বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমাকে কে চেনে। আমি বলতাম, ভাই, আমার নাম অমুক, আমি লেখালেখি করি, আমাদের এক ডিরেক্টর বন্ধু এখন আপনার থানায় আছে, রাতের বেলা নাকি সোনারগাঁও সিগন্যালে ট্রাফিক কন্ট্রোল করছিল, বোঝেনই তো, শিল্পী মানুষ, একটু অন্য রকম হয়। কখনো কখনো আমার ফোনেও কাজ হতো। কখনো হতো না।
এই রকমই একটা ফোন এল। ফোন করেছেন পরিচালক শরাফ আহমেদ জীবন। রাত ১২টার পরের ফোন মানেই আমি জানি, কেউ একজন গ্রেপ্তার হয়েছে। কে?
জীবন বলল, সর্বনাশ হয়ে গেছে! পুলিশ আবদুল মান্নান সৈয়দকে ধরে থানায় নিয়ে গেছে।

আবদুল মান্নান সৈয়দ, মানে বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক। তাঁকে থানায় নিয়ে গেছে। কেন?

জীবন একটা নাটক বানাচ্ছেন, ‘শেখ আবদুর রহমানের আত্মজীবনী’। সেটা আমি জানি। সেই নাটকে নামভূমিকায় অভিনয় করছেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, সে বিষয়েও আমি তদবির করেছি।

ঘটনা হলো, মাঝরাতে শুটিং শেষে আবদুল মান্নান সৈয়দ ফিরছেন। তাঁর হাতে শুটিংয়ের কাপড়চোপড়-সমেত ট্রাভেল ব্যাগ। তিনি ফিরছেন স্কুটারে। সোনারগাঁওয়ের মোড়ে পুলিশ স্কুটার থামাল।

পুলিশ বলল, ব্যাগে কী আছে? ব্যাগ খোলেন।
ব্যাগ খুলতেই দেখা গেল, ব্যাগের ভেতর একটা পিস্তল।
আমি বলি, পিস্তল এল কোথা থেকে। জীবন জানাল, নাটকের একটা প্রপ হলো এই পিস্তল। কেমন করে যে সেটা মান্নান সৈয়দের ব্যাগে ঢুকে গেছে, কে জানে।
পুলিশ বলল, পিস্তল কোথা থেকে এল?

মান্নান ভাই কবি মানুষ, তিনি তো খুলে বলতে পারতেন, এটা খেলনা পিস্তল, এটা নাটকের উপকরণ। তা না বলে তিনি বললেন, আমি জানি না, মনে হয় কেউ ষড়যন্ত্র করে আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে।

পুলিশ বলল, আপনাকে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
এখন এত রাতে আমি কী করি?

আবদুল মান্নান সৈয়দ মাথা চাপড়ে বলতে লাগলেন, আনিস ষড়যন্ত্র করে আমাকে অ্যারেস্ট করাল। আবার টেলিভিশনের ক্যামেরা পাঠিয়ে দিয়েছে সেটা প্রচার করার জন্য। ও আমার সঙ্গে এত বড় শত্রুতা করতে পারল!

থানায় ফোন করব, থানার নম্বরটা তো দরকার। আমার পরিচিত ক্রাইম রিপোর্টারকে ফোন করলাম। চ্যানেল আইয়ে ফোন করে বললাম, একটু অমুক থানায় লোক পাঠান না। আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো শ্রদ্ধেয় মানুষকে যেন আটকে না রাখে। তাড়াতাড়ি ছাড়ে। শোনেন, এক কাজ করেন। ক্যামেরাসহ রিপোর্টার পাঠান। ক্যামেরা দেখলে পুলিশ তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবে।

আমি ফোন করছি থানায়। আবদুল মান্নান সৈয়দ শুনলেন, আনিসুল হক ফোন করেছে। তাঁর ধারণা হলো, আনিসুল হকই ষড়যন্ত্র করে তাঁর ব্যাগে পিস্তল রেখে তাঁকে গ্রেপ্তার করিয়েছে।

এরপর এল চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা। কে পাঠিয়েছে। আনিসুল হক পাঠিয়েছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দ মাথা চাপড়ে বলতে লাগলেন, আনিস ষড়যন্ত্র করে আমাকে অ্যারেস্ট করাল। আবার টেলিভিশনের ক্যামেরা পাঠিয়ে দিয়েছে সেটা প্রচার করার জন্য। ও আমার সঙ্গে এত বড় শত্রুতা করতে পারল!
যা-ই হোক, মান্নান সৈয়দ ছাড়া পেলেন।

তাঁকে এ কথা বোঝাতে আমার যথেষ্ট কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল যে, আমি তাঁকে উদ্ধার করার জন্য চেষ্টা করছিলাম, আমি তাঁর বন্ধু, শত্রু নই।

পরে আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার ‘শ্রেষ্ঠ উপন্যাস’ বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন।
এবং তাঁর জীবদ্দশায় আমি তাঁর বইয়ের সপ্রশংস রিভিউ লিখেছিলাম। অত্যন্ত সদালাপী মানুষটা যখন আমাদের অফিসে আসতেন, আমরা আড্ডার লোভে তাঁর চারপাশে জড়ো হতাম। খুবই গপ্পু মানুষ ছিলেন।

default-image

আবদুল মান্নান সৈয়দ আমাদের আধুনিকতার সন্ধান দিয়েছিলেন, তাঁর ‘সত্যের মতো বদমাশ’ নামের গল্পগ্রন্থ পড়ে আমরা জেনেছিলাম গল্পের স্পর্ধা কত দূর বিস্তৃত হতে পারে; তাঁর ‘শুদ্ধতম কবি’ পড়ে প্রথম জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কে বিশ্লেষণে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম; তাঁর ‘কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড’ পড়ে কবিতার নতুন দিগন্তের সন্ধান পেয়েছিলাম; এবং তাঁর পরাবাস্তব কবিতা পড়ে জেনেছিলাম পরাবাস্তবতার ইশতেহার সম্পর্কে।

আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে স্মৃতির কথা লিখতে বসে অনেক কিছুই আসলে মনে পড়ছে। মান্নান সৈয়দ মানেই আমার কাছে প্রাণবান একজন মানুষ, শুদ্ধ একজন মানুষ।

মুক্ত গদ্য থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন