বড্ড হিংস্র একটা সময় পার করছি আমরা। চারদিকে অস্থিরতা; অবিশ্বাস ঘন হয়ে আসছে। এই ঘেরাটোপ থেকে মনটা কেবলই ‘পালাই পালাই’ করে। কিন্তু কোথায় যাই? কী করি? আমার ভেতর একটা ‘শীত’ আছে। তীব্র, উষ্ণ শীত। একে আমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারি না। আমার কাছে শীত মানে কেবল ঋতুবদল নয়, শীত মানে ‘আশ্রয়’। তীব্র শীত আমাকে সব সময় আশ্রয়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাই আর কালবিলম্ব নয়। ডিসেম্বরের হাড় হিম করা বাতাসের ডাকে সাড়া দিয়ে চেপে বসলাম নাইট কোচে।
বাসের চাকা যখন ঘুরছিল, আমার কানে তখন কিশোরী আমনকর। রাগ হংসধ্বনির তীব্র হাহাকার আমার মস্তিষ্কে নাকি হৃদপুরের পথে, তা আমি আলাদা করতে পারি না। সুবহে সাদিকের ফিকে আলোয় যখন বাস থেকে নামলাম, মনে হলো আমি পৃথিবীর শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। নামছি আমার স্মৃতির উঠোনে। আমার পুরোনো ডেরা ভেঙে গেছে সেই কবে, জাগতিক হিসেব-নিকেশে আমি বাস্তুচ্যুত। কিন্তু তাতে কী আসে–যায়? পা ফেলতেই হৃদপুরের পথঘাট আমাকে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি ফিরেছ!’
ডিসেম্বরের এই ভোরটা কেমন যেন ধ্যানমগ্ন। হৃদপুর তার সবটুকু ডালপালা গুটিয়ে নিয়ে এক অদ্ভুত ঋষির মতো ধ্যানে মগ্ন হয়ে আছে। জামে মসজিদ পেরোতেই মেহগনির পাতা থেকে টুপ করে ঝরে পড়া শিশির আমাকে ছুঁয়ে দিল। মনে হলো, ওসমান চৌকিদার কি আজও ডিউটি দিচ্ছে? তিনি নেই, নাকি আছেন? ওই যে চটে মোড়ানো ছায়াময় অবয়বগুলো—ওরা কি ওসমান চৌকিদার, নাকি আমারই ফেলে আসা সময়ের প্রহরী? জানি না।
নামছি আমার স্মৃতির উঠোনে। আমার পুরোনো ডেরা ভেঙে গেছে সেই কবে, জাগতিক হিসেব-নিকেশে আমি বাস্তুচ্যুত। কিন্তু তাতে কী আসে–যায়? পা ফেলতেই হৃদপুরের পথঘাট আমাকে ফিসফিস করে বলল, ‘তুমি ফিরেছ!’
হাঁটছি। মাস্টারবাবুর বাড়ি পেরিয়ে রাজেনবাবুর দোকান। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে দোকানটাকে দেখছি। একসময় এর কোণে ঝুমকো জবা আর মধুমঞ্জরির ঝাড় ছিল। আজ কুয়াশায় কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। নাকি আমার দৃষ্টিই ঝাপসা? কুয়াশা কি কেবল প্রকৃতিকে ঢেকে দেয়? আমরা তো জেনে এসেছি, কুয়াশা দৃষ্টিকে ঝাপসা করে দেয়। কিন্তু আপনি যদি ঘটমান বর্তমানে থেকে, হৃদপুরের এই মাতাল কুয়াশা গায়ে মেখে পথে হাঁটেন; তবে দেখবেন এই কুয়াশাই আপনাকে নিজের ভেতরে ডুব দিতে শেখাচ্ছে। নাগরিক জটাজালে আমরা একই বৃত্তে অনবরত খাবি খাই, কিন্তু হৃদপুরের এই শীতল সিম্ফনি আপনাকে জীবন জিজ্ঞাসায় আত্মমগ্ন করবে।
আমি এখন হাঁটছি বর্তমানে, অথচ আমার অস্তিত্ব দুলছে অতীতে। নাগরিক জঞ্জালে আমরা তো কেবল খাবি খাই, কিন্তু এখানে? এই যে হৃদপুরের শীতল সিম্ফনি—এ আমাকে জীবন জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, দোয়ানি মোড় পেরিয়ে যে সরলরেখাটা চলে গেছে ডুয়ার্সের দিকে, ওটা কোনো রাস্তা নয়, ওটা সান্তা ক্লজের হীরণ্ময় পথ। ছিপছিপে নদী, কাঁটাতার ছুঁয়ে পাকদণ্ডী আর পাকদণ্ডী। সেই প্যাঁচানো পথ পেরিয়েই উঁচুতে উঠতে হয়। হৃদপুর থেকে শৈল শহর দার্জিলিং কেবল কুয়াশা–ছেঁড়া দূরত্বের ব্যবধান।
