‘চূড়ান্ত বিচারে মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার নিজের চয়িত কর্মকাণ্ডে, কেবল ভাগ্যচালিত ঘটনায় নয়’—এটাই ছিল প্রয়াত মাহবুব উল হকের বিশ্বাস। ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত কর্মজীবন কিংবা উন্নয়ন-দর্শন—সব ক্ষেত্রেই তিনি এই বিশ্বাস ধারণ করেছিলেন।
মাহবুব উল হক একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; কৈশোরে উপমহাদেশের বিভাজনের ভয়াবহ অস্থিরতা ও গণহত্যার সাক্ষী হয়েছিলেন; এবং এমন এক সময়ে বেড়ে উঠেছিলেন, যখন সদ্য স্বাধীন দেশগুলো নানা দিক থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল। কিন্তু তিনি কখনোই ভাগ্যের ঘটনাগুলোকে নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রক হতে দেননি। তিনি গভীর আবেগের সঙ্গে ‘জীবনের সুযোগের সমতা’র পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও সামাজিক বিদ্বেষকে তিনি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। শান্তি, নিরাপত্তা এবং মানুষের কল্যাণের প্রতি তিনি ছিলেন অবিচলভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করেছিলেন; তিনি কখনোই কেবল ভাগ্যের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। সম্ভবত এ কারণেই তিনি শুধু মানব উন্নয়ন ধারণার প্রবর্তকই নন; বরং সারা জীবন এর অন্যতম প্রধান প্রবক্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।
মানব উন্নয়নের ধারণার মূল ভিত্তি হলো: মানুষই একটি জাতির প্রকৃত সম্পদ। উন্নয়নের মৌলিক লক্ষ্য এমন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে মানুষ দীর্ঘ, সুস্থ ও সৃজনশীল জীবন উপভোগ করতে পারে। মানব উন্নয়ন মানুষের পছন্দ ও সম্ভাবনার পরিধি সম্প্রসারণের একটি প্রক্রিয়া। উন্নয়নের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য শুধু উচ্চতর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা নয়; বরং প্রত্যেক মানুষের জন্য সম্ভাব্য বিকল্প ও সুযোগের ক্ষেত্র প্রসারিত করাও। মানব উন্নয়ন একই সঙ্গে একটি প্রক্রিয়া ও একটি ফলাফল। এটি যেমন মানুষের বিকল্প ও সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়, তেমনি সেই সম্প্রসারিত সুযোগ-সুবিধার বাস্তব ফলাফলের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেয়।
মানব উন্নয়নের ধারণা সম্পর্কে মাহবুব উল হক তিনটি মৌলিক বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতেন। প্রথমত, মানুষের বিকল্প ও সুযোগ তখনই বিস্তৃত হয়, যখন তারা অধিকতর সক্ষমতা অর্জন করে এবং সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ পায়। মানব উন্নয়ন এই দুটি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর জোর দেয়। যদি সক্ষমতা ও সুযোগের মধ্যে অসামঞ্জস্য থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও বঞ্চনার সৃষ্টি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, মানব উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ, কিন্তু কখনোই উন্নয়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়। আয় তখনই অর্থবহ অবদান রাখে, যখন তার সুফল মানুষের জীবনের মান উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়। কেবল আয়ের বৃদ্ধি কোনো লক্ষ্য হতে পারে না। উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মানুষকে।
তৃতীয়ত, মানুষের চয়নের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মানব উন্নয়ন ধারণা স্বীকার করে যে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং সেই সিদ্ধান্তের নজরদারি—প্রতিটি পর্যায়েই মানুষের অংশগ্রহণ থাকা অপরিহার্য।
চূড়ান্ত বিচারে, মানব উন্নয়ন হলো মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্য উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন।
মানুষের উন্নয়ন বলতে মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি বোঝায়। মানুষের জন্য উন্নয়ন বলতে বোঝায় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অবশ্যই মানুষের যাপিত জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এনে দেবে। আর মানুষের দ্বারা উন্নয়ন জোর দেয় যে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে এমন প্রক্রিয়াগুলোতে তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে।
১৯৯০ সালে মাহবুব উল হকের নেতৃত্বে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি প্রথম মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এটি ছিল বিশ্বের সামনে মানব উন্নয়নের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপনের একটি নমিত প্রচেষ্টা। মানব উন্নয়নের ধারণা, এর জন্য একটি সমন্বিত পরিমাপক নির্মাণ এবং সংশ্লিষ্ট নীতিগত বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে এই প্রতিবেদন উন্নয়নকে দেখার এবং মূল্যায়নের প্রচলিত ধারা আমূল বদলে দেয়।
মাহবুব উল হক উপলব্ধি করেছিলেন যে মানব উন্নয়ন সম্পর্কিত বিভিন্ন সূচক, পরিসংখ্যান ও পরিমাণগত তথ্যকে সম্মিলিতভাবে মানব উন্নয়নের হিসাব-নিকাশ বলা যেতে পারে। কিন্তু তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে এই হিসাবের শুধু একটি ব্যাপ্ত মাত্রিকতা নয়, এর একটি সারসংক্ষেপমূলক মাত্রিকতাও থাকা উচিত। তাঁর মতে, যত সমৃদ্ধই হোক না কেন, মানব উন্নয়ন সংক্রান্ত তথ্য, সূচক ও পরিসংখ্যানের বিস্তৃত ভান্ডারগুলোর একটি সমন্বিত পরিমাপক থাকা জরুরি। অন্যথায় মোট মাথাপিছু আয়ের একচ্ছত্র আধিপত্য কখনোই ভাঙা সম্ভব হবে না। মানুষ মানব উন্নয়নের বিস্তৃত তথ্যসমূহকে গুরুত্ব দেবে ঠিকই, কিন্তু উন্নয়নের সার্বিক অবস্থার একটি সহজ সূচক ব্যবহারের সময় তারা আবারও ওই মাথাপিছু আয়ের কাছেই ফিরে যাবে। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি এমন একটি সূচক তৈরির চেষ্টা করেন—একটিমাত্র সংখ্যা, যা এর মতোই সহজবোধ্য হবে, কিন্তু মানুষের জীবনের সামাজিক ও মানবিক দিকগুলোকে মাথাপিছু আয়ের মতো উপেক্ষা করবে না। সেই প্রচেষ্টার ফলেই সৃষ্টি হয় বিশ্বখ্যাত মানব উন্নয়ন সূচক।
মাহবুব উল হক নারী-পুরুষ সমতার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন যদি নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। এই দূরদর্শী চিন্তার ফল হিসেবে ১৯৯৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন নারী-পুরুষ সমতার ওপর নিবেদিত হয়। এতে শুধু নারীদের অবৈতনিক শ্রমের একটি আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নই করা হয়নি; বরং দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত সূচক চালু করা হয়েছিল: নারী-পুরুষ-সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক এবং নারীর ক্ষমতায়ন পরিমাপক।
১৯৯০ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন তাই মানব উন্নয়নের এই তিনটি মৌলিক মাত্রার ভিত্তিতে একটি সমন্বিত সূচক নির্মাণ করে, যার নাম মানব উন্নয়ন সূচক। এই সূচকে চারটি নির্ণায়ক অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল: দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য জন্মকালীন প্রত্যাশিত আয়ু; জ্ঞান অর্জনের মাত্রা নির্দেশ করার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার এবং প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে সম্মিলিত ভর্তির হার; এবং একটি গ্রহণযোগ্য জীবনযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের প্রতীক হিসেবে ক্রয়ক্ষমতা সমতা সমন্বিত মাথাপিছু প্রকৃত আয়।
