আলোকচিত্রে গল্প
এক আত্মগত মহাকাব্যের জন্ম
অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।
জাপানি লোককথার কল্পনাশক্তির এক অতিশয় সূক্ষ্ম ও দীর্ঘস্থায়ী নিদর্শন হচ্ছে ‘কামাইতাচি’ বা ‘কাস্তে-বেজি’র কিংবদন্তি। এই মিথ একদিকে প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত রহস্যের অতিলৌকিক ব্যাখ্যা দেয়, অন্যদিকে প্রকৃতির অদৃশ্য ও হঠাৎ নেমে আসা সহিংসতার এক গভীর রূপক হয়ে দাঁড়ায়। এর শিকড় প্রধানত উত্তর জাপানের শীতল, পাহাড়ঘেরা অঞ্চলে পোঁতা। বিশেষ করে তোহোকু ও নিইগাতা এলাকায়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কামাইতাচি আসলে একটি নয় বরং তিনটি দুষ্ট বেজির সমষ্টি। যারা ঘূর্ণিবায়ুর কেন্দ্রে অবস্থান করে, এমন অতিমানবিক বেগে ছুটে চলে যে মানুষের স্বাভাবিক দৃষ্টি তাদের ধরতেই পারে না।
বেজি তিনটির কাজের ধরন ভয়ংকরভাবে যান্ত্রিক ও নিখুঁত। প্রথম বেজিটি পথচারীকে কিছু বুঝতে না দিয়ে হঠাৎ হোঁচট খাইয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। দ্বিতীয়টি তার কাস্তের মতো ধারালো নখ দিয়ে পায়ের ওপর গভীর এক কাঁটা বসিয়ে দেয়। আর তৃতীয় বেজিটি সেই ক্ষতে লাগিয়ে দেয় এক জাদুকরি মলম—যা সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা অবশ করে দেয় এবং রক্তপাত বন্ধ করে ফেলে।
এই তিন ধাপের নির্মম সমন্বয়ই ব্যাখ্যা করে কেন কামাইতাচির শিকাররা মুহূর্তটিতে কেবল হঠাৎ এক দমকা হাওয়ার অনুভূতি পায়। কিন্তু কয়েক মিনিট কিংবা ঘণ্টাখানেক পরে, যখন জাদুর প্রভাব ফুরিয়ে যায়, তারা আবিষ্কার করে তাদের ত্বকে এক স্পষ্ট রক্তহীন গভীর ক্ষত, যেন অদৃশ্য কোনো ছুরি ছুঁয়ে গেছে।
‘কামাইতাচি’ বা ‘কাস্তে-বেজি’র কিংবদন্তি। এই মিথ একদিকে প্রাকৃতিক আবহাওয়াজনিত রহস্যের অতিলৌকিক ব্যাখ্যা দেয়, অন্যদিকে প্রকৃতির অদৃশ্য ও হঠাৎ নেমে আসা সহিংসতার এক গভীর রূপক হয়ে দাঁড়ায়।
ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে কামাইতাচির নাম এক অনন্য শব্দখেলা। এদো যুগের শিল্পী তোরিয়ামা সেকিয়েন এই রূপকে জনপ্রিয় করেন। তিনি ‘কামাএতাচি’ (যার অর্থ তলোয়ার টানার ভঙ্গি) শব্দটিকে রূপান্তরিত করেন কামাইতাচি-তে, অর্থাৎ ‘কাস্তে-বেজি’। এর মাধ্যমে বাতাসের এক বিমূর্ত কিন্তু ধারালো আঘাত পায় এক স্পষ্ট ও পশুরূপী অবয়ব। যা আগে ছিল কেবল ‘বাতাসের তলোয়ার’, এখন তা হয়ে ওঠে জীবন্ত এক শিকারি সত্তা।
