স্মরণ
হুমায়ূন ফেনোমেননের ভাষ্য
১৯ জুলাই ছিল হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুদিন। মৃত্যুর এক যুগ পেরিয়েও তাঁকে ঘিরে পাঠকের আগ্রহ, বিতর্ক ও বিস্ময় কমেনি। কেন তিনি বাংলা সাহিত্যে এক অনন্য ‘ফেনোমেনন’ হয়ে উঠলেন, তাঁর জনপ্রিয়তার সামাজিক, ভাষিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি কী—নিজের পাঠ-অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের আলোকে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজেছেন লেখক।
হুমায়ূনসৃষ্ট সাহিত্য সম্পর্কে আমার মতামত কী, লেখক হিসেবে পাঠকমহলে তাঁর বিপুল আবেদনের কারণ কী, এমন প্রশ্নের মুখোমুখি আমাকে প্রায়ই হতে হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও দু–একজন প্রশ্ন করেছেন, হুমায়ূনকে নিয়ে কিছু না লেখার কারণ জানতে চেয়েছেন। এ ধরনের প্রশ্ন আমি সব সময় এড়িয়ে গিয়েছি। কারণ, বঙ্গদেশি ভক্ত পাঠককুল বড্ড বেশি একচক্ষু হরিণবৎ। যুক্তির ধার এরা ধারে না। পাঠাভ্যাসে ব্যক্তির স্বাদের ভিন্নতা কিংবা বৈচিত্র্য যে থাকতে পারে অধিকাংশ তা মানতেই অপারগ। আরেকটা কারণ, হুমায়ূনসৃষ্ট সাহিত্য সম্পর্কে আমার আজন্ম কিঞ্চিৎ নির্লিপ্ততা। লেখক হিসেবে হুমায়ূনের উত্থান আমার চোখের সামনেই ঘটেছে। আশির দশক থেকেই প্রত্যক্ষ করেছি একটু একটু করে হুমায়ূন কী করে ব্যাখাতীত এক ফেনোমেননে রূপান্তরিত হলেন। সত্যি বলতে, আমার প্রজন্মই হুমায়ূনকে প্রথম তুঙ্গে তুলেছে, দেবতার আসনে বসিয়েছে, লার্জার দ্যান লাইফে পরিণত করেছে। আমার বন্ধু-সহপাঠী-সতীর্থের দল যখন ছিল হুমায়ূনে আচ্ছন্ন, রুচির ভিন্নতার কারণে তখন (এবং আজও) হুমায়ূন–সাহিত্যে আমার গভীরভাবে অবগাহন করা হয়নি।
হুমায়ূনের লেখাতেই প্রথমবারের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে উঠেছে পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও কালচার। আধুনিক বাংলা সাহিত্য তৈরি হয়েছে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের হাতে। ভাগীরথীতীরের ভাষাটি নগরকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুদের মুখের ভাষা। এই ভাষার পরিশীলিত ও প্রমিত রূপ গত দেড় শ বছর আধুনিক বাংলা গদ্যের বাহনরূপে চর্চিত। স্থানীয় মৌখিক ভাষা থেকে কিছুটা বিচ্যুত এই উপভাষা অবশ্য পূর্ববঙ্গের কথ্যভাষা থেকে অনেক যোজন দূরে। সত্যি বলতে, পূর্ব বাংলার মানুষ এই ঘটি বাংলাকে কখনো আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়নি।
তারপরেও বলব, আমি হুমায়ূন উত্থানের সাক্ষী। বিটিভিতে তাঁর প্রথম দিকের নাটকগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। দর্শক মুগ্ধ করার তাঁর ঐশ্বরিক ক্ষমতা অস্বীকার অসম্ভব। আশির দশকে মাত্র একটি টিভি চ্যানেল শাসিত ও ইন্টারনেটহীন ঢাকার সাদা-কালো জীবনে হুমায়ূন ছিলেন আমাদের জীবনে বসন্তের ছোঁয়া। ওর লেখায় যেন আমাদের তারুণ্য প্রাণ পেল। মনে আছে ১৯৮৮ কি ১৯৮৯ সালের এক সন্ধ্যার কথা। বেইলি রোডের সাগর পাবলিশার্সে বন্ধুচক্র মিলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর নভেলা ‘বৃহন্নলা’ পাঠের স্মৃতি। একজনের পিঠে আরেকজনকে ভর দিয়ে পড়তে দেখে স্বত্বাধিকারী এম আর আখতার মুকুলের সে কী অট্টহাসি। স্বভাবসুলভ জলদগম্ভীর কণ্ঠে তাঁর উচ্চারণ, ‘পোলাপাইন আজকাইল চালাক হইয়া গ্যাছে। খাড়ায়া খাড়ায়া পড়ে, বই কিনে না।’ স্তম্ভিত শওকত ওসমানেরও কী বিস্ময় আমাদের কাণ্ড অবলোকন করে। শওকত ওসমান মিষ্টভাষী ছিলেন, তাঁর গুণমুগ্ধও এ কথা বলবে না। তারও আগে, বিচিত্রা ঈদ সংখ্যায় পড়েছিলাম হুমায়ূনের অসম্ভব মায়াবী এক লেখা ‘একা একা’। লেখাটি মনে গভীর দাগ কেটেছিল, ভার হয়েছিল আমার বুক। আখ্যানের বেকার বাবার সদ্য তরুণীর বিষণ্ন হাহাকারে আমার গলায় কষ্টের যে দলা পাকিয়ে উঠেছিল, আজও ভুলিনি।
দুই.
