রশীদ করীমের জন্মশতবর্ষ
নীরবে অথচ কাছে
রশীদ করীম ছিলেন দেশের অন্যতম কথাসাহিত্যিক। বিভিন্ন রচনায় তিনি রেখেছেন নিজস্ব স্বাক্ষর। জন্মশতবর্ষে রশীদ করীমকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তাঁর একমাত্র মেয়ে নাবিলা মুরশেদ
রশীদ করীম গুলাম মুরশেদ, অর্থাৎ রশীদ করীম, তাঁর শারীরিক জীবন মৃত্যুর হাতে সমর্পণ করেছেন ঠিকই, তবে তিনি জীবনভর যা অর্জন করেছেন, তার সবকিছু যে সেই জীবনসংহারকারীর হাতে তুলে দিয়েছেন, তা ঠিক নয়। তিনি ছিলেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী পুরস্কার এবং বিশেষভাবে লেখিকা সংঘ পুরস্কার বিজয়ী লেখক। মানবজীবন, নারী-পুরুষ, সমাজ এবং তিনি যে জগৎ সম্পর্কে জানতেন, তা নিয়ে যা কিছু লিখেছেন, তার সবটাই মনের গভীর থেকে লিখেছেন। তবে নিজের জানাশোনার বাইরের কোনো কিছু নিয়ে তিনি লেখেননি। এ জন্যই হয়তো তাঁর লেখা আজও বাংলা সাহিত্যের বিদগ্ধ পাঠক ও গবেষকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে আছে।
বাবা সব সময়ই লেখার তাগিদ বোধ করতেন। তাই করপোরেট কর্মকর্তা হয়েও তিনি লেখার জন্য নিয়মিত সময় বের করে নিতেন। আর পড়াশোনা করতেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। তাতে থাকত গভীর মনোযোগ আর সমালোচনামূলক দৃষ্টি। যা কিছু তিনি পড়তেন, তাতে দাগ টেনে দিতেন এবং পাশে নোট লিখে রাখতেন। তিনি রাস্তার পাশের বইয়ের স্টল, বইয়ের দোকান এবং বইমেলা থেকে বই কিনতেন। যে পাঠক যে রকম বই পছন্দ করেন, তাঁকে সে রকম বই উপহার দিতেও তিনি খুব পছন্দ করতেন। কেউ কেউ তাঁর কাছ থেকে মূল্যবান অনেক বই নিয়ে আর ফেরত দেননি। তাতে তিনি বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। তাই তিনি কাউকে বই ধার দিতে পছন্দ করতেন না।
যখন আমি বাবার লেখকজীবনের দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন আমার মনে পড়ে তিনি লেখার সময় গভীর নীরবতা পছন্দ করতেন। তিনি চাইতেন তাঁর লেখার টেবিলটি যেন জানালার পাশে থাকে। তিনি তাঁর ফাউন্টেন কলমটা দোয়াতের ভেতর ডুবিয়ে দিতেন।
শৈশবেই তিনি পেয়েছিলেন সমৃদ্ধ পারিবারিক লাইব্রেরি। আর পেয়েছিলেন বড় ভাই আবু রুশদসহ একুশে পদক পাওয়া অনেক বন্ধুদের তৈরি উচ্ছল সাহিত্যিক পরিবেশ। এসবই বাবাকে একজন লেখক হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।
যখন আমি বাবার লেখকজীবনের দিনগুলোর কথা মনে করি, তখন আমার মনে পড়ে তিনি লেখার সময় গভীর নীরবতা পছন্দ করতেন। তিনি চাইতেন তাঁর লেখার টেবিলটি যেন জানালার পাশে থাকে। তিনি তাঁর ফাউন্টেন কলমটা দোয়াতের ভেতর ডুবিয়ে দিতেন। তারপর অতিরিক্ত কালি ঝরিয়ে নিতেন, শেষে সুন্দর কাগজে ফুটিয়ে তুলতেন তাঁর চিন্তাগুলো। মাথাটা একটু বাঁয়ে ঝুঁকিয়ে নিয়ে তিনি লিখতেন। তখন বাঁ হাতে কাগজটা স্থির করে ধরে রাখতেন। আর ডান হাত দিয়ে সুন্দর ছোট ছোট অক্ষরে শব্দগুলো লিখতেন। আবার লেখা সংশোধনও করতেন বারবার। লেখার সময় তিনি যেন সম্পূর্ণ আলাদা এক জগতে চলে যেতেন।
বাবা যখন আমার যত গ্লানি উপন্যাস লিখছিলেন, তখন আমাদের ধানমন্ডির ৭৭৩ নম্বর সাতমসজিদ রোডের ফ্ল্যাটে তা পাঠ করে শোনানোর আয়োজন করেছিলেন। বাবা একবার বলেছিলেন, ‘আমি ১২টা উপন্যাস লিখেছি। তার মধ্যে ছয়টি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আমি আর শামসুর রাহমান মিলে উচ্চ স্বরে পাঠ করেছি।’ কখনো কখনো আমি চুপচাপ ডাইনিং রুমে গিয়ে মন্ত্রমুগ্ধকর সেই পাঠ শুনতাম। দেখতাম, আমার চশমা পরা বাবা তখন সুতি বা খাঁটি খাদি কাপড়ে তৈরি করা তাঁর প্রিয় পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে ট্যানড উলের কার্পেটে সোজা হয়ে বসে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে স্পষ্ট স্বরে গভীর আন্তরিকতা নিয়ে পড়ছেন। সঙ্গে খাবারদাবারের আয়োজন থাকত। আর অনেক রাত অবধি চলত আলোচনা। তিনি যে লেখকদের পছন্দ করতেন, দ্বিধাহীনভাবে তাদের প্রশংসা করতেন। আবার বইপুস্তকের পর্যালোচনা লেখাকে তিনি মনে করতেন তাঁর একটা দায়িত্ব।
আমি ১২টা উপন্যাস লিখেছি। তার মধ্যে ছয়টি উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আমি আর শামসুর রাহমান মিলে উচ্চ স্বরে পাঠ করেছি।রশীদ করীম
রশীদ করীম জীবদ্দশায় ব্যাপক, বিস্তৃত, গুরুত্বপূর্ণ ও বিশাল ঐতিহাসিক পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি ১৯৫০ সালের ১৫ মার্চ ভারত ছেড়ে আসেন। কিন্তু ১৯৭১ সালে আমরা আবার ঢাকাতেই ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যাই। আমার মনে আছে একদিন বিকেলে সেনাদের একটা জিপ এসে আমাদের বাড়ির গেটে থামে। বাড়ির সব পুরুষকে তারা আঙিনায় জমায়েত হওয়ার হুকুম দেয়। আমাদের বাড়ির বৃদ্ধ মালিক, আমার বাবা এবং আরও কিছু পুরুষকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গেটের সামনে জড়ো করে। বাসা থেকে বের হয়ে নিচে যাওয়ার আগে বাবা তাঁর সুন্দরী বউ ও জীবনের সুখ-দুঃখের সঙ্গী সেলিমাকে শুধু এইটুকু বলে যান, ‘যাচ্ছি। কিছু হলে, আপার কাছে চলে যেয়ো।’ আপা মানে সেলিমার বিধবা বড় বোন। আমাদের নানিবাড়িতে তিনি সবাইকে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের মতো আগলে রাখতেন।
তবে সৌভাগ্যবশত সেদিন কোনো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেনি। সে বছরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভ করায় সেদিনটি ছিল আমাদের সবার জন্য আনন্দের। আব্বু মনে করতেন, সফল হোক বা ব্যর্থ, সব কবি-লেখকের বাংলাদেশ যে স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তা নিয়ে লেখা উচিত।
আমার কাছে আমার বাবা সবার আগে একজন পারিবারিক মানুষ। তিনি সব সময় আমাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। তিনি ছিলেন আমার পরামর্শদাতা। ছিলেন আমার শৈশবের অভিধান। আমাদের সেসব জীবনকথা তিনি তাঁর একটা উপন্যাসে ফুটিয়ে তুলেছেন। সেখানে আমাকে ‘শাবক’ নাম দিয়েছেন।
আমার কাছে আমার বাবা এখন নীরব, তবু যেন খুবই কাছে। তাঁর স্মৃতি আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। যেসব গান আমরা একসঙ্গে শুনতাম, তিনি যেন সেগুলোর সঙ্গে মিশে আছেন। যেসব শিক্ষা তিনি আমাকে দিয়েছেন, তার সঙ্গেই যেন তিনি আমার কাছে আছেন।
