আমার শৈশবে-কৈশোরে কথাসাহিত্যের যে দুটি চরিত্র আমার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে, তারা হলো বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’র অপূর্ব কুমার রায় ওরফে অপু এবং নিকোলাই অস্ত্রোভস্কির রুশ উপন্যাসের বাংলা ভাষান্তর ‘ইস্পাত’ (হাুউ দ্য স্টিল ওয়াজ টেমপার্ড)-এর পাভেল কোরচাগিন ওরফে পাভলুশা, ওরফে পাভলুশকা, ওরফে পাভকা।
‘পথের পাঁচালী’ ও ‘ইস্পাত’ দুটোই আত্মজৈবনিক উপন্যাস। অপু যেমন বিভূতিভূষণের আপন চরিত্রের প্রতিবিম্ব, তেমনি পাভেল চরিত্রটিও অস্ত্রোভস্কির নিজ জীবনের ছায়া অনুসরণে নির্মিত। দুটো উপন্যাসই তাদের স্রষ্টাদের সিগনেচার ক্রিয়েশান, তাঁদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
‘পথের পাঁচালী’ প্রথম আমার হাতে আসে আমার বছর আটেক বয়সে, যখন আমি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। প্রশ্ন, ওই নিতান্ত অবোধ শৈশবে ‘পথের পাঁচালী’র মতো একটা ধ্রুপদি গ্রন্থের কতটুকু আমি বুঝতে বা হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলাম। জবাবে এটুকু বলতে পারি, বই পড়ার অভ্যাস একেবারে দুগ্ধপোষ্য বয়স থেকেই আমার রক্তে সহজাত প্রবহমান ছিল এবং স্বভাবেও খানিকটা ইঁচড়ে পাকা বা ‘প্রিকশাস’ ধরনের ছিলাম, যার ফলে সহজ-সরল কাব্যিক সাধু গদ্যে লেখা বিভূতিভূষণের অসাধারণ উপন্যাসটির মর্ম শুধু যে বুঝেছিলাম তা-ই নয়, বুঝে একদম অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।
অবশ্য উপন্যাসটির দার্শনিক অংশগুলো, যেমন সবশেষের ‘পথের দেবতা প্রসন্ন হাসিয়া কহিলেন’ ধরনের কথাগুলোর মর্মার্থ পুরোটা বুঝতে পেরেছিলাম বললে ভুল হবে। তবে অপু চরিত্রটি আমাকে সেই বয়সেই একেবারে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল, যার ঘোর আজ প্রায় অর্ধশতাব্দী পরেও পুরোপুরি কাটেনি।
‘পথের পাঁচালী’ ও ‘ইস্পাত’ দুটোই আত্মজৈবনিক উপন্যাস। অপু যেমন বিভূতিভূষণের আপন চরিত্রের প্রতিবিম্ব, তেমনি পাভেল চরিত্রটিও অস্ত্রোভস্কির নিজ জীবনের ছায়া অনুসরণে নির্মিত। দুটো উপন্যাসই তাদের স্রষ্টাদের সিগনেচার ক্রিয়েশান, তাঁদের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি।
আসলে অপুর সঙ্গে তখন আমি আমার নিজের অনেক মিল খুঁজে পেয়েছিলাম, আবার অনেক গরমিলও। অপুর কল্পনাপ্রবণতা, বাঁশের কঞ্চির তির-ধনুক হাতে পৌরাণিক চরিত্র সেজে আপনমনে খেলা করা, গাছপালা ও প্রকৃতির রাজ্যে বিভোর হয়ে হারিয়ে যাওয়া—এসব ব্যাপার তখন আমার চরিত্রেও অনেকটা ছিল। কিন্তু আমি এ–ও বুঝতাম, অপুর অনুপম সারল্য আমার বা আমাদের কালের শিশুদের চরিত্রে নেই, আমরা তার মতো দেবশিশু নই। কথাটা ভেবে আমি তখন খুব কষ্ট পেতাম। প্রাণপণে চাইতাম অপুর মতোই হয়ে উঠতে, যদিও সারা জীবনের চেষ্টায়ও তা হতে পারিনি—কোনো দিন পারব বলেও মনে হয় না।
এর পাঁচ কি ছয় বছর পর, অষ্টম কি নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে আমাদের পারিবারিক গ্রন্থ সংগ্রহের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম ‘ইস্পাত’ বইটি। বঙ্গানুবাদটি ছিল রবীন্দ্র মজুমদারের করা। সু-অনূদিত অসাধারণ এই ধ্রুপদি উপন্যাসটির নায়ক পাভেলও আমাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল, যদিও তার চরিত্রের সঙ্গে আপাতদৃষ্টে আমার তেমন কোনো মিল ছিল না। পাভেল ছিল এমন এক চরিত্র, যাকে আমরা বলি ডানপিটে, একগুঁয়ে, মারকুটে ধরনের। কিন্তু তার চরিত্রে যেটা আমাকে ভীষণ টানত, সেটা হলো বন্ধু বা সঙ্গীদের প্রতি তার অপরিসীম ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও আনুগত্য। এককথায় যাকে বলা যায় ‘ক্যামারেডেরি’—বন্ধু ও সহযোদ্ধাদের প্রতি পাভেলের আচরণ ছিল তার প্রকৃষ্ট নিদর্শন।
অপু চরিত্রেও এই বন্ধুবাৎসল্য একটা বড় পরিধিজুড়ে ছিল, যার প্রধান নিদর্শন দরিদ্র অন্ত্যজ ব্রাহ্মণসন্তান, বাল্যবন্ধু পটুর প্রতি অপুর অসাধারণ ভালোবাসা, নিজে দরিদ্র হয়েও দরিদ্রতর বন্ধুটির প্রতি বারবার তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। নিজে খুব শক্তপোক্ত শরীরের বা মারকুটে স্বভাবের না হয়েও, কড়ি খেলার আসরে পটুকে বাঁচানোর জন্য অপু যেভাবে জেলেপাড়ার ধেড়ে ছেলেদের সাহসী মোকাবিলা করেছে, তা তার চরিত্রের অন্য একটা দিককে বিশেষভাবে তুলে ধরে।
পাভেল-তানিয়ার সম্পর্কের মধ্যে শরীরের একটা ভূমিকা আছে, যদিও তা কখনোই শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়নি। পক্ষান্তরে অপু-লীলার সম্পর্ক, যা গড়িয়েছে ‘পথের পাঁচালী’র পরবর্তী খণ্ড ‘অপরাজিত’তেও, তা ছিল একান্তভাবেই প্লাটোনিক—কামগন্ধহীন ‘রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম’।
তা ছাড়া আমার বয়ঃসন্ধিকালে প্রথম হাতে আসা অস্ত্রোভস্কির বইটিতে দুই কিশোর-কিশোরী পাভেল ও তানিয়া তুমানোভার যে আবেগঋদ্ধ প্রেমকাহিনি বর্ণিত হয়েছে, সেটাও যে আমাকে খুব টেনেছিল, তা–ও স্বীকার করতে হবে। ‘পথের পাঁচালি’ ও ‘ইস্পাত’—এ দুই গ্রন্থে বর্ণিত অপু-লীলা ও পাভেল-তানিয়া যুগলের বন্ধুত্ব কিংবা প্রেমের কাহিনির মধ্যেও মিল-গরমিল দুই-ই রয়েছে। পাভেল-তানিয়ার সম্পর্কের মধ্যে শরীরের একটা ভূমিকা আছে, যদিও তা কখনোই শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়নি। পক্ষান্তরে অপু-লীলার সম্পর্ক, যা গড়িয়েছে ‘পথের পাঁচালী’র পরবর্তী খণ্ড ‘অপরাজিত’তেও, তা ছিল একান্তভাবেই প্লাটোনিক—কামগন্ধহীন ‘রজকিনী প্রেম নিকষিত হেম’।
অপু ও পাভেল দুজনই যেমন দরিদ্র পরিবারের সন্তান, তেমনি লীলা ও তানিয়া দুজনই কিন্তু ধনী বা সচ্ছল পরিবারের কন্যা। অসম আর্থিক অবস্থা তাদের ভালোবাসায় কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি এবং এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছে অবশ্যই ধনী প্রেমিকাদ্বয়। এ দুই ধনী-দরিদ্র যুগলের কারোরই বাল্য বা কৈশোর প্রণয় শেষ পর্যন্ত মিলন বা পরিণয়ে পরিণতি পায়নি। লীলা ও তানিয়া—দুজনই এক পর্যায়ে শিকার হয়েছে অসুখী দাম্পত্যজীবনের; যদিও আমার শৈশবে সেসব বিষয় খুব বেশি বিবেচ্য ছিল না। অপু-পাভেলের বাল্য ও কৈশোরলীলার অনবদ্য অনন্য কাহিনিগুলো নিয়েই আমি তখন বিভোর হয়ে থাকতাম। অপু-লীলার প্রেম বা অপু-পটুর বন্ধুত্বের পরিণতি জানার জন্য অবশ্য ‘পথের পাঁচালী’র পরের পর্ব ‘অপরাজিত’ পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম আরও কিছুদিন পর।
আপাতদৃষ্টে পাভেল আর অপু সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটো চরিত্র। দুজনের মধ্যে প্রধান দুটো মিল—তারা দুজনেই দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং দুজনের জীবনেই প্রধান নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে তাদের মা। অপুর মা সর্বজয়া এবং পাভেলের মা মারিয়া (ইয়াকভলেভনা)—গভীর বাৎসল্যবোধের দিক থেকে এ দুই বাঙালি ও রুশ মায়ের মধ্যে বিস্তর মিল রয়েছে। তারা দুজনই পুত্র–অন্তঃপ্রাণ। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে পাভেলের জীবনে মারিয়ার তুলনায় অপুর জীবনে সর্বজয়ার ভূমিকা অনেক বেশি সর্বব্যাপী। অপু আশৈশব বেড়ে উঠেছে তার মাতৃছায়ায়। সর্বজয়া আমৃত্যু তার স্নেহের আঁচলে ঢেকে রেখেছে তার ‘নিতান্ত অবোধ, সরল’ ছেলেটাকে। অপুর জন্মের পর থেকে তো বটেই, কিন্তু বিশেষ করে কাশীতে অপুর বাবা হরিহরের মৃত্যুর পর থেকে, সর্বজয়া যেভাবে নিজেকে নিংড়ে, সর্বস্ব উজাড় করে, সব ধরনের দীনতা, দাসত্ব ও অপমান সহ্য করে অপুকে মানুষ করে তুলেছে, তার তুলনা মেলা ভার।
অসম আর্থিক অবস্থা তাদের ভালোবাসায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। এ দুই ধনী-দরিদ্র যুগলের কারোরই বাল্য বা কৈশোর প্রণয় শেষ পর্যন্ত মিলন বা পরিণয়ে পরিণতি পায়নি। লীলা ও তানিয়া—দুজনই এক পর্যায়ে শিকার হয়েছে অসুখী দাম্পত্যজীবনের; যদিও আমার শৈশবে সেসব বিষয় খুব বেশি বিবেচ্য ছিল না।
পক্ষান্তরে পাভেল নিতান্ত শিশু বয়স থেকেই স্বনির্ভর—বালক বয়সেই স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে সে কর্মজীবনে ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়েছে। তারপর রুশবিপ্লব ও বিশ্বযুদ্ধের নানা ঘটনাপ্রবাহ তাকে উল্কার মতো ছুটিয়ে বেড়িয়েছে তার বিশাল স্বদেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। ফলত মাতৃসান্নিধ্যে থাকার সময় সে পেয়েছে খুবই কম। তারপরও সর্বজয়ার মতো অতটা না হলেও, বিধবা মারিয়াও তার দুরন্ত ছেলেটার জন্য কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার কম করেনি।
শৈশবে অপু চরিত্রের সঙ্গে আমার অনেক মিল ছিল, সে কথা আগেই বলেছি। তার স্বভাবের কল্পনাবিলাস, বাগাড়ম্বর, প্রকৃতিপ্রেম প্রভৃতি দিকগুলোতে আমি নিজেকে খুঁজে পেতাম। তাই তাকে ভালোবাসা বা পছন্দ করার পেছনে একটা যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু পাভেলকে কেন আমি এত পছন্দ করতাম, সেটা একটা রহস্য। সে ছিল আমার প্রায় সম্পূর্ণ বিরুদ্ধ স্বভাবের। হয়তো আমি যা নই, অথচ আমি যা হতে চাই, পাভেলের মধ্যে সেটা দেখতে পেয়েছিলাম বলেই আমি তার অনুরাগী হয়ে পড়েছিলাম।
অপু ও পাভেল দুজনই দরিদ্র, কিন্তু দুজনে দারিদ্র্যকে নিয়েছে দুভাবে। অপুর দারিদ্র্য তার স্বভাবকে মলিন বা কলঙ্কিত করতে পারেনি। বরং দারিদ্র্যই যেন তার চরিত্রকে আরও মহত্ত্বে, মানবিকতায় ভাস্বর করে তুলেছে। বিভূতিভূষণ বইটির এক জায়গায় দারিদ্র্যকে ‘সোনা-করা জাদুকরের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন—অপুর জবানিতে। অন্যদিকে পাভেল তার দরিদ্র জীবন ও পরিপার্শ্বের প্রতি ছিল গভীরভাবে ক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ, পরিণতিতে যা তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বিপ্লবের পথে।
ছোটবেলায় আরও অনেক শিশু-কিশোর চরিত্রের দেখা পেয়েছি গল্পে-উপন্যাসে। চার্লস ডিকেন্সের অলিভার টুইস্ট, মার্ক টোয়েনের টম সইয়ার ও হাকলবেরি ফিন এবং আরও কত যে চরিত্র ভিড় করে এসেছে আমার মনোজগতে! তারা সবাই না হলেও অনেকেই আমার মনকে টেনেছে নিশ্চয়, কিন্তু সত্যিকার অর্থে আমার মন কেড়েছে, হৃদয় হরণ করেছে বিভূতিভূষণের অপু আর অস্ত্রোভস্কির পাভেল। এরাই ছিল আমার শৈশবের প্রকৃত নায়ক কিংবা অন্তরঙ্গ বন্ধু।