বেলা তারের বিষণ্ন জগৎ

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

২০১২ সালে হার্ভার্ড ফিল্ম আর্কাইভে ‘বেলা তারের বিষণ্ন জগৎ’ শিরোনামে একটা লেখা পড়ার পরই আগ্রহ জন্মে তাঁর সিনেমা দেখার। সে বছরই প্রথম তাঁর একটা সিনেমা দেখি। ‘দ্য তুরিন হর্স’। এ সিনেমা পরিচালনায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অ্যাগনেস হ্রানিৎস্কি। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন গত বছর সাহিত্যে নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে। অভিনয় করেছেন জ্যানোস ডারজি, এরিকা বোক এবং মিহালি করমোস।

বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশেকে নিয়ে মূলত এ সিনেমার আখ্যান। ইতালির তুরিন শহরে দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে তাঁর বৃদ্ধকালে একদিন হাঁটতে বের হন। হঠাৎ দেখেন এক ঘোড়ার গাড়ির চালক তার ঘোড়াটিকে নির্দয়ভাবে চাবুক দিয়ে মারছে। ঘোড়াটি স্থির। ঘোড়ার গাড়ির চালক চাইছে ঘোড়াটি দৌড়াক। এ দৃশ্য দেখে নিৎশে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

নিৎশে ঘোড়ার গলায় হাত রেখে কাঁদতে থাকেন। তার প্রতিবেশী তাকে বাড়িতে নিয়ে যান। ডিভানে গিয়ে শুয়ে থাকেন। আর বিড়বিড় করেন, ‘মা, আমি বোকা।’ এরপর প্রায় দশ বছর নিৎশে বেঁচে ছিলেন কিন্তু অসুস্থ হয়ে।

‘দ্য তুরিন হর্স’। এ সিনেমা পরিচালনায় তাঁর সঙ্গে ছিলেন অ্যাগনেস হ্রানিৎস্কি। সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছিলেন গত বছর সাহিত্যে নোবেলজয়ী লাসলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে। বিখ্যাত দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশেকে নিয়ে মূলত এ সিনেমার আখ্যান।

এই ‘মা’ কে? সেই ঘোড়া মালিকের অবুঝ মেয়ে, যে কিনা নিজেও ঘোড়াটির জন্য কষ্ট পেয়েছিল। চলচ্চিত্রটিতে ছয় দিনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সেই থেকে ঘোড়াটি কিছু খেতে চায় না, চুপচাপ বসে থাকে। ঘোড়ার মালিকের মেয়েটিও বসে থাকে জানালার পাশে মন খারাপ করে।

এক সন্ধ্যায়, একজন প্রতিবেশী বার্নহার্ডআসে; সে দাবি করে যে কাছের শহরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে ঈশ্বর এবং মানুষ উভয়কেই এই মহাবিশ্বের পরিস্থিতির জন্য দায়ী করে রেখে।

‘দ্য তুরিন হর্স’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত

পরে মেয়েটি দেখে তাদের পরিবারের কুয়ো শুকিয়ে গেছে। পানি নেই। এরপর ঘোড়ার মালিক ও তার মেয়ে তাদের খামার ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঘোড়া তাদের সঙ্গে আর যাবে না কোথাও। সেই ঘোড়ার চোখেও দেখা যায় ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার ভয়, বিষণ্নতা ও নীরব কান্না।

পঞ্চম দিনে, তারা দেখতে পায় ঘোড়াটি অসুস্থ। মারা যাওয়ার অবস্থা। ঘোড়ার মালিক ঘোড়ার লাগাম খুলে গোলাঘরে রেখে দেন। এরপর বাবা ও মেয়ে সারা দিন ঘরের ভেতরেই থাকেন, বাইরে বাতাস বইতে থাকে। সন্ধ্যায়, হঠাৎ বাইরের সূর্যের আলো অদৃশ্য হয়ে যায় এবং ঘর অন্ধকারে ডুবে যায়। মেয়েটি ঘরের চারপাশে লন্ঠন জ্বালায়। কিছুক্ষণ পরে লন্ঠনগুলোও হঠাৎ নিভে যায়। ষষ্ঠ দিনে, কোনো ঝনঝন বাতাস বা সূর্যের আলো নেই। মেয়েটি খেতে বা কথা বলতে অস্বীকৃতি জানায়।

মেয়েটি একা হাঁটতে থাকে। তার বাবা পেছনে পেছনে যাচ্ছে।

এই সিনেমাটির প্রিমিয়ার হয় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। আমি পরের বছর দেখি। বার্লিনালে উৎসবে প্রদর্শনের আগে হাঙ্গেরিয়ান কিংবদন্তি এই নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন কনস্টান্টি কুজমা। জানতে চেয়েছিলেন, নিৎশেকে নিয়েই এ সিনেমা কেন?

