টিয়াদুর: একটি সর্বপ্রাণবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প

ইচক দুয়েন্দের (১৪ ডিসেম্বর ১৯৬০—১৬ মে ২০২৬) প্রতিকৃতি ও ‘টিয়াদুর’ বইয়ের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ইচক দুয়েন্দের মহাগপ্প টিয়াদুর একটি সর্বপ্রাণবাদী রাজনৈতিক প্রকল্প। এর কাহিনিজগৎ মানুষ, পাখি, উদ্ভিদসহ সকল প্রাণসত্তাকে একই যৌথ রাজনৈতিক ও নৈতিক পরিসরে স্থাপন করেছে। সৃষ্টিজগতের প্রকৃত বাস্তবতা এ রকমই তো আসলে। সকল সৃষ্টিসত্তার দ্বান্দ্বিক অথচ পরস্পর নির্ভরশীল সহাবস্থানের এক অসামান্য ঐক্যবদ্ধ পরিসর এই পৃথিবী যাকে আমরা, মানুষেরা, খণ্ডবিখণ্ড করেছি, নিজেদের সাধ্যমতো দখল করেছি, আধিপত্য বিস্তার করার নামে নিজেদেরসহ সকল প্রাণসত্তার বসবাস ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছি। চূড়ান্তে আমরা স্বনির্মিত ফাঁদে আটকা পড়েছি। আমরাই আবার দুনিয়ার ধ্বংস-আশঙ্কা আবিষ্কার করে ঘোষণা দিচ্ছি—আমরা আজ বিপদাপন্ন!

মহান ইচক দুয়েন্দে টিয়াদুরে সৃষ্টিজগতের এমন এক প্রবণতার বিমূর্ত ও মূর্তের মিশ্র চিত্র গড়েছেন, যা মানুষের কৃত্রিম শ্রেষ্ঠত্ববাদকে চ্যালেঞ্জ করে। মানুষ কেবল অপরাপর প্রাণ-প্রকৃতি হন্তারকই হয়ে ওঠেনি, এমনকি স্বজাতিকেন্দ্রিকতাও বজায় রাখতে পারেনি, লিপ্ত হয়েছে পরস্পরবিরুদ্ধ চিন্তা ও কার্যক্রমের অর্থহীন লড়াইয়ে, যা সমস্ত ভিন্ন ভিন্ন প্রাণসত্তার বৃহত্তর সম্পর্কজাল বিক্ষত ও ছিন্ন করে। এর বিপরীতে, সর্বপ্রাণবাদের মূল শর্ত হলো, জগতের সকল প্রাণের সমান মর্যাদা স্বীকার ও পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাপূর্ণ আচার-ব্যবহার করা। ‘মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব’ জাতীয় কথায় যে ভঙ্গুর শ্রেষ্ঠত্ববাদ ঘায়ের মতো ফুটে ওঠে, সর্বপ্রাণবাদ তা থেকে মুক্ত।

আরেক দিকে রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার অভিপ্রায়ে রাজনীতি নামক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পেয়েই পরিণত হয় স্রেফ ক্ষমতা অর্জন এবং নাগরিক নামক জনসাধারণসহ সকল প্রাণসত্তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের শাসনব্যবস্থায়। এই প্রেক্ষাপটে ‘সর্বপ্রাণবাদী রাজনীতি’ বলতে এমন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হবে, যেখানে সকল প্রাণ মহাপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে সমান মর্যাদা, স্বার্থ, আনন্দ ও কল্যাণের অধিকারী। এই ধারণাকে এমন এক সাম্য ও সমতাপূর্ণ মানবিক দুনিয়া কায়েমের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে হবে, যার মাধ্যমে প্রত্যেক ভিন্ন সত্তা নিজ নিজ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা ও অধিকারসহ সমমর্যাদায় বিবেচিত হবে। শুনতে, ভাবতে ও দেখতে রূপকথার মতো মনে হলেও টিয়াদুরে প্রতিফলিত এই আইডিয়া আমাকে আচ্ছন্ন করে।

