দেশভাগের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় মাতৃভাষার জন্য বাঙালিকে রাজপথে নামতে হয়। সাত মাসের মধ্যে ঘটে রক্তপাতের ঘটনা। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকায় প্রথম ধর্মঘট পালিত হয়। সেদিন পুলিশের বর্বর হামলায় সচিবালয়ের সামনের পথ রক্তে রঞ্জিত হয়। কারাগার ভরে যায় তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানসহ সংগ্রামী ছাত্রদের গ্রেপ্তারের কারণে। ওই দিন প্রতিবাদের যে ভিত রচিত হয়, তারই পথ ধরে আসে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি। আটচল্লিশের সেই উত্তাল দিনের নানা মুহূর্ত কোডাক ফোল্ডিং ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব। তাঁর তোলা ভাষা আন্দোলনের ওই ছবিগুলো হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি স্বৈর সিদ্ধান্তের বিপরীতে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলনের গবেষণায় তাঁর ছবি বারবার ব্যবহৃত হলেও কোনো গবেষক বা ইতিহাসবিদের লেখায় এই আলোকচিত্রীর অবদানের কথা উঠে আসেনি। ফলে ভাষা আন্দোলনে তাঁর ত্যাগের মহিমা কিংবা অসমসাহসের গল্প দীর্ঘকাল মানুষের কাছে অজানা থেকে গেছে। দুঃখের ব্যাপার হলো, এ প্রজন্মের কেউ এই সাহসী আলোকচিত্রীর নামটি পর্যন্ত জানেন না।
আটচল্লিশের রক্তাক্ত অধ্যায় যে শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের ক্যামেরায় ধরা, তার প্রমাণ পাই বাংলা একাডেমিতে পুরোনো পত্রিকার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন দৈনিক বাংলার শেষ পৃষ্ঠায় একটি বিশেষ প্রতিবেদনের সঙ্গে ইয়াকুবের তোলা তিনটি দুর্লভ ছবি ছাপা হয়। প্রথম ছবিতে দেখা যায়—আহত ছাত্রনেতা শওকত আলীকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। দ্বিতীয় ছবিটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র সমাবেশের। ছবিটি ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তোলা বলে ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়। তৃতীয় ছবিটি হলো সচিবালয়ের এক নম্বর গেটে আহত ছাত্রনেতা মোহাম্মদ বায়তুল্লাহর [দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশের প্রথম ডেপুটি স্পিকার]। তাঁকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন কয়েকজন ছাত্রনেতা। আহত শওকত আলীর ছবিটি সবার দেখা হলেও বায়তুল্লাহ ও আমতলার সমাবেশ—এই ছবি দুটি দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিল।
শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের তোলা ভাষা আন্দোলনের ওই ছবিগুলো হয়ে উঠেছিল পাকিস্তানি স্বৈর সিদ্ধান্তের বিপরীতে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। ভাষা আন্দোলনের গবেষণায় তাঁর ছবি বারবার ব্যবহৃত হলেও কোনো গবেষক বা ইতিহাসবিদের লেখায় এই আলোকচিত্রীর অবদানের কথা উঠে আসেনি।
শওকত আলী ও শেখ মুজিবের ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়—‘১৯৪৮ সালে ঢাকায় গুলিতে আহত একজন ছাত্রকে রিকশায় করে নিয়ে যাচ্ছেন সেদিনের তরুণ নেতা শেখ মুজিব—আজকের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি তুলেছেন: শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব।’ ভাষা আন্দোলন নিয়ে যত গবেষণা হয়েছে, যত বই প্রকাশিত হয়েছে, কোথাও ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ নেই। কিন্তু ওই দিন যে সেক্রেটারিয়েটের সামনে আন্দোলন ঠেকাতে গুলি ছোড়া হয়, দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত ছবির ক্যাপশনে সে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়।
