রফিকুলের ক্যামেরায় একুশের উত্তাল সময়

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা যখন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র রফিকুল ইসলামের মনে হয়, এই ঐতিহাসিক ঘটনার ছবি তুলে রাখা দরকার। তাঁর ছিল একটি ভয়েগল্যান্ডার ফোল্ডিং ক্যামেরা। তাতে এক রোল ফিল্মে আটটি ছবি তোলা যায়। ক্যামেরায় এক রোল ফিল্ম লোড করে আর পকেটে আরেকটি রোল নিয়ে তিনি ছুটলেন পুরোনো কলা ভবনের আমতলায় [বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগ]। একুশের সকালে কলা ভবন প্রাঙ্গণে সভা শুরু হয়। ওই সভা এতটাই জনাকীর্ণ ছিল যে প্রাঙ্গণ থেকে তার পুরোটা তোলা যাচ্ছিল না। এই ছবির টপ ভিউ তুলতে হলে তাঁকে কলা ভবনের ছাদে উঠতে হবে। কিন্তু দোতলা এই ভবনের ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না, ছিল একটি ফোকর। ওই ফোকর দিয়ে বন্ধুরা তাঁকে ছাদে উঠিয়ে দিলেন। রৌদ্রোজ্জ্বল ফাল্গুনের দুপুরে ওই ছাদ থেকে তিনি ছাত্রসভার এক রোল ছবি তুললেন। এরপর একটু ছায়ায় গিয়ে শার্টের নিচে ক্যামেরা রেখে বদলে নিলেন ফিল্ম।

বেলা ১১টার দিকে সিদ্ধান্ত হলো ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। শিক্ষার্থীরা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার জন্য কলা ভবনের সিংহদ্বারের বন্ধ করা লোহার গেটের দিকে অগ্রসর হলেন। এ সময় তিনি ছবি তুললেন আরও এক রোল। এর মধ্যে গেটের অপর দিকে শুরু হয়ে গেল পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ আর ধরপাকড়। ছাদ থেকে তিনি এসব দৃশ্য দেখতে পেলেন না। তাই বাধ্য হয়ে নিচে নেমে এলেন। এর মধ্যে তাঁর ফিল্মও শেষ হয়ে যায়।

একুশের সকালে কলা ভবন প্রাঙ্গণে সভা শুরু হয়। ওই সভা এতটাই জনাকীর্ণ ছিল যে প্রাঙ্গণ থেকে তার পুরোটা তোলা যাচ্ছিল না। এই ছবির টপ ভিউ তুলতে হলে তাঁকে কলা ভবনের ছাদে উঠতে হবে। কিন্তু দোতলা এই ভবনের ছাদে ওঠার কোনো সিঁড়ি ছিল না, ছিল একটি ফোকর।
অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম [১ জানুয়ারি ১৯৩৪-৩০ নভেম্বর ২০২১]। আলোকচিত্রী : অজানা

সারা দিন ধরে পুলিশ-ইপিআরের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ চলছে। রফিকুল সেই সংঘর্ষের একেবারে সামনের কাতারে। বেলা তিনটার দিকে মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসের গেট দিয়ে কিছু সশস্ত্র পুলিশ ভেতরে ঢোকে। তারা সমবেত ছাত্র-জনতার দিকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। পুলিশ যখন গুলিবর্ষণ শুরু করে তখন তিনি দ্রুত হোস্টেল প্রাঙ্গণ ছেড়ে মেডিকেল কলেজ ভবনের মাঝখানের প্রবেশপথে অবস্থান করেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেডিকেলের ওয়ার্ডবয়রা অ্যাম্বুলেন্সে করে মাথায় গুলি লাগা একটি মরদেহ স্ট্রেচারে করে নামালেন। গুলিতে মাথার খুলি উড়ে গেছে, সেখান থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে; মগজ গলে পড়ছে। লাশটা জরুরি বিভাগে না রেখে একটি গুদাম ঘরে নিয়ে যাওয়া হলো। গুমের উদ্দেশ্যেই ওখানে রাখা হয় লাশটা। পরে জেনেছেন, ওটা রফিক উদ্দিন আহমেদের লাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এমএ ক্লাসের ছাত্র আবুল বরকতের গুলি লাগে ঊরু ও তলপেটে। অনেকের সঙ্গে রফিকুলও তাঁকে ধরাধরি করে জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। বরকতের শরীর থেকে কলকল করে রক্ত বের হচ্ছে। গুলির ব্যথায় কাতর বরকত বারবার পানি পানি করছিলেন। তাঁর সারা মুখে বৃষ্টির ফোটার মতো ঘাম। স্পষ্ট করে বললেন, ‘আপনারা পুরানা পল্টনে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে খবর দেন। ওখানে আমার বোন আর ভগ্নিপতি আছেন।’ রফিকুল কার যেন একটা সাইকেল নিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া ভবনে যান। বরকতের ভগ্নিপতি বাড়িতে নেই, তাই বোনকে খবরটা দিলেন। সন্ধ্যায় হাসপাতালে আসেন তাঁর ভগ্নিপতি। সে রাতেই অপারেশন থিয়েটারে মারা যান বরকত।