এ মহাগপ্পে মানুষের নাম যেমন চিরমা দুর্দিক বা জুলিপান তিন্দভ, বৃক্ষের নাম বোবাডোম—‘বাগানের গাছপালার একটার পর একটা নাম’, এমনকি পোষা বেজির মিষ্টি নাম কুহমি-জুহমি, তেমনি যাদের নাম থাকতে পারে বলে মানুষ ভাবতেই পারে না, সেই সব প্রাণ-প্রজাতিরও আকর্ষণীয় ও অপ্রচলিত নাম রেখেছেন ইচক দুয়েন্দে। এসব নাম উচ্চারণ করতে গেলে রোমাঞ্চ জাগে, কানে মধুর ও দীর্ঘস্থায়ী স্বনন তৈরি করে। মনে হয় যেন এক ইউটোপিয়ান পৃথিবীর নাম-সংস্কৃতির মধ্যে আমি প্রবেশ করি। তবে কেবল নামেই নয়, চরিত্রগুলো চিন্তা ও কার্যকলাপেও অভিনব। যেমন ভাই-অন্তপ্রাণ মেয়ে জরি তাতার ‘বাস বনেবাদাড়ে। বন্য উদ্ভিদ বৃক্ষ সাপখোপ ও প্রাণীর সাথে তাঁর ওঠাবসা।’ ওদিকে অদ্ভুত মানবিক এক চরিত্র ‘টিয়াদুর’: ‘জি, বাদুর ঈয়াক ঈল্ ও টিয়ে পাখি দিনাট নুনঝের ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেন টিয়াদুর।’ হিরণ্ময় চন্দের প্রচ্ছদে এই নতুন অচেনা অথচ যেন কতকালের চেনা এই পাখি প্রজাতিকে দেখাও যায় মহাগপ্পের বইটির মলাটের গায়ে উড়ন্ত ভঙ্গিতে। তার লাল ঠোঁট—গোলাকার, সাদা গোল চোখে গোল কালো মণি, সারা গা সবুজ, হলুদ লেজ, ধূসর পাখনা, গলায় কমলা রঙের অপরূপ রিং লেপ্টে আছে! মনে হয় রং–বৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের এক বহুরঙা জীবন্ত মেটাফোর এই টিয়াদুর নামের ক্রস প্রাণিটী। এ পাখির এমন গুণ, যা মানুষের আদর্শে থাকলেও, আচার-আচরণে নেই। পরির মেলা তথা সতের্বাঠার মেলায় বেনজা ইনঝের মতো ‘মরে গেছে’ ধরে নেওয়া সমস্ত মানুষকে পাখায় ঢেকে সুরক্ষা দেয় টিয়াদুর, পুনরায় বাঁচিয়ে তোলে। আরও কত ইঙ্গিতময় ভূমিকাই যে পালন করে টিয়াদুর—পৃথিবীর মানুষকে সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের নতুন পথ প্রদর্শন করতেই হয়তো। ইচকের মহাগপ্পে এই প্রকৃতির এমন সব মাজেজা বর্তমান, যা পাঠককে উদ্দীপিত করে প্রচলিত চিন্তা-কাঠামোর বাইরে গিয়ে জীবন, জগৎ ও জাগতিকতার পারস্পরিক সম্পর্ক বিষয়ে নতুন ভাবনার দিকে বাঁক নিতে।

ইচক দুয়েন্দে
এখানে ব্যর্থ বিধ্বস্ত উপেক্ষিত গ্রেগর সামসার ক্রমে ভয়ংকর পোকায় রূপান্তরিত হবার মর্মস্পর্শী দৃশ্যও নেই। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্মের মতো সম্পূর্ণ পলিটিক্যাল এলিগরিও এটি নয়; যেখানে শুয়োর, হাঁস-মুরগিসহ বিবিধ প্রাণী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; যেখানে হাসতে হাসতে ঘোষণা করা হয়: ‘অল অ্যানিমেলস আর ইকুয়াল বাট সাম অ্যানিমেলস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স!’ টিয়াদুরে সকল প্রাণসত্তা তাদের নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্যে হাজির হয় এবং তাদের কার্যকলাপ সংঘটিত হয় মানুষের দুনিয়ায় একীভূত হবার মধ্য দিয়ে।

মাঝেমধ্যে মানুষের জাগতিকতার দিকে ক্রিটিক্যালি তাকালে বমি আসে। কত ভেদ ও বিভেদ মানুষ উদ্ভাবন করেছে অপরকে খাটো করে, তুচ্ছ করে, নিজেকে ও নিজের প্রজাতিকে বা গোষ্ঠীকে শ্রেষ্ঠ করে তোলার রিপুতাড়িত উদ্দেশ্যে। হিন্দু-মুসলমানে, ইহুদি-খ্রিষ্টানে, ব্রাহ্মণ-নমশুদ্রে, ভিন্ন ভাষাভাষিতে, সাদায়-কালোয়, ধনি-গরিবে, শাসক-শাসিতে, মানুষে-পশুতে-পাখিতে-উদ্ভিদে সম্মিলন পণ্ড করে দিতে অমানবিক, প্রাণ-প্রকৃতি সমন্বয়বিরোধী আইন, বিশ্বাস, নীতি, রীতি ও প্রথা দানবীয় ধারালো তলোয়ারের বেড়ার মতো খাড়া করে রেখেছে মানুষ জাতি। এই পটভূমির ওপর টিয়াদুরে ভিন্নতার মিলনে জন্ম নিচ্ছে নতুন এক মানবীয় প্রাণী ‘টিয়াদুর’; জন্ম হচ্ছে নতুন ধারণার, নতুন সম্ভাবনার। টিয়াদুর আসলে কৃত্রিম প্রথা, বিশ্বাস ও নিয়মের জালে আটকা পড়া শ্বাসরুদ্ধকর সমাজকে প্রাকৃতিক পৃথিবীর দিকে যাত্রা করার শিল্পিত আহ্বান। এই অভিযাত্রার সহযাত্রীদের কাউকে রূপান্তরিত হতে হয় না, যে যার নিজ অবয়ব, ভাষা ও স্বভাব নিয়েই এগোয়। ইচক জানেন, সাগরের সঙ্গে সংগম করতে নদীর প্রয়োজন পড়ে না সাগরে রূপান্তরিত হবার, বরং নদী যেখানে থামে, সেখানেই সাগরের শুরু। না, ইচকের মহাগপ্পে কোনো হাস্যকর ‘হাঁসজারু’ নেই। এখানে ব্যর্থ বিধ্বস্ত উপেক্ষিত গ্রেগর সামসার ক্রমে ভয়ংকর পোকায় রূপান্তরিত হবার মর্মস্পর্শী দৃশ্যও নেই। জর্জ অরওয়েলের অ্যানিমেল ফার্মের মতো সম্পূর্ণ পলিটিক্যাল এলিগরিও এটি নয়; যেখানে শুয়োর, হাঁস-মুরগিসহ বিবিধ প্রাণী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে; যেখানে হাসতে হাসতে ঘোষণা করা হয়: ‘অল অ্যানিমেলস আর ইকুয়াল বাট সাম অ্যানিমেলস আর মোর ইকুয়াল দ্যান আদার্স!’ টিয়াদুরে সকল প্রাণসত্তা তাদের নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্যে হাজির হয় এবং তাদের কার্যকলাপ সংঘটিত হয় মানুষের দুনিয়ায় একীভূত হবার মধ্য দিয়ে। টিয়াদুর পাঠান্তে এই বোধ জন্ম নেয় যে সকলের সমান হবার দরকার নেই। আদতে তা সম্ভবও নয়। ভিন্নতার বৈচিত্র্য দ্বারাই সৃষ্টিজগতের বাস্তবতা ও অনুপম সৌন্দর্য প্রকাশিত হয়। যে যার অবস্থা ও অবস্থানে থেকেই ভূমিকা পালনের মাধ্যমে সসম্মানে চিহ্নিত হয়। অসম চেহারা, আলাদা সক্ষমতা (কেউ উড়তে পারে, কেউ পারে ভাসতে, কেউ দৌড়াতে) নিয়েই প্রত্যেক সত্তা যার যার ভূমিকা পালন করার মাধ্যমে সহাবস্থান করতে পারে।