শওকত আলী ও শেখ মুজিবের ছবিটির একটি খণ্ডিত অংশ ফ্রেমবন্দী অবস্থায় দেয়ালে টাঙানো আছে বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউসে ভাষা আন্দোলন জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং শহীদ আবুল বরকত স্মৃতি জাদুঘর ও সংগ্রহশালায়। প্রদর্শিত ছবিটির নিচে ঘটনার উল্লেখ থাকলেও আলোকচিত্রীর নাম নেই। এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন নিয়ে এখন পর্যন্ত যত বই বের হয়েছে, তার কোনোটিতেই এই ছবির আলোকচিত্রীর নাম উল্লেখ করা হয়নি। কোনো কোনো বইয়ে দায়সারাভাবে লেখা হয়েছে ‘সংগৃহীত’। দৈনিক বাংলায় ছবিটির ক্রেডিট না ছাপা হলে এই আলোকচিত্রীর নাম কিংবা তাঁর অবদানের কথা অন্ধকারে হারিয়ে যেত।
আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের একমাত্র আলোকচিত্রী মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ—এ কথা বহুল প্রচারিত। জীবদ্দশায় তকীয়ূল্লাহ ভাষাসংগ্রাম নিয়ে তাঁর অবদানের কথা লিখে গেছেন। চিহ্নিত করে গেছেন তাঁর তোলা ছবিগুলোও। কিন্তু আটচল্লিশের ভাষাসংগ্রামে অন্য যেসব ছবি বিভিন্ন প্রকাশনায় বেনামে দেখা যেত, সেগুলো কার তোলা—এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন ছিল অমীমাংসিত। দৈনিক বাংলার পাতায় ইয়াকুবের তোলা ছবিগুলো ছাপা হওয়ার কারণে এই অমীমাংসিত বিষয়টির সমাধানের পথ তৈরি হলো। দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত তিনটি ছবি ছাড়া ইয়াকুবের বাকি ছবিগুলো আর কখনোই দেখা সম্ভব নয়। কারণ, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে তাঁর সারা জীবনের কাজ।
ইয়াকুবের কথা প্রথম জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইয়ে। ছেচল্লিশের দাঙ্গা নিরসনে তাঁর তোলা মর্মস্পর্শী ছবিগুলো কী প্রভাব ফেলেছিল, সে সম্পর্কে বিস্তারিত লিখেছেন শেখ মুজিব। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র ৮১ ও ৮২ নম্বর পৃষ্ঠায় শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘আমি আর ইয়াকুব নামে আমার এক ফটোগ্রাফার বন্ধু পরামর্শ করলাম, আজ [১৯ আগস্ট, ১৯৪৬] মহাত্মাজীকে একটা উপহার দিব। ইয়াকুব বলল, তোমার মনে আছে আমি আর তুমি বিহার থেকে দাঙ্গার ফটো তুলেছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ মনে আছে। ইয়াকুব বলল, সমস্ত কলকাতা ঘুরে আমি ফটো তুলেছি। তুমি জানো না তার কপিও করেছি। সেই ছবিগুলি থেকে কিছু ছবি বেছে একটা প্যাকেট করে মহাত্মাজীকে উপহার দিলে কেমন হয়। আমি বললাম, চমৎকার হবে। চল যাই, প্যাকেট করে ফেলি। যেমন কথা তেমন কাজ। দুইজন বসে পড়লাম। তারপর প্যাকেটটা এমনভাবে বাঁধা হলো যে কমপক্ষে দশ মিনিট লাগবে খুলতে। আমরা তাঁকে উপহার দিয়েই ভাগব। এই ফটোর মধ্যে ছিল মুসলমান মেয়েদের স্তন কাটা, ছোট শিশুদের মাথা নাই, শুধু শরীরটা আছে, বস্তি, মসজিদে আগুন জ্বলছে, রাস্তায় লাশ পড়ে আছে, এমনই আরও অনেক কিছু! মহাত্মাজী দেখুক, কীভাবে তার লোকেরা দাঙ্গাহাঙ্গামা করেছে এবং নিরীহ লোককে হত্যা করেছে।’
জীবদ্দশায় তকীয়ূল্লাহ ভাষাসংগ্রাম নিয়ে তাঁর অবদানের কথা লিখে গেছেন। চিহ্নিত করে গেছেন তাঁর তোলা ছবিগুলোও। কিন্তু আটচল্লিশের ভাষাসংগ্রামে অন্য যেসব ছবি বিভিন্ন প্রকাশনায় বেনামে দেখা যেত, সেগুলো কার তোলা—এই প্রশ্নের উত্তর এত দিন ছিল অমীমাংসিত।
শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘আমরা নারকেলডাঙ্গায় মহাত্মাজীর ওখানে পৌঁছালাম। তাঁর সাথে ঈদের মোলাকাত করব বললাম। আমাদের তখনই তাঁর কামরায় নিয়ে যাওয়া হলো। মহাত্মাজী আমাদের কয়েকটা আপেল দিলেন। আমরা মহাত্মাজীকে প্যাকেটটা উপহার দিলাম। তিনি হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। আমরা যে অপরিচিত, সেদিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ নাই। তবে বুঝতে পারলাম, তাঁর নাতনী মনু গান্ধী আমার চেহারা দেখেছে ব্যারাকপুর সভায়, কারণ আমি শহীদ সাহেবের [হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী] কাছে প্ল্যাটফর্মে বসেছিলাম। আমরা উপহার দিয়ে চলে এলাম তাড়াতাড়ি হেঁটে।...। বন্ধু ইয়াকুবের এই ফটোগুলি যে মহাত্মা গান্ধীর মনে বিরাট দাগ কেটেছিল, তাতে সন্দেহ নাই।’
শেখ মুজিবের লেখা পড়েই মূলত ইয়াকুবের ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠি। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই সাপ্তাহিক বিচিত্রার ১৯৯০ সালের ঈদসংখ্যা। ২০ এপ্রিল প্রকাশিত ঈদসংখ্যায় ‘সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ’ শিরোনামে আসিফ নজরুলের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। পেশাদার আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব, মীজানূর রহমান, ওবায়েদুর রহমান ফিরোজ ও খন্দকার কামরুল হুদার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রবন্ধটি রচিত। আসিফ নজরুলের প্রবন্ধ পাঠে জানতে পারি, দেশভাগ–পরবর্তী সময়ে ইয়াকুবের নিযুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পিআইডির ফটোগ্রাফি সেকশনের যাত্রা শুরু হয়। ইয়াকুব সম্পর্কে সামান্য তথ্য পাওয়া যায় ফটোসাংবাদিক আবদুল মতিনের ‘বাংলাদেশের আলোকচিত্র সাংবাদিকতার সেকাল-একাল’ শিরোনামে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধে শেষ পর্বে। শেষ পর্বটি ছাপা হয় ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে বিপিএসের মুখপত্র মাসিক ফটোগ্রাফিতে।
সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও মাসিক ফটোগ্রাফির তথ্যমতে, ইয়াকুবের জন্ম ১৯২৭ সালে, কলকাতায়। ১৯৪৫ সালে স্কুলে পড়ার সময় এক খ্রিষ্টান যুবকের কাছ থেকে বিশ টাকা দিয়ে কোডাকের বি-টু সাইজের ফোল্ডিং ক্যামেরা কিনে তিনি ফটোগ্রাফি শুরু করেন। তিনি যখন অষ্টম বা নবম শ্রেণির ছাত্র, তখন দাঙ্গার ভয়াবহতা তাঁর মনে ভীষণভাবে দাগ ফেলে। তখন কলকাতায় মুসলমানের চেয়ে হিন্দুদের সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। কিছু কিছু এলাকায় হিন্দুরা নির্মমভাবে মুসলমানদের হত্যা করতে লাগল। ইয়াকুব সেসব নির্মমতার ছবি তুলতে শুরু করেন। ছবি তুলে পাকসার্কাসে এক মুসলমানের স্টুডিওতে গোপনে নেগেটিভ ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করতেন। ওই সময় বিহারে ব্যাপকভাবে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম লীগের একটি স্বেচ্ছাসেবী দলের সঙ্গে তিনি সেখানে গেলেন। কেউ যেন তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে, সে জন্য রেডক্রসের চিহ্ন আঁকা ব্যাগে ক্যামেরা রাখলেন। বিহারে গিয়ে তিনি উঠলেন আজিজ ম্যানসনে। ওখানেই শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজুর রহমান ও ড. মফিজ আলী চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি একদিন শেখ মুজিবকে ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বের করে দেখালেন। শেখ মুজিব বেশ প্রভাবিত হলেন।
বিহারের দাঙ্গায় নিহত ব্যক্তিদের ছবি তোলার জন্য একদিন রেডক্রসের কর্মী সেজে তিনি এক হাসপাতালে প্রবেশ করলেন। হাত-পা ভাঙা, মাথা গুঁড়িয়ে দেওয়া লাশের ছবি তুললেন। মেয়েদের অনেকের স্তন কেটে ফেলা হয়েছে, ছোট বাচ্চাদের হাত-পা ভেঙে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে—এসব ছবি তুলতে তুলতে তিনি আবেগে বিহ্বল হয়ে পড়েন। এ সময় তাঁদের দলের একজন এসে বললেন, ‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছবি তোলার ঘটনা টের পেয়ে গেছে। এক্ষুনি পালাতে হবে।’ এই কথা শুনে ক্যামেরা ব্যাগে ভরে অন্যদিকের দরজা দিয়ে পালাতে সক্ষম হন ইয়াকুব। এরপর বিহারে যত দিন ছিলেন, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের গাড়িতে করে ছবি তুলেছেন। এক গ্রামে গিয়ে শুনলেন সতিত্ব বাঁচাতে মুসলমান মেয়েরা কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। কুয়োর ভেতরের ছবি তুললেন, কুয়োর পাশে পড়ে থাকা ভাঙা চুড়ির ছবি তুললেন। নদীতে ভেসে থাকা লাশ, পুড়ে যাওয়া বিরান ঘরবাড়ি, ভাঙা মসজিদ আর ছেঁড়া কোরআন শরিফ—বাদ যায় না কোনো কিছু। ছবিগুলো তখনকার মুসলিম সমাজে বেশ প্রশংসিত হয়।
ইয়াকুব বলল, তোমার মনে আছে আমি আর তুমি বিহার থেকে দাঙ্গার ফটো তুলেছিলাম? আমি বললাম, হ্যাঁ মনে আছে। সমস্ত কলকাতা ঘুরে আমি ফটো তুলেছি। ...তার কপিও করেছি। সেই ছবিগুলি থেকে কিছু ছবি বেছে একটা প্যাকেট করে মহাত্মাজীকে উপহার দিলে কেমন হয়। আমি বললাম, চমৎকার হবে।
মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা তখন হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা থামাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দাঙ্গা থামানোর ব্যাপারে গান্ধীর সঙ্গে সোহরাওয়ার্দীর প্রায়ই কথাবার্তা হতো। ওই রকম একটি বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে ইয়াকুবের জীবনের গতিপথ পাল্টে যায়। ইয়াকুব তখন সবে বিহার থেকে কলকাতায় ফিরেছেন। শেখ মুজিব তাঁকে বললেন, ‘সোহরাওয়ার্দী সাহেব মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে বালিয়াঘাটে যাবেন।’ তিনি যাবেন কি না, জানতে চাইলেন শেখ মুজিব। ইয়াকুব বললেন, ‘মহাত্মার সঙ্গে দেখা করে তাঁকে একটি চিঠি দেব।’ ওই দিনই ইয়াকুব চিঠি লিখলেন। চিঠির বক্তব্য—‘মহাত্মা রায়ট থামাতে নোয়াখালী গেছেন, কিন্তু কলকাতায় আসেননি। কারণ, নোয়াখালীতে হিন্দুরা অত্যাচারিত আর কলকাতায় মুসলমানরা। এটা অন্যায়।’ ইয়াকুব লিখলেন, ‘আমার তোলা রায়টের ছবি সারা বিশ্বে পৌঁছে দেব। দুনিয়ার লোক এসব জানুক।’ শেখ মুজিবকে চিঠিটি দেখিয়ে ইয়াকুব বললেন, সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে যেন এ বিষয়টি না জানানো হয়।
সেদিন গান্ধীর মৌন দিবস ছিল। দুটি কিশোরী মেয়ের কাঁধে ভর করে গান্ধী বেরিয়ে এলেন। ইয়াকুব অটোগ্রাফ চাইলে গান্ধী পাঁচ আঙুল দেখালেন। মেয়ে দুটি ইয়াকুবকে বোঝালেন আটোগ্রাফ নিতে হলে গান্ধীর কল্যাণ তহবিলে পাঁচ টাকা দিতে হবে। ইয়াকুব টাকা দেওয়ার সময় মেয়েদের হাতে প্যাকেটটিও দিলেন। সেই প্যাকেটেই ছিল চিঠি আর দাঙ্গার কিছু ছবি। প্যাকেটটি দিয়েই তাঁরা দ্রুত বাসায় চলে আসেন। ছবি তোলার ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পাড়ার হিন্দু ছেলেরা ইয়াকুবের ওপর খেপে ওঠে। তখন দেশ ভাগ হয়ে গেছে। ইয়াকুব সিদ্ধান্ত নিলেন ঢাকায় চলে আসবেন। আসার আগে ডাকযোগে পাকিস্তানের প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক ডনের ঠিকানায় দাঙ্গার কিছু ছবি পাঠালেন।
ঢাকায় এসে নবাবপুর হাইস্কুলের রিফিউজি ক্যাম্পে উঠলেন ইয়াকুব। কিছুদিন পর পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে আরমানিটোলায় একটি বাড়ি ভাড়া করলেন। সে সময় বুড়িগঙ্গার তীর থেকে ঢাকা শহর খুব বেশি দূর এগোয়নি। একদিন রাস্তায় হাঁটছিলেন। খাজা শাহাবুদ্দিন তখন পূর্ব পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী। মন্ত্রীর প্রাইভেট সেক্রেটারি আবদুর রশীদ কলকাতায় থাকতেই ইয়াকুবকে চিনতেন। ইয়াকুবকে দেখেই তিনি গাড়ি থামালেন। কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। চাকরিবাকরি নেই শুনে তিনি ইয়াকুবকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফটোগ্রাফার পদে আবেদন করতে বললেন। আবেদন করার কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর চাকরি হয়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ফটোগ্রাফার হিসেবে ইয়াকুবের এই নিযুক্তি ছিল পিআইডির সর্বপ্রথম নিয়োগ। ছবি তোলার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে তাঁকে একটি রোলিফ্লেক্স ক্যামেরা দেওয়া হয়।