বাংলা নাট্যের আত্মানুসন্ধানে দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পদর্শন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

ঔপনিবেশিক শাসনকাল দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল, তার রেশ শিল্প ও সাহিত্যেও সুদূরপ্রসারী ছিল। পাশ্চাত্য জ্ঞানতত্ত্ব ও শিল্পরীতির আত্তীকরণ তৎকালীন সময়ে একাধারে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও, তা নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকটকেও তীব্র করে তুলেছিল। বাংলা নাটকের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও প্রকট ছিল। ব্রিটিশ প্রভাবে ইংরেজি নাটকের আদলে গড়ে ওঠা নাট্যমঞ্চ ও পরিবেশনারীতি, বিশেষত শেক্‌সপিয়রীয় ধারার অন্ধ অনুকরণ একদিকে যেমন রুচি ও মননশীলতার পরিচায়ক ছিল, অন্যদিকে তেমনি তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির আপন সুর ও বর্ণনাত্মক ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে, যখন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি তার নিজস্ব শিকড়ের সন্ধানে ব্যাপৃত, তখন একজন নন্দনতাত্ত্বিক ও নাট্যাচার্য হিসেবে সেলিম আল দীন আবির্ভূত হলেন এক স্বতন্ত্র শিল্পভাষার কারিগর রূপে। তিনি কেবল একজন নাট্যকার ছিলেন না, বরং ছিলেন উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা নাট্যের এক অনন্য স্থপতি, যিনি ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত এক স্বতন্ত্র নন্দনতাত্ত্বিক দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন।

সেলিম আল দীন [১৮ আগস্ট ১৯৪৯—১৪ জানুয়ারি ২০০৮]
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

সেলিম আল দীনের শিল্পভাবনার মূল সুর ছিল বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গভীরে প্রোথিত শিকড় অনুসন্ধান। তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, ব্রিটিশ শাসনলব্ধ ইউরোপীয় নাট্যরীতির অন্ধ অনুকরণ বাংলা নাটকের স্বকীয় বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায়। তাই তিনি বাংলা নাটকের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য নিরন্তর সাধনা করেছেন, যা তাঁকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পতত্ত্বের তুলনামূলক বিশ্লেষণে প্রণোদিত করেছিল। তাঁর প্রবন্ধ ও সমালোচনামূলক লেখায় বারবার উঠে এসেছে এই আত্মানুসন্ধানের তাগিদ। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের লোকায়ত শিল্পকলা, যেমন জারি, সারি, পালাগান, কথকতা, যাত্রা, ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাট্য এগুলো বর্ণনাত্মক ভঙ্গিতে গল্প বলার এক সমৃদ্ধ ধারা বহন করে, যেখানে গান, ছন্দ, সুর, নৃত্য এবং সংলাপ অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে আছে। ইউরোপীয় নাট্যরীতির বিভাজনমূলক প্রবণতা, যেমন ট্র্যাজেডি-কমেডির কঠোর সীমারেখা, অথবা নাটক, উপন্যাস, কবিতার সুস্পষ্ট শ্রেণিবিভাজন এগুলো প্রাচ্যের সামগ্রিক ও মিশ্র শিল্পচেতনার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ ছিল না বলেই তিনি মনে করতেন। তাঁর এই বিশ্লেষণ কেবল একাডেমিক অনুশীলন ছিল না, বরং তা ছিল একটি সাংস্কৃতিক ও আত্মপরিচয়ের আন্দোলন।

ব্রিটিশ প্রভাবে ইংরেজি নাটকের আদলে গড়ে ওঠা নাট্যমঞ্চ ও পরিবেশনারীতি, বিশেষত শেক্‌সপিয়রীয় ধারার অন্ধ অনুকরণ একদিকে যেমন রুচি ও মননশীলতার পরিচায়ক ছিল, অন্যদিকে তেমনি তা হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির আপন সুর ও বর্ণনাত্মক ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল।

তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, শিল্পকে কেবল তার নির্দিষ্ট কাঠামো বা ফর্ম দিয়ে বিচার করা হলে তার অন্তর্নিহিত প্রাণসত্তা অবহেলিত হয়। প্রাচ্যের শিল্পাদর্শে, বিশেষত এর মৌখিক ও পরিবেশনাধর্মী রূপগুলোতে, গল্প বলার ভঙ্গিমাটি সর্বদাই একটি সমন্বিত রূপ পরিগ্রহ করে, যেখানে লিখিত পাঠের চেয়েও পরিবেশকের স্বাধীনতা ও দর্শকের সঙ্গে তাঁর মিথস্ক্রিয়া অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এই সামগ্রিকতাকেই তিনি বাংলা নাটকের নিজস্ব পথ খুঁজে পাওয়ার মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।

সেলিম আল দীনের শিল্পদর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তাঁর উদ্ভাবিত দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্ব। এটি কেবল একটি তাত্ত্বিক কাঠামো নয়, এটি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পচিন্তার এক গভীর সংমিশ্রণ এবং বাংলা নাটকের নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তি রচনার এক বিপ্লবী প্রয়াস। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি শিল্পের প্রচলিত বিভাজনগুলোকে (যেমন নাটক, উপন্যাস, কবিতা) শুধু অস্বীকারই করেননি, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা পাশ্চাত্য জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। ‘দ্বৈতাদ্বৈত’ শব্দটির মধ্যেই তত্ত্বটির মূল মর্মার্থ নিহিত। এটি একাধারে দুইয়ের সহাবস্থান (দ্বৈত) এবং তাদের অবিচ্ছেদ্যতা (অদ্বৈত) নির্দেশ করে। অর্থাৎ সেলিম আল দীন মনে করতেন, শিল্পে ভিন্ন ভিন্ন উপাদান (যেমন পাঠ ও পরিবেশনা, বাস্তবতা ও ফ্যান্টাসি, দৃশ্য ও শ্রুতি) স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান থাকলেও, তারা একটি বৃহত্তর শিল্পকর্মের অংশ হিসেবে একে অপরের পরিপূরক এবং সামগ্রিকভাবে এক অখণ্ড সত্তা তৈরি করে। তিনি প্রাচ্যের শিল্পরীতিকে মূলত বর্ণনাত্মক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যেখানে সুর, ছন্দ, গান এবং সংলাপ একই সূত্রে গাঁথা। এই বর্ণনাত্মকতাই প্রাচ্যের শিল্পের প্রাণ, যা ইউরোপীয় নাটকের সংঘাতনির্ভর, লিনিয়ার আখ্যান কাঠামো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউরোপীয় নাটকে সাধারণত সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও ঘটনার বিকাশ ঘটে, যেখানে সুনির্দিষ্ট শুরু, মধ্য এবং শেষ থাকে। পক্ষান্তরে প্রাচ্যীয় বর্ণনাত্মক শিল্পে, বিশেষত বাংলা লোকনাট্যে, গল্প বলার ভঙ্গিটি বহুলাংশে অনুলম্ব, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক মসৃণ যাতায়াত দেখা যায় এবং পরিবেশক নিজেই আখ্যানের সূত্রধর হিসেবে আবির্ভূত হন। এই বর্ণনাত্মক রীতিতে চরিত্রাবলিও সর্বদা সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তারা বৃহত্তর সামাজিক ও মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপটে তাদের অস্তিত্ব খুঁজে পায়। দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের আলোকে সেলিম আল দীন এই সামগ্রিকতা ও বর্ণনাত্মকতার ওপর জোর দিয়েছেন, যা বাংলা নাটকের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।