বাবার সঙ্গে আমার যত স্মৃতি আছে, তার মধ্যে অন্যতম প্রিয় স্মৃতিটি হচ্ছে—যখন তিনি আমাদের জন্য গানের ক্যাসেট আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বাসায় ফিরতেন। তিনি সকালে বাড়ি থেকে বের হতেন, দুপুরের খাবারের আগে ফিরে আসতেন। সঙ্গে করে নিয়ে আসতেন তাঁর যত্ন করে বাছাই করা গানের ডিস্ক। এসব গান সংগ্রহ করার জন্য তিনি ঢাকা শহরের নানান দোকানে নিয়মিত ঘোরাঘুরি করতেন। ফিরে এসে তিনি আমাকে তাঁর বাছাই করা গানগুলো শুনতে বলতেন। কলাবাগানের ফ্ল্যাটে, তাঁর পড়ার ঘরে, আমি তাঁর চেয়ারের পেছনে মেঝেতে বসে মনোযোগ দিয়ে শুনতাম তাঁর যত্ন করে সাজানো গানগুলো। এ সময় তাঁকে কেউ কোনো বাধা দিলে বা ব্যাঘাত ঘটালে তিনি তা পছন্দ করতেন না। তবে গানগুলো শোনা শেষ হলে তা নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। তাঁর সঙ্গে আরেকটি কোমল মুহূর্তের স্মৃতি হলো—আমি যখন মাথা রাখতাম তাঁর কোলে এবং চুপচাপ বিশ্রাম নিতাম, আর তিনি আলতো করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। তিনি বলতেন, আমি তাঁর ‘শাবক’। তখন আমার সবকিছুই ভালো হয়ে যেত।
গান শোনা, গান গাওয়া, একসঙ্গে খাওয়া, পরিবারের বন্ধু ও সদস্যদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করা, একসঙ্গে নীরবে বসে থাকা এবং তাঁর একমাত্র নাতনি তিশনা এবং কখনো কখনো মেয়ের জামাই খন্দকার মুশাহেদ মোহিউদ্দীনের সঙ্গে বসে পারিবারিক পরিবেশে কথাবার্তা বলা বাবার জন্য রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরোটা, কাবাব, সমুচা ও বই নিয়ে বাবার যে রকম আগ্রহ ছিল, আমার মনে হয় তা দিয়ে তিনি তাঁর নাতজামাই অ্যান্ড্রু ফেডেটজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারতেন। যদিও তাকে বাবা দেখে যেতে পারেননি। তবে আমি নিশ্চিত, তাকে পেলে তার জন্য বাবা ঢাকা ক্লাবে গিয়ে বিরিয়ানি ও কাবাব নিয়ে আসতেন। এমনকি হয়তো তিনি অ্যান্ড্রুকে নিয়ে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানগুলোতেও ঘুরতে যেতেন।
আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন, তাহলে জীবনের প্রতি তাঁর আগ্রহ আগের মতোই অপরিবর্তিত থাকত। এখন তাঁকে কীভাবে খুশি করা যায়? তাঁকে স্মরণ করলে ও তাঁর লেখা পড়লেই হয়তো তিনি খুশি হন।
বাংলাদেশের কোনো এক গ্রামে বাবার নামে স্থাপিত নলকূপ থেকে পানি পান করে কোনো পথিক এবং স্থানীয় গ্রামবাসী তৃষ্ণা নিবারণ করছে—এ রকম কিছু আমি দেখতে চাই। তাই বাবার প্রিয় নাটকগুলোর একটি রবীন্দ্রনাথের চণ্ডালিকার এ রকম একটি দৃশ্য আমার মনে মাঝেমধ্যে ভেসে ওঠে।
আমার কাছে আমার বাবা এখন নীরব, তবু যেন খুবই কাছে। তাঁর স্মৃতি আমার হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছে। যেসব গান আমরা একসঙ্গে শুনতাম, তিনি যেন সেগুলোর সঙ্গে মিশে আছেন। যেসব শিক্ষা তিনি আমাকে দিয়েছেন, তার সঙ্গেই যেন তিনি আমার কাছে আছেন।
যখন আমি জীবনের উত্থান-পতনের মুখোমুখি হই, তাঁকে স্মরণ করি। তিনি যেভাবে সবকিছু সামলাতেন, আমি সেভাবেই সামলানোর চেষ্টা করি। তাঁর মতোই আমি আমার কাজে মানবিক দিকগুলো বজায় রাখার চেষ্টা করি। তিনি যেসব প্রথার চলন করেছেন, সেগুলো আমরা মেনে চলি।
ওপর থেকে নয়, নিচ থেকে আমরা সবাই তাঁকে বলছি, শুভ জন্মদিন, আব্বু!
...... ...... ......
অনুবাদ: জিয়া হাশান