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফটোগ্রাফার হিসেবে তাঁকে মন্ত্রীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি তুলতে হতো। অন্য দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় অতিথিরা এলে তাঁদেরও ছবি তুলতেন ইয়াকুব। আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনে ছবি তোলার বিষয়টি পিআইডি কর্মকর্তা জেনে যান। ফলে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শুরুতে তাঁর ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় যুক্ত ফ্রন্টের কিছু জনসভার ছবি তোলার অনুমতি পান তিনি। ওই সময় সিরাজগঞ্জে যুক্ত ফ্রন্টের এক জনসভার ছবি দেখে মন্ত্রণালয়ের এক পাঞ্জাবি কর্মকর্তা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি বারবার জিজ্ঞেস করেন, কয়েকটি ছবি জোড়া লাগিয়ে এই ছবিটি তৈরি কি না! ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে। ছাত্ররা তখন আইয়ুব খানকে ঘৃণা করত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা কুকুরের গলায় আইয়ুবের নাম ঝুলিয়ে রাস্তায় ছেড়ে দিতেন। সরকারি ফটোগ্রাফার হিসেবে ইয়াকুবের ওপর নির্দেশ ছিল ছাত্রদের বিশৃঙ্খলার ছবি তোলার। ইয়াকুব সেসব সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে ছাত্রদের পক্ষে ছবি তুলতেন।
‘সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ’ শিরোনামে আসিফ নজরুলের একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ ...পাঠে জানতে পারি, দেশভাগ–পরবর্তী সময়ে ইয়াকুবের নিযুক্তির মাধ্যমে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে পিআইডির ফটোগ্রাফি সেকশনের যাত্রা শুরু হয়।
১৯৬৬ সালে ইয়াকুবকে রাওয়ালপিন্ডিতে বদলি করা হয়। সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের খবর খুব একটা পাওয়া যেত না। দেশের খবরের জন্য তিনি খুব অস্থির থাকতেন। পিআইডির রেকর্ড সেকশনে নোয়াখালীর এক অফিসার ছিলেন। তিনি গোপনে পূর্ব পাকিস্তানের খবর আছে এমন ম্যাগাজিন দিয়ে যেতেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। আইডেনটিটি কার্ড জমা নেওয়া হয়। ওই সময় তিনি ইস্ট পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে আটকে পড়া বাঙালিদের সহযোগিতা করতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে এক পাঠান ছাত্রনেতার পরিচয় হয়। সেই নেতা অর্থের বিনিময়ে বাঙালিদের পাকিস্তান থেকে পালাতে সাহায্য করতেন। ইয়াকুব সেই নেতার সাহায্য নিয়ে এক রাতে পাকিস্তান ত্যাগ করেন। দীর্ঘ পথ হেঁটে, খচ্চরে চড়ে, ট্রাকে করে পাকিস্তানের সীমান্ত পার হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করেন। সীমান্ত পুলিশকে ২৫ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি আফগানিস্তানে ভারতীয় দূতাবাসে পৌঁছাতে সক্ষম হন। এরপর দূতাবাসের সহযোগিতায় দিল্লিতে পৌঁছান। সেখান থেকে বাংলাদেশে পা রাখেন ’৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। পাকিস্তান ত্যাগের সময় তাঁর সব ছবি ও নেগেটিভ একজন বাঙালি সহকর্মীর কাছে রেখে আসেন। কিছুদিন পর সেই সহকর্মী তাঁর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে ছবি ও নেগেটিভ পাঠান ইয়াকুবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কাস্টমস চেকের ভয়ে সেই লোক সব ছবি ও নেগেটিভ পুড়িয়ে ফেলেন। এ কথা মনে করে মাঝেমধ্যে নিজেকে রিক্ত মনে করতেন ইয়াকুব।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে কেন জায়গা পেলেন না ইয়াকুব, বিষয়টি বোঝার জন্য ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, গবেষক মফিদুল হক ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সব শুনে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক বললেন, ‘এখন পর্যন্ত ভাষাসংগ্রামের যে লিখিত ইতিহাস, তাতে শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের কথা উল্লেখ নেই। ওই সময় ঢাকা থেকে কোনো দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। ফলে তাঁর ছবি হয়তো সে সময় প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু ১৯৭৪ সালে দৈনিক বাংলার মতো গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় যেহেতু ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে, তাই তাঁকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা এখন সময়ের দাবি।’
মফিদুল হক বললেন, ‘আমাদের মনোযোগ বায়ান্নর দিকে। অথচ আটচল্লিশ আর বায়ান্ন একই সূত্রে গাঁথা। আটচল্লিশ ছাড়া বায়ান্নকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও কারাবরণের কারণে শেখ মুজিব গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন, যা ইয়াকুবের ক্যামেরায় বন্দী। ছাত্রনেতা বায়তুল্লাহ ও শওকত আলীর ছবি দুটি প্রমাণ করে ওই দিনের বিক্ষোভ সমাবেশে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ইয়াকুব শুধু আটচল্লিশেই নয়, ছেচল্লিশের দাঙ্গার ছবি তুলেও দেশপ্রেমের এক অনন্য নজির স্থাপন করেছিলেন। ফলে এই মানুষটি সম্পর্কে আরও বেশি জানা দরকার। এ বিষয়ে যত তথ্য, বিবরণ ও ভাষ্য উঠে আসবে, আমাদের ইতিহাস ততই সমৃদ্ধ হবে।’
মুনতাসীর মামুন বললেন, ‘অনেক দেরিতে হলেও শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ ভাষাসংগ্রামীকে আবিষ্কার করতে পারা এক বিশাল ঘটনা। তাঁর তোলা আমতলার সমাবেশ ও আহত বায়তুল্লাহর ছবিটি ইতিহাসের এক নব সংযোজন। তাঁর ছবির কারণে আমাদের ভাষা আন্দোলনের দৃশ্য-ইতিহাসের পরিধিটাও আরও বিস্তৃত হলো। ফলে এখন থেকে তাঁর ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে ক্রেডিট লাইন ব্যবহার করা কর্তব্য বলে মনে করি।’
ইয়াকুব ব্যক্তিগত জীবনে অকৃতদার ছিলেন। মাকে নিয়ে থাকতেন পল্টনের একটি ভাড়া বাড়িতে। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর জীবন আর ভালো কাটেনি। শেষজীবনে জাতীয় প্রেসক্লাবের অভ্যর্থনা কক্ষের মেঝেতে ঘুমাতেন। দিনের বেলায় ঘুরে বেড়াতেন প্রেসক্লাবের আঙিনায়। কখনো ক্লাবের ক্যানটিনের এক কোনায় চুপচাপ বসে থাকতেন। অনুজ আলোকচিত্রীদের কাছে পেলে পুরোনো দিনের গল্প বলতেন। জীবনের একেবারে শেষ দিকে শরীরের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এ সময় বড় অবহেলায় তাঁকে নিঃসঙ্গ ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত।
কবে মারা গেলেন শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব, জানতে প্রেসক্লাবে গেলে তাঁর কথা মনে করে কয়েকজন প্রবীণ আলোকচিত্রী স্মৃতিকাতর হলেন। কিন্তু কেউ তাঁর চলে যাওয়ার দিনক্ষণ বলতে পারলেন না! প্রেসক্লাবের রেজিস্ট্রি খাতায়ও তাঁর মৃত্যুর তারিখটি পাওয়া গেল না! কম্পিউটারে সংরক্ষিত পরলোকগত সদস্য তালিকা দেখে একজন বললেন, ‘এই নামে কোনো ফটোসাংবাদিক ছিল বলে জানা নেই!’ পরে বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে পুরোনো পত্রিকার ফাইল ঘেঁটে জানলাম, ইয়াকুবের চলে যাওয়ার দিনটি ছিল বুধবার, ৭ জুন, ১৯৯৫। সেই সময়ের কয়েকটি দৈনিকে এতটা দায়সারাভাবে তাঁর প্রয়াণের সংবাদ ছাপে।