১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি [পুরাতন কলা ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

রফিকুল সেদিন যত ছবি তোলেন, সেগুলো রক্ষা করা নিয়ে শঙ্কায় পড়লেন। চারদিকে পুলিশ আর গোয়েন্দা সংস্থার লোক। এক্সপোজড করা ফিল্ম বাসায় রাখা নিরাপদ নয়, যেকোনো সময় তল্লাশি হতে পারে। কী করা যায় তাৎক্ষণিকভাবে ভেবে গেলেন ১৯ তোপখানা রোডের জাইদিস ফটোগ্রাফার্সে। জাইদিস তখন ঢাকার সবচেয়ে নামকরা স্টুডিও। এর মালিক সাগীর আলী জাইদি ছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের লোক। রফিকুল ফিল্ম দুটি সেই স্টুডিওতে রেখে নতুন ফিল্ম নিয়ে বাসায় ফেরেন। ফিল্মটি এমন জায়গায় রাখলেন যেন সহজে কেউ খুঁজে না পান। কিছুক্ষণ পর গোয়েন্দা সংস্থার দুই সদস্য তাঁর বাসায় এসে হাজির। ছবি তুলেছেন কি না জানতে চান। রফিকুল ক্যামেরা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ফিল্ম ছিল না বলে ছবি তুলতে পারি নাই।’ ক্যামেরায় ফিল্ম না পেয়ে গোয়েন্দারা চলে গেলেন।

পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদের রক্তশপথে ঢাকা শহর উত্তাল হয়ে ওঠে। দিনের আলো ফুটতেই বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম লোড করে বেরিয়ে পড়েন রফিকুল। পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পুরাতন কলা ভবনের আমতলায় ছাত্রছাত্রীরা জমায়েত হয়। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে কলা ভবনের চূড়ায় উত্তোলন করা হয় শোকের পতাকা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা। জানাজা শেষে বের করা হয় শোক শোভাযাত্রা। আহত হৃদয়ে ওই শোকাবহ মুহূর্তের ছবি তুললেন রফিকুল। এরপর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত টানা একুশ উদ্‌যাপনের ছবি তুলেছেন তিনি। ১৯৫৩ সালে নির্মিত শহীদ মিনার, ফেস্টুন হাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের বিক্ষোভ মিছিল, পুরাতন ঢাকা কলেজ প্রাঙ্গণে এবং ইডেন কলেজের ছাত্রীদের শহীদ মিনার নির্মাণ, পল্টন ময়দানে ঢাকা চারুকলার ছাত্রদের শোভাযাত্রা, ১৯৫৪ সালে রাজপথে শোভাযাত্রা, ১৯৫৬ সালে বর্তমান শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তরের আলোকচিত্রসহ একুশের প্রায় সব ছবিই তাঁর তোলা। রফিকুলের রক্তের আখরে রচিত সেই আলোকচিত্রের ভান্ডার এখন বাংলা একাডেমির ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে রক্ষিত আছে। তাঁর অধিকাংশ ছবি আছে সি এম তারেক রেজার একুশ : ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৫৬) শিরোনামের অ্যালবামেও।

ফিল্মটি এমন জায়গায় রাখলেন যেন সহজে কেউ খুঁজে না পান। কিছুক্ষণ পর গোয়েন্দা সংস্থার দুই সদস্য তাঁর বাসায় এসে হাজির। ছবি তুলেছেন কি না জানতে চান। রফিকুল ক্যামেরা এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ফিল্ম ছিল না বলে ছবি তুলতে পারি নাই।’ ক্যামেরায় ফিল্ম না পেয়ে গোয়েন্দারা চলে গেলেন।
পুলিশের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে পুরাতন কলা ভবনের আমতলায় ছাত্রছাত্রীদের জমায়েত [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

