হেমিংওয়ের প্রথম নারীরা

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

১০ বছরের বন্ধ্যা সময় পার করে ১৯৫০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ উপন্যাসটি। ফর হুম দ্য বেল টোলস পড়ার দীর্ঘ ব্যবধানের পর তাঁর পাঠকগোষ্ঠী এবারের দুর্বল উপন্যাসটি আগের উষ্ণতায় গ্রহণ করেনি। নতুন এই উপন্যাসে তিনি তাঁর কন্যাসম আদ্রিয়ানা ইভানচিচকে যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে আদ্রিয়ানা এবং তাঁর মায়ের পক্ষে ইতালিতে পরিচিতদের কাছে মুখ দেখানো কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। পঞ্চাশোর্ধ্ব হেমিংওয়ে শেষবারের মতো প্রেমে পড়েছিলেন তাঁর চেয়ে ৩১ বছরের কনিষ্ঠ আদ্রিয়ানার। আমরা জানতাম, তাঁর প্রথম প্রেম ছিল ইতালির মিলানে মার্কিন রেডক্রস হাসপাতালের নার্স অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে। কিন্তু তারও আগে, হেমিংওয়ের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন মিশিগানের পেটোস্কিতে ১৪ বছরের কিশোরী লুসি মার্জোরি বাম্পের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল তাঁর। গ্রীষ্মের ছুটিতে মামা প্রফেসর আর্নেস্ট ওহলের হটন বে বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন মার্জোরি। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ওহলের একটা সামার কটেজ ছিল সেখানে। গালে টোল পড়া লাল চুল আর সবুজ চোখের ছোটখাটো মেয়েটিকে স্বভাবতই ভালো লেগে গিয়েছিল সদ্য যুবা হেমিংওয়ের। সেই ভালো লাগা একসময় ভালোবাসায় পৌঁছে গিয়েছিল বলেই প্রতীয়মান হয়। আর মার্জোরির কাছে দীর্ঘদেহী সুপুরুষ ছেলেটিকে ভালো না লাগার কোনো কারণ ছিল না।

তাঁদের মধ্যকার সেই সম্পর্ক কৈশোর পেরিয়ে যৌবন পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এক মর্টার হামলায় মারাত্মক আহত হয়ে হেমিংওয়ে ভর্তি হয়েছিলেন মিলানের রেডক্রস হাসপাতালে। যুদ্ধাহত হেমিংওয়ে যখন ফেরত আসেন, বীরত্বের জন্য খেতাব পাওয়া এই যুবক হটন বে এলাকার তরুণীদের কাছে পরিণত হয়েছিলেন এক স্বপ্নপুরুষে। এ সময় অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে তাঁর এক বছরের কম সময়ের প্রেম ভেঙে যায়। প্রথম পরিচয়ের পর থেকে হেমিংওয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতিনির্ভর নানান বিষয় উঠে এসেছে মার্জোরি বাম্পের জবানিতে লেখা তাঁর মেয়ে জর্জিনা মেইনের বইয়ে। বইটিতে চিঠিপত্র, ছবি ও বাক্যালাপের সূত্রে জানা যায় হেমিংওয়ের জীবনের নানান অজানা তথ্য। এই মার্জোরিকেই অবিকল তুলে এনেছেন হেমিংওয়ে তাঁর ‘দ্য এন্ড অব সামথিং’ গল্পে। ‘দ্য থ্রি ডে রেইন’ গল্পে আবারও উপস্থাপন করা হয়েছে মার্জোরিকে এবং হীনভাবে তুলে আনা হয়েছে তাঁর মাকে। অ্যাক্রস দ্য রিভার অ্যান্ড ইনটু দ্য ট্রিজ উপন্যাসের জন্য আদ্রিয়ানা ও তাঁর পরিবারকে যেমন ইতালিতে পরিচিত মহলে কাছে বিপাকে পড়তে হয়েছিল, এই গল্প দুটির জন্য মার্জোরিকেও মুখোমুখি হতে হয়েছিল চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির। বইটিতে মার্জোরি লেখেন, ‘আমি সব সময় ভাবি, হেমিংওয়ে কেন আমাকে আর আমার মাকে ছোট করতে চেয়েছেন তাঁর দ্য নিক অ্যাডাম স্টোরিজ-এর ‘দ্য এন্ড অব সামথিং’ এবং ‘দ্য থ্রি ডে রেইন’ গল্পে।...যখন বুঝতে পারি যে অনুমতি ছাড়াই আমার সত্যিকার নাম মার্জ ব্যবহার করেছেন তিনি, সেটা ছিল আমার জন্য এক মানসিক আঘাত। আমার দীর্ঘ জীবনের পুরোটা জুড়ে এক গভীর ক্ষত রয়ে গেছে; কারণ, আমার সত্যিকার নাম দিয়ে অসত্যভাবে আমাকে চিত্রিত করেছেন আর্নেস্ট।’