লোককথার সরল স্তর ছাড়িয়ে কামাইতাচি জাপানি সংস্কৃতিতে রূপ নেয় এক শক্তিশালী সাংস্কৃতিক প্রতীকে। ‘অদৃশ্য ক্ষত’র প্রতিরূপ হিসেবে। এই ভাবনা বিশেষভাবে প্রতিধ্বনিত হয়েছে জাপানি শিল্প ও সাহিত্যে। সবচেয়ে তীব্রভাবে হয়েছে যুদ্ধোত্তর আলোকচিত্রে আইকোহ হোসোয়ের কাজে। জাপানি কোরিওগ্রাফার এবং নৃত্যশিল্পী তাতসুমি হিজিকাতার সঙ্গে তার সহযোগিতায় কামাইতাচি হয়ে ওঠে ইতিহাসের সেই হঠাৎ, ব্যথাহীন কিন্তু স্থায়ী ক্ষতচিহ্নের প্রতীক। যেমন ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বোমা হামলায়। কিংবা পশ্চিমা আধুনিকতার দিকে আকস্মিক ও বিভ্রান্তিকর ধাবমানতায়। এই আঘাতগুলো সমাজকে এমন দ্রুততায় বিদ্ধ করে যে আক্রান্ত হওয়ার সময় যন্ত্রণা যতখানি পাওয়া যায়, তার চেয়ে অধিক যন্ত্রণা টের পাওয়া যায় অনেক পরে। ভবিষ্যতে পৌঁছে পেছনে তাকিয়ে। যখন কোনো ক্ষত থাকে না কিন্তু দাগ ভয়াবহ স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয় এবং ফলাফল বয়ে বেড়ায়।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় এই ঘটনার কারণ ধরা হয় ক্ষুদ্র ঘূর্ণিবায়ুতে সৃষ্ট শূন্যচাপ কিংবা তীব্র শীতে ত্বকের হঠাৎ ফেটে যাওয়ার মতো কিছু। তবু কামাইতাচির মিথ আজও মানুষের সমষ্টিগত চেতনায় বেঁচে আছে। এটি অজানার জন্য একটি কাহিনি, অকারণ আঘাতের জন্য একটি অর্থবহ ভাষা। এই মিথ ভূদৃশ্যকে এক শিকারিতে রূপান্তরিত করে। প্রকৃতিকে কেবল মানবকর্মের পটভূমি নয় বরং এক সক্রিয় ও নির্মম অংশগ্রহণকারী হিসেবে স্বীকার করে নেয়।
কামাইতাচির শিকাররা মুহূর্তটিতে কেবল হঠাৎ এক দমকা হাওয়ার অনুভূতি পায়। কিন্তু কয়েক মিনিট কিংবা ঘণ্টাখানেক পরে, যখন জাদুর প্রভাব ফুরিয়ে যায়, তারা আবিষ্কার করে তাদের ত্বকে এক স্পষ্ট রক্তহীন গভীর ক্ষত।
বাতাসকে যখন এক ধারালো প্রাণীতে রূপ দেওয়া হয়, তখন জাপানি ঐতিহ্য আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতি নিরপেক্ষ নয়। সে যেকোনো মুহূর্তে, কোনো সতর্কতা ছাড়াই, মানবদেহে তার চিহ্ন রেখে যেতে পারে। আর সেই ক্ষতের উৎস কোথায় তা ভেবে মানুষ কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে নিজের শরীরের দিকে, যেন ক্ষতটি সত্যিই কোথাও থেকে আসেনি, হঠাৎ করেই জন্ম নিয়েছে।
কামাইতাচির মিথের উৎপত্তি প্রাচীন কৃষিভিত্তিক কুসংস্কার ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনের ভেতরে। এই মিথ মানুষের মানসিক জগতে হঠাৎ ও ব্যাখ্যাতীত আঘাত কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়, তার এক জটিল মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো হাজির করে। ফলে কামাইতাচি হয়ে ওঠে সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও নিখুঁত রূপক। মিথটির প্রকৃত প্রতিভা নিহিত আছে তার তিন ধাপের ধারাবাহিক এক প্রক্রিয়ায়—পড়ে যাওয়া, ক্ষতবিক্ষত হওয়া এবং অবশেষে অবশ হয়ে যাওয়া। এই কাঠামো আশ্চর্যজনকভাবে মানুষের শক বা ধাক্কা খাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়। যেখানে মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে আঘাতের পূর্ণ বাস্তবতা থেকে মানুষকে রক্ষা করে; ব্যথা বা যন্ত্রণা সামনে আসে তখনই, যখন ব্যক্তি মানসিকভাবে তা গ্রহণ করার মতো নিরাপদ অবস্থায় পৌঁছায়।
তোহোকু ও হোকুরিকু অঞ্চলের লোকবিশ্বাসে পাহাড়ি শীতল বাতাসে ত্বক ফেটে যাওয়ার মতো কঠিন প্রাকৃতিক বাস্তবতাকে তিনটি কাস্তে-ধরা বেজির কাহিনিতে রূপান্তর করা হয়েছিল। তিনটির মধ্যে তৃতীয় বেজিটি—যে ক্ষতে অবশ করা মলম লাগায়, সে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সে ইঙ্গিত দেয়, অতিলৌকিক জগতের শিকারি খেয়ালখুশির মধ্যেও একধরনের শীতল, নিরাসক্ত করুণা লুকিয়ে থাকতে পারে। সম্ভবত এই সূক্ষ্ম মানবিক ছায়াটিই কামাইতাচিকে আধুনিক যুগে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে। কারণ এটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরে সেই ‘ব্যথাহীন’ উপায়, যেভাবে সংস্কৃতি ও স্মৃতি দ্রুত অগ্রগতির হাওয়ায় কেটে যায় আর মানুষ টের পায় অনেক পরে।
‘কামাইতাচি’ একধরনের আত্মগত দলিল—যেখানে লোককথা, পারফরম্যান্স আর্ট এবং ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে গেছে। এই কাজটি জন্ম নিয়েছিল হোসোয়ে ও তাতসুমি হিজিকাতার যৌথ সৃজনশীল সমন্বয়ে।
আধুনিক বিশ্লেষণে কামাইতাচি আর কেবল পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা এক দৈত্য নয়; এটি জাপানি পপ সংস্কৃতি ও আভান্ত-গার্দ শিল্পের এক বহুমাত্রিক প্রতীক। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় এই ঘটনার উৎস খোঁজা হয় ক্ষুদ্র ঘূর্ণিবায়ুর ভেতরের শূন্যচাপে বা তীব্র শীতে ত্বকের আকস্মিক কুঁচকে যাওয়ায়।
যুদ্ধোত্তর জাপানি আলোকচিত্রের ইতিহাসে খুব অল্প কিছু কাজই আছে, যেগুলো আইকোহ হোসোয়ের কামাইতাচির (১৯৬৯) মতো গভীরভাবে তাড়িত করে। শরীর ও চেতনাকে একসঙ্গে কাঁপিয়ে তোলে। এটি নিছক কিছু ছবির সংকলন নয়; বরং একধরনের আত্মগত দলিল—যেখানে লোককথা, পারফরম্যান্স আর্ট এবং ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধির অভিজ্ঞতা একাকার হয়ে গেছে। এই কাজটি জন্ম নিয়েছিল হোসোয়ে ও বুটোহ নৃত্যের প্রবর্তক তাতসুমি হিজিকাতার যৌথ সৃজনশীল সমন্বয়ে।
হিজিকাতা কোনো মঞ্চের জন্য নাচেননি; তিনি নেচেছেন জমির জন্য, কাদার জন্য, ধানখেতের জন্য। কখনো তিনি ছুটে গেছেন খেতের আল ধরে, কখনো বেড়া টপকে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, কখনো আবার গ্রামবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের মাঝখানে হঠাৎ উপস্থিত হয়ে সৃষ্টি করেছেন বিস্ময় ও অস্বস্তি। ষাটের দশকের শেষভাগে, যখন জাপান দ্রুত শিল্পায়ন ও পাশ্চাত্যকরণের পথে এগোচ্ছে, কামাইতাচি ছিল আধুনিক নগরজীবনের প্রতি এক স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান। উত্তরের কাদামাখা, পূর্বপুরুষের মাটিতে ফিরে গিয়ে হোসোয়ে ও হিজিকাতা খুঁজতে চেয়েছিলেন সেই আদিম জাপানকে, যেটি নিয়ন আলো আর ইস্পাতের শহরের নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় টোকিওতে অগ্নিবোমা হামলার কারণে শিশু হোসোয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন তোহোকুর গ্রামে। এই কাজের মাধ্যমে তিনি সেই সময়ের নিষ্পাপ সুখ এবং তার তলায় লুকিয়ে থাকা ভয় ও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হলেন। হোসোয়ে এই সিরিজটি তুলেছিলেন ঝলকের মতো, একেবারে তাৎক্ষণিক, পরিকল্পনাহীন এক গেরিলা ভঙ্গিতে। এর ফলে ক্যামেরায় ধরা পড়েছে কৃষক ও শিশুদের সেই অনভিনীত, খাঁটি প্রতিক্রিয়া। যখন তারা তাদের শান্ত মাঠে হঠাৎ দেখে এক অর্ধনগ্ন, অদ্ভুত দেহ, যেন অন্য কোনো জগৎ থেকে ছুটে এসেছে।
হোসোয়ে ও হিজিকাতা কারও কাছ থেকে কোনো অনুমতি নেননি, কোনো পেশাদার সেট বানাননি। হিজিকাতা হঠাৎ করেই মাঠে আবির্ভূত হতেন, কখনো বেড়া টপকে, কখনো কাদায় কুঁকড়ে বসে, তার আঙ্কোকু বুটোহ পরিবেশন করতেন হতভম্ব কৃষক ও শিশুদের সামনে। এই আকস্মিকতা হোসোয়েকে সুযোগ দেয় মানুষের প্রকৃত প্রতিক্রিয়া আলোকচিত্রে ধারণ করার। যেখানে অভিনয় ও বাস্তব সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়। ক্যামেরাও এখানে নিছক পর্যবেক্ষক নয়; সে নিজেই নৃত্যের অংশ হয়ে ওঠে। অনেক সময় হোসোয়ে হিজিকাতার পাশে পাশে দৌড়েছেন, দৌড়াতে দৌড়াতে শাটার টিপেছেন। ফলে তার ধারণ করা আলোকচিত্রে ধরা পড়েছে শরীরের উন্মত্ত গতি ও শক্তি। কখনো ব্লার, কখন লো পারসপেক্টিভ এঙ্গেল এবং এমন এক ভীতিকর নৈকট্যে, যা দর্শককে বিষয়বস্তুর সঙ্গে এক অস্বস্তিকর অন্তরঙ্গ সম্পর্কে টেনে নেয়।
কামাইতাচি সাদা-কালো আলোকচিত্রশিল্প মাধ্যমের প্রকাশ ক্ষমতার এক অনুপম পাঠ। হোসোয়ে পাশ্চাত্যের ‘ফাইন প্রিন্টের’ আরামদায়ক নান্দনিকতা প্রত্যাখ্যান করে বেছে নেন উচ্চ-কনট্রাস্ট, যেখানে মাঝারি ধূসর টোনগুলো প্রায় নিশ্চিহ্ন। এই কারিগরি সিদ্ধান্ত বুটোহ নৃত্যের ‘সব নয় তো কিছুই নয়’—এই চরম তীব্রতার প্রতিধ্বনি।
হোসোয়ের ছবিতে আকাশ প্রায়ই হয়ে ওঠে চোখ ধাঁধানো, বৈশিষ্ট্যহীন সাদা; আর মাটির ছায়া নেমে যায় গভীর, কালির মতো অন্ধকারে। এই দ্বিমাত্রিক কালার ল্যাঙ্গুয়েজ গ্রামীণ ভূদৃশ্যকে উত্তীর্ণ করে এক পৌরাণিক পরিসরে। যেখানে হিজিকাতার বিকৃত দেহ দিগন্তে আঁকা কোনো ক্যালিগ্রাফির আঁচড়ের মতো ভাসে। ওয়াইড-অ্যাঙ্গেল লেন্সের ব্যবহার তার শরীরের অনুপাত আরও বিকৃত করে, হাত-পা যেন হয়ে ওঠে সেই পুরাণের কামাইতাচির কাস্তে।
নান্দনিক উৎকর্ষের বাইরেও কামাইতাচি এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবাদ। ষাটের দশকের অর্থনৈতিক বিস্ময় ও আনপো আন্দোলনের (আধুনিক জাপানের ইতিহাসের বৃহত্তম এবং অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি গণবিক্ষোভ, ১৯৫৯ থেকে ১৯৬০ সালের মধ্যে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র নিরাপত্তা চুক্তি বাতিলের দাবিতে সংঘটিত হয়েছিল) উত্তাল সময়ে নির্মিত এই কাজ ছিল আধুনিক জাপানের ‘পরিষ্কার’ ও ‘শৃঙ্খলিত’ মুখোশের বিরুদ্ধে এক আর্তচিৎকার। গ্রামবাংলার কাদায় ‘অন্ধকারের নৃত্য’ নামিয়ে এনে হোসোয়ে ও হিজিকাতা পুনর্দখল করতে চেয়েছিলেন এক আদিম জাপানি পরিচয়, যা যুদ্ধোত্তর দখলদারির বিশ্বায়িত সংস্কৃতিতে মুছে যাচ্ছিল। এই কাজ ইঙ্গিত দেয়—টোকিওর চকচকে আকাশচুম্বী ভবনে জাপানি আত্মার সারবস্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না; বরং তা লুকিয়ে আছে পূর্বপুরুষের মাটির কুসংস্কারাচ্ছন্ন, রুক্ষ এবং কখনো কখনো বিকৃত বাস্তবতায়। এক অদৃশ্য ক্ষত, যা রক্ত ঝরায় না, তবু মানুষকে চিরতরে বদলে দেয়।
কামাইতাচির উত্তরাধিকার আজও সমকালীন আলোকচিত্র ও পারফরম্যান্স আর্টের প্রতিটি কোণে অনুভূত। এটি অঁরি কার্তিয়ের-ব্রেসোঁর ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’-এর ধারণাকে ভেঙে দিয়ে দেখিয়েছে যে একটি আলোকচিত্র হতে পারে দুটি আত্মার যৌথ নির্মাণ—আলোকচিত্রী ও আলোকিত ব্যক্তির। এটি প্রোভোক আন্দোলনের (১৯৬০-এর দশকের শেষভাগে জাপানে শুরু হওয়া একটি আমূল পরিবর্তনকামী এবং প্রভাবশালী শৈল্পিক আন্দোলন, যা মূলত ফটোগ্রাফি এবং চিন্তাচেতনার একটি নতুন ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে) দাইদো মোরিয়ামার মতো শিল্পীদের প্রভাবিত করেছে, যারা হোসোয়ের কনট্রাস্টকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
কামাইতাচি মানব অবস্থার এক কালজয়ী অনুসন্ধান। এমন এক কাজ, যা বলে দেয় আমাদের স্মৃতিরা কখনো মরে না; তারা কেবল অতীতের উঁচু ঘাসে লুকিয়ে থাকে। অপেক্ষা করে, হঠাৎ এক ঘূর্ণিবায়ুর মতো আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য, যখন আমরা একেবারেই প্রস্তুত নই।