নিজের নাট্য প্রযোজনার ফেস্টুনের পাশে সেলিম আল দীন
ছবি: সংগৃহীত

দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের সরাসরি প্রয়োগ হিসেবে সেলিম আল দীন কথানাট্য নামক নতুন এক নাট্য-আঙ্গিকের প্রবর্তন করেন। এটি কেবল একটি নতুন ফর্ম তৈরি করেনি, বাংলা সাহিত্যের সীমানাকে বহুদূর বিস্তৃত করেছে এবং নাটকের ধারণাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। কথানাট্য আঙ্গিকে আখ্যানভাগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একজন সূত্রধর বা কথক, যিনি দর্শককে গল্পের গভীরে প্রবেশ করান তাঁর বর্ণনা, গান, সংলাপ ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে। এই আঙ্গিকে নাটকের চরিত্রগুলো কেবল নিজেদের মধ্যে সংলাপ বিনিময় করে না, বরং তারা সরাসরি দর্শকের সঙ্গে কথা বলে, আখ্যানের গতিকে প্রভাবিত করে এবং তাদের ব্যক্তিগত অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৃহত্তর জীবনের সম্পর্ক স্থাপন করে। কথানাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর বর্ণনাত্মক প্রকৃতি, যেখানে গল্পের সূত্রপাত, বিকাশ এবং সমাপ্তি প্রচলিত নাটকের মতো সুনির্দিষ্টভাবে হয় না; বরং তা এক নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মতো এগিয়ে চলে, যেখানে গীতিময়তা, ছন্দ এবং প্রক্ষেপণ বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এটি ঐতিহ্যবাহী বাংলা পালাগান, কথকথা এবং যাত্রাপালার বর্ণনাত্মক ধারা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করলেও, আধুনিক নাট্যরীতির সংবেদনশীলতা ও বিষয়বস্তুর গভীরতাকে এর সঙ্গে যুক্ত করে এক অভিনব শৈলী তৈরি করে। কথানাট্যের মাধ্যমে সেলিম আল দীন দেখিয়েছেন, নাটক কেবল ঘটনা ও সংঘাতের উপস্থাপন নয়, বরং তা জীবনের নিরন্তর প্রবাহ, স্মৃতি, স্বপ্ন এবং বাস্তবতার এক বহুস্তরীয় বয়ান। এই আঙ্গিকে সময় ও স্থান প্রায়ই তরল হয়, যা দর্শককে এক বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করে। কথানাট্যের মাধ্যমে সেলিম আল দীন প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, আধুনিক বাংলা নাটকের তার নিজস্ব ঐতিহ্যের মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত না হয়েও বিশ্বমানের এক শিল্পরূপ অর্জন করা সম্ভব।

এটি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পচিন্তার এক গভীর সংমিশ্রণ এবং বাংলা নাটকের নিজস্ব নন্দনতাত্ত্বিক ভিত্তি রচনার এক বিপ্লবী প্রয়াস। এই দর্শনের মাধ্যমে তিনি শিল্পের প্রচলিত বিভাজনগুলোকে (নাটক, উপন্যাস, কবিতা) শুধু অস্বীকারই করেননি, এর পেছনে লুকিয়ে থাকা পাশ্চাত্য জ্ঞানতাত্ত্বিক আধিপত্যকেও চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।

সেলিম আল দীনের সাহিত্যকর্মে প্রান্তিক ও নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম এক স্বতন্ত্র মহিমায় ফুটে উঠেছে। তাঁর নাটকে প্রায়ই এমন সব চরিত্ররা কেন্দ্রীয় ভূমিকায় আসে, যারা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন, যাদের জীবনযাপন প্রচলিত কাঠামোর বাইরে এবং যাদের কণ্ঠস্বর প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন, তাদের সংস্কৃতি, তাদের হাসি-কান্না, উৎসব-পার্বণ এবং তাদের গভীর দার্শনিক বোধকে তিনি তাঁর লেখায় অনন্যসাধারণ শিল্পরূপ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি কেবল তাদের জীবনকে মঞ্চে আনেননি, তাদের মানবিক মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন। ‘কীর্তনখোলা’ নাটকের মাধ্যমে তিনি প্রথমবার মেলাকেন্দ্রিক বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের মহাকাব্যিক হাহাকার মঞ্চে নিয়ে আসেন। কীর্তনখোলা মেলা, যা গ্রামীণ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবজীবনের উত্থান-পতন, প্রেম, বিরহ, দারিদ্র্য এবং টিকে থাকার সংগ্রামের এক মর্মস্পর্শী চিত্র এই নাটকে উপস্থাপিত হয়েছে। মেলা, যা আপাতদৃষ্টিতে আনন্দ ও উৎসবের প্রতীক, তা যে কীভাবে এক বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার উৎস এবং একই সঙ্গে তাদের গভীর দুঃখ ও বঞ্চনার সাক্ষী, তা সেলিম আল দীন দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। নাটকের চরিত্রগুলো, যেমন দুখাই, সয়ফল, কাঞ্চন, তারা সবাই এই মেলাকেন্দ্রিক জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। তাদের জীবন যেন মেলার ঘূর্ণিপাকের মতোই পরিবর্তনশীল। কীর্তনখোলা নাটকের বর্ণনাত্মক রীতি দর্শককে এই মেলাজীবনের গভীরে প্রবেশ করিয়ে দেয়, যেখানে লোকজ উপাদান, গান এবং কাব্যিক সংলাপ এক অপরূপ ব্যঞ্জনাময় আবহ তৈরি করে।