আমরা জানতাম, তাঁর প্রথম প্রেম ছিল ইতালির মিলানে মার্কিন রেডক্রস হাসপাতালের নার্স অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে। কিন্তু তারও আগে, হেমিংওয়ের বয়স যখন ১৬ বছর, তখন মিশিগানের পেটোস্কিতে ১৪ বছরের কিশোরী লুসি মার্জোরি বাম্পের সঙ্গে পরিচয় ঘটেছিল তাঁর।

নতুন বন্ধুদের মার্জোরি কখনোই বলতে পারেননি যে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল তাঁর। পেটোস্কির মতো খুবই ছোট শহরে সবাই ছিলেন পরস্পরের পরিচিত, গল্পে এভাবে চিত্রিত হওয়ার কারণে আর কখনোই পেটোস্কিতে যেতে পারেননি মার্জোরি। বইটিতে মার্জোরির জবানিতে যা লেখা হয়েছে, তাতে বোঝা যায়, লাল চুলের এই কিশোরীর সঙ্গে হেমিংওয়ের পরিচয় ঘটে ১৯১৫ সালে। মার্জোরির বয়স তখন ১৪ আর হেমিংওয়ের ১৬। ছিপ ফেলে মাছ ধরে ফেরার পথে হেমিংওয়ের সঙ্গে পথে দেখা হয় তাঁর। ছোট এই মেয়েটির মৎস্য শিকারের প্রতি আগ্রহ আছে বুঝতে পেরে আর্নেস্ট তাঁকে তাঁর মাছ ধরতে যাওয়ার সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সেটি রক্ষাও করেছিলেন তিনি। তারপর দ্রুতই হেমিংওয়ের বোনদের সঙ্গে মার্জোরির বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তাঁরা সবাই হেমিংওয়ের নেতৃত্বে প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় মাছ ধরা, সাঁতার কাটা কিংবা বনভোজন করার অভিযানে যেতেন। হেমিংওয়ে যখন বিশ্বযুদ্ধের ইতালি ফ্রন্টে চলে যান, তখনও মার্জোরির সঙ্গে পত্রালাপ ছিল তাঁর। মার্জোরির ভাষ্যে, ‘তাঁর দিক থেকে আসা কথাগুলোতে সব সময় ছড়ানো থাকত বর্ণনামূলক শব্দবন্ধ, রূপক আর কাব্যিক চিত্রকল্প। অন্যদিকে তাঁর কাছে লেখা ভুল বানান আর ব্যাকরণে ভরা আমার চিঠিগুলো ছিল ছেলেমানুষের মতো, অপরিণক্ক।’