কবি আহমেদ স্বপন মাহমুদ ২০২১ সালের কোনো এক ঘোর লাগা শীতের সন্ধ্যায় ইচক দুয়েন্দের এই মহাগপ্পের খবর ঘোষণা করেন। কী তাঁর উত্তেজনা! তাঁর আস্তানায় বসেই টিয়াদুর পড়ে ফেলি। প্রথম তিনটি অধ্যায়—তরুমা চি, ইতিচি দুন ও পরির মেলা পর্যন্ত গপ্পের আগামাথা ধরতে পারছিলাম না। শুধু খেয়াল করলাম যে বসবাসের, সমাবেশের, আলোচনার, বিনোদনের পরিসর হিসেবে ইচকের মহাগপ্পে ‘চৌদ্দভুজ’ নামের এক সর্বজনীন অবকাঠামোর দেখা পাওয়া যায়। গপ্প শুরুই হয় ‘ঈল্লিচিল্লি চৌদ্দভুজ’-এর আনন্দে নেচে ওঠা দিয়ে। এরপর একে একে অসংখ্য চৌদ্দভুজে প্রবেশের সুযোগ হয়। চৌদ্দভুজের ভেতরে ও বাইরে পরাজাগতিক সব দৃশ্য এবং স্বপ্নের মতো সব ঘটনা ও অপ্রচলিত অচেনা বাক্যভঙ্গির চেনা সংলাপ চলতে থাকে মহাগপ্পের ভাঁজে ভাঁজে। বোবাডোম বৃক্ষের তরতাজা পাতার মাটিতে পড়ে থাকা, কিংবা চিরমা ও দুর্দিকের ‘কাঠবিড়ালি হয়ে’ ছোটাছুটি করার মতো রোমান্টিক দৃশ্যাবলির মুগ্ধতার ভেতর ‘সতের্বাঠার মেলা’ আগমনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। এটি পরির মেলা, যার জন্য সকল সত্তার উত্তেজনাকর আগ্রহ ও অপেক্ষা। এই মেলাটিই মহাগপ্প টিয়াদুরের কেন্দ্রীয় সেটিং। এখানে উপস্থিত নেই, এমন কাউকে পাওয়া যায় না। পরি তো আসেই, আসে রাজ্যের সকল প্রাণসত্তা। বাস্তব আর কল্পজগৎ থেকে নেমে আসা সকল চরিত্রের সমাবেশ ঘটে। ঐতিহ্যগতভাবে মেলা মানেই এমন এক সমাবেশের আয়োজন, যেখানে যেতে কারও বারণ থাকে না—না মানুষের, না পণ্যের, না পরির। বাংলাদেশের চিরায়ত এক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরম্পরা এভাবে টিয়াদুরে সর্বসত্তা সমন্বয়ের প্রতীকী পরিসর হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

‘টিয়াদুর’ বইয়ের প্রচ্ছদ
টিয়াদুর কি উপন্যাস নাকি গদ্যে লেখা মহাকাব্য? অবশ্য সত্যিকারের কাব্যও তো জুড়ে দেওয়া আছে গপ্পের অংশ হিসেবে, যেন লম্বা রাতের কবিগানের স্ক্রিপ্ট এই টিয়াদুর—যাতে বয়ানের পর বয়ান এবং গীতবাদ্যের ঝংকারপূর্ণ সঞ্জীবনী গান, যাতে সেরে ওঠে ‘এ-হৃদয়ের ব্যথা’। কবিতা সমৃদ্ধ ‘অজগরযান’, ১২ সর্গে বিভক্ত ‘ফিঙেলা’ এবং ভিক্ষুকবাদ অধ্যায়ে আমরা পাই কবিতার শরীর। আরও দু-এক জায়গায় আছে কবিতার সরাসরি উপস্থিতি। সুতরাং ভাষায়ম কাঠামোয় প্রচলিত নির্দিষ্ট কোনো বর্গে টিয়াদুরকে আটকে ফেলা কঠিন।

মহাগপ্পের ‘জুলিপান তিন্দভ’ নামের চতুর্থ অধ্যায়ে পৌঁছানোর পর আর থামতে পারি না। ঘোর লেগে যায়। এ কোন দেশের গপ্প? কোন দুনিয়ার? অচেনা লাগে! অথচ অবাস্তব লাগে না। শেষ করে ফেলি টিয়াদুর পরের দিনের মধ্যেই স্বপন ভাইয়ের টেবিলে বসেই। কচি ভাই ওরফে ইচক দুয়েন্দেকে ফোন করি। কিন্তু কী বলব বুঝতে পারি না। বলি, আপনার বিকাশ চেক করেন, ইনবক্স দেখেন, আমাকে এক কপি টিয়াদুর পাঠান। একদিন পরেই বই চলে আসে। আমি আবার পড়ি। একে ওকে বলি, ‘পড়েছেন নাকি টিয়াদুর?’ কেউ বুঝতে পারে না গ্রন্থের নাম। জিজ্ঞেস করে, ‘নাম কী বললা?’ আমাকে বানান করে বলতে হয়—টি য়া দু র! তারপরও যেন বোঝে না। বলে, ‘এটা আবার কেমন নাম! মানে কী?’

ইচক দুয়েন্দের নাম শুনেছিলাম নব্বই দশকে, চব্বিশ ঘণ্টার কবি মাসুদ খানের কাছে, রংপুরে। উনি একটি পত্রিকা দিয়েছিলেন। সেখানে শামসুল কবির নামের একজনের গল্প ‘সখা’ মার্ক করে দিয়ে পড়তে বলেছিলেন। মাসুদ খানের কাছে তখন আমরা সাহিত্য শিখছি। তাঁকে গুরু মানছি। সুতরাং ‘সখা’ পড়েছিলাম। তারপরই জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে সমস্ত ভাবনা উল্টে যেতে শুরু করে। কোথাও কোনো দুঃখ নেই। এমনকি ক্লেদতাও নেই, যেন জীবন এমনকি পৌরাণিক হলেও তার অবসান স্বাভাবিক। যখন দেখতে পাই যে সখাবাবা হয়ে উঠে এক যুবক কী রূপে একের পর এক সন্তানহীন নারীর মাতৃত্বের স্বপ্ন পূরণের আনন্দ ও খ্যাতি কামাই করছে; এবং অবশেষে এক বয়স্ক নারীকে সন্তানবতী করতে রাজি না হওয়ার খেসারত হিসেবে সখাবাবার বাবাত্ব কলঙ্কিত হচ্ছে। তার পা খসে যাচ্ছে, হাত কাটা পড়ছে…। একের পর এক অঙ্গ বাদ দিয়ে হতাশ হবার বদলে সখাবাবা নিজেকে ভাবছে নির্ভার, স্বাধীন, মুক্ত। হাতহীন, পাহীন, আমার অনুমান লিঙ্গহীন হয়ে এক প্রত্যাশাহীন বোধিপ্রাপ্ত মানুষে রূপান্তরিত হচ্ছে সখাবাবা। তারপর বেছে নিচ্ছে এমন এক জীবনাবসান পদ্ধতি, যাকে বলা যেতে পারে শিশুদের আনন্দময় ঢিল নিক্ষেপের খেলা। ইচকের নিজের স্বভাবও, এ রকমই প্রায়। বেদনাকে হাসিতে এবং সহজকে পেঁচিয়ে উপস্থাপন করার শৈলী যেন ইচকের জন্মগত প্রতিভা। এভাবে তিনি প্রভাবিত করতে পারতেন বাস্তব সঙ্গী ও সাগরেদদেরকেও। তাঁর কাছে ভালো-মন্দ ধরনের সিদ্ধান্ত নেই, অন্তরে বিচার করার প্রবণতা নেই, আছে শুধু একটি আশ্চর্য ঐশ্বরিক নির্লিপ্ততা। রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে মিষ্টিঘরে বসে মাসুদ খান বেশ পরে একবার আমাদের জানান যে এই শামসুল কবির কচি এবং ইচক দুয়েন্দে একই দেহে বাস করেন। তারপর আর কিছু পড়া হয়নি ইচকের বা শামসুল কবির কচির। ২০২১ সালের শীতে টিয়াদুর পড়ার পরই ইচককে বোঝার চেষ্টা করি, পড়তে থাকি—লালঘর, উই আর নট লাভার্স এবং আরও কিছু গল্প ও দুটি কবিতা। সবকিছুতেই কচি ভাই ব্যাকরণ উল্টে দিয়েছেন। সে জন্য নিজের নামটাও নিয়েছেন পাল্টে। গানের কথা উল্টে দিয়ে ঠিকঠাক সুরে গেয়ে তৈরি করতেন রহস্য! ইচকের নিজের কথা বলার ধরন ও ইচকের সাহিত্য আলাদা নয় হয়তো। সমাজের রীতি, রাজনীতির খেলা, দেখার দৃষ্টিভঙ্গি—সবটাকেই তিনি উল্টো করে দেখার ও ব্যতিক্রমী স্টাইলে ব্যাখ্যা করার বিরল ওস্তাদ।

