মূলত ঔপন্যাসিক হিসেবেই রশীদ করীমের পরিচিতি ও সুখ্যাতি। তিনি বহুপ্রজ লেখক নন; কিন্তু যে ১২টি উপন্যাস লিখেছেন, তার জন্যই স্মরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে থাকবেন উত্তরসূরির কাছে। সাহিত্যকর্মের গুণ যে সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না, রশীদ করীম তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অনেকেই একমত যে তিনি তাঁর সব উপন্যাসে আধুনিকমনস্কতার গুণে, জীবনদৃষ্টির গভীরতায় ও মানবিকতাবোধে উজ্জীবিত হয়ে যে কাহিনি বর্ণনা করেছেন, তা একই সঙ্গে বাস্তবানুগ ও আদর্শমণ্ডিত। তাঁর উপন্যাসে একটি নাগরিক, পরিশীলিত, সংস্কারমুক্ত ও শাণিত মনের পরিচয় পাওয়া যায়। একজন সফল ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর আসন সুপ্রতিষ্ঠিত।
রশীদ করীম উপন্যাসের পাশাপাশি সক্রিয় সাহিত্যজীবনের শেষ পর্বে অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। সংবাদপত্র এবং সাহিত্য ম্যাগাজিনে কলাম হিসেবেই এগুলোর আত্মপ্রকাশ। উপন্যাসের মতোই, কিংবা বলা যায় সেই তুলনায় বেশি করেই, তাঁর প্রবন্ধে চিন্তার মননশীলতা ও প্রকাশের বৈদগ্ধ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। উপন্যাসে চরিত্র ও ঘটনার চাপ যেমন লেখককে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রবন্ধে তেমন হয় না বলে রশীদ করীম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, মননশীল বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও আধুনিক গদ্যের ব্যবহারে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।
রশীদ করীম কেবল আরবি-ফারসি-উর্দু নয়, বাংলা ভাষার ভেতর থেকেও এমন শব্দ তুলে এনেছেন, যাদের ব্যবহার কদাচিৎ হয় অথবা একেবারেই নতুন। যেমন, ‘মজিদ যে তারাবাজি দেখিয়ে আমাদের চোখ টেরিয়ে দিল’; ‘আমি একজন খটখটে শহুরিয়া’; ‘ভবিষ্যৎটা খুবই ধোঁয়াদার হবে’।
প্রচলিত বাংলা শব্দের পাশাপাশি তিনি অনায়াসে ব্যবহার করেছেন আরবি, ফারসি ও উর্দু শব্দ। যেমন ‘তাঁরা ঠিক অতটা ফরমানবরদার বান্দা নন’; ‘কোনো দানেশমন্দ এমন একটি মঞ্জিল গড়লেন’; ‘প্রশংসা করার জন্য যে আফসানাগুলো একবার পড়ে নেওয়ার তকলিফটুকু ফরমাতে হবে, সেও কি মালুম হয় না?’ স্পষ্টতই উল্লিখিত বাক্যবন্ধে এমন শব্দ রয়েছে, যার প্রচলন বলতে গেলে সাধারণভাবে দৈনন্দিন জীবনে প্রায় নেই। কিন্তু এর জন্য বাক্যের অর্থ বুঝতে কষ্ট হয় না। উপরন্তু ছন্দের দ্যোতনা সৃষ্টি হওয়ার ফলে পাঠকের আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়। বাংলা তৎসম-তদ্ভবের বাইরে এসব শব্দের অনেকগুলোই যে পরবর্তীকালে জনপ্রিয়তা লাভ করেনি, প্রচলিত হয়নি, তার জন্য লেখকের নতুন বাক্যবন্ধ তৈরির প্রচেষ্টাকে খাটো করে দেখা যায় না।
রশীদ করীম কেবল আরবি-ফারসি-উর্দু নয়, বাংলা ভাষার ভেতর থেকেও এমন শব্দ তুলে এনেছেন, যাদের ব্যবহার কদাচিৎ হয় অথবা একেবারেই নতুন। যেমন, ‘মজিদ যে তারাবাজি দেখিয়ে আমাদের চোখ টেরিয়ে দিল’; ‘আমি একজন খটখটে শহুরিয়া’; ‘ভবিষ্যৎটা খুবই ধোঁয়াদার হবে’; ‘সুসহ ধাক্কা খেয়েছি’ ইত্যাদি। এসব দৃষ্টান্তে ইংরেজি ভাষার প্রভাব আছে, যার জন্য ভাষার ক্ষেত্রে তাঁর উদারমনস্কতা ও আধুনিকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। এভাবে আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি যখন যা উপযোগী মনে হয়েছে—রশীদ করীম বিনা দ্বিধায় সেসব ব্যবহার করে বাংলা গদ্যকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছেন। সেই সঙ্গে তৈরি হয়েছে তাঁর নিজস্ব একটি গদ্যশৈলী। এই শৈলী এমন, যা পাণ্ডিত্যকে প্রচ্ছন্ন রেখে খুব অন্তরঙ্গ স্বরে পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। এভাবে তিনি অনেক জটিল বিষয় খুব সহজ ভঙ্গিতে এবং কখনো কৌতুকের সঙ্গে উপস্থাপন করেন। তাঁর লেখা তখন হয়ে ওঠে কথোপকথন, যেখানে কৃত্রিমতা নেই, আনুষ্ঠানিকতার আবরণ উধাও।
প্রবন্ধের ভাষায় ও বর্ণনাভঙ্গিতে পাঠক ব্যক্তি রশীদ করীমকেই পায়। কিন্তু সেই মোহনীয় মজলিশি আবহে তিনি অবলীলায় নিজের বক্তব্যটি তুলে ধরেন।
উপন্যাসে চরিত্র ও ঘটনার চাপ যেমন লেখককে নিয়ন্ত্রণ করে, প্রবন্ধে তেমন হয় না বলে রশীদ করীম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, মননশীল বিশ্লেষণ ক্ষমতা ও আধুনিক গদ্যের ব্যবহারে অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ।