আমাদের বিস্মৃত বিচারক, জাপানের চিরস্মরণীয় বীর

রাধা বিনোদ পালের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘বিচার যদি হয়, তবে সেই বিচার যেন বিজয়ীর প্রতিহিংসা না হয়। যেখানে আইন নেই, সেখানে অপরাধও নেই।’—বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল, টোকিও ট্রায়াল ভিন্নমত রায়, ১৯৪৮

জাপানের টোকিও শহরে একটি সুপ্রশস্ত রাজপথের নাম আছে একজন বাঙালির নামে। কিয়োটো শহরে দাঁড়িয়ে আছে তাঁর ভাস্কর্য। ইয়াসুকুনি শ্রাইনে—যেখানে কেবল জাপানি বীরদের স্মরণ করা হয়—সেখানে একমাত্র বিদেশি ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়েছে তাঁর স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিবছর হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবসে লাখ লাখ জাপানি তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। জাপানের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর জীবনী পড়ানো হয়। সম্রাট হিরোহিতো স্বয়ং তাঁকে দেশটির সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ফার্স্ট অর্ডার অব দ্য সেক্রেড ট্রেজার’ দিয়োছিলেন।

এই মানুষটি কোনো সেনাপতি ছিলেন না, কোনো রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন বিচারক—কিন্তু এমন একজন বিচারক, যাঁর একটিমাত্র রায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বের ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। তিনি ড. রাধা বিনোদ পাল—বাংলাদেশের কুষ্টিয়ার সন্তান, যাঁকে জাপান চেনে, শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে; কিন্তু যাঁর নিজের মাতৃভূমি বাংলাদেশ তাঁকে প্রায় ভুলে গেছে।

১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি, তৎকালীন নদীয়া জেলার কুষ্টিয়া মহকুমার দৌলতপুর উপজেলার তারাগুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাধা বিনোদ পাল। পরিবার ছিল দরিদ্র—এতটাই দরিদ্র যে পড়াশোনা করাটাই ছিল একটা সংগ্রাম। শৈশবেই বাবাকে হারান। মামার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করতে হয়েছে, মামার দোকানে কাজ করতে হয়েছে, কখনো পালকির পেছনে পায়ে হেঁটে সাত মাইল দূরের স্কুলে যেতে হয়েছে। একসময় পরিবার বলে বসেছিল—আর পড়াশোনার দরকার নেই।

কিন্তু মেধা ও অদম্য মনোবল তাঁকে থামাতে পারেনি। রাজশাহী কলেজ থেকে এফএ, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিতে বিএ ও এমএ, ১৯২০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে এলএলএম প্রথম শ্রেণিতে প্রথম এবং ১৯২৪-২৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে ডক্টরেট। তিনি তিনবার মর্যাদাপূর্ণ ‘ট্যাগোর ল প্রফেসর’ পদে নির্বাচিত হন, যা এর আগে কেউ তিনবার পাননি। কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এবং ১৯৪৪-৪৬ মেয়াদে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেন।

একজন উপনিবেশিত দেশের সন্তান হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের বৈষম্য তিনি নিজে দেখেছিলেন। রুশ-জাপান যুদ্ধে (১৯০৪-০৫) এশিয়ার একটি দেশ ইউরোপীয় শক্তিকে পরাজিত করতে পারে—এই সংবাদ তরুণ রাধা বিনোদের মনকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। সেই উপনিবেশবাদবিরোধী চেতনাই পরবর্তীকালে তাঁর আইনি দর্শনকে গড়ে তুলেছিল।

রাধা বিনোদ পাল
রায় লেখার জন্য বিচারপতি পাল টোকিওর হোটেলে প্রায় স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে থাকলেন। জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার বই পড়লেন। তারপর লিখলেন ১ হাজার ২৩৫ পৃষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ভিন্নমত রায়। একমাত্র বিচারক হিসেবে তিনি সব অভিযুক্তের খালাসের পক্ষে মত দিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মিত্রশক্তি জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের বিচার করার সিদ্ধান্ত নেয়। ২৭ এপ্রিল ১৯৪৬ সালে গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’—ইতিহাসে যা ‘টোকিও ট্রায়াল’ নামে পরিচিত। জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত এই বিচারে ১১টি দেশের ১১ জন বিচারক নিযুক্ত হন। ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হন ড. রাধা বিনোদ পাল—পুরো বিচারক প্যানেলের মধ্যে একমাত্র আইনশাস্ত্রের পেশাদার বিশেষজ্ঞ।

অভিযুক্ত করা হয়েছিল ২৮ জন জাপানি শীর্ষ নেতাকে। অভিযোগ তিন শ্রেণিতে—‘এ’ (শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ), ‘বি’ (প্রচলিত যুদ্ধাপরাধ) এবং ‘সি’ (মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ)। উল্লেখযোগ্যভাবে, সম্রাট হিরোহিতো—যিনি সমগ্র যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে ছিলেন, তাঁকে বিচারের আওতার বাইরে রাখা হয়। বিচারক পালকে সাধারণ হোটেলে রাখা হয়েছিল, আর অন্য বিচারকদের জন্য ছিল আলিশান ব্যবস্থা।এটি সুস্পষ্ট, এশিয়ার প্রতিনিধিত্ব ছিল নিছক লোকদেখানোর জন্য।

রায় লেখার জন্য বিচারপতি পাল টোকিওর হোটেলে প্রায় স্বেচ্ছাবন্দী হয়ে থাকলেন। জাপানের ইতিহাস, সংস্কৃতি, দর্শন, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক আইনসংক্রান্ত প্রায় তিন হাজার বই পড়লেন। তারপর লিখলেন ১ হাজার ২৩৫ পৃষ্ঠার এক ঐতিহাসিক ভিন্নমত রায়। একমাত্র বিচারক হিসেবে তিনি সব অভিযুক্তের খালাসের পক্ষে মত দিলেন।

তাঁর প্রথম যুক্তি ছিল আইনের বৈধতা নিয়ে। জাপান যখন যুদ্ধে গিয়েছিল, তখন ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলে কোনো আন্তর্জাতিক আইন ছিল না। যুদ্ধের পরে আইন তৈরি করে পূর্ববর্তী ঘটনার বিচার করা আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতি ‘নুল্লুম ক্রিমেন সিনে লেগে’র (আইন ছাড়া অপরাধ নেই) সরাসরি লঙ্ঘন। তাঁর ভাষায়, এই ট্রায়াল ছিল ‘প্রতিহিংসার তৃষ্ণা নিবারণের জন্য আইনি প্রক্রিয়ার একটি জঘন্য অপব্যবহার।’

দ্বিতীয় যুক্তি ছিল উপনিবেশবাদের দ্বিচারিতা। দুই শতাব্দী ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষকে শোষণ করা ব্রিটেন, ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডস কোন নৈতিক অধিকারে জাপানের বিচার করে? পূর্ব এশিয়ায় নিজের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জাপান আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দেখানো পথেই হেঁটেছিল।

তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে সাহসী অবস্থান—তিনি হিরোশিমা ও নাগাসাকির প্রসঙ্গ তুললেন। ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট এই দুটি শহরে মার্কিন হামলায় হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪ হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হন। বিচারপতি পাল বললেন, জাপানকে যদি যুদ্ধাপরাধের জন্য বিচার করা হয়, তবে এই গণহত্যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রেরও বিচার হওয়া উচিত। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম এশিয়ান, যিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বোমা হামলার বিরুদ্ধে সাহসী প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

রাধা বিনোদ পালের সম্মানে জাপানের টোকিওর ইয়াসুকুনি মঠে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ
১৯৬৬ সালে সম্রাট হিরোহিতো তাঁকে জাপানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ফার্স্ট অর্ডার অব দ্য সেক্রেড ট্রেজার’ প্রদান করেন, যে সম্মান অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান এবং সনির প্রতিষ্ঠাতা আকিও মরিতার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালে টোকিওর ইয়াসুকুনি শ্রাইনে এবং কিয়োটোর রিয়োজেন গোকোকু জিনজা মন্দিরে তাঁর পাথরের স্মৃতিফলক স্থাপিত হয়। ১৯৭৪ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের হাকোনে পাহাড়ে স্থাপিত হয়েছে ‘পাল-শিমোনাকা স্মৃতি জাদুঘর’।

তবে তিনি জাপানের সব কর্মকাণ্ড সমর্থন করেননি। নানকিং গণহত্যাসহ (১৯৩৭) জাপানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতা তিনি স্বীকার করেছেন এবং ‘বি’ ও ‘সি’ শ্রেণির অভিযোগের বৈধতা মেনেছেন। তাঁর আপত্তি ছিল নির্দিষ্টভাবে সেই অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে, যেগুলো যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক আইনে বিদ্যমান ছিল না।

বিচারপতি পালের রায়ের তাৎক্ষণিক প্রভাব আদালতে সীমিত হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রতিক্রিয়া ছিল সুদূরপ্রসারী। ১৯৫২—১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের ‘ইন্টারন্যাশনাল ল কমিশন’-এর সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর রায়ই প্রথমবারের মতো বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছিল—যুদ্ধাপরাধের বিচারে একটি স্থায়ী, নিরপেক্ষ ও সুসংগত আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো দরকার। এই উপলব্ধি থেকেই পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ধারণা বিকশিত হয়।

আইনতত্ত্বের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান আরও গভীর। তৃতীয় বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্তর্জাতিক আইনকে দেখার যে ধারা—যা আজ টুয়েইল (থার্ড ওয়ার্ল্ড অ্যাপ্রোচেস টু ইন্টারন্যাশনাল ল) নামে একটি প্রতিষ্ঠিত আইনি মতবাদ—তার বীজ রোপণ হয়েছিল বিচারপতি পালের চিন্তায়। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন—আন্তর্জাতিক আইন কি সত্যিকার অর্থে সব রাষ্ট্রের সমতার ভিত্তিতে গড়া, নাকি পশ্চিমা শক্তির আধিপত্য বজায় রাখার একটি হাতিয়ার? এই প্রশ্ন আজও আন্তর্জাতিক আইনের গবেষণায় প্রাসঙ্গিক।

১৯৬৬ সালে সম্রাট হিরোহিতো তাঁকে জাপানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ফার্স্ট অর্ডার অব দ্য সেক্রেড ট্রেজার’ প্রদান করেন, যে সম্মান অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যান এবং সনির প্রতিষ্ঠাতা আকিও মরিতার মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরাও পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালে টোকিওর ইয়াসুকুনি শ্রাইনে এবং কিয়োটোর রিয়োজেন গোকোকু জিনজা মন্দিরে তাঁর পাথরের স্মৃতিফলক স্থাপিত হয়। ১৯৭৪ সালে কানাগাওয়া প্রদেশের হাকোনে পাহাড়ে স্থাপিত হয়েছে ‘পাল-শিমোনাকা স্মৃতি জাদুঘর’।

২০০৭ সালে জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে ভারত সফরে এসে লোকসভায় বিচারপতি পালকে শ্রদ্ধা জানান এবং কলকাতায় গিয়ে তাঁর পুত্র প্রশান্তকুমার পালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

বিচারপতি পাল ১৯৫২ সালে হিরোশিমায় প্রথম এশিয়ান শান্তি সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেছিলেন। হিরোশিমার হোনশোজি বৌদ্ধমন্দিরে নিজ হাতে বাংলা ও সংস্কৃতে শান্তির বাণী লিখে দিয়েছিলেন, যা আজও একটি পাথরের ফলকে খোদাই করা আছে।

কিন্তু বাংলাদেশে? তাঁর জন্মভূমি কুষ্টিয়ার তারাগুনিয়া গ্রামে সরকারিভাবে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নেই। তাঁর নামে কোনো জাতীয় পুরস্কার নেই, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিভাগ বা ভবনের নামকরণ নেই। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে তাঁর নাম নেই। বাংলাদেশি জনপরিসরে তিনি প্রায় অস্তিত্বহীন। অথচ জাপানে তিনি একজন জাতীয় বীর।

কলকাতা হাইকোর্টে স্থাপিত রাধা বিনোদ পালের আবক্ষ ভাস্কর্য
ছবি: সংগৃহীত
আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, এর শিকড় আছে একটি সভ্যতার বিবেকের গভীরে। সেই বিবেকের কণ্ঠস্বর ছিলেন কুষ্টিয়ার রাধা বিনোদ পাল। এই মানুষটিকে চেনার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের। তাঁর নামে গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, জাতীয় পুরস্কার প্রদান এবং পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি—এগুলো আজ সময়ের দাবি।

একটি তথ্য অনেকের কাছে অজানা, সম্রাট হিরোহিতো বিচারপতি পালের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘যত দিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে বা অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।’ এটি নিছক কথার কথা ছিল না। আজ জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উন্নয়ন অংশীদারদের একটি।

২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানে হোলি আর্টিজান হামলায় ৯ জন জাপানি প্রকৌশলী প্রাণ হারান। এত বড় ক্ষতির পরও জাপান বাংলাদেশকে ছেড়ে যায়নি, বরং পাশে থেকেছে। এই বিশ্বস্ততার বীজ হয়তো সেই ১৯৪৮ সালেই বোনা হয়েছিল, যখন একজন কুষ্টিয়ার সন্তান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তির মুখের ওপর সত্য কথা বলেছিলেন।

রাধা বিনোদ পালের জীবন আমাদের শেখায় দারিদ্র্য একজন মানুষের সীমা নির্ধারণ করে না, বরং মনোবল ও নৈতিক দৃঢ়তা দান করে। তাঁর রায় আমাদের শেখায়, শক্তিমানের ভয়ে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে বিচারের মৃত্যু। তাঁর উত্তরাধিকার আমাদের শেখায় আন্তর্জাতিক আইন তখনই সত্যিকারের আইন হয়, যখন তা বিজয়ীর খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর না করে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক কেবল কূটনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, এর শিকড় আছে একটি সভ্যতার বিবেকের গভীরে। সেই বিবেকের কণ্ঠস্বর ছিলেন কুষ্টিয়ার রাধা বিনোদ পাল। এই মানুষটিকে চেনার দায়িত্ব বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের। তাঁর নামে গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা, জাতীয় পুরস্কার প্রদান এবং পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্তি—এগুলো আজ সময়ের দাবি।

বিচারপতি পাল ১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি কলকাতায় শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বর, যা ১৯৪৮ সালে টোকিওর আদালতে বিজয়ীর মুখের ওপর সত্য কথা বলেছিল—আজও ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা প্রত্যেক মানুষের অনুপ্রেরণা। জাপান তাঁকে মনে রেখেছে। এখন বাংলাদেশেরও সময় এসেছে তাঁকে মনে রাখার।

তথ্যসূত্র ও গ্রন্থপঞ্জি

১. বাংলা উইকিপিডিয়া—রাধা বিনোদ পাল

২. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা—‘৭০ বছর পরও যে বাঙালিকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে জাপানিরা’, সুচিস্মিতা তিথি, ৭ আগস্ট ২০২০।

৩. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা—রাধা বিনোদ পাল: আজও যে বাঙালিকে কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মান জানায় জাপানিরা, আহমাদ ইশতিয়াক, ২৬ জানুয়ারি ২০২২।

৪. বিডিনিউজ২৪ বাংলা—‘বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল এবং হিরোশিমা’, প্রবীর বিকাশ সরকার, ৩১ মার্চ ২০২৫।

৫. আওয়ারবাংলা২৪—টোকিও ট্রায়ালের নীরব প্রতিবাদী বিচারক, তানভীর আজাদ, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬।

৬. ন্যাশনাল ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু মিউজিয়াম—‘জাস্টিস রাধা বিনোদ পাল অ্যান্ড দ্য টোকিও ট্রাইবুনাল’, ৩১ মে ২০২১।

৭. নাকাজিমা, তাকাশি—জাজ পাল, হোক্কাইডো ইউনিভার্সিটি, ৩০৯ পৃষ্ঠা।

  • লেখক: শিক্ষার্থী, জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়