টিয়াদুর কি উপন্যাস নাকি গদ্যে লেখা মহাকাব্য? অবশ্য সত্যিকারের কাব্যও তো জুড়ে দেওয়া আছে গপ্পের অংশ হিসেবে, যেন লম্বা রাতের কবিগানের স্ক্রিপ্ট এই টিয়াদুর—যাতে বয়ানের পর বয়ান এবং গীতবাদ্যের ঝংকারপূর্ণ সঞ্জীবনী গান, যাতে সেরে ওঠে ‘এ-হৃদয়ের ব্যথা’। কবিতা সমৃদ্ধ ‘অজগরযান’, ১২ সর্গে বিভক্ত ‘ফিঙেলা’ এবং ভিক্ষুকবাদ অধ্যায়ে আমরা পাই কবিতার শরীর। আরও দু-এক জায়গায় আছে কবিতার সরাসরি উপস্থিতি। সুতরাং ভাষায়ম কাঠামোয় প্রচলিত নির্দিষ্ট কোনো বর্গে টিয়াদুরকে আটকে ফেলা কঠিন। এটাকে নিছক স্যাটায়ার, এলিগরি, জাদুবাস্তবতা কোনোটাই সরাসরি বলা যায় না। আলিফ লায়লা, কিংবা মহাভারত, রামায়ণ, এমনকি মঙ্গলকাব্যের অনুসারীও নয় টিয়াদুর—বিন্যাসে, কনটেন্টে, তীব্রতায়, ঠাট্টায়, সিরিয়াসনেসে টিয়াদুর পড়তে পড়তে আপনার যদিও মনে হতে পারে অনেক ক্ল্যাসিকের কথাই। কিন্তু টিয়াদুর একটাই, যেখানে ইচক খেলেছেন দিল খুলে, হাত খুলে—এক যুগ ধরে লিখেছেন একটিই গ্রন্থ। এবং ইচক প্রকাশে ব্যাকুল ছিলেন না। লিখতেই হবে, এমন ভাবনায় তাড়িত হতেন না। না-লেখা উদ্‌যাপন করতেন। ব্যক্তি হিসেবেও ইচক উদ্ভট, মজার আকর্ষণীয়। সেসব কথা থাক, ইচকের সান্নিধ্যে যাঁরা গেছেন, তারাই আর বের হতে পারেননি তাঁর ঘোর থেকে। সুতরাং তাঁর গপ্পের চরিত্রগুলো তাঁরই বহুমাত্রিক চিন্তা ও জীবন-ভাবনার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। এই সব মিলে কালে কালে টিয়াদুর সাহিত্যজগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী উদাহরণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা ধারণ করে বলেই মনে হয়। হয়তো তাই, ইচক দুয়েন্দে নিজেই টিয়াদুরকে বলেছেন—মহাগপ্প।

এই মহাগপ্পের মানুষ, পাখি, বৃক্ষ, পুষ্প, ইঁদুর, বাদুড়, টিয়াদুর সবাই কথা বলে, সাড়া দেয়, বিস্মিত হয়, বেদনাহত হয়ে পড়ে, আনন্দে লাফায়, ওড়ে। তবে তারা বসবাস করে তথাকথিত আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে। রাষ্ট্র মানে রাজনীতি, নীতি, শাসক দল, জনতা, বিরোধী দল, নতুন দল, নতুন চিন্তা। যেমন জুলিপান তিন্দভ এমন এক সংঘের প্রধান, যার কাজ উদোম থাকতে পছন্দ করা মানুষকে পোশাক পরতে উৎসাহিত করা্, সভ্য করে তোলা। সে পোশাকে পকেট থাকবে।

এই যখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির হকিকত, তখন গুজব রটে যে রাষ্ট্রের সব থেকে বড় উৎসব পরির মেলায়—সতের্বাঠার মেলায় ‘সব মানুষ গেছে মারা।’ পরির মেলায় সহজে যাওয়া যায় না। দুর্গম পথ। পথে চিরমা চি বলে, ‘আমার খুব ভয় করছে। মনে হচ্ছে এটু সামনে এগোলেই মাটি ফুঁড়ে একটা মস্ত দৈত্য বের হয়ে এসে আমাদের গিলে ফেলবে। ইয়া বড় দৈত্য দশটা হাতিকে হার মানাবে। জিব মহা লম্বা, লাল চকচকে, লকলক করে রক্ত ছিটাচ্ছে।’ পথে আছে নদী-নালা, অজগর—তবু পরির মেলায় যাওয়া মানে এক ‘সুন্দর ফুরফুরে ভ্রমণ।’ সেখানে আছে আকাশভেদী বৃক্ষ। নাম যার বুড্ঢা জামচি কোকোনো।

