লেখার বিকল্প নেই

আসলে সৈয়দ হক যে যুগের সন্তান, তখন বন্ধুত্ব একটা বিষয়ই ছিল, যেটা মানুষ আমৃত্যু বয়ে নিয়ে যেত। বন্ধুত্ব রক্ষাটা দায়িত্ব মনে করত। এখন অন্য যুগ। বাণিজ্যই সব। তবু এ যুগে এসেও, আমি অনুভব করি, বাংলা ভাষার এই যে এত বড় মাপের একজন সব্যসাচী লেখক হক, তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী? অগ্রজ-অনুজ সহযাত্রীই শুধু?

সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে লেখকছবি: সংগৃহীত

গত শতকের আশির দশকে আমরা যারা মফস্বল শহরে বেড়ে উঠেছিলাম, তারা ঢাকা বা কলকাতায় বসবাস করা কবি-লেখকদের নামের সঙ্গে যতটা পরিচিত ছিলাম, সেসব কবি-লেখকের ছবি তেমন দেখতে পেতাম না। বইয়ের ফ্ল্যাপে যে ছবি দেওয়া থাকত, সেই ছবি দেখেই শনাক্ত করতে হতো কবি, লেখককে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে কখনো কোনো অনুষ্ঠানে কবি–সাহিত্যিকেরা অংশ নিতেন বটে, কিন্তু মফস্বলে তখন টেলিভিশন খুব সচরাচর ছিল না। সিনেমা বা নাটক দেখতে টেলিভিশনের সামনে ভিড় হতো বটে, তাই বলে কবি-সাহিত্যিকদের অনুষ্ঠান আর কীভাবে দেখা যাবে? তাই কবি-লেখকদের সরাসরি দেখার বা চেনারও খুব একটা সুযোগ ছিল না, অন্তত গ্রামে বসে, মফস্বল শহরের বারান্দায় বসে। একটু বেশি পড়ুয়ারা হয়তো বইয়ের ফ্ল্যাপ দেখেই চিনে রাখত কবি বা লেখককে।

একদিন দেখলাম, রিকশায় বসে যাচ্ছেন দুজন। একজনকে চিনে ফেললাম। কারণ, তাঁর মাথায় চুল নেই, বিরাট জুলফি। তাঁর ছবি দেখছি বইয়ের ফ্ল্যাপে। অনেক বই পড়ে ফেলেছি তাঁর, সেই বয়সেই, যখন আমি ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র, ঝিনাইদহ কেশবচন্দ্র কলেজে।

কলেজের সফেদাগাছের তলায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। পাঁচিলের ওপারে রাস্তা—অগ্নিবীণা সড়ক। দেখলাম, রিকশায় যাচ্ছেন দুজন। একজনকে চিনে ফেললাম তাঁর জুলফি দেখেই। মনে হলো, উনিই সৈয়দ শামসুল হক। বন্ধু হুমায়ুনের বাইসাইকেল ছিল। বললাম, চল তো। মনে হলো রিকশায় সৈয়দ শামসুল হক।

ঝিনাইদহ সদরের প্রধান দুটি সড়কের নাম দুটি কাব্যগ্রন্থের নামে। যেকালে শহর পৌরসভা হয়, সেকালেই, প্রথম পৌরপিতা ডা. কে আহমেদ শহরের প্রধান দুটি রাস্তার নামকরণ করেন দুটি কবিতার বইয়ের নামে। এক, গীতাঞ্জলি সড়ক। দুই, অগ্নিবীণা সড়ক। আমাদের কেসি কলেজ অগ্নিবীণা সড়কের গা ঘেঁষে। জেলা শহরের প্রধান কলেজ। সরকারি। আমি ইন্টারে পড়ি। ঢাকার পত্রপত্রিকায় কবিতা পাঠাই ডাকযোগে। বছরে দু-চারখানা লেখা ছাপা হয়। সেই আনন্দেই ঘুরে বেড়াই। ঢাকার কোনো বড় কবি-সাহিত্যিককে ঝিনাইদহে দেখতে পাব, এ তো প্রায় অসম্ভব। কিন্তু মনে হলো, দেখে ফেললাম সৈয়দ শামসুল হককে। কিন্তু যাঁকে দেখলাম, উনিই সৈয়দ শামসুল হক তো?