সেলিম আল দীন (১৮ আগস্ট ১৯৪৯—১৪ জানুয়ারি ২০০৮)
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

বর্ণনাত্মক রীতির সার্থক রূপায়ণ দেখা যায় তাঁর ‘চাকা’ নাটকে, যেখানে একটি বেওয়ারিশ লাশের ভ্রমণের মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের গভীর সংকট চিত্রিত হয়েছে। ‘চাকা’ নাটকের আখ্যানভাগ আপাতদৃষ্টিতে সরল হলেও, এর দার্শনিক গভীরতা অসাধারণ। একটি বেওয়ারিশ লাশের সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর যাত্রা, সেই লাশের পরিচয় অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা এবং তাকে দাফন করার জন্য গ্রাম থেকে গ্রামে নিয়ে যাওয়াই এই নাটকের মূল উপজীব্য। কিন্তু এই যাত্রাপথ একটি ভৌগোলিক যাত্রা মাত্র নয়, বরং এটি মানব–অস্তিত্বের গভীর সংকট, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জীবনের অর্থ অনুসন্ধানের এক প্রতীকী যাত্রা। লাশটি কার, তা কেউ জানে না, কিন্তু তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার মানবিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় দুই গাড়োয়ান। এই লাশ বহনকারী গাড়ির চাকার অবিরাম ঘুরতে থাকার সঙ্গে জীবনের গতির এক গভীর সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। চাকার ঘূর্ণন যেমন নিরন্তর, তেমনি জীবনের যাত্রা এবং মৃত্যুর পরপারে অস্তিত্বের রহস্যও অবিরাম। এই নাটকে সেলিম আল দীন দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি নিথর দেহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে—কারও সহানুভূতি, কারও ভয়, কারও নির্লিপ্ততা। নাটকের বর্ণনাত্মক ভঙ্গি, গীতিময় সংলাপ এবং প্রতীকের ব্যবহার চাকাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যেখানে দর্শকের মনে প্রশ্ন জাগে জীবনের অর্থ, মৃত্যু, এবং মানব সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে। একটি মৃতদেহকে কেন্দ্র করে নাটকের আবর্তন মানবজীবনের ভঙ্গুরতা এবং সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বকে তুলে ধরে।

ইউরোপীয় নাটকে সাধারণত সংলাপের মাধ্যমে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও ঘটনার বিকাশ ঘটে, যেখানে সুনির্দিষ্ট শুরু, মধ্য এবং শেষ থাকে। পক্ষান্তরে প্রাচ্যীয় বর্ণনাত্মক শিল্পে, বিশেষত বাংলা লোকনাট্যে, গল্প বলার ভঙ্গিটি বহুলাংশে অনুলম্ব, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে এক মসৃণ যাতায়াত দেখা যায়।

