ডেভিড লিঞ্চ এক ‘অদ্ভুত’–এর জাদুকর। সবাই বোধ করি এই প্রসঙ্গে একমত—তাঁর চলচ্চিত্রগুলো স্বপ্নময়, অস্বস্তিকর এবং অন্তহীন ব্যাখ্যাসাপেক্ষ, যেন তাঁরা আমাদের বাস্তবতার সংলগ্ন কোনো ভিন্ন মাত্রায় অস্তিত্বশীল, লীলায়িত প্রাণ উৎস কিন্তু উদরস্থ। সোজা কথায়, তিনি আমাদের কোনো সুসংবদ্ধ আখ্যানের মাধ্যমে টানেননি, বরং আবহ, বস্তুর টেক্সচার এবং সর্বব্যাপী এক গা ছমছমে অনুভূতির ভেতর দিয়ে টেনেছেন। কিন্তু তাঁর এই অতিপ্রাকৃত শিল্পকৌশলের নিচে আরও পরিচিত এক সংকল্প লুকিয়ে থাকে—অপরের ভাবনা, সেই শক্তিগুলোর কথা, যা আমাদের বোধগম্যতার ঠিক কিনারায় অবস্থান করে।
এই দিক দিয়ে ভাবলে লিঞ্চের চলচ্চিত্রগুলো এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজমের সঙ্গে একধরনের রহস্যময় সাযুজ্য বহন করে, যেখানে সাঈদ পশ্চিমের দৃষ্টিতে প্রাচ্যের নির্মাণকৌশল নিয়ে সমালোচনা করেছেন। লিঞ্চ স্পষ্টভাবেই কোনো রাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিশীল জগৎ বারবার মুখোমুখি হয়েছে চেনা ও অচেনার দ্বন্দ্বের সঙ্গে, স্বাভাবিক ও বিকৃতির সংঘর্ষের সঙ্গে। আর এই উত্তেজনার ভেতর—যেখানে মোহ ও আতঙ্ক, আকাঙ্ক্ষা ও বিপদের মধ্যে এক সূক্ষ্ম টানাপোড়েন—লুকিয়ে আছে এক গভীর ওরিয়েন্টালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি আমাদের কোনো সুসংবদ্ধ আখ্যানের মাধ্যমে টানেননি, বরং আবহ, বস্তুর টেক্সচার এবং সর্বব্যাপী এক গা ছমছমে অনুভূতির ভেতর দিয়ে টেনেছেন। কিন্তু তাঁর এই অতিপ্রাকৃত শিল্পকৌশলের নিচে আরও পরিচিত এক সংকল্প লুকিয়ে থাকে—অপরের ভাবনা।
ডিউন (১৯৮৪) ও মরুভূমির ওরিয়েন্টালিজম
ডিউন (১৯৮৪), ফ্রাঙ্ক হার্বার্টের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত লিঞ্চের বিতর্কিত অথচ চিত্রগতভাবে অভূতপূর্ব চলচ্চিত্র। এই ছবির কেন্দ্রীয় উপাদান আরাকিস নামের মরুগ্রহ, যা ওরিয়েন্টালিস্ট চিত্রকল্পের এক প্রকৃষ্ট নিদর্শন—রুক্ষ, রহস্যময় এবং একদল আদিবাসী (ফ্রেমন) দ্বারা আবাসিত, যাদের প্রাচীন জ্ঞান অবশেষে কাজে আসে এক শ্বেতাঙ্গ ত্রাণকর্তার জীবনে।
এই চলচ্চিত্রে মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামি সংস্কৃতির অনুষঙ্গ অত্যন্ত স্পষ্ট—ফ্রেমনদের জীবনধারা জিহাদের ধারণায় আবর্তিত এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম বাস্তবের ঔপনিবেশিক লড়াইয়ের প্রতিচিত্র। কিন্তু চলচ্চিত্রটি এই জনগোষ্ঠীকে যথার্থ গভীরতা ও স্বাধীনতার সঙ্গে চিত্রিত না করে তাদের রূপ দেয় এক প্রতীকী, প্রায় পৌরাণিক সত্তায়, যাদের একমাত্র ভূমিকা শ্বেতাঙ্গ নায়ক পল অ্যাট্রেইডিসকে এক মেসিয়াহতে রূপান্তরিত করা। এটাই মূল ওরিয়েন্টালিজম—প্রাচ্য এখানে এক রহস্যময় ও বিপজ্জনক অঞ্চল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ নায়ক অপরের জ্ঞান আত্মসাৎ করে নিজের পরিত্রাণ নিশ্চিত করে।
