলাম। রিকশায় বসা অবস্থাতেও আব্বু দুই হাতে আমাদের দুই বোনকে ধরে রেখেছেন আর বলছেন, ‘আব্বুকে শক্ত করে ধর, পড়ে যাবি।

বাড়িতে আমাদের সময়টা ভালোই কাটছিল। এক সপ্তাহের মতো থেকে আমি আবার ফিরে গেলাম। আব্বু আবার একা হয়ে পড়লেন, তবে এবার আরও খারাপভাবে। মা বললেন, বাবা নাকি সকালে ঘুম থকে উঠেই আমার রুমে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকতেন, রুমের জানালা খুলে দিতেন। আমার বিছানায় শুয়ে থাকতেন। এসবই মা জানতেন, তবে আমাদের কাউকে জানাননি। আমি যে খুব ভালো ছিলাম তা নয়, বাড়ির জন্য মনটা কেমন করত। কষ্ট হতো, একদিন বাবাকে বললাম, ‘আব্বু আমার আপনার জন্য অনেক খারাপ লাগছে।’ উত্তরে আব্বু বললেন, ‘তোদের খারাপ লাগলে তো তোরা আমায় বলতে পারিস, কিন্তু আমি কাকে বলব?’

সেদিন ভীষণভাবে ধাক্কা খেলাম, বাড়ি আসার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। ছোট আপুরও একই অবস্থা, কিন্তু কেন জানি ভাইয়া দিচ্ছিল না। একপর্যায়ে বাড়ি আসা নিয়ে ওদের ঝগড়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে আপু বলল, বাড়ি যাওয়ার অনুমতি না দিলে আমি একেবারে বাড়ি চলে যাব। আর তোমার সংসারে ফিরব না। আপু সত্যিই ব্যাগ গুছিয়ে আমায় বলল, চল এভাবে থাকা আর সম্ভব নয়। আমরা সেদিন সত্যিই বাড়ির জন্য রওনা করেছিলাম। দিনটা ছিল ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮। সেদিন বাড়ির দূরত্বটা ঢাকা থেকে এত বেশি মনে হয়েছিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। বেলা তিনটা নাগাদ আমরা স্টেশনে পৌঁছাই, বরাবরের মতো অনেক দূর থেকে জানালার ফাঁকে একটা অতি চেনা হাস্যোজ্জ্বল মুখ চোখে পড়ল।
আমাদের বাবা!
কিন্তু বাবাকে দেখে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠল। এতটা বিমর্ষ বাবাকে এর আগে কখনো দেখিনি।

বাস থেকে নেমে রিকশায় করে বাড়ি এলাম। বাড়ির উঠানে আসার পরই বাবা আমায় জড়িয়ে ধরলেন আর বললেন, বুকের ভেতরটা খুব ঠান্ডা লাগছে এখন। আমরা দুই বোনই কাঁদছি, এত রোগা, এতটা অসহায় আর বিমর্ষ চেহারা আগে কোনো দিনই দেখিনি বাবার। এখানে একটা কথা বলে রাখি, আব্বুর সঙ্গে এমন কখনো হয়নি যে আমরা তিন বোনের কেউই তাঁর কাছে নেই। মানে বড় আপু না থাকলে ছোট আপু কিংবা আমি। কিন্তু এই প্রথম এমন ঘটল যে আমরা তিন বোনই নেই। বাবাকে আমাদের কাছে পাওয়ার ১৮ বছরে এই প্রথম বাবা তাঁর তিন মেয়েকে না দেখে ২২ দিন ছিলেন। ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২২ অক্টোবর অবধি।