মাহবুব উল হক মানব উন্নয়ন সূচক সম্পর্কে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরতেন। প্রথমত, এই সূচক মানব উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিমাপক নয়। এটি মানব উন্নয়নের কেবল মৌলিক কয়েকটি মাত্রা ধারণ করে; মানব উন্নয়নের আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ দিক এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত, এটি মানব উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পরিমাপ করে। ফলে এটি উন্নয়ন নীতি বা সরকারি উদ্যোগের মতো প্রয়াস–প্রচেষ্টাকে প্রতিফলিত করে না এবং স্বল্পমেয়াদি মানব উন্নয়ন অর্জনও যথাযথভাবে পরিমাপ করতে পারে না। তৃতীয়ত, এটি একটি গড়ভিত্তিক সূচক। তাই একটি দেশের অভ্যন্তরে বিদ্যমান বৈষম্য ও অসমতার বহু দিক আড়াল হয়ে যায়। তবে নারী-পুরুষ, অঞ্চল, জাতি বা নৃগোষ্ঠীভিত্তিকভাবে বিভাজিত মানব উন্নয়ন সূচক গঠন করলে সেই লুকিয়ে থাকা বৈষম্যগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। চতুর্থত, নিজস্ব গুরুত্বে নয়, বরং একটি সম্মানজনক জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের প্রতীক হিসেবে মাথাপিছু আয় মানব উন্নয়ন সূচকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সবশেষে, কোনো পরিস্থিতিতেই মানব উন্নয়ন সূচক মানব উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে পারে না। একটি সামগ্রিক মূল্যায়ন পেতে হলে একে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সূচকের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। অর্থাৎ মানব উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে শুধু মানব উন্নয়ন হিসাব-নিকাশ, কেবল মানব উন্নয়ন সূচক নয়।
মাহবুব উল হকের দক্ষ নেতৃত্বে মানব উন্নয়ন সূচক এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল যে মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনগুলো প্রথমত বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়; দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দেশের মধ্যে ইতিবাচক ও স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে; তৃতীয়ত, মানব উন্নয়নের বার্তা শক্তিশালীভাবে বিশ্বব্যাপী প্রচার করে; চতুর্থত, উন্নয়নকে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের সুযোগ দেয়; এবং সর্বোপরি মানুষের কল্যাণের একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে আয়ের আধিপত্য ভেঙে দেয়।
মাহবুব উল হকের সৃজনশীল চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব পরবর্তী মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনগুলোতেও (১৯৯১–১৯৯৬) প্রতিফলিত হয়। এসব প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ছিল মানব উন্নয়নের জন্য সরকারি ব্যয়, জনগণের অংশগ্রহণ, মানব উন্নয়নমুখী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি। তাঁর কিছু ধারণা ছিল বিশ্লেষণধর্মী, কিছু ছিল পরিমাপ পদ্ধতি সম্পর্কিত এবং অন্যগুলো ছিল নীতিনির্ধারণমূলক। বিশ্লেষণধর্মী ধারণাগুলোর মধ্যে ১৯৯৩ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে তিনি ‘কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি’র ধারণা উপস্থাপন করেন। এর অর্থ হলো, অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সম্প্রসারিত হচ্ছে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না; প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র মানুষের জীবনে পৌঁছাচ্ছে না। ১৯৯৪ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে মাহবুব উল হক মানব নিরাপত্তার ধারণা প্রবর্তন করেন। এই ধারণায় নিরাপত্তা বলতে কেবল রাষ্ট্রের ভৌগোলিক নিরাপত্তা বোঝানো হয় না; বরং কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা, আয়ের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা, পরিবেশগত নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রভৃতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ধারণা নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞাই বদলে দেয় এবং উন্নয়ন-চিন্তা ও নীতিনির্ধারণে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
মাহবুব উল হক নারী-পুরুষ সমতার একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, উন্নয়ন যদি নারীর দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থকে অন্তর্ভুক্ত না করে, তবে তা প্রকৃত উন্নয়ন হতে পারে না। এই দূরদর্শী চিন্তার ফল হিসেবে ১৯৯৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন নারী-পুরুষ সমতার ওপর নিবেদিত হয়। এতে শুধু নারীদের অবৈতনিক শ্রমের একটি আনুমানিক অর্থনৈতিক মূল্যায়নই করা হয়নি; বরং দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত সূচক চালু করা হয়েছিল: নারী-পুরুষ-সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক এবং নারীর ক্ষমতায়ন পরিমাপক। নারী-পুরুষ সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক নারীদের সক্ষমতা উন্নয়নের অর্জনকে মানব উন্নয়ন অনুরূপভাবে মূল্যায়ন করে, তবে নারী ও পুরুষের মধ্যকার বৈষম্যকে বিবেচনায় নেয়। অন্যদিকে নারীর ক্ষমতায়নের পরিমাপক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের সুযোগ ও ক্ষমতায়নের মাত্রা পরিমাপ করে। এই দুটি সূচক শুধু নারী-পুরুষ অসমতার একটি সমন্বিত মূল্যায়নই দেয়নি; বরং এই সমতা দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকেও মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে।
মাহবুব উল হক বিশ্বাস করতেন, ইতিহাসের প্রকৃত চালিকা শক্তি হলো ধারণা, বিপ্লব আসে তার পরবর্তী ধাপে। এটি ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম মৌলিক উপাদান। তাঁর মতে, নতুন কোনো ধারণার বিকাশ সাধারণত তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে। প্রথম পর্যায়ে থাকে সংগঠিত প্রতিরোধ; দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন ধারণাটি ব্যাপক কিন্তু সমালোচনাহীন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে; আর তৃতীয় পর্যায়ে সেই ধারণার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন হয় এবং বাস্তব জীবনে তার কার্যকর প্রয়োগ শুরু হয়।
নীতিনির্ভর চিন্তার মানুষ হিসেবে মাহবুব উল হকের প্রধান মনোযোগ সব সময়ই ছিল নীতিগত প্রভাব সৃষ্টির দিকে। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনগুলো অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন তাঁর বিভিন্ন উদ্ভাবনী নীতিপ্রস্তাব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ২০:২০ প্রস্তাব, যেখানে বলা হয়েছিল যে প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব সম্পদের ২০ শতাংশ এবং সরকারি উন্নয়ন সহায়তার ২০ শতাংশ মৌলিক সামাজিক সেবায় ব্যয় করবে। এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক নীতিগত বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানব উন্নয়নের জন্য অর্থায়নের উৎস হিসেবে টোবিন কর ধারণাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। একই সঙ্গে তিনি শান্তির লভ্যাংশ মানব উন্নয়নে বিনিয়োগের আহ্বান জানান এবং একটি বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব দেন। এ ছাড়া তিনি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মৌলিক সংস্কারের পক্ষে সাহসিকতার সঙ্গে মত দেন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা পরিষদ ও একটি বৈশ্বিক কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মতো প্রস্তাবও উত্থাপন করেন।