রফিকুল যে ক্যামেরা দিয়ে ভাষা আন্দোলনের ছবি তুলেছিলেন, সেটি ১৯৪৯ সালে উপহার পেয়েছিলেন তাঁর বিলেতফেরত এক ভাইয়ের কাছ থেকে। এই ক্যামেরার ছিল ৩ দশমিক ৫ কালার স্কোপার লেন্স। ক্যামেরাটি যেহেতু অটোমেটিক ছিল না, সে জন্য ওই দিন লেন্স ও দূরত্বের কথা মাথায় রেখে তাঁকে ছবি তুলতে হয়। ১৯৪৩ সালে মাত্র ৯ বছর বয়সে প্রথম কোডাকের একটি সিক্স টোয়েন্টি বক্স ক্যামেরা হাতে পেয়েছিলেন রফিকুল। ওই সময় থেকে বাবার চাকরি সূত্রে তিনি ঢাকায়। তাঁর বাবা মো. জুলফিকার আলী ছিলেন রেলওয়ে হাসপাতালের চিকিৎসক। ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদর দপ্তর ছিল ফজলুল হক হল। আর ফজলুল হক হলের উল্টো দিকের রেলওয়ে কলোনিতেই ছিল তাঁদের বাসা। তখন স্কুলের ছাত্র হলেও এই আন্দোলনের উত্তাপ এসে লাগে তাঁর উন্মীলিত কৈশোরে। ক্যাম্পাস এলাকায় বসবাস হওয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত আন্দোলন-সংগ্রামের স্রোতধারা তাঁর রক্তের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি [পুরাতন কলা ভবন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের একজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন রফিকুল। তিনি তখন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র। বিশিষ্ট সাংবাদিক বেবী মওদুদকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ। ২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বিডিনিউজে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সকাল বেলা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যখন সেক্রেটারিয়েট ঘেরাও করে, তখন প্রচণ্ড রকমের কৌতূহল নিয়ে রফিকুল সেখানে ছুটে যান। তাঁর বাসার পাশেই সেক্রেটারিয়েট। সেদিন ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। অসংখ্য ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব রফিকুলের চোখের সামনেই ঘটে। ওখানেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখেন। সেক্রেটারিয়েটের প্রবেশপথে ছাত্ররা যখন মাটিতে শুয়ে বাঁধা দিচ্ছিলেন, তখন একজন ছাত্রনেতাকে দেখলেন শুয়ে পড়তে। আর একটা দৃশ্য দেখলেন যে সেই ছাত্রনেতা আহত একজনকে রিকশায় করে মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাচ্ছেন। রফিকুল কিন্তু তখনো সেই ছাত্রনেতাকে চিনতেন না। পরে শুনেছেন তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।

সেদিন ছাত্রদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়। অসংখ্য ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। এসব রফিকুলের চোখের সামনেই ঘটে। ওখানেই তিনি বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখেন। সেক্রেটারিয়েটের প্রবেশপথে ছাত্ররা যখন মাটিতে শুয়ে বাঁধা দিচ্ছিলেন, তখন একজন ছাত্রনেতাকে দেখলেন শুয়ে পড়তে।

ভাষা আন্দোলন নিয়ে জীবনভর লেখালেখি করেছেন রফিকুল। সেগুলো পড়ে তাঁর সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে। ইচ্ছা হয়, তাঁর নিজের মুখে ভাষা সংগ্রামের সেই সব উত্তাল দিনের কথা শুনতে। ফোন করতেই বললেন, ‘আগামীকাল ধানমন্ডির ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসে চলে আসেন।’ ২০১৭ সালের ১৮ মার্চ সকালে ইউ ল্যাবে গিয়ে হাজির হই। আমার প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘১ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় পুরো মাস ঢাকা মুখরিত ছিল। রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ৪ ফেব্রুয়ারি কলা ভবনের আমতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই দিন পতাকা দিবসের প্রতিবাদ সভা ও ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ মিছিলসহ শহর প্রদক্ষিণের বেশ কিছু ছবি তুলি। ৪ তারিখে ঘোষণা করা হলো যে ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ববাংলার আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন হবে। ওই দিনটিকে আমরা রাষ্ট্রভাষা দিবসরূপে পালন করব এবং আইন সভায় গিয়ে স্মারকলিপি দেব। এই কর্মসূচিকে সফল করার জন্য ১১ ফেব্রুয়ারি আমরা পতাকা দিবস পালন করলাম এবং ঢাকার প্রায় সব স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করলাম।’