আরও অনেক দিন পর মার্কিন মুলুকে হুমায়ূনের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। তা সত্ত্বেও তাঁর লেখা সম্পর্কে আগ্রহ জাগেনি মনে। আসলে আমি ছিলাম আজন্ম জাফর ইকবাল ভক্ত। জাফর ইকবাল ভক্তির পেছনে ব্যক্তিগত কারণও ছিল। শৈশব থেকে জাফর ইকবালকে জেনেছি ‘জাফর মামা’ হিসেবে। সত্তরের দশকে, জাফর ইকবালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব–জীবন থেকে আমাদের পরিচয়। মেজ মামার ক্লাসমেট মুহম্মদ জাফর ইকবাল। মেজ মামাও ছিলেন উচ্চমানের সাই-ফাই লেখক এবং ভার্সিটির হলে জাফর মামার রুমমেট। সেই সুবাদে আমাদের বাসায় জাফর মামার তখন নিত্য আসা-যাওয়া। জাফর মামার পরিবারের বাইরে আমিই সম্ভবত, তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘হাত কাটা রবিন’-এর পাঠক। লেখকের হাত থেকে সইসহ বইটি প্রথম যখন ভাগনের হাতে আসে, সদ্য বাইন্ডিং করে আনা দশ কপি বইয়ের আঠা তখনো শুকায়নি। হুমায়ূন সেসব খবর জানতেন। স্মিতহাস্যে একবার আমাকে তিনি ‘জাফরের দলের লোক’ বলে টিপ্পনীও কেটেছিলেন। ঘরোয়া এক আসরে হুমায়ূনের উপস্থিতিতেই জাফর ইকবালকে বাংলাদেশের সেরা সায়েন্স ফিকশন লেখক রায় দেওয়ার কারণেই তাঁর এই মশকরা।
তার পরের টানা বিশ-পঁচিশ বছর কেটেছে কাউবয়ের দেশে। একা একা সে এক যাযাবর জীবন। অবারিত প্রেইরির আনাচে–কানাচে, ভাসমান শৈবালের যাপিত জীবন। হুমায়ূনের যে গোটা দশ-বারো বই পড়েছি, সেটা পড়েছি এই সময়—টানা, এক সিটিংয়ে। ১৯৯৩ সালের সামার কেটেছে কানসাসের উইচিটায়। রাত নটার আকাশে তখনো সূর্যের আলো। বাড়ির পর্চে বসে পড়ছি হুমায়ূনের শ্রেষ্ঠ বা নির্বাচিত উপন্যাস গোছের একটি সংকলন। সেই প্রথম, সেই শেষ। আমার আর হুমায়ূনের জগতে ফেরা হয়নি। যৎসামান্য পড়ে কারও লেখা মূল্যায়ন অসম্ভব। তাই মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছি তাঁর সম্পর্কে। তবে এটাও সত্যি, ভাত একটি টিপলেই যথেষ্ট। যা পড়েছি এবং অন্যদের ওপর হুমায়ূনের লেখার প্রভাব দেখে তাঁর জনপ্রিয়তার কারণটি বুঝতে পেরেছি বলেই মনে হয়।
লক্ষ করেছি, হুমায়ূনের পক্ষ-বিপক্ষ কট্টর দুই যুধ্যমান গ্রুপের সীমাহীন রক্তাক্ত লড়াই। মধ্যপন্থী ক্রিটিকের দল হুমায়ূন পাঠক তৈরিতে অশেষ ভূমিকা রেখেছেন যুক্তি দিয়ে তাঁকে যৎকিঞ্চিৎ ডিফেন্ডের চেষ্টা করেছেন। তাঁদের যুক্তির সারমর্ম হলো, লেখক হিসেবে হুমায়ূন গড়পড়তা, পপুলার লেখক। তৎসত্ত্বেও হুমায়ূনের লেখার সামাজিক উপযোগিতা অনস্বীকার্য। যুক্তিটি আমার মতে সর্বৈব খোঁড়া ও অনৈতিহাসিক। হুমায়ূনের আগে ও সমকালেও অনেক বিপুল জনপ্রিয় লেখক ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের ছিল নিজস্ব পাঠকগোষ্ঠী। সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী কিংবা ইমদাদুল হক মিলনের ভক্ত কম ছিল না সমাজে। পশ্চিমবঙ্গের লেখককুল, বিশেষ করে সুনীল, শীর্ষেন্দু বা বুদ্ধদেব গুহের নিবেদিত পাঠকের কথা ছেড়েই দিই। আরেকটু নিচের দিকে দেখলে রোমেনা আফাজ, কাজী আনোয়ার হোসেন, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়, নিমাই ভট্টাচার্য আর নীহাররঞ্জন গুপ্তের পাঠক বাংলাদেশে তখনো বিপুল। পথেঘাটে বিক্রি হতো তাঁদের লেখা। ওদিকে বাজার বলছে বিক্রির বিচারে আজকাল কাসেম বিন আবুবকর হুমায়ূনকেও ছাড়িয়ে যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা না হয় বাদই দিলাম।
হুমায়ূনের লেখা পড়ে আমাদের প্রজন্ম তালেবর পাঠকে রূপান্তরিত হয়েছে, কথাটি তাই সত্যি নয়। যারা হুমায়ূন ছাড়াও অন্যান্য বই পড়ে, পড়ুয়া বলেই পড়ে। এদের পাঠাভ্যাস গড়তে হুমায়ূনের ক্রেডিট নেই। পক্ষান্তরে, তাঁর বিপুলসংখ্যক পাঠক তাঁর লেখার বাইরে আদৌ কিছু পড়ে কি না সন্দেহ। তাঁর বিপুল আর অসাধারণ জনপ্রিয়তার তাহলে আসল কারণ কী? লেখক হিসেবে তাঁর উপযোগিতাই বা কোথায়? এ প্রশ্নের সার্বিক উত্তর দেওয়া আমার পক্ষে অসাধ্য। সম্ভাব্য কিছু কারণ সংক্ষেপে আমি বলতে পারি মাত্র। হুমায়ূনের লেখা সম্পর্কে আমার এই প্রচেষ্টা পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন নয়। ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর লেখা সম্পর্কে মোটাদাগের কিছু পর্যবেক্ষণ। হুমায়ূনের লেখার বৈশিষ্ট্যগুলো শনাক্ত করে পর্যবেক্ষণগুলো পয়েন্ট আকারে তুলে ধরেছি আমি। চিন্তার খসড়া হিসেবেও লেখাটিকে দেখতে পারেন।
তিন.
হুমায়ূনের লেখাতেই প্রথমবারের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে উঠেছে পূর্ব বাংলার নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও কালচার। আধুনিক বাংলা সাহিত্য তৈরি হয়েছে কলকাতার বর্ণহিন্দুদের হাতে। ভাগীরথীতীরের ভাষাটি নগরকেন্দ্রিক বর্ণহিন্দুদের মুখের ভাষা। এই ভাষার পরিশীলিত ও প্রমিত রূপ গত দেড় শ বছর আধুনিক বাংলা গদ্যের বাহনরূপে চর্চিত। স্থানীয় মৌখিক ভাষা থেকে কিছুটা বিচ্যুত এই উপভাষা অবশ্য পূর্ববঙ্গের কথ্যভাষা থেকে অনেক যোজন দূরে। সত্যি বলতে, পূর্ব বাংলার মানুষ এই ঘটি বাংলাকে কখনো আত্মস্থ করতে সক্ষম হয়নি। যাপিত জীবনে ও দৈনন্দিন অনুষঙ্গে বাঙালদের কথ্যভাষা সে কারণে আলাদাই রয়ে যায়। ওদিকে, ১৯৪৭–উত্তর ঢাকার লেখককুলও স্বভাবত কলকাতার হেজিমনিক প্রমিত ভাষা পরিত্যাগে সক্ষম হয়নি, যদিও পূর্ব বাংলার কথ্যভাষা দ্রুততার সঙ্গে প্রমিতকরণের পথে অগ্রসর হচ্ছিল।
হুমায়ূনসৃষ্ট চরিত্রগুলো, ঔপন্যাসিক ই এম ফর্স্টার যাকে বলেছেন, ফ্ল্যাট ক্যারেক্টার। অর্থাৎ অপূর্ণ চরিত্র। চরিত্রগুলো ইউনিডাইমেনশনাল—জীবনের ব্যঞ্জনা, কূটাভাস, ক্রূরতা, শাঠ্য বা দার্শনিক গভীরতার ছাপ নেই এতে। সমকালীন সামাজিক ঘাত–প্রতিঘাত থেকে বিযুক্ত চরিত্রগুলো ভীষণভাবে আদর্শায়িত। ফ্যান্টাসিপ্রবণ বাঙালি মন যেমন আদর্শ বাবা, আদর্শ ভাই বা আদর্শ প্রতিবেশী খোঁজে—হুমায়ূনের সৃষ্ট চরিত্রগুলো হুবহু সেই অবাস্তব আদর্শ মানুষের মূর্তি।