মাহবুব উল হকের সৃষ্ট এই বুদ্ধিবৃত্তিক উদ্যোগ—মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন—বিশ্লেষণ, তথ্য ও নীতিগত আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী উন্নয়নচর্চায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। প্রথমত, এটি জাতীয় পর্যায়ে নতুন নীতিগত বিতর্ক ও সংলাপের সূচনা করে এবং নীতিনির্ধারকদের নতুন উন্নয়ন কৌশল গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। দ্বিতীয়ত, এটি নারী-পুরুষ, অঞ্চল, জাতি ও নৃগোষ্ঠীভিত্তিকভাবে মানব উন্নয়ন সূচক বিশ্লেষণের প্রবণতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য ও অসমতা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হয় এবং সরকারগুলো প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ ও উপযুক্ত নীতি প্রণয়নে সহায়তা পায়। তৃতীয়ত, উন্নয়নকর্মী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব প্রতিবেদনকে অ্যাডভোকেসি বা জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। চতুর্থত, মানব উন্নয়নের বিশ্লেষণ কাঠামো, সূচক, পরিসংখ্যান এবং নীতিগত সুপারিশকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে অসংখ্য একাডেমিক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। পঞ্চমত, বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য গ্রন্থ বা শিক্ষাসামগ্রী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
মাহবুব উল হকের সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গিই জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রণয়নের উদ্যোগকে অনুপ্রাণিত করেছিল। ১৯৯১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে মাত্র চারটি দেশ—বাংলাদেশ, কলম্বিয়া, ঘানা ও পাকিস্তান—এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। কিন্তু আজ বিশ্বের ১২০টির বেশি দেশে প্রায় ৯০০টি জাতীয় মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন জাতীয় নীতি ও উন্নয়ন কৌশল প্রণয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি, উদ্ভাবনী তথ্যের ভান্ডার এবং জনসচেতনতা ও নীতিগত প্রচারণার শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মাহবুব উল হক অকালপ্রয়াণের আগে তাঁর প্রতিষ্ঠিত ইসলামাবাদভিত্তিক দক্ষিণ এশিয়া মানব উন্নয়ন কেন্দ্রের মাত্র দুটি মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রকাশের নেতৃত্ব দিতে পেরেছিলেন। একটি ছিল বঞ্চনা, অন্যটি শিক্ষাবৈষম্য নিয়ে। এই দুটি প্রতিবেদন দক্ষিণ এশিয়ায় এমন সব প্রশ্ন সাহসের সঙ্গে উত্থাপন করেছিল, যেগুলো আগে কখনো প্রকাশ্যে আলোচিত হয়নি; একই সঙ্গে সেসব দেশে আগে কল্পনাও করা হয়নি—এমন বহু উদ্ভাবনী নীতিপ্রস্তাবও তুলে ধরেছিল। তবে মাহবুব গভীরভাবে ব্যথিত ছিলেন এই ভেবে যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো দারিদ্র্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সম্মিলিতভাবে লড়াই করার পরিবর্তে আত্মবিনাশী সংঘাত ও যুদ্ধেই নিজেদের শক্তি বেশি ব্যয় করছে।
মাহবুব উল হক বিশ্বাস করতেন, ইতিহাসের প্রকৃত চালিকা শক্তি হলো ধারণা, বিপ্লব আসে তার পরবর্তী ধাপে। এটি ছিল তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির অন্যতম মৌলিক উপাদান। তাঁর মতে, নতুন কোনো ধারণার বিকাশ সাধারণত তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে। প্রথম পর্যায়ে থাকে সংগঠিত প্রতিরোধ; দ্বিতীয় পর্যায়ে নতুন ধারণাটি ব্যাপক কিন্তু সমালোচনাহীন গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে; আর তৃতীয় পর্যায়ে সেই ধারণার সমালোচনামূলক মূল্যায়ন হয় এবং বাস্তব জীবনে তার কার্যকর প্রয়োগ শুরু হয়।
সাহস ছিল তাঁর চিন্তাধারার আরেকটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। তিনি প্রায়ই বলতেন, পৃথিবীর প্রয়োজন আরও সাহসী ধারণা, ক্রমবর্ধমান আমলাতান্ত্রিক বা প্রযুক্তিনির্ভর হতাশা নয়। তাঁর উপলব্ধি ছিল, বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে জ্ঞানের অভাবের চেয়ে সাহসের অভাবই বেশি প্রকট। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত তাঁর শেষ গ্রন্থ ‘রিফ্লেকশনস অন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’–এ তিনি লিখেছিলেন:
‘মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার পুরো সময়ে আমি উপলব্ধি করেছি যে বিশ্বের কাছে এই প্রতিবেদনগুলোকে প্রিয় করে তুলেছে তাদের নির্ভীক সাহস; পেশাদারত্ব বজায় রেখেও অকপটে সত্য বলার ক্ষমতা; এবং প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কাছে কোনো ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক আপস না করার দৃঢ় প্রত্যয়।’
মাহবুব উল হক প্রয়াত হয়েছেন প্রায় তিন দশক আগে—১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করি; তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। দীর্ঘদিন তাঁর টেবিলে একটি ফলক ছিল, যাতে লেখা ছিল: ‘আমার সঙ্গে একমত হতে তোমরা অনেক বিলম্ব করে ফেলেছ, কারণ আমি ইতোমধ্যেই আমার মোট বদলে ফেলেছি।’ সম্ভবত আজও, তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও, বিশ্বের জন্য মাহবুব উল হককে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। কারণ, বিশ্ব এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি তাঁর ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব, তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও তাঁর স্বপ্নের বিশালতা।
মাহবুব উল হক এমন একটি পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতেন, যেখানে নিরাপত্তার প্রতিফলন ঘটবে মানুষের জীবনে, রাষ্ট্রের অস্ত্রভান্ডারে নয়; যেখানে দারিদ্র্যকে সামান্য জ্বরের মতো নয়, বরং দেহের ক্যানসারের মতো গভীর ও জরুরি সমস্যা হিসেবে মোকাবিলা করা হবে; যেখানে লিঙ্গসমতা কেবল সাময়িক প্রতিকার হিসেবে বিবেচিত হবে না, বরং উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হবে; যেখানে জনগণ রাষ্ট্র ও বাজার—উভয়কেই পরিচালিত করার ক্ষমতা অর্জন করবে, কারণ শেষ পর্যন্ত এই দুই ব্যবস্থারই মানুষের কল্যাণে কাজ করা উচিত; যেখানে দরিদ্র দেশগুলো দয়া বা অনুদান নয়, বৈশ্বিক বাজারে ন্যায্য প্রবেশাধিকার পাবে; এবং যেখানে শান্তি ও উন্নয়ন পাশাপাশি বিকশিত হবে।
তিনি লিখেছিলেন: ‘আগামী দশকগুলোতে আমাদের সবচেয়ে সৃজনশীল শক্তিকে যে সংগ্রামটি অব্যাহতভাবে চ্যালেঞ্জ জানাবে, তা হলো মানুষের অভাব-অনটন থেকে মুক্তির সংগ্রাম।’ আশা ছিল মাহবুব উল হকের দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সাধারণ মানুষের দূরদর্শিতা ও সংগ্রামী শক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। কারণ তাঁদেরই প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের ফলে একসময় অকল্পনীয় বলে মনে হওয়া ঘটনাগুলো—যেমন বার্লিন প্রাচীরের পতন কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের অবসান—বাস্তবে পরিণত হয়েছিল। তিনি নৈরাশ্যের মধ্যে কোনো ইতিবাচকতা দেখতেন না। তাঁর প্রিয় উক্তি ছিল: ‘যারা নৈরাশ্যবাদী, তাদের উন্নয়নের কাজে থাকা উচিত নয়।’ অধিকাংশ মানুষ বাস্তবতাকে যেমন আছে তেমনই দেখে প্রশ্ন করে ‘কেন?’ কিন্তু মাহবুব উল হক ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম, যাঁরা এমন কিছুর স্বপ্ন দেখেন, যা এখনো বাস্তব হয়নি এবং প্রশ্ন করেন ‘কেন নয়?’