বেলা তার নিজেই বলেছিলেন, ‘৩০ বছর ধরে আমি একই বিষয়ে ছবি বানিয়ে চলেছি। মানুষের জীবনকে নিয়ে শোষক, মহাকালের প্রহসন ও ষড়যন্ত্র নিয়ে।’ ‘স্লো সিনেমা’ আন্দোলনের একেবারে প্রথমসারির মুখ ছিলেন তিনি। তাঁর ছবির মধ্যে জড়িয়ে থাকত বিষণ্নতার রেশ।

উত্তরে বেলা তার হাসতে হাসতে বলেছিলেন, সিনেমাটি নিৎশেকে নিয়ে নয়, কিন্তু সেই ঘটনার আত্মা পুরো সিনেমার ওপর ছায়ার মতো বিস্তৃত। নিৎশে এখানে উপস্থিত একজন চরিত্র নন, বরং একটি নৈতিক ও দার্শনিক প্রতিধ্বনি।

২০১১ সালে ‘দ্য তুরিন হর্স’ মুক্তির পর বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবেই বেলা তার ঘোষণা দেন, এটাই তাঁর শেষ ছবি। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৫৫! এরপর আর ছবি করেননি। দীর্ঘ অসুস্থতায় ভুগে তাঁর মৃত্যু হয় চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি ৭০ বছর বয়সে।

পরে তাঁর আরেকটি সিনেমা দেখি। এটি ১৯৯৪ সালে নির্মিত সাত ঘণ্টার মহাকাব্যিক ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’। এটি বেলা তার লাসলো ক্রাজনাহোরকাইয়ের উপন্যাস অবলম্বনে সৃষ্টি করেন।

বেলা তার (২১ ‍জুলাই ১৯৫৫ – ৬ জানুুয়ারি ২০২৬)
ছবি: সংগৃহীত

‘স্যাটানট্যাঙ্গো’র বাংলা অর্থ শয়তানের নৃত্য। (ট্যাঙ্গো—লাতিন আমেরিকায় উদ্ভূত একধরনের যুগল নৃত্য) সিনেমার গল্পটা এমন সময়কে নিয়ে, যখন হাঙ্গেরিতে যৌথ খামার ভেঙে পড়েছে। মূল চরিত্র ইরিমিয়াস। তার কথার ধরন বিভিন্ন মাত্রা দেয় সব সময়ই। দার্শনিক ভঙ্গিমা থাকে। এই ইরিমিয়াসই বিভিন্ন সময়ে গ্রামের মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে সর্বনাশের দিকে ঠেলে দেয়। সে আসলে প্রশাসনের এক গুপ্তচর। ক্ষমতাচর্চাকারী। কিন্তু তার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি মানুষ বিশ্বাস করে। ধু–ধু কাদামাখা ল্যান্ডস্কেপে একনাগাড়ে বৃষ্টি ঝরে সেই গ্রামে। আর এদিকে ইরিমিয়াসের কথার জাদুতে মানুষ প্রতারিত হয়ে একা হতে থাকে। কিন্তু এরপরও তার কথাকে মনে হয় আপ্তবাক্য। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক। যেমন ইরিমিয়াস সবাইকে বলে ‘টাকার গাছ’ আছে। সেটা সবাই বিশ্বাস করে। ইরিমিয়াস একজনের মৃত্যুর জন্য পুরো সবাইকে দায়ী করে টাকা দিতে বলে। সবাই টাকা দেয়।

মূলত কমিউনিস্ট শাসনামলকেই পরিহাস করা হয়েছে। এমনকি গির্জার ঘণ্টাও দেখা যায় বাজাচ্ছিল (শেষের দিকে আবিষ্কার হয়) একজন পাগল। সেই পাগল একটি ধাতব রড দিয়ে ঘণ্টার তালি মারছে এবং অবিরাম চিৎকার করছে যে তুর্কিরা আসছে। আর সবাই তুর্কিদের আগমনে ভয় পাচ্ছিল।

মিহলি ভিগের করা সংগীত এ ছবির মূল আকর্ষণ। এ সিনেমায় একই শট শুরুতে হয়তো ক্লোজ আপ, সেই শটই খানিক বাদে গিয়ে এক্সট্রিম লং শটে রূপান্তরিত হয়। এ রকম বিস্তৃতভাবে কোরিওগ্রাফ করা বর্ধিত ট্র্যাকিং শটও রয়েছে। সম্মোহনী ছন্দ এবং আসন্ন ধ্বংসের অনুভূতিতে পরিপূর্ণ রহস্যময় গল্প।

ইউরোপিয়ান ফিল্ম একাডেমির রিভিউতে এ সিনেমা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্যাটানট্যাঙ্গো’ হচ্ছে সিনেমার মহাকাব্য।

বেলা তার নিজেই বলেছিলেন, ‘৩০ বছর ধরে আমি একই বিষয়ে ছবি বানিয়ে চলেছি। মানুষের জীবনকে নিয়ে শোষক, মহাকালের প্রহসন ও ষড়যন্ত্র নিয়ে।’

‘স্লো সিনেমা’ আন্দোলনের একেবারে প্রথমসারির মুখ ছিলেন তিনি। তাঁর ছবির মধ্যে জড়িয়ে থাকত বিষণ্নতার রেশ। অনেক সমালোচকের দাবি, তারাকোভস্কির প্রভাব ছিল তাঁর কাজে। কারণ, তিনিও মনে করতেন, সিনেমায় গল্প দ্রুতলয়ে দেখাতে হবে এমন নয়। সিনেমার গল্প নির্বাচন বিষয়ে তিনি গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি গল্প কেয়ার করি না। কখনোই করিনি। সব গল্পই আসলে একই গল্প। আমাদের কাছে নতুন কোনো গল্প নেই। আমরা পুরোনো গল্পগুলোই পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছি। আমি আসলেই মনে করি না মুভি বানানোর সময় আপনাকে গল্প নিয়ে ভাবতে হবে। ফিল্ম গল্প নয়। এর বেশির ভাগই হচ্ছে ছবি, শব্দ এবং প্রচুর প্রচুর ইমোশন।’

১৯৫৫ সালে হাঙ্গেরির দক্ষিণাঞ্চলের শহর পেচে জন্মগ্রহণ করেন বেলা তার। ১৯৭৭ সালে নির্মাণ করেন তার প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘ফ্যামিলি নেস্ট’।