মনজুর আলম বেগের ‘ছায়াপুষ্প’

মনজুর আলম বেগ (১ অক্টোবর ১৯৩১—২৬ জুলাই ১৯৯৮) ও তাঁর ধারণ করা আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর বিকেলে বেগার্ট ইনস্টিটিউটে ইমতিয়াজ আলম বেগের সঙ্গে আড্ডা হচ্ছিল। আড্ডার এক ফাঁকে তিনি একটি কালো মলাটের বই দেখালেন। দুষ্প্রাপ্য বইটির নাম ফটোগ্রাফি ডাইজেস্ট। এর রচয়িতা মনজুর আলম বেগ। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (বিপিএস) থেকে এটি প্রকাশিত হয়। বইটির প্রচ্ছদে একটি সাদাকালো ছবি। এটিও গ্রন্থরচয়িতার তোলা। নগরের পিচঢালা রাস্তায় সিমেন্টের তৈরি কতগুলো মোটা পাইপ। তপ্ত দুপুরে সেই পাইপের ভেতর শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে দুই শ্রমজীবী। তাদের পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলছে একটি নির্মাণসামগ্রীর ট্রাক। প্রাত্যহিক নাগরিক জীবনের এই ছবি দেখে একটু অন্য রকম অনুভূতি হয়। কঠিন জড়বস্তুর মধ্যে এক প্রাণের সঞ্চার দেখি। সারিবদ্ধ পাইপগুলোর একেকটার ফাঁকা জায়গা দিয়ে আলো ঢুকছে সহজে। সেই আলো হালকা ছায়ার মধ্যে যে বক্রাকার রেখা তৈরি করেছে, তা অনেকটা গোলাপের পাপড়ির চক্রাকার বিন্যাসের মতো মনে হয়।

মনজুর আলম বেগের এই ছবি এমন এক শিল্প, যার তুলনা চলে প্রস্ফুটিত গোলাপের সঙ্গে
ছবি: লেখকের সৌজন্যে
পাঁচ দশক আগে এই শহর কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের অনেক জবাব আছে এই ছবিতে। ফলে মনজুর আলম বেগের এই ছবির এক ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।

মনজুর আলম বেগের এই ছবি স্ট্রিট ফটোগ্রাফির এক অনবদ্য উপস্থাপনা। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি হলো ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। ছবিটি ঠিক কবে, কোথায় তোলা জানা যায় না। তবে ছবিটির দিকে গভীরভাবে তাকালে এর সম্ভাব্য স্থান ও কাল সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। আন্দাজ করি, ছবিটি স্বাধীনতার পরপর ঢাকায় তোলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের রাজধানী শহর তখনো বেশ ফাঁকা। রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম। সড়কে রাখা পয়োনিষ্কাশনের পাইপ আর দূরে ঊর্ধ্বমুখী দালানকোঠা যেন একটি নতুন রাষ্ট্রের অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতীক। বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে রাজধানীর পরিধি বিস্তৃত হচ্ছে। পাঁচ দশক আগে এই শহর কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের অনেক জবাব আছে এই ছবিতে। ফলে মনজুর আলম বেগের এই ছবির এক ঐতিহাসিক গুরুত্বও রয়েছে।

মনজুর আলম বেগ
আলোকচিত্র: ওবায়েদুল্লাহ মামুন
দেখার চোখ না থাকলে আলোকচিত্রশিল্পী নিশ্চয়ই সেটিকে ছবি করে তুলতে পারতেন না। সাধারণ বিষয়ের ছবিই তাই ক্যামেরার ফ্রেমে অসাধারণ হয়ে উঠেছে—এখানেই শিল্পীর মাহাত্ম্য।

মিডিয়াম ফরম্যাট ক্যামেরায় তোলা এই ছবি নিয়ে কথা বলি প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায়ের সঙ্গে। জানতে চাই তাঁর অনুভূতিও। ছবিটি দেখে তিনি এক অসাধারণ মন্তব্য করলেন। মৃত্যুঞ্জয় রায় এই ছবি সম্পর্কে লিখে পাঠালেন—‘কী অসাধারণ একটি ছবি ও তার শিল্পরূপ। পয়োনিষ্কাশন পাইপগুলো রাস্তার ধারে সাজানো। কিন্তু সেসব চোঙার মতো নলের বৃত্তাকার মুখগুলো সৃষ্টি করেছে এমন এক আর্ট, যাকে তুলনা করে চলে আধফোটা গোলাপের মুখের সঙ্গে। গোলাপের পাপড়িগুলো যে রকম সর্পিলাকারে সজ্জিত থাকে, মাঝে থাকে একটা ঘন কেন্দ্র, পাইপের মুখগুলোও যেন সে রকম। আর তা দেখার চোখ না থাকলে আলোকচিত্রশিল্পী নিশ্চয়ই সেটিকে ছবি করে তুলতে পারতেন না। সাধারণ বিষয়ের ছবিই তাই ক্যামেরার ফ্রেমে অসাধারণ হয়ে উঠেছে—এখানেই শিল্পীর মাহাত্ম্য।’

আলোকচিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘কাউন্টার ফটো’র প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ সাইফুল অমির কাছে এই ছবির একাডেমিক মূল্যায়ন জানতে চাই। তিনি পাঁচ দিন সময় নিলেন। তারপর লিখলেন, ‘স্ট্রিট ফটোগ্রাফির প্রধান বৈশিষ্ট্য মূলত দুটো। কম্পোজিশনের চমক আর আলোকচিত্রীর মুহূর্ত ধরতে পারার ক্ষমতা। জগদ্বিখ্যাত প্রায় সব আলোকচিত্রীর কাজে এই বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রবণতার একটা স্বাভাবিক বিপদ হচ্ছে বেশির ভাগ সময়ই ছবি হয়ে ওঠে আলোকচিত্রীর নিজস্ব ক্ষমতা আর প্রতিভার গুণে। মানুষ সেখানে গৌণ। আলোকচিত্রের সব ধারার মধ্যে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি তাই সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক। বেগ স্যারের এই বিশেষ ছবি প্রথম দেখলাম। আর বরাবরের মতোই থমকে গেলাম। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির সব প্রথা ভাঙা এক ছবি—যার একটার পর একটা তলা। রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষ, অন্তহীন যাতনার অতল জীবন—যার চক্কর থেকে বের হয়ে আসার ক্ষমতা তার নাই। আলোর খেলা, বাঁয়ে চলমান গাড়ি, যা জীবনেরই সিম্বল। দম বন্ধকরা পাইপের ভেতর আটকে যাওয়া জীবন—আর কে এমন করে বলতে পারে গল্প; দারিদ্র্যের, বেঁচে থাকার—এইখানেই বেগ স্যার সবার থেকে আলাদা। আলোকচিত্রী নিজে এইখানে বড়, নাকি যার গল্প বলা হচ্ছে সে।’

তিনি জীবনভর ছবি তুলেছেন, লিখেছেন, অন্যকে লিখতে উৎসাহিত করেছেন; একটি শিল্পপ্রজন্ম গড়ে তুলতে তিনি কী না করেছেন! অথচ এমন এক নক্ষত্রমানবের বেশির ভাগ ছবি যে প্রজন্মের অদেখা রয়ে গেল—সেটি বরং আলোকচিত্রশিল্প মাধ্যমের জন্য এক বড় দুর্ভাগ্য।

সাইফুল হক অমি আক্ষেপ নিয়ে আরও লিখেছেন, ‘আলোকচিত্রের একজন শিক্ষক হিসেবে একটা প্রশ্ন আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়ায়। আমরা আমাদের আলোকচিত্রের প্রধান মানুষ বেগ স্যারের আরও অনেক বেশি কাজ যদি জনসমক্ষে নিয়ে আসতে পারতাম, বাংলাদেশের আলোকচিত্রের গতিপথ তাহলে কেমন হতো? মনে পড়ে তার এক প্রদর্শনীর কথা। কয়েক বছর আগে ঢাকার ধানমন্ডিতে ‘উত্তরসূরি’ আয়োজিত ওই প্রদর্শনীর সামনে দাঁড়িয়ে বারবার ভেবেছি আমাদের সব থেকে ক্ষমতাবান আলোকচিত্রীর কতটুকু আমরা সামনে আনতে পারলাম!’

বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের নক্ষত্রদের একজন আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ। এ দেশের আলোকচিত্রশিল্পে তিনি চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিনের সমতুল্য। জয়নুলের মতো তিনিও একনাগাড়ে শিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আলোকচিত্রের বিবর্তনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন, বদলে দিয়েছেন ছবি তোলা চর্চার প্রথাগত ধারণা। তিনি জীবনভর ছবি তুলেছেন, লিখেছেন, অন্যকে লিখতে উৎসাহিত করেছেন; একটি শিল্পপ্রজন্ম গড়ে তুলতে তিনি কী না করেছেন! অথচ এমন এক নক্ষত্রমানবের বেশির ভাগ ছবি যে প্রজন্মের অদেখা রয়ে গেল—সেটি বরং আলোকচিত্রশিল্প মাধ্যমের জন্য এক বড় দুর্ভাগ্য।