পকেটে থাকবে অর্থ। বল প্রয়োগ করে পোশাকের সংস্কৃতিতে প্রবেশের ফল হিসেবে আরও নানা আইন প্রণয়নের প্রেক্ষাপট তৈরি হতে থাকে টিয়াদুর-এর রূপান্তরিত দুনিয়ায়। জুলিপান তার চিফ অব স্টাফকে আদেশ দিয়ে বলেন, ‘শোনো। দেশে নতুন আইন হবার যাচ্ছে। যার পকেট কাটা যাবে সে শাস্তি পাবে বোকামির জন্য। আর যে পকেট কাটতে পারবে, সে পুরষ্কার পবে তার বুদ্ধির জন্য। হ্যাঁ। দেখি, তোমরা সব খবরই রাখ। দুর্বিন দুর্নিভা আমাক নিজে বলছে। তার দল এই দাবি রাখতে যাচ্ছে। তার বোকা দলের লক্ষ্য দেশের সকল লোককে চালাক বানানো।...।’ ইচকের রাজনৈতিক ব্যাকরণও উল্টো। যে অন্যেরটা কেড়ে নিজের পকেট ভরতে পারে সেই সিকান্দার! রাজনীতিকে জানতে হয় কখন পোশাক পরার আইন করতে হবে; কখন পোশাক খুলে নেংটি পরে গায়ে কাদা মাখতে হবে। এই সব নব নব বৈপ্লবিক (!) দাবি ও দাবি বাস্তবায়নের পেছনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—পুঁজির ওপর আধিপত্য বিস্তার। ‘উপার্জন শেষ পর্যন্ত খারাপ হবে না।’ আহা উপার্জনের বাটখারায় নয়া দুনিয়ায় নির্ণিত হবে মানুষের মর্যাদা!

তবে তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে একটি দল থাকলে চলে না। জনগণকে বিভক্ত করতে হয় বহুদলে, বহুমতে ও পথে। তাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। তবে এমন বহু কট্টর মতের জগতে নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন সোজা কথা নয়। পারিবারিক প্রতিপত্তি থাকতে হয়। পরিবারতন্ত্রই সব। টিয়াদুরে যেমন দেখা যায় ‘পড্ড পরিবার’ এবং তাদের দল ‘ভিক্ষুকহো’, যা আবার নিষিদ্ধঘোষিত। তাদের আছে ‘ভিক্ষুক মুক্তিফৌজ’। এরা এতটাই সাহসী যে শাসক দলের সামরিক সদর দপ্তরে হামলা চালাতে ভয় পায় না। ফৌজের নেতা ঈধু মিউজিতার ভাষণে ভিক্ষুক সমাজ নবপ্রাণ লাভ করে যেন। ঈধুর ভাষণে বলা হয়, ‘হ্যাঁ আমরা ভিক্ষা করে খাই। মিউজিতা ভিক্ষা করে। হিদ্র পুন ভিক্ষা করে, করে দৃনা সান্দ্রিতা। আমরা স্বীকার করি যে আমরা ভিক্ষা করি। (অন্যদিকে) বালুকাচপলের সামরিকশাহী দেশের নামে দশের নামে ভিক্ষা করে। কিন্তু ওরা স্বীকার করে না। যখন আমি বলি যে ওরা সুদে ভিক্ষা করে, ওরা আমার ভাষা শোধরানোর জন্য মামলা করে। মিউজিতা তোমাদের মামলাকে ভয় পায় না। মিউজিতা তোমাদের চোখ রাঙানিকে ভয় পায় না। আমার দল লিচপ্রেল দাদাবনের চান্দ্রগণতন্ত্র প্রত্যাখ্যান করেছে। আমরা ছুড়ে ফেলে দিয়েছি ফিজিবনের সৌরগণতন্ত্র। আমরা বিশ্বাস করি ভিক্ষুকতন্ত্রে। যত দিন না ভিক্ষুকতন্ত্র মেনে নেবে বালুকাচপলের সামরিকশাহী তার আগপর্যন্ত আমরা নির্বাচনের যাব না। সামরিকতন্ত্রের আন্ডারে আমরা নির্বাচনে যাব না। প্রহসনের নির্বাচনে মিউজিতা যাবে না।...’

