হামে মৃত্যু কি কেইনসের টিকাবিরোধী চিন্তার সিলসিলা
সম্প্রতি মিশেল মারফি নামে এক লেখকের ‘দ্য ইকোনমাইজেশন অব লাইফ’ নামে একটা বই দেখছিলাম। বইটার ২১ পৃষ্ঠায় বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেনার্ড কেইনস নিয়ে আলাপ দেখে একটু মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করলাম। লেখক, অর্থাৎ মিশেল মারফি সাহেব বলছেন, কেইনস প্রো-নাটালিস্ট পলিসির বিরুদ্ধে ছিলেন এবং তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে ছিলেন।
ভাবলাম, এইটা তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তত দিনে ম্যালথাসের জনসংখ্যাতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। কেইনস যেহেতু ম্যালথাসের একজন অনুরাগী ছিলেন, ফলে তাঁর তো এই তত্ত্ব আমল করা খুবই যৌক্তিক। শুধু তাঁর কাছে নয়, ম্যালথাসের যুক্তি সেকালে ও একালে সব দেশে না হলেও অন্তত আমাদের মতো গরিব দেশে খুবই জনপ্রিয় ধারণা। ম্যালথাসের মূল বক্তব্য হলো: জনসংখ্যা কমাও, গরিবি হটাও। কেইনসও যে এই লাইনেই হাঁটবেন তা আশ্চর্যের কী।
কিন্তু আরেকটু এগোনোর পর মনে হলো একটু শকগ্রস্ত (শোকগ্রস্ত নয়) হলাম। যখন দেখলাম তিনি লিখেছেন, কেইনস মনে করতেন, কলোনিয়াল ভারতে টিকাদানের যে কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে তা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। ইট ওয়াজ মিসগাইডেড। এ ছাড়া কেইনস দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, পাঞ্জাবে প্লেগ মহামারিতে জনসংখ্যা হ্রাস ও সেখানকার পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের উন্নতির মধ্যে একটা ইতিবাচক আন্তসম্পর্ক রয়েছে। কথাটা হয়তো সত্যই। কিন্তু তারপরও কয়েক দিন ধরে এই শক যেন কাটছেই না।
শকের কারণ দুটি। এক, কেইনসের মতো একজন অর্থনীতিবিদ কী করে এমন খতরনাক চিন্তা করতে পারলেন! উন্নতি তাঁর কাছে মানুষের জীবনের চেয়েও মূল্যবান হয়ে গেল? বিপুল মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে উন্নতি এল তাকেও তিনি উন্নতিই বললেন? বিকল্প কোনো শব্দের দিশা তিনি দিতে পারলেন না? উন্নতি কিংবা উন্নয়ন কি আমাদের জন্য এতটাই অপরিহার্য? সব মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে হলেও আমাদের উন্নতি লাগবে? এতই দরকারি এই উন্নয়ন?
শকের কারণ দুটি। এক, কেইনসের মতো একজন অর্থনীতিবিদ কী করে এমন খতরনাক চিন্তা করতে পারলেন! উন্নতি তাঁর কাছে মানুষের জীবনের চেয়েও মূল্যবান হয়ে গেল? বিপুল মানুষের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে যে উন্নতি এল তাকেও তিনি উন্নতিই বললেন? বিকল্প কোনো শব্দের দিশা তিনি দিতে পারলেন না? উন্নতি কিংবা উন্নয়ন কি আমাদের জন্য এতটাই অপরিহার্য? সব মানবিকতা বিসর্জন দিয়ে হলেও আমাদের উন্নতি লাগবে? এতই দরকারি এই উন্নয়ন?
এই গেল শকের একটা কারণ। এবার দ্বিতীয় কারণটা বলি। কেইনসের এই অবস্থান দেখে মাথায় একটা প্রশ্ন উঁকি মারল: আমাদের দেশে হামে যে গত এক বছরে হাজারের ওপর শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মারা গেল, তা কি কেইনসের এই চিন্তারই ধারাবাহিকতা?