নিজস্ব ভাষাভঙ্গি তৈরিতে ব্যর্থতার কারণে একাত্তর–উত্তর বাংলাদেশি লেখককুলের লেখ্যভাষা ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হতে শুরু করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আবরণে ঢাকার ওপর কলকাতার সাংস্কৃতিক ও ভাষিক আধিপত্য মেনে নেওয়াটা স্থানীয় লেখকের পক্ষে নিজস্ব ভাষারীতি গঠনে ব্যর্থতা ডেকে আনে। আধুনিকতা ও অবিভাজ্য বাঙালি জাতিসত্তার দোহাইয়ের আড়ালে ভাষিক এই আধিপত্য জারি রাখা হয়। আধিপত্যের বিরুদ্ধ প্রতীকী সাহিত্যিক প্রচেষ্টাও আক্রমণের শিকার হয়। এমনতর প্রচেষ্টা উপহাস করা হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাৎপদ ও পাকিস্তানপন্থী বলে। ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ ও ‘প্রহরান্তরে পাশ ফেরা’ কাব্যগ্রন্থত্রয় প্রকাশকালে সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে আল মাহমুদের কোণঠাসা অবস্থান হিংস্র এই হেজিমনিক আধিপত্যের নির্দেশক।
ফলে, অনেক দিন ধরেই বাংলাদেশি পাঠকের মনে তৈরি হয়েছে মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন। একদিকে ছিল তার নিজস্ব জবান আর যাপিত জীবনের সাহিত্যিক প্রতিফলনের বাসনা, অন্যদিকে ছিল প্রতিফলনের চিত্র পরিহারের আপ্রাণ প্রচেষ্টা। পরিশীলিত হলেও পশ্চিম বাংলার সাহিত্যে ঘরের যাপিত জীবনের চিত্র দেখতে পায়নি বাংলাদেশের মানুষ। জ্ঞাতি ভাইয়ের কেচ্ছা পড়ে তার মনের ক্ষুধা তৃপ্ত হয়নি। অবচেতনে তার মন চেয়েছে নিজ ঘরের কাহিনি পড়তে। মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনজনিত এই দ্বন্দ্ব হুমায়ূনের সাহিত্যিক উত্থানে সহায়ক হয়েছে।
হুমায়ূনের লেখার পূর্ববঙ্গীয় কথ্যভাষা, কালাচারাল রেফারেন্স ও ইল্যুশনের প্রয়োগ বাঙালি মুসলমানের হীনম্মন্যতাজনিত দ্বিধা কাটাতে সহায়তা করেছে। নিজের আটপৌরে বাঙাল ভাষায়, মুসলমানি উপাদানে ভরপুর স্বতঃস্ফূর্ত এই লেখার বান এক লহমায় সংখ্যাগুরুর ব্রাত্য জীবনকাহিনিকে নন্দনতাত্ত্বিক বৈধতা দেয়। সৈয়দ শামসুল হক বা হাসান আজিজুল হকের আড়ষ্ট গদ্যভাষার বিপরীতে হুমায়ূনের স্বতঃস্ফূর্ত লেখ্যভাষা একদিকে পূর্ব বাংলার ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে পাছে কিছু বলে, ভীতি কাটাতেও সাহায্য করেছে তরুণ প্রজন্মকে। আজ আর তরুণ লেখককে ভাষার প্রশ্নে ভুগতে হচ্ছে না। তাকে ভাবতে হচ্ছে না মুসলমানি অনুষঙ্গ ও উপাদানের ব্যবহার তাকে ব্রাত্য করছে কি না।
অর্থাৎ হুমায়ূনের লেখার ভাষা ও কনটেন্ট বাংলাদেশের সাহিত্যজগতে সুপ্ত যে নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় দ্বন্দ্ব চলছিল, পরোক্ষভাবে অনেকাংশে তার সুরাহার পথ দেখিয়েছে। হুমায়ূনের সাফল্যের কারণ ওর ভাষা ও ভাবের মধ্যপন্থা, সমন্বয়বাদী ও নিম্নকণ্ঠ অবস্থান। পাঠককে ভাষাগত বড় মাপের ধাক্কা খেতে হয়নি বলে হুমায়ূনের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে শতগুণ। সোজা কথায়, হুমায়ূনের লেখার ভাষা পূর্ব বাংলার পাঠকের জন্য হয়েছে কাঙ্ক্ষিত এক উইন-উইন সিচুয়েশনের প্রতিফলন। প্রমিত কালচার বিসর্জন না দিয়েও পাঠককে নিজের ডমিনেটেড ও প্রান্তিক কালচার তুলে ধরার মনস্তাত্ত্বিক বৈধতা দিয়েছে কোনো ধরনের সাফাই গাওয়া ছাড়াই। সেই অর্থে, বাংলাদেশি পাঠকের জন্য হুমায়ূনের ভূমিকা অনেকটা মেডিসিন ম্যানের। জনগোষ্ঠীর মানসিক দ্বন্দ্বের ওঝা—হিলার। হুমায়ূন ফেনোমেননের এটি এক বড় অবচেতন কারণ।
চার.