টুইন পিকস ও মিস্টিসিজমের নান্দনিকতা
লিঞ্চের এই প্রবণতা কেবল মরুপ্রান্তর বা স্পষ্টত প্রাচ্যনির্ভর কাহিনিগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টুইন পিকস—তার অন্যতম কালজয়ী সৃষ্টি—একেবারে আমেরিকার মাটিতে গাঁথা গল্প, যেখানে রয়েছে ছোট শহরের জীবন, চেপে রাখা ট্রমা আর আদর্শিক জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ানক দুর্নীতি। কিন্তু এখানেও লিঞ্চ ক্রমাগত প্রাচ্যবাদী চিহ্নগুলোকে রহস্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেন।
এই সিরিজে তিব্বতের উল্লেখ বারবার আসে—যেমন এজেন্ট কুপারের অনুসন্ধানী পদ্ধতি, যা তিনি তিব্বতি ভবিষ্যদ্বাণীর কৌশল থেকে অনুপ্রাণিত বলে দাবি করেন। তা ছাড়া বিখ্যাত রেড রুম—এক অতিপ্রাকৃত, রহস্যময় জগৎ—পশ্চিমের দৃষ্টিতে প্রাচ্যের রহস্যময়তা ও আধ্যাত্মিকতার এক বিমূর্ত প্রতিরূপ হয়ে ওঠে।
চলচ্চিত্রটি এই জনগোষ্ঠীকে রূপ দেয় এক প্রতীকী, প্রায় পৌরাণিক সত্তায়, যাদের একমাত্র ভূমিকা শ্বেতাঙ্গ নায়ক পল অ্যাট্রেইডিসকে এক মেসিয়াহতে রূপান্তরিত করা। এটাই মূল ওরিয়েন্টালিজম—প্রাচ্য এখানে এক রহস্যময় ও বিপজ্জনক অঞ্চল, যেখানে শ্বেতাঙ্গ নায়ক অপরের জ্ঞান আত্মসাৎ করে নিজের পরিত্রাণ নিশ্চিত করে।
এইখানে, ঠিক ডিউনের মতোই, প্রাচ্য বাস্তব কোনো ঐতিহাসিক স্থান নয়, বরং এক নান্দনিক চালাকির অংশ—এক অদ্ভুত, জ্ঞানগর্ভ ও আধ্যাত্মিক মোড়ক, যা নায়কের আত্মজিজ্ঞাসার পথচলার মূল চাবিকাঠি। পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতাকে এইভাবে প্রতীকের মতো ব্যবহার করেছে। কিন্তু লিঞ্চের কাজ এই সমস্ত উপাদানকে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়, যেখানে এই রহস্যময়তা ও ভয়াবহতা মিশে যায় তার নিজস্ব মানসিক আতঙ্কের সঙ্গে।
অপরের মোহ ও অজানা আতঙ্ক
লিঞ্চের চলচ্চিত্রগুলো ওরিয়েন্টালিজমের সবচেয়ে সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায় এক জায়গায়—অপরের প্রতি একযোগে মোহ ও আতঙ্ক। ব্লু ভেলভেট ও মুলহল্যান্ড ড্রাইভের মতো ছবিগুলোও অপরিচিত কোনো জগতের অনুপ্রবেশ নিয়ে আবর্তিত, যেখানে প্রতীক, নিষিদ্ধ জ্ঞান এবং অস্তিত্ববাদী আতঙ্ক মিশে থাকে।