ঝিনাইদহ শহরের তখন যে বাসস্ট্যান্ড, লোকে বলত ‘চুয়াডাঙ্গা স্ট্যান্ড’। স্ট্যান্ড থেকে চুয়াডাঙ্গাগামী গাড়ি ছাড়া যশোর ও কুষ্টিয়ায় যাওয়ার বাসও ছাড়ত। তাই আমি ও আমার বন্ধু হুমায়ুন বাইসাইকেলে গিয়ে পৌঁছলাম চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে। আমরা প্রথমে কোনদিকের কাউন্টারে যাব? মনে হচ্ছিল, সৈয়দ শামসুল হককে কোনো না কোনো বাস কাউন্টারেই পাব। ছোট ছোট ঘর বাস কাউন্টারের। খুঁজতে খুঁজতে কুষ্টিয়াগামী এক বাস কাউন্টারে গিয়ে পেলাম। দেখলাম, রিকশায় বসে থাকা সেই দুজন। একটু দুরু দুরু আবার প্রবল আগ্রহ—এই দুই ঝাপটা নিয়েই গেলাম কাছে। জুলফি বড় দেখেই আর বইয়ের ফ্ল্যাপে দেখা ছবি মনে মনে মিলিয়েই, তাঁকে প্রশ্ন করি, আপনি কি সৈয়দ শামসুল হক? তিনি মাথা নাড়ান। তিনি তখন তাকিয়ে দেখছেন ইন্টারমিডিয়েটে পড়া মফস্বলের এক অচেনা ছাত্রকে। তিনি আমার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। কোন ক্লাসে পড়ি, জিজ্ঞাসা করলেন। আমি তাঁকে প্রশ্ন করি, ‘যাচ্ছেন কোথায়?’ সৈয়দ হক উত্তর দেন, ‘কুষ্টিয়ায়।’ ‘ওখানে কি কোনো অনুষ্ঠান আছে?’ সৈয়দ হক মাথা নাড়ান। বলেন, ‘আগামীকাল কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের জাতীয় সম্মেলন। একে চেনো?’ সৈয়দ শামসুল হক তাঁর পাশে বসা লোকটাকে দেখালেন। রিকশায় সৈয়দ হকের পাশেই বসে ছিলেন তিনি। আমি মাথা নাড়ালাম, ‘না, চিনি না।’

বাংলা ভাষা পেয়েছে সৈয়দ হককে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, চিত্রনাট্য, গীত রচনা, ছবি পরিচালনা, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য নির্মাণ—কী করেননি তিনি? বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রপরবর্তী এত ফল্গুধারার লেখক বা সব্যসাচী লেখক আর কে?

এতক্ষণে সৈয়দ হক আমার চরিত্রের অস্থিরতা ধরে ফেলেছেন। আমি যে কবিতা লিখি এবং ঢাকার পত্রিকায় দু-একটি ছাপাও হয়, তা–ও বলেছি তাঁকে। সে সময়, তখনকার বেশ কুলীন গোছের মাসিক সাহিত্যপত্র ‘দীপঙ্কর’ যেটা দৈনিক ‘সংবাদ’ থেকেই বের হতো, সম্পাদক ছিলেন অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আমার দুটো কবিতা ছাপা হয়েছিল তখনকার ‘চলতি’ সংখ্যায়। সেই সংখ্যায়ই সৈয়দ হকের ছোটগল্প জাদুবাস্তবতার শিহরণ ‘রক্তগোলাপ’ নিয়ে বড় একটা আলোচনা লিখেছিলেন অধ্যাপক শহীদুর রহমান। শহীদুর রহমান কবি ও ছোটগল্পকার। আমাদের কেসি কলেজেরই শিক্ষক। একদা ঢাকাতেই ঢাকা কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে যুক্ত হয়েছিলেন তখনকার দৈনিক পাকিস্তানে। শিক্ষকতায় ঢুকলেন শহীদ স্যার। জগন্নাথ কলেজ। বাংলা বিভাগ। ইন্টারে পড়তে আসেন শহীদুর রহমান ঢাকায়, ১৯৫৮ সালে। ভর্তি হলেন ঢাকা কলেজে। ৮১ সাল র্পযন্ত ঢাকায় থাকলেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ নিয়ে উচ্চতর গবেষণায় কলকাতায় গেলেন ১৯৮১ সালে। গবেষণা অসমাপ্ত রেখে বাংলাদেশে ফিরলেন এবং যুক্ত হলেন ঝিনাইদহ সরকারি কেশবচন্দ্র কলেজে। সেই কলেজেই আমি তখন ইন্টারে পড়ি, সেদিনকার কথা লিখছি আজ। শহীদুর রহমানের বন্ধু যাঁরা ঢাকায় ছিলেন, আমি পড়েছি তাঁদের লেখাও। কারা শহীদুর রহমানের বন্ধু? আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল কাসেম ফজলুল হক বা মনসুর মুসা—তাঁরা। আমি জানতাম। তো সৈয়দ শামসুল হক, তখন, সেই ১৯৮৮ কি ’৮৯ সালের দুপুরবেলায়, ঝিনাইদহ শহরের বাস কাউন্টারে বসে যখন আমাকে দেখিয়ে বললেন, ‘একে চেনো?’ আমি বললাম, ‘না।’ ‘এর নাম সেলিম আল দীন। চিনেছ?’ আমি অবাক হয়ে যাই। বললাম, ‘পড়েছি। আপনার লেখা নাটক সম্পর্কে আমার একটা ধারণা আছে। আপনিই সেলিম আল দীন?’ সেলিম আল দীন মাথা নাড়েন। আমি একের মধ্যে দুই পেয়ে গেলাম। কেমন যে ভালো লাগল! সৈয়দ শামসুল হক ও সেলিম আল দীন বসে আছেন আমার সামনে। ঝিনাইদহ শহরের একটা ছোট বাস কাউন্টারে। কুষ্টিয়ার বাস এলে সে বাসে উঠলেন তাঁরা। আমি আর আমার বন্ধু হুমায়ুন বাইসাইকেলে চড়ে চলে গেলাম হোস্টেলে। আমরা তখন ‘ঝিনেদা থিয়েটার’ করি। ঝিনেদা থিয়েটারও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের অঙ্গসংগঠন। পরদিন কুষ্টিয়ায়ও গেলাম। কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমিতে গ্রাম থিয়েটারের সম্মেলনে আমাদের ঝিনেদা থিয়েটারের নেতারা ছিলেন। আমি গেছি সৈয়দ হক ও সেলিম আল দীনের সঙ্গে যদি আবার দেখা হয়, এই আশায়। সেই আশা পূরণ হয়নি। কারণ, সৈয়দ হক ও সেলিম আল দীন খুব ব্যস্ত ছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে আমি ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশিত সেলিম আল দীনের নাটক ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ দেখেছিলাম। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’তে দেখা হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় আজও আমার মনে আছে। একটা দৃশ্যে ফরীদি দর্শকের উদ্দেশে চোখ মেরেছিলেন, এখনো মনে আছে। টেলিভিশনে তখন তুমুল জনপ্রিয় হুমায়ুন ফরীদি। এর ১৫-১৬ বছর পর, যখন আমি ঢাকায় থাকি এবং আমার বন্ধু সরয়ার, বাজার যাকে চেনে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নামে, সরয়ার যখন ওর প্রথম সিনেমা ‘ব্যাচেলর’ বানাচ্ছিল, সেই ‘ব্যাচেলর’-এ আমি ফরীদি ভাইকে পেলাম কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে, ফরীদি আমার কো-আর্টিস্ট। আমি প্রামাণ্য চরিত্র ‘টোকন’। তিনি ফিকশন ক্যারেক্টার আবরার ভাই। প্রায় ১২-১৪ বছর পেরিয়ে গেছে ‘ব্যাচেলর’ বানানোর। এর মধ্যেই, কয়েক বছর আগে এক পয়লা ফাল্গুনে ফরীদি ভাই মরেও গেলেন।

তো সেদিন যখন সৈয়দ হককে তাঁর গুলশানের বাসায় আড্ডাচ্ছলে বললাম ঝিনাইদহের সেই কথা, হক ভাইয়ের তো তা মনে থাকার কথা নয়। মনে নেইও। শুনে হক ভাই বললেন, ‘তো লিখেছ এটা কোথাও যে তুমি আমাকে প্রথম কোথায় দেখেছিলে?’

বললাম, ‘না, লিখিনি।’ হক বললেন, ‘লিখে ফেলো। মজার স্মৃতি। তার মানে তুমি ঝিনেদাতেই আমাকে প্রথম দেখেছিলে?’

—হ্যাঁ।

—লেখো কোথাও।

—লিখব।

—লেখার বিকল্প নেই। হক বললেন।

সত্যি। লেখার বিকল্প নেই বলেই আমরা সৈয়দ শামসুল হককে চিনি। জানি। তিনি কী বলতে চেয়েছেন, জেনেছি। তিনি কী বলতে পেরেছেন, জানি। তিনি কী দিতে চেয়েছেন, আমরা পেয়েছি। বাংলা ভাষা পেয়েছে সৈয়দ হককে। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, চিত্রনাট্য, গীত রচনা, ছবি পরিচালনা, ছবি আঁকা, ভাস্কর্য নির্মাণ—কী করেননি তিনি? বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রপরবর্তী এত ফল্গুধারার লেখক বা সব্যসাচী লেখক আর কে?

সৈয়দ শামসুল হক তুমুল প্রেমিক, আমি জানি। এই নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার অনেক কথা হতো। কোনো দ্বিধা নেই। হকের সঙ্গে কথা হতো টোটাল আর্ট নিয়েই। একবার, ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আমন্ত্রণে এক সন্ধ্যায় কবিতা পড়তে গেলাম গুলশানে। সর্বজনাব সৈয়দ হক। ১৪ জন কবিতা পড়বেন। শাহনাজ মুন্নী আর আমিই জুনিয়র। মধ্যে নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, রুবী রহমান, কামাল চৌধুরী, আসাদ মান্নান...। দর্শক–শ্রোতা সীমিত, শ খানেক। প্রথমেই ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে ১৪ জনকে শুভেচ্ছা জানান জনাব গওহর রিজভী। বিরাট গুরুগম্ভীর পদের মানুষ তিনি, কিন্তু কবিতার আসরে ছিলেন হাস্যোজ্জ্বল। সেই অনুষ্ঠান হয়েছিল মূলত ভারতীয় হাইকমিশনের অফিসার অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাপ্রেম থেকেই। সন্ধ্যা থেকে কবিতাপাঠ চলল রাত দশটা পর্যন্ত। তারপর রাতের খাবার। খাবারের আগে পানাহার। নানান পদের পানীয় দাঁড়িয়ে আছে আমাদের অপেক্ষায়। যে যা নিতে চাচ্ছেন, তাঁকে তাই ঢেলে দিচ্ছে। হক ভাইয়ের সঙ্গে আনোয়ারা সৈয়দ হকও আছেন। আসলে অনুষ্ঠানটির আমন্ত্রণের সময়ই বলে দেওয়া ছিল, ‘আমন্ত্রণ, আপনি ও আপনার মিসেস...।’ আমি চেষ্টা করেছিলাম কাউকে ‘মিসেস’ সাজিয়ে নিয়ে যেতে। কিন্তু বেশি রাত হয়ে যেতে পারে ফিরতে, তাই যে দু-একজনকে বলেছিলাম, তারা রাজি হয়নি। একাই গিয়েছিলাম। মিসেস না থাকলে কী করব? গিয়ে দেখি, গুণদাও একাই গেছেন। গুণদা ডিভোর্সি। আমি সিঙ্গেল। হক ভাই বললেন, ‘টোকন, কী নিচ্ছ?’

সৈয়দ শামসুল হক
ছবি: টোকন ঠাকুর

‘আমাকেও তা–ই দাও।’

সে রাতে সবাই ভেসে যাচ্ছিল জলমগ্ন স্রোতের দিকে। সেই স্রোত, সেই ছোট ছোট ঢেউ আমার এখনো মনে আছে।

একবার রাজশাহীতে কবিতা পড়তে গিয়েছিলাম। বিভাগীয় কমিশনারের আমন্ত্রণে। কমিশনার—কবি আসাদ মান্নান। ঢাকা থেকে আরও গিয়েছিলেন আবু বকর সিদ্দিক, নির্মলেন্দু গুণ, মাকিদ হায়দার, আনোয়ারা সৈয়দ হক, অসীম সাহা, শিহাব সরকার, হায়াৎ সাইফ এবং আরও কজন অগ্রজ। আমরা ছিলাম রাজশাহী সার্কিট হাউসে। রাতে, সবাই যখন সার্কিট হাউসে জলমগ্ন, নিদ্রামগ্ন তখন, হক ভাই আমাকে ফোন করলেন। হ্যালো...