ফ্যান্টাসি বা (আদর্শবাদী) ইচ্ছাপূরণের গল্প হুমায়ূনের লেখাগুলো। সমস্যায় আকীর্ণ আর ব্যর্থতায় মোড়া জিন্দেগি সাধারণ বাংলাদেশির জীবন। সামাজিক, আর্থিক আর রাজনৈতিক অস্থিরতা এ দেশে নিত্যসঙ্গী। অগভীর ও হঠকারী বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবণতা সমস্যাকে করেছে জটিল থেকে আরও জটিলতর। লোকজ সৃষ্টিশীল ঐতিহ্যে এ দেশ গরীয়ান হলেও বৈশ্বিক মানদণ্ডে এ দেশের মধ্যবিত্তের সৃষ্টিশীলতার মান অসম্ভব নিচু। সাহিত্যে তাই বাংলাদেশি মধ্যবিত্ত খোঁজে যাপিত যন্ত্রণার সাময়িক পরিত্রাণ। সাহিত্যের কাছে পাঠকের আকাঙ্ক্ষা জীবনের রুক্ষতা আর যন্ত্রণা থেকে সাময়িক নিবৃত্তি বা এসকেপ রুট—জীবনের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন নয়। বাংলাদেশের পাঠক সাহিত্যে সেটাই পেতে চায়, তার বাস্তব জীবনে যে চিত্র অনুপস্থিত। সৃষ্টিশীল সাহিত্যে পাঠক খোঁজে সুকোমল সৌন্দর্যে ভরপুর, সদাচারী, মায়াবী মনের হৃদয়বান মিস্টিক মানুষ। বাংলাদেশি পাঠক চায় যাপিত জীবনের ক্ষতে কাল্পনিক প্রলেপ। বাংলাদেশি পাঠকের তাই বড় পছন্দ ফ্যান্টাসি–প্রবণ সাহিত্য। হুমায়ূনের সাহিত্য সে চাহিদা পূরণ করেছে। হুমায়ূনের অসম্ভব জনপ্রিয়তার এটি অন্যতম কারণ।
হুমায়ূনসৃষ্ট চরিত্রগুলো, ঔপন্যাসিক ই এম ফর্স্টার যাকে বলেছেন, ফ্ল্যাট ক্যারেক্টার। অর্থাৎ অপূর্ণ চরিত্র। চরিত্রগুলো ইউনিডাইমেনশনাল—জীবনের ব্যঞ্জনা, কূটাভাস, ক্রূরতা, শাঠ্য বা দার্শনিক গভীরতার ছাপ নেই এতে। সমকালীন সামাজিক ঘাত–প্রতিঘাত থেকে বিযুক্ত চরিত্রগুলো ভীষণভাবে আদর্শায়িত। ফ্যান্টাসিপ্রবণ বাঙালি মন যেমন আদর্শ বাবা, আদর্শ ভাই বা আদর্শ প্রতিবেশী খোঁজে—হুমায়ূনের সৃষ্ট চরিত্রগুলো হুবহু সেই অবাস্তব আদর্শ মানুষের মূর্তি। চিনির মতো মিষ্টি এরা, টক-ঝাল-তেতো স্বাদের অস্তিত্ব নেই চরিত্রগুলোর গঠনে। এমনকি, অশুভও নয় কেউ এরা! চরিত্রের অশুভগুলোও এক্সটার্নাল। চরিত্রগুলো যেন নিজেই বহিঃস্থ অশুভ শক্তির ভিকটিম। কাহিনির বিস্তারে অশুভত্বকে ছাপিয়ে ওঠে এদের মানবিক আবেদন। অবধারিতভাবে পাঠক হয়ে ওঠে এদের অনুরক্ত।
গল্প বলার আটপৌরে ঢঙের কারণে তাঁর লেখায় কথক ঠাকুরের মিষ্টত্ব প্রকট। এই মিষ্টত্ব আবিষ্ট করে পাঠককে। সদর্থক বৈশিষ্ট্যের ওপর একপক্ষীয় আলোকপাত, নেতির প্রতি তীব্র অনীহা—সর্বোপরি, বঙ্গদেশি পাঠকের পক্ষে স্বস্তিদানকারী ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য হুমায়ূনের লেখাকে দিয়েছে সামাজিক গ্রাহ্যতা। হুমায়ূনের লেখা পড়ে ছেলেপুলে নষ্ট হবে না—অব্যক্ত এই স্বস্তিবোধ এত গভীর যে খোদ ছেলেপুলের কাছ থেকে ধার করেই মা-বাবারা পড়েন তাঁর বই। হুমায়ূনের লেখা সে অর্থে মাল্টি-প্রজন্মকে সার্ভ করে। তাঁর লেখার সর্বজনীনতার এটি একটি উৎস।
‘কোথাও কেউ নেই’–এর বাকের ভাই সে কারণে আসলে মাস্তান নয়, খুনি তো নয়ই, আদ্যোপান্ত ভালো মানুষ। ঘটনার ঘনঘটায় অশুভত্বে আটকে যাওয়া বাকের ভাই আদতে এক দেবদূত। শত অত্যাচার করেও ‘অয়োময়’–এর জমিদার মির্জা অত্যাচারী জমিদার নন—সন্তান বুভুক্ষু হৃদয়বান, কিন্তু ভালোবাসা প্রদর্শনে অক্ষম প্রতাপশালী নৃপতি। ‘একা একা’–এর বাড়িওয়ালা দুই যুবক বাড়িভাড়া শোধে অক্ষম উচ্ছেদ হওয়া ভাড়াটের তরুণী কন্যাকে দেখে রোমান্স মিশ্রিত আবেগে—যে আবেগ পাঠক ভীষণভাবে যাঞ্ছা করে, কৈশোর উত্তীর্ণ সদ্য তরুণীকে আশ্রয়ের ছাদ দেওয়ার লক্ষ্যে। সোজা কথায়, ব্যর্থ জীবনের কম্পেনসেশন হিসেবে পাঠক যা চায়, অবিশ্রান্ত ধারায় হুমায়ূন সেটাই সাপ্লাই দিয়েছেন।
পাঠককের বিশ্বাস আমূল নাড়া দেওয়া, পাঠকের প্রেজুডিস আর প্রিডিস্পোজিশন ভাঙচুর করে দেওয়া লেখাগুলো মহৎ ও চিরায়ত সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। মৌল এই লক্ষণ হুমায়ূন তাঁর লেখায় আনেননি। মানিক বা তারাশঙ্করের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মতো (কুবের, অপলা, ভিখু অথবা নিমাই, কৃষ্ণেন্দু) হুমায়ূনসৃষ্ট চরিত্র পাঠকমনে চিরস্থায়ী দাগ কাটে না। পাঠান্তেই পাঠক সহজে ভুলে যায় হুমায়ূনের চরিত্রগুলো। হুমায়ূনের লেখাগুলো অনেকটা সাময়িক সুগার রাশ সরবরাহ করেই ক্ষান্ত। এই তাৎক্ষণিকতাই হুমায়ূন সাফল্যের সূত্র।
পাঁচ.