ঠিক এই একই কাঠামো ওরিয়েন্টালিস্ট কল্পনাকে চালিত করেছে দীর্ঘদিন। প্রাচ্যকে পশ্চিমের দৃষ্টিতে বরাবরই এক রহস্যময় ও ভয়ংকর এলাকা হিসেবে দেখানো হয়েছে—একদিকে এর সৌন্দর্য মোহিত করে, অন্যদিকে এটি এক ভয়ংকর নৈতিক সংকটের কেন্দ্র। লিঞ্চ হয়তো সচেতনভাবে এসব ধারণা ব্যবহার করেননি, কিন্তু তার গল্পগাথা ঠিক সেই একই আবেগের ওপর ভর করে গড়ে ওঠে।
এমনকি লরা পামার, টুইন পিকস-এর কেন্দ্রীয় ট্র্যাজিক চরিত্র, এই দ্বৈত প্রকৃতির প্রতিচিত্র। তিনি একদিকে ছোট শহরের নিখুঁত, নিষ্পাপ কন্যা, অন্যদিকে এক ঘন অন্ধকারের প্রতীক। ঠিক যেমন ওরিয়েন্টালিস্ট কল্পনায় প্রাচ্যকে দেখা হয়েছে একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও ভয়ংকর বলে, তেমনই লরার গোপন দুর্দশা আর কষ্টই গড়ে তোলে এক সম্পূর্ণ পুরাণ।
প্রাচ্য বাস্তব কোনো ঐতিহাসিক স্থান নয়, বরং এক নান্দনিক চালাকির অংশ—এক অদ্ভুত, জ্ঞানগর্ভ ও আধ্যাত্মিক মোড়ক, যা নায়কের আত্মজিজ্ঞাসার পথচলার মূল চাবিকাঠি। পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতাকে এইভাবে প্রতীকের মতো ব্যবহার করেছে।
এখানে এ কথা ভুল বোঝার অবকাশ নেই যে লিঞ্চ সরাসরি সেই রকম ভূরাজনৈতিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেননি, যেমনটি সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম আলোচনা করে। তিনি মধ্যপ্রাচ্য বা এশিয়া নিয়ে চলচ্চিত্র বানাননি বা ওরিয়েন্টালিস্ট পাঠ্যগুলোর মতো প্রাচ্যকে একরৈখিকভাবে চিত্রিত করেননি। কিন্তু তাঁর পুরো চলচ্চিত্রকৌশলই সাঈদের বর্ণিত সেই উত্তেজনার ওপর নির্ভরশীল—মোহ ও আতঙ্ক, জ্ঞান ও অজ্ঞতা, শক্তি ও দুর্বলতার সংঘর্ষ।
ডেভিড লিঞ্চের প্রতিভা আমাদের অস্থির করে তোলার মধ্যে দিয়ে নিজেকে উন্মোচন করে। তার চলচ্চিত্রের অপরতা—হোক তা প্রাচ্যের আধ্যাত্মিকতার ছায়া, স্বপ্নময় বিভ্রম কিংবা বাস্তবের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা চরিত্রদের মাধ্যমে—আমাদের বাধ্য করে আমাদের নিজস্ব উপলব্ধির সীমানাগুলো পরীক্ষা করতে। এভাবেই সচেতন না হয়েও, তিনি ওরিয়েন্টালিজমের এক মৌলিক সত্যের প্রতিধ্বনি করেন—আমরা যেভাবে অপরকে কল্পনা করি, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের সম্পর্কে অনেক বেশি বলে দেয়।
লিঞ্চ আমাদের নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেন—কে অপর, কে নিজ এবং এই দুইয়ের মধ্যে সীমানা কোথায়? তাঁর সিনেমা কোনো উত্তর দেয় না, বরং আমাদের এক নতুন জগতে প্রবেশ করায়, যেখানে আমরা নিজেরাই হয়ে উঠি অপর এবং সম্ভবত, এটাই তাঁর সিনেমার সবচেয়ে মায়াবী দিক—এটি শুধু অপরের প্রতিচিত্র আঁকে না, আমাদেরও অপর বানিয়ে দেয়।