জগতে যেসব খুনে পলিসি বাস্তবায়িত হয়, সেগুলোর উদ্গাতা কারা? সেখানেও তো কেইনসের মতো অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা থাকে নাকি? অন্য খাতের বিশেষজ্ঞরাও নিশ্চয়ই থাকেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদেরও সেখানে একটা মুখ্য ভূমিকা থাকার কথা। অথচ তাঁদের সেসব খুনে পলিসি বা পরামর্শের কারণে দুনিয়ার কোথাও মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটলেও ঘুণাক্ষরেও তাঁদের নাম কারও মাথায় আসবে না। আমরা দেখতে পাব প্রয়োগকারী সংস্থাকে, খুনি রাজনীতিবিদ কিংবা পুলিশ–প্রশাসনকে।
ইন্টেরিমের কর্তাব্যক্তিরা নানা সময়ে যেসব যুক্তি দিয়েছিলেন সেগুলো তো দেখেছি। সেগুলোর সত্যতা-অসত্যতা নিরূপণ করা আমাদের মতো আমের পক্ষে দুরূহ। কিন্তু আড়ালে কেইনসের মতো কোনো নির্বিকার (নাকি বিকারগ্রস্ত?) অর্থনীতিবিদ পরামর্শকের ভূমিকায় ছিলেন কি না, তা তো আর আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র চলে গোপনীয়তার নীতি মেনে। ফলে গোপনে সেখানে কত কিছু ঘটে যায়। সেসব আর সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা কখনো সম্ভব হয় না।
ভালোমতো খেয়াল করলে দেখবেন, অর্থনীতিবিদেরা সবচেয়ে নিরীহ ও নিষ্পাপ একটা চেহারা নিয়ে সমাজ বা পৃথিবীতে বিরাজ করেন। যেন তাঁরাই আমাদের রক্ষাকর্তা। মানুষকে উদ্ধারের নব নব পরামর্শ নিয়ে হাজির হওয়া তাঁদের এক প্রধান কর্ম। এইটা তো ভালোই। কিন্তু তাঁদের ভালো ভালো পরামর্শগুলো আদতেই কখনো বাস্তবায়িত হয়? নাকি সেগুলো তাঁদের ইউটোপিয়া আকারেই অমর হয়ে থাকে?
এ তো গেল একটা প্রশ্ন। আরেকটা প্রশ্ন হলো, জগতে যেসব খুনে পলিসি বাস্তবায়িত হয় সেগুলার উদ্গাতা কারা? সেখানেও তো কেইনসের মতো অর্থনীতিবিদদের ভূমিকা থাকে, নাকি? অন্য খাতের বিশেষজ্ঞরাও নিশ্চয়ই থাকেন। কিন্তু অর্থনীতিবিদদেরও সেখানে একটা মুখ্য ভূমিকা থাকার কথা। অথচ তাঁদের সেসব খুনে পলিসি বা পরামর্শের কারণে দুনিয়ার কোথাও মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটলেও ঘুণাক্ষরেও তাঁদের নাম কারও মাথায় আসবে না। আমরা দেখতে পাব প্রয়োগকারী সংস্থাকে, খুনি রাজনীতিবিদ কিংবা পুলিশ-প্রশাসনকে। এমনকি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ মাঠে থাকা অন্য পেশাদারদেরও আমরা দায় দেওয়ার জন্য খুঁজে পাব। কিন্তু খুঁজে পাব না সেসব আড়ালের পরামর্শকদের। এই অদৃশ্য বুদ্ধিদাতারা থেকে যাবেন অধরা। থেকে যাবেন নিষ্পাপ।
জার্মান রাজনীতি তাত্ত্বিক হান্না আরেন্ট ‘ব্যানালিটি অব ইভিল’ নামে যে ধারণা চালু করেছিলেন, তা তাঁদের ক্ষেত্রেও সম্ভবত আমরা প্রয়োগ করতে পারি। এই ধারণায়, আরেন্ট এমন এক শয়তানের কথা বলেছেন যে কখনো তার শয়তানির দায় অনুভব করে না। সে মনে করে সে একটা সিস্টেমের পার্ট, এখানে তার কোনো দায় নেই।
আমার এই লেখার মানে এই নয় যে পৃথিবীতে ভালো অর্থনীতিবিদ নাই। অবশ্যই আছে। অসংখ্য ভালো অর্থনীতিবিদ আছেন। এই ভালো অর্থনীতিবিদদের একটা বড় অংশই ছিলেন দার্শনিক। তাঁদের ভূমিকাকে সংকুচিত করে আমরা নাম দিয়েছি অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতির জনক যে অ্যাডাম স্মিথকে বলা হয়, তিনিও ছিলেন একজন দার্শনিক।
আধুনিক কালে ‘অর্থনীতিবিদ’ নামে যে ক্যাটাগরির আবির্ভাব ঘটেছে তাকে খানিক সন্দেহের চোখে দেখতে পারাটা মনে হয় ভালো।