ব্যক্তি হিসেবে মাহবুব উল হক ছিলেন অসাধারণ মানবিক গুণের অধিকারী। তিনি ছিলেন ভদ্র, মৃদুভাষী ও উদার হৃদয়ের মানুষ। তবে তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরতা ছিল আরও বিস্তৃত। তাঁর কোমল ও শান্ত স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে ছিল অসাধারণ দৃঢ়তা, অধ্যবসায় ও চরিত্রের শক্তি, যার পরিচয় তিনি ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিয়েছেন।
মাহবুব উল হক সবচেয়ে বেশি মূল্য দিতেন জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সততাকে। একবার তিনি বলেছিলেন, ‘সততা এমন একটি উপহার, যা কেবল বন্ধুরাই বন্ধুদের দিতে পারে।’ ‘রিফ্লেকশন্স অন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ গ্রন্থের উৎসর্গপত্রে তিনি তাঁর সন্তান তনিমা ও ফারহানকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন: ‘তনিমা ও ফারহানের প্রতি—জ্ঞান হোক তোমাদের তরবারি, আর প্রজ্ঞা হোক তোমাদের ঢাল।’ একজন পিতার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য এর চেয়ে মূল্যবান উপদেশ আর কী হতে পারে!
মাহবুব উল হক ছিলেন সংগ্রামী মানুষ; তিনি চ্যালেঞ্জ ভালোবাসতেন। তাঁর দুটি প্রিয় কবিতা ছিল টি এস এলিয়টের ‘ডু উই ডেয়ার’ এবং রবার্ট ফ্রস্টের ‘দ্য রোড নট টেকেন’। নিজের চিন্তা ও ধারণার মাধ্যমে তিনি নিরন্তর পৃথিবীর প্রচলিত ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তিনি সব সময় সেই পথই বেছে নিতে ভালোবাসতেন, যে পথে মানুষের পদচারণ কম। কারণ, আংশিকভাবে সেই পথ ছিল অধিকতর চ্যালেঞ্জিং; আবার আংশিকভাবে সেই পথ মানবজাতিকে আরও কার্যকর ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
মাহবুব উল হক কবিতারও অনুরাগী ছিলেন। তিনি নিজেই পাকিস্তানের প্রখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর অনূদিত গ্রন্থ অ্যান এলিউসিভ ডন সমালোচকদের উচ্চ প্রশংসা লাভ করে; এমনকি কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ নিজেও তাঁর অনুবাদের গুণগত মানে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে মাহবুব উল হক ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, যত্নশীল এবং সৌম্য স্বভাবের মানুষ। তাঁর কাছে স্ত্রী বাণী ছিলেন কেবল জীবনসঙ্গী নন, তাঁর চিন্তার অবিচ্ছেদ্য সহযাত্রী এবং জীবনের সব অর্জনের অন্যতম অংশীদার। সন্তান তনিমা ও ফারহানের প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল এবং তাঁদের নিয়ে গভীরভাবে গর্বিত। আর অসংখ্য বন্ধুর কাছে তিনি ছিলেন নির্ভরতার এক দৃঢ় স্তম্ভ, যাঁর সৌজন্য, উদারতা ও আন্তরিকতার স্পর্শে তাঁরা সবাই সমৃদ্ধ হয়েছেন।
মাহবুব উল হক প্রয়াত হয়েছেন প্রায় তিন দশক আগে—১৯৯৮ সালের ১৬ জুলাই। এই দিনে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করি; তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। দীর্ঘদিন তাঁর টেবিলে একটি ফলক ছিল, যাতে লেখা ছিল: ‘আমার সঙ্গে একমত হতে তোমরা অনেক বিলম্ব করে ফেলেছ, কারণ আমি ইতোমধ্যেই আমার মোট বদলে ফেলেছি।’ সম্ভবত আজও, তাঁর মৃত্যুর প্রায় তিন দশক পরেও, বিশ্বের জন্য মাহবুব উল হককে সম্পূর্ণভাবে মূল্যায়ন করার সময় আসেনি। কারণ, বিশ্ব এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি তাঁর ব্যক্তিত্বের মহত্ত্ব, তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তি ও তাঁর স্বপ্নের বিশালতা।
সেলিম জাহান: লেখক ও অর্থনীতিবিদ