এই যখন রাষ্ট্র ও রাজনীতির হকিকত, তখন গুজব রটে যে রাষ্ট্রের সব থেকে বড় উৎসব পরির মেলায়—সতের্বাঠার মেলায় ‘সব মানুষ গেছে মারা।’ পরির মেলায় সহজে যাওয়া যায় না। দুর্গম পথ। পথে চিরমা চি বলে, ‘আমার খুব ভয় করছে। মনে হচ্ছে এটু সামনে এগোলেই মাটি ফুঁড়ে একটা মস্ত দৈত্য বের হয়ে এসে আমাদের গিলে ফেলবে। ইয়া বড় দৈত্য দশটা হাতিকে হার মানাবে। জিব মহা লম্বা, লাল চকচকে, লকলক করে রক্ত ছিটাচ্ছে।’ পথে আছে নদী-নালা, অজগর—তবু পরির মেলায় যাওয়া মানে এক ‘সুন্দর ফুরফুরে ভ্রমণ।’ সেখানে আছে আকাশভেদী বৃক্ষ। নাম যার বুড্ঢা জামচি কোকোনো। ‘বৃক্ষের নিচে কিছু তরুণ–তরুণী বসে আছে।’ তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওরা পরিনৃত্য দেখে। জাদুকর তনিপ্পা বিন বাঁশি বাজায়। তখন আকাশ থেকে সতেরো পরির নেমে আসার দৃশ্য দেখা যায়। একসময় আঠারোতম পরিও নেমে আসে মেলার মাঠে। ‘সোনামণিরা, পরির মেলা সতেরো বছর পরপর আঠারো দিন ধরে চলে। সেটিই প্রকৃত সতের্বাঠার পরির মেলা। আপনাদের প্রশ্ন হলো, তাহলে প্রতিবছর কী করে মেলা বসে? হ্যাঁ বসে, তবে সে হলো নকল মেলা। যা আসল বা খাঁটি তার নকলও হয়। এটাই জগতের নিয়ম। আমরা ইচ্ছা করলেও তা থামাতে পারি না।’

এই রকম এক দ্বন্দ্ব ভরা পৃথিবীতে টিয়াদুর আসে অজানা রাজনৈতিক শক্তির নৃশংস হামলায় মৃত হাজারো প্রাণ বাঁচাতে। বাঁচিয়ে সে অদ্ভুত সংবেদনশীল মানবিক পাখি টিয়াদুর, ঝাঁক ঝাঁক টিয়াদুর আকাশে মাথা খাড়া করে মানুষকে সম্মান জানিয়ে চলে যেতে থাকে। টিয়াদুর-এর রাজনীতি কেবলই মানুষের সমাজে সীমিত থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে মহাজগতেও, যেখান থেকে টিয়াদুর নেমে এসে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে যুদ্ধ, হত্যা ও বিদ্বেষ থেকে। তবে শুধু মানুষ টিয়াদুরের লক্ষ্য নয়। সর্বপ্রাণের সংহতিই টিয়াদুরের অন্তর্গত উদ্দেশ্য।