আত্মমগ্ন হয়েই পথ চলছিলাম। হঠাৎ কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে এল চেনা শব্দ, চেনা সুর—‘বাবু কেমন আছ? অনেক দিন চোখে দেখি না।’ থমকে দাঁড়ালাম। ঘন কুয়াশা ফুঁড়ে বিপরীত জন আমার কাছে ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠলেন। বয়সের ভারে চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে, বলিরেখায় মুখের অবয়ব অনেকটা ঝুলে গেছে। কিন্তু তাঁর দাঁড়ানোর সেই ঋজু ভঙ্গিটা আজও জ্বলজ্বল করছে। এ মানুষটিই আমাকে অনায়াস দক্ষতায় পাকদণ্ডী মাড়িয়ে বাইসাইকেল চালানোয় হাতেখড়ি দিয়েছিলেন। এমন অগণন ‘প্রথম’-এর সাক্ষী হয়ে আমার হৃদপুর; অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে।
হৃদপুরের প্রান্তর জুড়ে এখন শুধু খড়-নাড়ার অবশিষ্ট। আমরা দুজন হাঁটছি, জমাট শিশির মাড়িয়ে। পুব আকাশে কুয়াশাভেজা সূর্য আলোকমঞ্জরি ছড়িয়ে উদ্বাহু হয়ে উঠছে। শুষে নিচ্ছে মাঠের ফাটল আর রাতের নিনাদ।
হৃদপুরের প্রায় প্রতিটি বাড়ি আমার আপন আঙিনার মতো। এখানে কোনো ভণিতা নেই, অনায়াসে অন্দরে ঢুকতে পারি। তাই শীত তাড়ানো ফোনকলে কাউকে জাগাতে এতটুকু ভাবতে হয়নি। নিশ্চিত ছিলাম—লেপ, তোশক কিংবা প্রিয়ার ওম ছেড়ে বেরিয়ে আসতে তার বিন্দুমাত্র বিলম্ব হবে না। হলোও তাই।
হৃদপুরের মেঠোপথে এখন আমরা দুজন। শুধু হাঁটছি। কোথায় যাব, কোথায় থামব—কোনো কিছুই ঠিক নেই। কুয়াশা আরও ঘন হয়েছে। আমাদের চোখ, মুখ, চিবুক ছুঁয়ে জলকণা হেসে উঠছে। পথ কীভাবে দিগন্তের প্রান্তে মিশে থাকে, এটি দেখতে চাইলে আপনাকে হৃদপুরের ধানি রঙের মাঠ পেরোতেই হবে।
ঘন শীতের পূর্বরাগে মাঠের শস্য ঝরে গেছে কবেই। হৃদপুরের প্রান্তর জুড়ে এখন শুধু খড়-নাড়ার অবশিষ্ট। আমরা দুজন হাঁটছি, জমাট শিশির মাড়িয়ে। পুব আকাশে কুয়াশাভেজা সূর্য আলোকমঞ্জরি ছড়িয়ে উদ্বাহু হয়ে উঠছে। শুষে নিচ্ছে মাঠের ফাটল আর রাতের নিনাদ।
কুয়াশা ভেদ করে আলো আসছে। কিন্তু হঠাৎ আমরা থমকে দাঁড়ালাম। পথপাশের কৃষ্ণচূড়াটি আর দাঁড়িয়ে নেই। বড্ড অসময়ে শিকড়চ্যুত হয়ে হেলে পড়েছে মাটিতে। দুজনের জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জলপিয়াসী কুহেলিকা পর্দা তুলে দেয়। ছায়াময় ফুল্লর ছড়ানো বৃক্ষটির এমন করুণ পরিণতি দেখে আমরা দুজনই প্রায় নির্বাক হয়ে গেলাম। এই দৃশ্য আমাদের নিজেদের দিকে আঙুল তুলছে। আমরাও কি বড্ড অসময়ে গড্ডলিকায় গা ভাসাচ্ছি? শিকড় আলগা হচ্ছে কি আমাদেরও!
এতক্ষণ আমাদের মুখে কথার তুবড়ি ছুটছিল। এই শীতকথনের কোনো ব্যাকরণ নেই। উদারা, মুদারা আর তারায় গলার স্বর ওঠানামা করছিল। আমরা তো চাইলে সাত-হাত-কালী কিংবা কৃষ্ণকুড়ি পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারতাম। কিন্তু ওই যে—‘চ্যুত’ হওয়ার যন্ত্রণা। গাছটার দিকে তাকিয়ে আমরা আর খুব বেশি এগোতে পারলাম না।
দেওকুড়ার পুলের ওপর আমরা দাঁড়িয়ে আছি নিশ্চল। পাশেই শ্মশান। জীবন আর মৃত্যু এখানে পাশাপাশি শুয়ে আছে। আর আছে বট-পাকুড়ের নিবিড় আলিঙ্গন। ওরা আমাদের আশ্বস্ত করছে…তোমরা এখনো মূল থেকে চ্যুত হওনি।
সূর্যটা পুরোপুরি উঠে গেছে। শীতের সকাল তার নিজস্ব নস্টালজিয়া ছড়াতে শুরু করেছে। আমার বুকে বাজছে অদ্ভুত এক সুর। ‘খাদের ধারের রেলিংটা…সেই দুষ্ট দো-দো শিড়িঙটা…’
হৃদপুর, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? আমি কোথাও যাইনি। আমি তোমার শীতকাহনে মিশে আছি। আর অনব ফিরে ফিরে আসি…