হক ভাই ও আমি সার্কিট হাউস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোথাও যাচ্ছি। রাত পায়ের নিচে টলে টলে যাচ্ছে। হক ভাই বললেন, ‘চল পদ্মায়।’

পদ্মার পাড়ে কি ঋত্বিক ঘটক দাঁড়িয়ে ছিলেন? বললাম না, রাত টলে টলে যাচ্ছিল। পদ্মা-শহর রাজশাহী কবিতার মতো বেজে বেজে উঠছিল। ঋত্বিককে মনে পড়তে বাধ্য।

হক ভাইয়ের ৭৯তম জন্মবার্ষিকীর আয়োজন আমি আমার ভালোবাসাতেই করেছি। শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তন দিয়ে ব্যাপক সহযোগিতা করেছে। হক ভাইয়ের ওপর আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে সাময়িকী জার্নাল ‘সামান্য কিছু।’ প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়ে গেল সেই অনুষ্ঠানে। কীভাবে এটা জোগাড় করেছিলাম, আমার দু-তিনজন সহকর্মীই জানে সেই জ্বালা, যন্ত্রণা। কিন্তু ভালোবাসা থাকলে জ্বালা-যন্ত্রণাও সয়ে যেতে হয়।

সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে বন্ধুত্বের একটি মজা হচ্ছে, এই কবির মন খুবই তরুণ। হাতে ব্রেসলেট পরে থাকেন, নতুন জিনসের প্যান্ট পরেন, চিন্তায় থাকেন উন্মুক্ত, তরুণ কবির মতো ঝাঁঝালো, এ দেশে দ্বিতীয়জন কাউকে আমি এমন পাইনি।

সাহিত্যের সব শাখায়ই সৈয়দ হক নিরীক্ষার পর নিরীক্ষা করেছেন। নিরীক্ষা শুধু নিরীক্ষাতেই সীমিত থাকেনি, উত্তীর্ণ ফসল হয়ে উঠেছে। বাংলা ভাষা তাঁকে ‘সব্যসাচী’ বলে ডাকে, ডাকবেই।

ছবি ও চিত্রকলার আলাপের ফাঁকে ফাঁকে কবিতার নানা পঙ্ক্তি এসে সৈয়দ হকের মুখে উচ্চারিত হতো। সৈয়দ হক উচ্চারণ করেন তাঁর নিজের লেখা পঙ্ক্তি, কখনো তাঁর বন্ধু আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর পঙ্ক্তি। শামসুর রাহমানের সঙ্গেও তাঁর বন্ধুত্ব ছিল প্রগাঢ়, ছিল কাইয়ুম চৌধুরী, আলমগীর কবির, জহির রায়হান বা সন্ধানীর গাজীর সঙ্গে। বন্ধুত্ব ছিল ফয়েজ আহমদের সঙ্গে। আসলে সৈয়দ হক যে যুগের সন্তান, তখন বন্ধুত্ব একটা বিষয়ই ছিল, যেটা মানুষ আমৃত্যু বয়ে নিয়ে যেত। বন্ধুত্ব রক্ষাটা দায়িত্ব মনে করত। এখন অন্য যুগ। বাণিজ্যই সব। তবু এ যুগে এসেও, আমি অনুভব করি, বাংলা ভাষার এই যে এত বড় মাপের একজন সব্যসাচী লেখক হক, তাঁর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কী? অগ্রজ-অনুজ সহযাত্রীই শুধু? আমার মনে হয়, এর বাইরে দিয়ে চলে যায় সর্ম্পকের রেখা। তাই, আই ফিল ইট, আমিও সৈয়দ হকের এ যুগের এক বন্ধু। আমি তাঁকে অগ্রজে পাই, বন্ধুত্বে পাই। এই বন্ধুত্ব বয়ে নিয়ে যেতে পারায় তুমুল আগ্রহ আমার।

সৈয়দ হক নেই, তাঁর অনুপস্থিতিতেও আমি তাঁকে অনুভব করি। প্রতিদিনই করি।