হিউমার ও মিষ্টি ভাষা হুমায়ূন লেখার আরেক গুণলক্ষণ। গোমড়া মুখের এ দেশে হুমায়ূনের সাফল্যের অন্যতম কারণ তাঁর লেখায় হিউমারের প্রয়োগ। শিরার রসে ডোবানো জিলাপির মতো হিউমারে জারিত হুমায়ূনের লেখার কোনো পূর্বসূরি নেই। উইট ও হিউমার সন্দেহের চোখে দেখা এ দেশের সুমহান ঐতিহ্য। হিউমারের মর্যাদা প্রতীচ্য সমাজে অতি উচ্চ হলেও বঙ্গদেশে হিউমার মানেই স্থূল ভাঁড়ামি। এ দেশের বিচারে লেখা পড়ে পাঠক হেসেছে মানে উচ্ছন্নে গেছেন লেখক। রম্য লেখকের তকমা জোটে কপালে। রম্য স্বাদ ও ভাষার প্রাঞ্জল্য যে উচ্চাঙ্গ সাহিত্যের গুণ, রামগুড়ের ছানাকে বোঝানো দুষ্কর। যদি হাসি পায়, এই ভয়ে সদা ত্রাসিত বঙ্গসন্তান গোমড়াবৃত্তির সাধনা করেছে আজীবন। আবার, প্রাঞ্জলতাকে দূরে ঠেলে রবি ঠাকুরের ভাষায় করেছে হিং টিং ছটের অর্থহীন দুর্বোধ্যতার চর্চা। আধুনিকতা কিংবা শ্রেণিসংগ্রামের দোহাইয়ে আশকারা পেয়েছে গুমোট বাংলা লেখার ঢং। হুমায়ূনের আবির্ভাব খুলে দিল সেই বদ্ধ অর্গল, বদ্ধ ঘরে এনে দিল দমকা বাতাস। সংকুচিত না হয়ে, কাঁচুমাচু না করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন হুমায়ূন। সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ততায় লেখায় এনেছেন হিউমার। পাঠকের সংকোচ তাতে ঘুচে যায় লহমায়। পাঠক যে আজ লেখা পড়ে আনন্দিত হয়ে চায়—এই চাওয়া সৃষ্টি করা লেখক হুমায়ূনের অবদান। পাঠককে সাহিত্যের ভোক্তা বা কনজ্যুমার বানানো ওর সাফল্যের অন্যতম কারণ।
হিউমারের সঙ্গে তাঁর লেখায় অতিরিক্ত আছে গল্প বলার মিষ্টি এক হুমায়ূনি ভাষাশৈলী। হুমায়ূনের গদ্য আটপৌরে ও স্বতঃস্ফূর্ত। আর দারুণ মিষ্টি। ওর ভাষা কথ্যভাষার অনুবর্তী। কথ্যভাষার সঙ্গে সাযুজ্যের কারণে তাঁর বাক্য হ্রস্ব ও সরল। তাঁর শব্দসম্ভার বা ভোকাবুলারি সীমিত। কথ্যভাষার বাইরে ব্যবহৃত শব্দসম্ভার নেই তাঁর লেখায়। হুমায়ূনের লেখা পড়ে অভিধান ঘেঁটে শব্দের অর্থ বের করতে হয়েছে অমন ঘটনা ঘটেনি। সীমিত ভাষাজ্ঞান নিয়েও পাঠক তাঁর লেখা পড়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মনে স্বস্তির আনন্দ পায়। শব্দসম্ভারের কৃচ্ছ্রতা লেখক হুমায়ূনের দুর্বলতার নির্দেশক বটে, কিন্তু লেখার এই অ্যাকসেসিবিলিটি তাঁর জনপ্রিয়তার কারণ। তেমনি আছে তাঁর বয়ানের মুনশিয়ানা। লেখার টেকনিক্যাল ফর্ম আর প্রেজেন্টেশনে বিশ্বাসী নন হুমায়ূন। গল্প বলার আটপৌরে ঢঙের কারণে তাঁর লেখায় কথক ঠাকুরের মিষ্টত্ব প্রকট। এই মিষ্টত্ব আবিষ্ট করে পাঠককে। সদর্থক বৈশিষ্ট্যের ওপর একপক্ষীয় আলোকপাত, নেতির প্রতি তীব্র অনীহা—সর্বোপরি, বঙ্গদেশি পাঠকের পক্ষে স্বস্তিদানকারী ভিক্টোরীয় মূল্যবোধের প্রতি আনুগত্য হুমায়ূনের লেখাকে দিয়েছে সামাজিক গ্রাহ্যতা। হুমায়ূনের লেখা পড়ে ছেলেপুলে নষ্ট হবে না—অব্যক্ত এই স্বস্তিবোধ এত গভীর যে খোদ ছেলেপুলের কাছ থেকে ধার করেই মা-বাবারা পড়েন তাঁর বই। হুমায়ূনের লেখা সে অর্থে মাল্টি-প্রজন্মকে সার্ভ করে। তাঁর লেখার সর্বজনীনতার এটি একটি উৎস।
শত ঝড়ঝঞ্ঝার মাঝেও জীবনের তিক্ততা উঠে আসেনি হুমায়ূনের লেখায়। আশির দশকের সেই জুভেনাইল স্পিরিটে আটকে রইলেন হুমায়ূন। আর আটকে রাখলেন তাঁর লক্ষ-কোটি পাঠক সম্প্রদায়কে। শত যন্ত্রণা, বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার বয়ানের পরেও হুমায়ূনের লেখায় ছাপিয়ে ওঠে আশাবাদের কথা—অল দ্যাট ইজ গিভেন টু লাইফ ইজ নট লস্ট। এই আশাবাদ অজান্তে ছুঁয়ে যায় পাঠকের মন। আর্দ্র করে পাঠকের হৃদয়। এটি হুমায়ূনের অতলস্পর্শী জনপ্রিয়তার অন্যতম গূঢ় উৎস।
ছয়.
নাগরিক ও মফস্সলের ফারাক বিমোচন এবং শ্রেণি ও বয়সভেদে যোগসূত্র স্থাপন হুমায়ূনের লেখার বৈশিষ্ট্য। লেখায় হুমায়ূন দেশ-কাল ও শ্রেণিভেদ অতিক্রমণ করেছেন। হুমায়ূনের পূর্বসূরি বা সমসাময়িক কোনো লেখক নিজস্ব পাঠকের বলয় অতিক্রম করতে পারেননি। বিশিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট ধাঁচের গদ্যকার হয়েই তাঁরা খুশি থেকেছেন; সর্বজনীন লেখক হতে পারেননি, হয়তো চানওনি। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আনুগত্য, ফর্ম ও গদ্যের দুর্বোধ্যতা, থিম ও কনটেন্টের একপাক্ষিকতার পাশাপাশি মতাদর্শিক রাজনীতির প্রতি আনুগত্যের প্রবণতা তাঁদের পাঠক বলয়কে করেছে সীমিত।
পক্ষান্তরে, রাজনীতি ও সামাজিক ডিসকোর্সের সচেতন পরিহার হুমায়ূনকে দিয়েছে সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। ঘরের কথা অকপটে বলার ক্ষমতা হুমায়ূনকে দিয়েছে নিরপেক্ষতা ও অথেনটিসিটির ভিত্তি। গ্রাহ্য হয়েছেন হুমায়ূন সবার কাছে। আঁতেল লেখকের মতো তাঁর লেখা কষ্টকল্পিত নাগরিক মহলে আবদ্ধ থাকেনি। প্রত্যন্ত গ্রামের পাঠকও আপ্লুত হয়েছে তাঁর লেখায়। সর্বজনীন আবেদনের কারণে আর্থসামাজিক শ্রেণির বেষ্টনী ভাঙতে সক্ষম হয়েছেন হুমায়ূন। কি ধনাঢ্য, কি মধ্যবিত্ত, কি নিম্নবিত্ত—সব পাঠকের কাছে আবেদন তৈরি করেছে হুমায়ূনের লেখা। আবেদনের বড় আরেক কারণ ব্যক্তি হিসেবে মিডিয়ায় হুমায়ূনের অকপট আচরণ। বিশিষ্ট রূপে উপস্থাপনা না করে ঘরোয়া ও আটপৌরে হিসেবে নিজের উপস্থাপনা হুমায়ূনের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠায়। পাঠক ও লেখকের ব্যক্তিগত অস্মিতার কনফ্লেশন ঘটে। লেখক ও ব্যক্তিসত্তার অবিভাজ্যতার নিরিখে শরৎচন্দ্রের পর প্রথম জাতীয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ।
সাত.