পুরাতন কলা ভবনের ছাদে কালো পতাকা উত্তোলন [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

‘১ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই আন্দোলনে কোনো পুলিশি হামলা হয়নি। ২০ ফেব্রুয়ারি সকাল বেলা পুরোনো কলা ভবনের মধুর স্টলে বসে শুনলাম একুশে ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারির ঘোষণা। এক মাস পর্যন্ত কোনো সভা, শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ করা যাবে না। ঘোড়ার গাড়ি থেকে মাইকে এই ঘোষণা প্রচার করা হচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে আমরা বিক্ষোভে ফেটে পড়লাম। আমাদের স্লোগান জেগে উঠল—১৪৪ ধারা মানি না, মানব না। আমতলায় জরুরি সভা বসল। সিদ্ধান্ত হলো পরের দিন সকালে ছাত্রসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ হবে কী হবে না। সারা রাত ঢাকা হলের একটা রুমে বসে আমরা নানা রকম ফেস্টুন, ব্যানার তৈরি করলাম। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, রাজবন্দীদের মুক্তি চাই”, “১৪৪ ধারা মানি না” ইত্যাদি ইত্যাদি। পরদিন ১১টায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে শুরু হয় ঐতিহাসিক সভা। কলা ভবনের সিংহদ্বার তালাবদ্ধ এবং এর পুরোটাই পুলিশ-ইপিআর পরিবেষ্টিত। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা পুরোনো রেললাইনসংলগ্ন কলা ভবনের দেয়াল টপকে আমতলায় এসে সমবেত হয়।’ রফিকুলের গল্প চলতে থাকে। বলতে থাকেন মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের কথাও। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী ও নির্যাতিত হওয়ার শ্বাসরুদ্ধকর গল্প শুনে শিহরিত হই।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৬টি ছবি তুলেছিলেন রফিকুল। ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের ওপর গুলি হতে পারে—এটা তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। ফিল্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন তিনি গুলিবিদ্ধ বরকত আর নিহত রফিকের ছবি তুলতে পারেননি; এই ঘটনাকে জীবনের বড় ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন।
প্রতিবাদ দিবসে সংগ্রামী ছাত্রছাত্রীদের শোভাযাত্রা [ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

রফিকুলের জীবন বর্ণাঢ্য। ১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে একই বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ওই সময় থেকে তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তিনিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নজরুল অধ্যাপক ও নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রথম পরিচালক। কবির জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে তিনি নজরুল নির্দেশিকা, নজরুল জীবনী, কাজী নজরুল ইসলাম : জীবন ও সাহিত্যসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই লেখেন। ২০১৮ সালে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে সম্মানিত করা হয়। গবেষণা, সাহিত্য ও শিক্ষা ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ২০০১ সালে একুশে পদক ও ২০১২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পুরস্কার, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের উপাচার্য ছিলেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং শেষ জীবনে এই প্রতিষ্ঠানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

ভাষাশহীদদের কবর জিয়ারতের জন্য জনতার ঢল [আজিমপুর কবরস্থান, ৫ মার্চ ১৯৫২]। আলোকচিত্র : রফিকুল ইসলাম

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ১৬টি ছবি তুলেছিলেন রফিকুল। ভাষার দাবির জন্য ছাত্রদের ওপর গুলি হতে পারে—এটা তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। ফিল্ম শেষ হয়ে যাওয়ায় ওই দিন তিনি গুলিবিদ্ধ বরকত আর নিহত রফিকের ছবি তুলতে পারেননি; এই ঘটনাকে জীবনের বড় ট্র্যাজেডি বলে মনে করেন। তাঁর ছবির কপিরাইট নিয়ে জানতে চাইলাম। রফিকুল বললেন, ‘আমি ছবি তুলেছি ইতিহাসকে ধরে রাখার জন্য। এখন ইতিহাসের প্রয়োজনে কেউ যদি আমার তোলা ছবি ব্যবহার করতে চায়, করবে। এর জন্য আমার কাছে এসে অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই। ছবিতে ক্রেডিট লাইন উল্লেখ করলেই চলবে।’

রফিকুলের কথা শুনে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে।