হামিদা রহমান: হারিয়ে যাওয়া এক চিঠির লেখক

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘জনাব বড় ভাই, আমার ছালাম জানবেন। নানান কাজের ঝামেলায় আপনার চিঠির উত্তর দিয়ে উঠতে পারি নাই। পরীক্ষা দেওয়ার খুবই ইচ্ছে। কিন্তু কাজের চাপে পড়াশুনা করতে পারি না। দোয়া করবেন। তবুও দেব বলে মনস্থ করেছি।’

মাস কয়েক আগে আমাদের ব্যক্তিগত লাইব্রেরি গোছাতে গিয়ে পুরোনো বইয়ের ভাঁজে হঠাৎ মিলল এই চিঠিখানা। পত্রলেখকের নাম ওপরে বাঁ দিকে ইংরেজিতে ছাপা রয়েছে: মিসেস হামিদা রহমান, এমএ বিটি, হেড মিস্ট্রেস, লেডি প্রতিমা মিত্তার গার্লস হাইস্কুল, চাঁদপুর, কুমিল্লা। চিঠির ডান দিকে লেখা তারিখ: ২৯.১১.১৯৬২।

চৌষট্টি বছরের পুরোনো চিঠি। প্রাপক ‘জনাব বড় ভাই’ নিশ্চয়ই আমার প্রয়াত শ্বশুর জাইন উদ্দিন আহমেদ। আর কে-ই বা হবেন? বাড়িজুড়ে আমার প্রয়াত শ্বশুর–শ্বাশুড়ির স্মৃতিবিজড়িত বইপত্র, আসবাব, চিঠি, অ্যালবাম ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে। মাঝেমধ্যেই এসবের মধ্যে কিছু অমূল্য রতন খুঁজে পেয়ে আমরা চমকে উঠি।

এই চিঠিও তেমনি আমাদের ভাবনায় ফেলে দিল। কে এই হামিদা রহমান? আমার শ্বশুরের সঙ্গে কীভাবে তাঁর পরিচয়? কেউ একজন যেন সঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে পারে, তার জন্য বেশ আস্থা নিয়েই ফর্ম পাঠাচ্ছেন। দাবি নিয়েই বলছেন, সে যেন পরীক্ষাটা দিতে পারে, সে ব্যবস্থা করে দেবেন। মনে হচ্ছে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর সঙ্গে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি নজর কাড়ল চিঠির শুরুর দিককার কথাটা, তাঁর নিজেরই কোনো একটা পরীক্ষা দেওয়ার খুব ইচ্ছা। কিন্তু কাজের চাপে পারছেন না। পত্রলেখক নিজে একজন প্রধান শিক্ষক। এমএ পাস করেছেন বেশ বুঝতে পারছি। আর কী লাগে একজন নারীর জীবনে, সেই সময়? তবু আরও পড়াশোনা করার ইচ্ছা এবং পরীক্ষা দেবেন বলে মনস্থ করেছেন। বেশ একটা দৃঢ় ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে লেখার ভঙ্গিতে। চিঠির ভাষা ও বাক্যচয়ন দেখেই বেশ বুঝতে পারি, তিনি যে–সে কেউ নন। খুবই দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রত্যয়ী এক নারী।

চিঠির নাম ধরে অনুসন্ধান শুরু হলো। পরিবারের একে–ওকে জিজ্ঞেস করে, ইন্টারনেট ঘেঁটে, বন্ধুপ্রতিম কবি পিয়াস মজিদের সঙ্গে কথা বলে যা জানতে পেলাম, তা রীতিমতো অভিভূত হওয়ার মতো। এক হারিয়ে যাওয়া অগ্নিকন্যাকে ক্রমেই আবিষ্কার করলাম যেন।

কে এই হামিদা রহমান? আমার শ্বশুরের সঙ্গে কীভাবে তাঁর পরিচয়? কেউ একজন যেন সঠিক সময়ে পরীক্ষা দিতে পারে, তার জন্য বেশ আস্থা নিয়েই ফর্ম পাঠাচ্ছেন। দাবি নিয়েই বলছেন, সে যেন পরীক্ষাটা দিতে পারে, সে ব্যবস্থা করে দেবেন। মনে হচ্ছে বেশ ঘনিষ্ঠতা ছিল তাঁর সঙ্গে।

১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে নতুন রাষ্ট্র পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা হবে উর্দু, এমন যুক্তিতে কলকাতার আজাদ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এর প্রতিবাদে যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজের আইএ ক্লাসের এক ছাত্রী স্বাধীনতা পত্রিকায় একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছিল ১০ জুলাই ১৯৪৭ সংখ্যায়, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে। চিঠির অংশবিশেষ এখানে তুলে ধরছি:

‘বাঙালি হিসেবে যেমন আমরা পুরো বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের ভেতর দাবি করেছিলাম, তেমনি আজ বাংলাদেশের বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে দাবি করব না কেন?… বাংলার সাড়ে চার কোটি লোক যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় সাহিত্য রচনা করে, যে ভাষায় মনের ভাব ব্যক্ত করে, সে ভাষা তার নিজস্ব ভাষা হবে না, এ–ও কি বিশ্বাস করতে হবে? স্বাধীন পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষার সঙ্গে তাদের প্রাণের কোনো যোগই থাকবে না, এ–ও কি সত্য হবে?’

পত্রিকায় চিঠি লেখা ও কলেজে আইএ পড়া এই তরুণীর নাম হামিদা রহমান। এর পরের বছর, ১৯৪৮ সালে দেখা যাচ্ছে, এই তরুণী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়ে রাজপথে নেমে গেছেন। তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন তিনি। পার্টি থেকে তাঁকে আত্মসমর্পণ করতে বলা হলে তিনি সেটা না করে আত্মগোপনে চলে যান এবং পার্টির কার্ড ফেরত দেন। এই সময়কার কথা জানা যাবে তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ জীবনস্মৃতিতে:

হামিদা রহমান (২৯ জুলাই ১৯২৭—১৪ আগস্ট ২০০৫)

‘১১ মার্চ (১৯৪৮) শহরময় হরতালের ডাক দেওয়া হলো। প্রতিটি স্কুল–কলেজ সেই ধর্মঘটে যোগ দিল। কেবল দিল না যশোরের মোমিন গার্লস স্কুল ও যশোর জিলা স্কুল। তখন যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন নোমানী সাহেব। তাঁর মেয়ে মোমিন গার্লস স্কুলে পড়ত। সে সক্রিয়ভাবেই সব মেয়েকে ধর্মঘটে যোগ দিতে বাধা দিয়েছিল। আমার আজও মনে আছে, মোমিনের মেয়েকে জোরে ধাক্কা দিয়ে সিঁড়ির ওপর থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিলাম। ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরে গিয়েছিল তার, কেউ কেউ বলে, একটি দাঁতও ভেঙে গিয়েছিল। এই ধর্মঘটের পর আমার নামে হুলিয়া জারি হয়। ছাত্রদের নামেও হুলিয়া ছিল। আমরা কজন ছাত্রছাত্রী মিটিংয়ে যোগ দিয়েছিলাম। আমাদের কলেজের বেয়ারা কেশবচন্দ্র সেদিন অত্যন্ত বিপদের ঝুঁকি নিয়ে কলেজের সমস্ত দরজা–জানালা বন্ধ করে কলেজকে একেবারে অন্ধকার করে দিয়েছিল। ওপরের ঘরে একটিমাত্র মোমবাতি জ্বালিয়ে সেদিন আমরা খুব তাড়াতাড়ি মিটিংয়ের কাজ শেষ করি। হোস্টেল থেকে কেশব একটা পাজামা, একটা শার্ট ও একটা গামছা এনে দিয়েছিল আমাকে। আমি শাড়ি বদলে পাজামা ও শার্ট পরে মাথায় গামছা বেঁধে একটা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে কলেজের পিছনের দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।’

অন্ধকারে গোপন মিটিং, পুরুষের পোশাক পরে পালানো, ম্যাজিস্ট্রেটের মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া। চমৎকৃত হতে হতেই জানা ও পড়া অব্যাহত রাখছি। চলুন, জানা যাক এরপর কী হলো।

পত্রিকায় চিঠি লেখা ও কলেজে আইএ পড়া এই তরুণীর নাম হামিদা রহমান। এর পরের বছর, ১৯৪৮ সালে দেখা যাচ্ছে, এই তরুণী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব নিয়ে রাজপথে নেমে গেছেন। তাঁর নামে হুলিয়া জারি হয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন তিনি।

১৩ মার্চ সকালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে মিছিল শুরু হলো। সাধারণ মানুষও যোগ দিল ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে। হামিদা রহমানের নেতৃত্বে মেয়েরাও একটা মিছিল বের করে। মিছিল সংগঠিত করতে সাহায্য করেন রুবি আহমেদ ও সুফিয়া খাতুন। মিছিলটি মোমিন গার্লস স্কুল থেকে বেরিয়ে লাইব্রেরির সামনে দিয়ে চৌরাস্তা হয়ে কালেক্টরেট ভবনের দিকে এগিয়ে গেলে থানার ওসি আবদুল জব্বারের নেতৃত্বে পুলিশ বাধা দেয়। কিন্তু মেয়েরা পিছু না হটে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। শুরু হয় সংঘর্ষ, পুলিশের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া আর ইট–পাটকেল ছোড়াছুড়ি। ওসি আবদুল জব্বারের কানে ইটের আঘাত লেগে রক্ত ঝরতে শুরু করলে পুলিশ ক্ষিপ্ত হয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করে। ছাত্রনেতা আলমগীর ছিদ্দিকি গুলিবিদ্ধ হন। আসুন, এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার গল্প শুনি ভাষাসৈনিক বিমল রায়চৌধুরীর বয়ানে:

‘১৯৪৭ সালে যশোর এম এম কলেজের প্রথম ছাত্রী আমাদের গুপি আপা (হামিদা রহমান) “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” দাবিতে পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলে ইটের টুকরো বাঁধা থাকত। আমরা সেই ইট পুলিশকে ছুড়ে মারতাম। তিনি খুব সাহসী ছিলেন। তাঁকে থানার বড় বাবুও ভয় পেতেন। আমরা যশোরের ছাত্র–জনতা বাংলা ভাষার জন্য ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ধর্মঘট করেছি। যশোরের ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল একটি সফল আন্দোলন। আর এই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আমাদের গুপি আপা।’

লেখক আনোয়ারা সৈয়দ হকের একটা প্রবন্ধ হাতে এল কদিন পর পিয়াস মজিদের মাধ্যমে। শিরোনাম ‘আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে যশোরের ভূমিকা ও ভাষাসংগ্রামী হামিদা রহমান’। প্রকাশিত হয়েছিল ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায়। তুলে দিচ্ছি তার একটি অংশ:

হামিদা রহমান ছিলেন যশোর এমএম কলেজের ছাত্রী। তিনি এগারোই মার্চের হরতালে ছাত্রীদের মিছিলের পুরোভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন। পোস্টারিং, দেয়াললিখন, জ্বালাময়ী বক্তৃতা ইত্যাদিতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। তেরোই মার্চের হরতালেও তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়।

এই লেখা লিখতে লিখতেই একদিন প্রশ্ন করেছিলাম আনোয়ারা সৈয়দ হককে, ‘আপনি কি তাঁকে চিনতেন? দেখেছেন?’ আনোয়ারা আপা মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমার দুর্ভাগ্য, কখনো দেখা হয়নি। তবে ঢাকায় থেকেও আমরা তাঁর নাম জানতাম। তিনি একজন সাহসী নেত্রী ছিলেন। আমার প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর ছেলের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল।’

১৯৪৭ সালে যশোর এম এম কলেজের প্রথম ছাত্রী আমাদের গুপি আপা (হামিদা রহমান) ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে পত্রিকায় চিঠি লিখেছিলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলে ইটের টুকরো বাঁধা থাকত। আমরা সেই ইট পুলিশকে ছুড়ে মারতাম। তিনি খুব সাহসী ছিলেন। তাঁকে থানার বড় বাবুও ভয় পেতেন।
হামিদা রহমানের চিঠি

হামিদা রহমানের কথা জানতে পারি ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের লেখায়ও। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ প্রথম আলোয় ‘জেলায় জেলায় ভাষা আন্দোলন’ কলামে তিনি লিখেছেন, ‘ঢাকা থেকে ১১ মার্চের ভাষা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের আহ্বানের আগেই যশোরের সংগ্রাম কমিটি পথে নামে সভা, সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে। সেই সঙ্গে ছাত্র ধর্মঘট। ইতিমধ্যে ১০ মার্চ জারি হয় ১৪৪ ধারা। প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে রাস্তায় নামে। মিছিলের শহর প্রদক্ষিণকালে এতে যোগ দেন ছাত্রীরা, রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ এবং বিশেষ করে বাংলাপ্রেমী জনসাধারণ। পুলিশ প্রচণ্ড দমননীতির মাধ্যমে মিছিল ছত্রভঙ্গ করে আন্দোলন বন্ধ করতে চেষ্টা চালায়। দফায় দফায় গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রনেতাসহ একাধিক ভাষাসংগ্রামীকে। প্রতিবাদে স্বতঃস্ফূর্ত হরতালের আলামত দেখা দেয়। দোকানপাট আপনা থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। এরপরের ঘটনা ১২ মার্চ থেকে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। পুলিশের লাঠিচার্জ ও গুলি স্তব্ধ করতে পারে না আন্দোলন। মিছিল যত বাড়তে থাকে, আন্দোলনে ছাত্রনেতৃত্বের সংখ্যাও ততই বেড়ে চলে। আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার সিদ্দিকী ছাড়াও নেতৃত্বদানে এগিয়ে আসেন সুনীল রায়, শেখ আমানুল্লাহ, সুধীর রায়, দেবীপদ চট্টোপাধ্যায়, গোলাম ইয়াজদাম চৌধুরী প্রমুখ। মেয়েদের নেতৃত্বে হামিদা রহমান, সুফিয়া খাতুন, রুবী রহমান। কয়েক হাজার মানুষের মিছিলের সঙ্গে পুলিশের একরকম খণ্ডযুদ্ধই চলে। পায়ে গুলি লাগে আলমগীর সিদ্দিকীর।’

আহমদ রফিকের মতে, যশোরে সেই সময়ের ভাষা আন্দোলন ঢাকাসহ অন্য যেকোনো শহরের তৎকালীন আন্দোলন থেকে কয়েক পা এগিয়ে ছিল। পরবর্তী সময়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পর যশোরে শহীদ দিবসের মিছিলে পনেরো হাজার মানুষের উপস্থিতি আর মাইল দেড়েক দীর্ঘ মিছিলের কথাও লিখেছেন আহমদ রফিক।

উইকিপিডিয়া বলছে, ১৯২৭ সালের ২৯ জুলাই যশোরের পুরাতন কসবায় হামিদা রহমানের জন্ম। মা বেগম লুৎফুন্নেসা, বাবা শেখ বজলুর রহমান। ১৯৪২ সালে যশোর মধুসূদন তারাপ্রসন্ন বালিকা বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ম্যাট্রিক পাসের পরপরই ১৯৪২ সালে সিদ্দিকুর রহমানের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৯৪৫ সালে যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজে পড়ার সময় যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতির সঙ্গে। ১৯৪৭ সালে আইএ পাস করার পর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯৫৪ সালে বিএ এবং ১৯৫৮ সালে এমএ পাস করেন। রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিটি পাস করেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত চাঁদপুর লেডি প্রতিমা বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। ওপরে উল্লিখিত চিঠিটা সে সময়ই লেখা। এরপর ছিলেন জগন্নাথ কলেজে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, তারপর পুরানা পল্টন গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ।

হামিদা রহমান ১৯৭০ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনোযাগ দেন। ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখা বেশ কটি বই প্রকাশিত হয়েছে। জীবনস্মৃতি নামে একটি জীবনীগ্রন্থও লিখেছেন। বইটি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের এক দলিল।

আমার স্বামীর বড় বোন জারিফা হোসেন ১৯৬০–এর দশকে স্কুলে পড়তেন। তিনি তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, ‘হামিদা খালা মাঝে মাঝেই আমাদের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় আসতেন। আব্বা–আম্মি খুব ভালোবাসতেন তাঁকে। তিনি খুবই স্মার্ট কিন্তু খুবই সিম্পল ছিলেন। আর ছিলেন খুব স্পষ্টভাষী। যেকোনো বিষয়ে আব্বার পরামর্শ নিতেন তিনি, এটা ছিল তাঁর একটা আস্থার জায়গা।’

হামিদা রহমান ১৯৭০ সালে অধ্যাপনা ছেড়ে সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় মনোযাগ দেন। ১৯৬০ ও ১৯৭০–এর দশকে ইত্তেফাক পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তাঁর লেখা বেশ কটি বই প্রকাশিত হয়েছে। জীবনস্মৃতি নামে একটি জীবনীগ্রন্থও লিখেছেন। বইটি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন ও নারী আন্দোলনের এক দলিল।

হামিদা রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র মোস্তফা আরিফ লিখেছেন, ১০-১১ বছর বয়সে ফুফু তাঁকে ঢাকায় বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলেন। হাত ধরে শহীদ মিনারে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘এই শহীদ মিনার আমাদের। আমরাই বুকের রক্ত দিয়ে তৈরি করেছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরিয়ে দেখানোর সময় তাঁকে তিনি শুনিয়েছিলেন নানা আন্দোলন–সংগ্রামের গল্প। যশোর এমএম কলেজের একটি হলের নাম রাখা হয়েছে তাঁর নামে।

আমাদের দীর্ঘ আন্দোলন–সংগ্রামের ইতিহাসে বরাবরই নারীরা ছিলেন সামনের সারিতে। পূর্ণ উদ্যম ও সাহসিকতা নিয়ে, সক্রিয় ছিলেন রাজপথে। সেই বায়ান্ন থেকে আজ অবধি। কিন্তু সংগ্রাম শেষে নারীদের কথা প্রায়ই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যায়। এ দেশের নারীরা চিরকালই সাহসের সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, নেতৃত্বও দিয়েছেন। অথচ দিন শেষে ফল ভোগ করতে পুরুষেরা যতটা সফল হয়েছেন, নারীরা তা পারেননি। একটি হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া চিঠি চৌষট্টি বছর পর আবার সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় আমাদের।