আমরা আসার পরদিনই বড় আপু-ভাইয়া এল। তিন মেয়েকে ফিরে পেয়ে বাবা যেন জীবন ফিরে পেলেন, তখন আমরা কেউ টেরই পাইনি এটাই ছিল আমাদের শেষ সম্মিলন। অজান্তেই জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল অতি মূল্যবান সময়গুলো। ভালোই কাটছিল। ২৬ তারিখ বড় আপু চলে গেল, দিনটা ছিল শুক্রবার। যাওয়ার আগে আপু বলছিল, চল আমরা ছবি তুলি। কারণ, আমরা তিন বোন এক রকমের জামা পরেছিলাম। আব্বুও রাজি। ওটাই ছিল আমাদের সঙ্গে আব্বুর শেষ ছবি।এর দুই দিন পর ২৮ তারিখ রোববার। দুপুর বেলা। আম্মুর কাজ শেষ হয়নি। তাই আমি খাবার বেড়ে আব্বুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মসজিদ থেকে ফিরে আব্বু যখন ঘরে ঢুকছিলেন, তখনই দেখলাম তাঁকে অসুস্থ লাগছে। আপু আর আমি দৌড়ে গেলাম আব্বুর কাছে। আব্বু বিছানায় শুয়ে পড়ে ছটফট করছেন যন্ত্রণায় আর আমরা কিছুই করতে পারছি না।

তাড়াতাড়ি আব্বুকে হাসপাতালে নিতে হবে। দুর্ভাগ্যবশত তখন সারা দেশে সড়ক অবরোধ চলছে, কোনো গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে একটা রিকশায় করে আমি আর ছোট আপু আব্বুকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলাম। রিকশায় বসা অবস্থাতেও আব্বু দুই হাতে আমাদের দুই বোনকে ধরে রেখেছেন আর বলছেন, ‘আব্বুকে শক্ত করে ধর, পড়ে যাবি। আমরা আব্বুকে বলছি, আব্বু সব ঠিক হয়ে যাবে, আল্লাহ ভরসা। হাসপাতালে ডাক্তার বলল, আব্বুর হার্ট অ্যাটাক করেছে, ঢাকায় নিতে হবে।

কিন্তু আমরা নিরুপায়, গাড়ির জন্য নিতে পারছি না। চাঁদপুর থেকে বড় আপু ফোন দিয়ে বলল যে চাঁদপুরে নিতে, সেখান থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় নেওয়া যাবে। আমরা অ্যাম্বুলেন্সে করে আব্বুকে নিয়ে যাচ্ছি, পুরোটা পথ যন্ত্রণায় বাবা কাতরাচ্ছিলেন, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়ব ভেবে একটু বোঝানোর চেষ্টা করেননি। যখন আমরা চাঁদপুর হাসপাতালের সামনে পৌঁছালাম, তখন বড় আপুকে দেখতে পেলাম। লোকজন এসে আব্বুকে নামাতে লাগল কিন্তু আব্বু আপুকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বললেন, ‘মাগো, আমার বুকে বড্ড ব্যথা।’ আমরা সবাই কাঁদছি। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন যে আব্বুর হার্টের ৭০ শতাংশ ব্লক হয়ে গেছে, দ্রুত চিকিৎসা লাগবে। আমি হাসপাতালের কেবিনে আব্বুর কাছে বসে, হঠাৎ আব্বু আমায় বললেন, ‘আব্বুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর, বুকটা ব্যথা করছে।’ আমরা সবাই কাঁদছি। সব কেমন যেন উল্টাপাল্টা লাগছে। এদিকে পরের দিন সকাল ১০টায় আমার বিবিএ মৌখিক পরীক্ষা। কোনো হিসাবই মেলাতে পারছি না।
রাত ১০টা, আব্বু কিছুটা ভালো আছেন। আমাদের তিন বোনের সঙ্গে কথা বলছেন। রাতে বড় আপুকে হাসিমুখেই বিদায় দিয়েছেন। কিন্তু পরের দিনের সকালটা যে আমাদের জন্য এত অন্ধকার হবে, কে জানত। পরদিন সকালে আব্বুর আবার হার্ট অ্যাটাক করল। এটা নাকি মেডিকেল সায়েন্সে খুব কমই হয়। প্রথম অ্যাটাকের পর এত দ্রুত পরের অ্যাটাক হয় না। আমার কিছুই বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি সবে আব্বুকে খাইয়েছি। অ্যাটাকের ১০ মিনিটের মাথায় আব্বুর ব্রেন স্ট্রোক হলো। সব শেষ হয়ে গেল। আমরা সব হারিয়ে ফেললাম!


অন্য আলো অনলাইনে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0