জুভেনাইল সাহিত্য সৃষ্টি হুমায়ূনের বড় আরেক অবদান। তাঁর বিপুল পাঠকশ্রেণির সিংহভাগ বয়সে জুভেনাইল। প্রাক্-কৈশোর থেকে তারুণ্য–উত্তর যে বিপুল জনগোষ্ঠী, তেরো থেকে তেইশ যাদের বয়স, তাদের চাহিদা মেটানোর সাহিত্য পূর্ববঙ্গে ছিল অনুপস্থিত। হুমায়ূন একাই পূরণ করেছেন সে চাহিদা। সায়েন্স ফিকশন, ডিটেকটিভ, মিস্ট্রি ও ক্যারেক্টারাইজেশনের মাধ্যমে এই বয়সীর ফ্যান্টাসি আর কল্পনা উসকে দিয়েছেন হুমায়ূন। মাস্টারমশায়ের উপদেশ নয়—তারুণ্যের সারল্য, উচ্ছ্বাস আর আবেগের উদ্বোধন তাঁর গভীর আবেদনের কারণ। হুমায়ূন পড়েই এই যুবা গ্রুপ প্রথম জেনেছে পাগলামিও গ্রহণযোগ্য। প্রতিটি তরুণ অনুভব করেছে তার মধ্যেও বাস করে একজন হিমু। হিমু হতে চাওয়াটা দোষনীয় নয়।
সে অনুভব করে শারীরিক সীমাবদ্ধতা কল্পনার দারুচিনি দ্বীপে যাওয়ার প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। হুমায়ূনের লেখা যেন পূর্ববঙ্গে তারুণ্যের অর্গল খুলে দেয়। নিম্নবিত্ত হিমু আর উচ্চমধ্যবিত্ত শুভ্রের মাধ্যমে এই তারুণ্য প্রথম অনুভব করে শ্রেণিভিত্তি ফ্যাক্টর নয়। ফ্যাক্টর হচ্ছে আকাঙ্ক্ষার লালন—জীবনে কিছু হতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। জীবনের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জিজীবিষা। অর্গল খুলে পৃথিবীর পথে পা ফেলার উদ্যোগ। হতে চাইলেই হিমু হওয়া যায়, হতে চাইলেই শুভ্র হতে পারা যায়। লক্ষ–কোটি মূক এই জনগোষ্ঠী হুমায়ূন পড়েই প্রথম পরিচিত হয় সাহিত্যের লাইটার জঁর সঙ্গে। কথাটি যেমন ওর সায়েন্স ফিকশনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য ওর ডিটেকটিভ ও মিস্ট্রি লেখার সঙ্গেও। মিসির আলী চরিত্র এই তারুণ্যের কল্পনা, গোয়েন্দাপ্রবণ মন উসকে দেয়। কুটু মিয়ার চরিত্র আগ্রহ জাগায় ব্যাখ্যাতীত ঐন্দ্রজালিক জগৎ সম্পর্কে। গা–ছমছমে সাহিত্য পূর্ববঙ্গে আগে ছিল না। হুমায়ূন একাকী জন্ম দিলেন বহু ধারার এ সাহিত্য-লহরি। জন্ম দিয়েই ক্ষান্ত হননি, প্রশস্ত করলেন অন্যের পথচলা।
আট.
সত্তরে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও হুমায়ূন মূলত আশি দশকের লেখক। আশির দশকের ঢাকার বৈশিষ্ট্য তাঁর সীমাহীন আশাবাদ। বিদ্যুৎ-পানি-যানজটহীন সে ঢাকা শহর ঘুমের শেষে সবে আড়মোড়া ভাঙছে। ঘরের ছেলেপুলে টুকাটাক বিদেশ যাচ্ছে, ফ্লাইং ব্যবসা ধরেছে অনেকে। বিদেশ ঘুরে এসে পাড়ার বড় ভাইয়েরা সিঙ্গাপুর, লন্ডন আর জার্মানির গল্প করছে। ছোটারা মুখ হাঁ করে শুনেছে চাকচিক্যের সেসব রূপকথা। সবার মনে কী আশা! বড় হয়ে আমরাও সিঙ্গাপুর যাব, আমেরিকা যাব। ঢাকাও নাকি একদিন সিঙ্গাপুর হবে—হবে না কেন? সেদিন না ফার্মগেটে ওভারব্রিজ হলো? মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সোডিয়াম বাতি লাগাল? সবার বিশ্বাস আমরাও একদিন কোরিয়া হব। অনেক উন্নত হব আমরা।
কি সাহিত্য, কি সমাজ, আশাবাদ তখন সর্বত্র। তীব্র আর তীক্ষ্ণ উদীয়মান উদগ্র ইচ্ছা। জীবনকে ছুঁয়ে দেখা, স্পর্শ করার আশার যে মুহূর্ত, ঠিক সে ব্রহ্মমুহূর্তে হাজির হলেন ব্যক্তি হুমায়ূন আর হুমায়ূনের লেখা। আশির দশকের আমাদের বয়স বেড়েছে, কিন্তু লেখক হুমায়ূনের বয়স বাড়েনি। শত ঝড়ঝঞ্ঝার মাঝেও জীবনের তিক্ততা উঠে আসেনি হুমায়ূনের লেখায়। আশির দশকের সেই জুভেনাইল স্পিরিটে আটকে রইলেন হুমায়ূন। আর আটকে রাখলেন তাঁর লক্ষ-কোটি পাঠক সম্প্রদায়কে। শত যন্ত্রণা, বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার বয়ানের পরেও হুমায়ূনের লেখায় ছাপিয়ে ওঠে আশাবাদের কথা—অল দ্যাট ইজ গিভেন টু লাইফ ইজ নট লস্ট। এই আশাবাদ অজান্তে ছুঁয়ে যায় পাঠকের মন। আর্দ্র করে পাঠকের হৃদয়। এটি হুমায়ূনের অতলস্পর্শী জনপ্রিয়তার অন্যতম গূঢ় উৎস।