তবে থামাতে না পরলেও নকল ও আসলের আলাপ চলতে থাকে। ‘সংসদে হৈহট্ট’ শিরোনামের দশম অধ্যায়ে আমরা দেখি যে ‘রাজধানী তিলপামাকায় ‘সুসানজিফ্রো জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন...আরম্ভ হবে।’ কিন্তু ‘...সংসদ মহাচৌদ্দভুজের মধ্যস্থলে চৌদ্দভুজ টেবিলের কেন্দ্রস্থলে অধ্যক্ষের আসনে বসে আছেন এক অচেনা তরুণী।’ ‘...যিনিই তরুণীর সাথে দৃষ্টি বিনিময় করছেন, বিশেষ একটি গন্ধ পেয়ে সেই সাংসদ এলিয়ে পড়ছেন নিজের চেয়ারে।’ সে তরুণীর প্রতি সংসদের অধ্যক্ষ ধীশান্ দুর্দিক পর্যন্ত বিভ্রান্ত হন। কিন্তু তরুণীকে ওই একবারই দেখা যায়, সে দেখাটাও আসল কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি সকলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিভ্রান্তিও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যখন সংসদে ‘একগুচ্ছ বিড়ালছানা কিঁউ কিঁউ পিঁউ পিঁউ ডেকে’ চলে। সুতরাং এক অধরা বহিঃশক্তির আঘাতে ‘অর্থমন্ত্রী ঝিকর পুনঝন-এর গলায় মাছের কাঁটা আটকে যাওয়ায় তিনি আজ বাজেট ভাষণ দিতে পারছেন না।’ এমনকি ‘অধ্যক্ষ সকল সংসদীয় রীতিনীতি জলাঞ্জলি দিয়ে খেতে শুরু করেছেন আতাফল।’ সব মিলিয়ে গণতন্ত্রের পতিত, ভেঙে পড়া, অশ্লীল একটা ছবি আমাদের সামনে হাজির হয়, যার মূলে রয়েছে এমন এক শক্তির রাজনৈতিক দাসত্ব মেনে নেওয়া, যা আছে কি নেই তা আমরা জানি না। ফলে সংসদ অধিবেশন শেষ হচ্ছে নিজেদের ভেতরের শত্রু চিহ্নিত করার ঘটনা দিয়ে। অধ্যক্ষের একান্ত সহকারী অর্পিত রিহাট জানাচ্ছেন, ‘আপনার পরম প্রিয় পুত্র তাহতি দুর্দিক ঝিমকানন ত্যাগ করে সতের্বাঠার পরির মেলার পথে রওনা হয়েছেন। তাঁর সাথে রয়েছেন এক অনুপম সুন্দর তরুণী। পরিচয় তাঁর উদ্‌ঘাটিত হয়েছে। সেই তরুণী আর কেউ নন, বেয়াদবি মাফ করবেন, আপনার জানি রাজনৈতিক দুশমন নিউচিতা’র উদ্ভিন্ন যৌবনা কন্যা চিরমা চি। শান্ত হোন, মহামহিম অধ্যক্ষ। আরও খবর আছে, বালুকাচপলে শুরু হয়েছে ক্ষমতা দখলের নৃশংস লড়াই। জাতির দুঃসময়ে আপনাকে হয়তো গ্রহণ করতে হতে পারে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। এখানেই শেষ নয় মহামহিম অধ্যক্ষ, সতের্বাঠার পরির মেলায় রহস্যজনকভাবে মারা গেছে সব মানুষ। কী ঘটেছে আমাদের পরম প্রিয় রাজপুত্রসম তাহতি দুর্দিক ও তাঁর অনুমপ সঙ্গিনীর ভাগ্যে তা এখনো অজ্ঞাত।’ এই সব ঘটছে এমন এক জগতে যেখানে ‘মহামহিম কড়ুই’ বৃক্ষে নানা বর্ণের পাতা। যেখানে সার্কাসের জিরাফ ও উট ‘বিষাদের গান গায়।’ সেখানে ঘটনাগুলো পরিরাজ্যের মতোই অলৌকিক কিন্তু সত্যির মতো মনে হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে ঘটে যাওয়া সত্য, গুজব, ও উদ্ধারপর্বের সাথে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত খাপ খাওয়ানোর মতোই বাস্তব। আমাদের অবস্থা জুলিপান তিন্দভ ও মিউজিতার রাজনৈতিক কখনো চিরবন্ধু, কখনো চিরশত্রুদের মতোই। যেমন মিউজিতা বলেন, ‘সকাল থেকে নানা রকম গুজব শুনছি। কোনটা বিশ্বাস করব কোনটা করব না ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু এ খবর পাঠিয়েছেন আমাদের বিশ্বস্ত কেউ। তবে আপনার কথা হেলাফেলার নয়। আমি আমাদের দলের সত্যনির্ণয় কমিটিকে ডাকছি।’ এসবের প্রভাবে কিছু সংস্কৃতিগত সংস্কার কার্যক্রমও প্রতিফলিত হয়। প্রাচীন গ্রন্থ আবিষ্কার, তার পাঠোদ্ধার, রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীতের অর্থ বোধকতাবিষয়ক বিতর্ক ইত্যাদি একধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সাংস্কৃতিক বিবর্তনের। নতুন সংস্কৃতিতে ‘ভুল করা’কে জায়েজ কাজ হিসেবে গণ্য করতে থাকে নতুন প্রজন্ম। একটু পড়া যাক, ‘টিয়াদুরের সমুদ্দুর মেলা প্রান্তর জুড়ে। শোনা যাচ্ছে শতসহস্র স্বজনহারার ক্রন্দনরোল, আহাজারি। হাঁক বালুপট্টি, হাঁক বালুপট্টি, বলে জ্যোতিষী হিম্পা জিরিহিট্টি’র বজ্র গর্জন শোনা যায়। “কী করিস”, জিজ্ঞেস করেন জ্যোতিষী। “ভুল করি।” বলেন মিউজিতা একটু ভেবে। জ্যোতিষী অবাক হন বেশ। এটি অপ্রত্যাশিত জবাব। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তুই কী খাস।” “ঘাস”, না ভেবেই জবাব দেন মিউজিতা।’ এসব শুনে ভবিষ্যৎ বলে দেন জ্যোতিষী যে মিউজিতা রাজা হবেন। এ কথাও বলেন যে মিউজিতা কুসংসর্গে পড়েছে। এবং মিউজিতা এমনভাবে কুসংসর্গের সাফাই গান যে মনে হয় জনগণ কুসংসর্গ পছন্দ করে বলেই রাজাকে কুসংসর্গ বরণ করতে হয়। এই রকম এক দ্বন্দ্ব ভরা পৃথিবীতে টিয়াদুর আসে অজানা রাজনৈতিক শক্তির নৃশংস হামলায় মৃত হাজারো প্রাণ বাঁচাতে। বাঁচিয়ে সে অদ্ভুত সংবেদনশীল মানবিক পাখি টিয়াদুর, ঝাঁক ঝাঁক টিয়াদুর আকাশে মাথা খাড়া করে মানুষকে সম্মান জানিয়ে চলে যেতে থাকে।

টিয়াদুর-এর রাজনীতি কেবলই মানুষের সমাজে সীমিত থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে মহাজগতেও, যেখান থেকে টিয়াদুর নেমে এসে পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারে যুদ্ধ, হত্যা ও বিদ্বেষ থেকে। তবে শুধু মানুষ টিয়াদুরের লক্ষ্য নয়। সর্বপ্রাণের সংহতিই টিয়াদুরের অন্তর্গত উদ্দেশ্য।

  • টিয়াদুর
    ইচক দুয়েন্দে

    প্রকাশক: মুহম্মদ শামসুল কবির, পেঁচা  
    প্রকাশ: দ্বিতীয় সংস্করণ ২০২১
    প্রচ্ছদ: হিরন্ময় চন্দ
    পৃষ্ঠা: ৩৫২; মূল্য: ৭৫০ টাকা