এ ছাড়া তাঁর মহাকাব্যিক উপাখ্যান ‘নিমজ্জন’ বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ ও বৈশ্বিক দলিল হিসেবে স্বীকৃত। নিমজ্জন সেলিম আল দীনের শিল্পভাবনার এক পরিণত প্রকাশ। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট ঘটনা বা সময়ের ওপর আলোকপাত করে না, বরং মানবজাতির ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অসংখ্য গণহত্যা, জাতিগত নিধন এবং মানবিক বিপর্যয়ের এক সর্বজনীন চিত্র তুলে ধরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলোকাস্ট থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, রুয়ান্ডার গণহত্যা, বসনিয়ার জাতিগত নিধন বিভিন্ন সময়ের এবং বিভিন্ন ভূখণ্ডের মানবতাবিরোধী অপরাধের এক অভিন্ন করুণগাথা এই নাটকে বর্ণিত হয়েছে। নিমজ্জনের আখ্যানশৈলীতে সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, যা নাটকটিকে এক মহাকাব্যিক মাত্রা দান করেছে। নাটকের চরিত্রগুলো নির্দিষ্ট কোনো ভূখণ্ডের প্রতিনিধি নয়, বরং তারা মানবজাতির সম্মিলিত যন্ত্রণার প্রতীক। সেলিম আল দীন এই নাটকে বারবার প্রশ্ন করেছেন, মানবসভ্যতার অগ্রগতি সত্ত্বেও কেন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি হয় এবং কেন মানুষ বারবার মানবতাকে বিসর্জন দিয়ে পাশবিকতার আশ্রয় নেয়। নিমজ্জন নাটকের পরিবেশনা রীতিও ছিল অভিনব, যেখানে কোরাস, গান, এবং নৃত্য এক সম্মিলিত শৈল্পিক রূপ পরিগ্রহ করে, যা দর্শকের মনে এক গভীর আবেগ ও উপলব্ধির জন্ম দেয়। এটি একটি স্মরণীয় শিল্পকর্ম, যা শুধু নাটকের সীমানাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানব–ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল, যা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মানবিকতার মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করে।

সেলিম আল দীন বাংলা নাটককে ঔপনিবেশিক প্রভাবমুক্ত করে তার আত্মপরিচয় অর্জনে সহায়তা করেছেন। তাঁর এই অবদান শুধু একজন নাট্যকার হিসেবে নয়, একজন নন্দনতাত্ত্বিক ও সংস্কৃতিবেত্তা হিসেবেও অনস্বীকার্য। তিনি বাংলা নাটকের আত্মানুসন্ধানের যে পথ দেখিয়েছেন, তা তাঁকে উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যচর্চার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর উদ্ভাবিত এথনিক থিয়েটার এবং বর্ণনাত্মক অভিনয়রীতি কেবল একটি শৈল্পিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল না, তা ছিল বাঙালির নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণের এক অতন্দ্র প্রয়াস, যা আজও উত্তর-ঔপনিবেশিক সাহিত্যচর্চায় এক শক্তিশালী দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এথনিক থিয়েটার বলতে তিনি বাংলার নিজস্ব নৃতাত্ত্বিক ও লোকজ উপাদান, তাদের ভাষা, রূপকথা, পৌরাণিক কাহিনি এবং পরিবেশনারীতিকে আধুনিক নাটকের সঙ্গে একীভূত করার প্রক্রিয়াকে বুঝিয়েছেন। এই ধারায়, নাটক তার শিকড়ের গভীরে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতির এক প্রামাণ্য দলিল হয়ে ওঠে। সেলিম আল দীনের শিল্পদর্শন ও প্রায়োগিক কাজ প্রমাণ করে, নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করেই একটি জাতি তার শিল্পকে বিশ্বমঞ্চে সগৌরবে উপস্থাপন করতে পারে। তাঁর সৃষ্টিকর্ম এবং নন্দনতাত্ত্বিক ভাবনাগুলো বাংলা নাটকের ভবিষ্যৎ বিকাশের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি শুধু নাট্যকার হিসেবে নয়, বাঙালির নিজস্ব শিল্পভাষা নির্মাণের এক অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।