ইতালির রণাঙ্গনে হেমিংওয়ের আহত হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন মার্জোরি। তারপর লিখেছেন, ‘তিনি যখন ইতালি থেকে পেটোস্কিতে ফিরে আসেন, যুদ্ধের পোশাক পরে ঘুরে বেড়ানোর সময় আরও বয়স্ক ও মোহনীয় মনে হতো তাঁকে। যুদ্ধকালীন অ্যাম্বুলেন্স বাহিনীতে থাকার সময় মাথায় যে বেরেট পরতেন তিনি, আমাকে উপহার দিয়েছিলেন সেটি।’ ইতালিতে বীরত্বের জন্য পাওয়া পদকটিও হেমিংওয়ে উপহার দিয়েছিলেন মার্জোরিকে, তবে তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন সেটি। উপন্যাসে এই হারিয়ে ফেলা পদকটিকে আর্নেস্টের জীবনের গল্প ও নিয়তির প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন মার্জোরি। আমরা দেখেছি, আ ফেয়ারওয়েল টু আর্মস উপন্যাসে ক্যাথরিনও একইভাবে তাঁকে দেওয়া হেনরির মেডেলটি হারিয়ে ফেলেছিলেন। এই মার্জোরির সঙ্গে নিজের জীবনের কাহিনী নিয়ে লেখা হেমিংওয়ের দুটি গল্পের একটি ‘দ্য এন্ড অব সামথিং’। গল্পটি এ রকম:

১০ বছর পরে হর্টন বেতে এসে নিক অ্যাডামস আর মার্জোরি নৌকা বেয়ে এসেছে লেকে মাছ ধরে পিকনিক করতে। নিকের সঙ্গে মাছ ধরতে ভালোবাসে মার্জোরি, মাছ ধরার কৌশলও ওকে শিখিয়েছে নিক। বড়শি ফেলে কম্বল বিছিয়ে লেকের পাড়ে বসে দুজন। সঙ্গে করে আনা খাবার বের করে নিককে দেয় মার্জোরি। নিকের খেতে ইচ্ছা করছিল না। নারীসুলভ স্বভাবে মার্জোরির পীড়াপীড়িতে রাজি হয় নিক। খেতে খেতে কেউ কোনো কথা বলে না, কেউ কাউকে স্পর্শও করে না।

হ্রদ পেরিয়ে আকাশের গায়ে পাহাড়ের শরীর স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠতে দেখে একসময় নিক বলে, চাঁদ উঠবে। মার্জোরি খুশি হয়ে বলে, আমি জানি। নিক একটু বিরক্ত গলায় বলে, তুমি তো সবই জানো। মার্জোরি জানতে চায় কী হয়েছে ওর। নিক বলে, আমার কিছু বলার নেই, তুমি যেন সবকিছু জানো। মার্জোরি পীড়াপীড়ি করতে থাকলে নিক জানায়, ওর আর ভালো লাগছে না এসব। মার্জোরি চুপ করে থাকে। নিক বলে, ওর ভেতরের সবকিছু বরবাদ হয়ে গেছে। মার্জোরি জানতে চায়, ভালোবাসায় আর মজা নেই? নিক বলে, নেই। এ কথার পর কিছু না বলে নৌকা নিয়ে চলে যায় মার্জোরি।

মার্জোরি চলে যাওয়ার পর নিকের বন্ধু বিল আসে। ওর সঙ্গে কথোপকথনে বোঝা যায়, মার্জোরিকে নিকের বলা কথাগুলো এবং ওর চলে যাওয়াটা ছিল পূর্বপরিকল্পিত, আর সেটা ঘটেছে বিলেরই প্ররোচনায়।

মার্জোরির বয়স তখন ১৪ আর হেমিংওয়ের ১৬। ছিপ ফেলে মাছ ধরে ফেরার পথে হেমিংওয়ের সঙ্গে পথে দেখা হয় তাঁর। ছোট এই মেয়েটির মৎস্য শিকারের প্রতি আগ্রহ আছে বুঝতে পেরে আর্নেস্ট তাঁকে তাঁর মাছ ধরতে যাওয়ার সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং সেটি রক্ষাও করেছিলেন তিনি।
মার্জোরি বাম্প
ছবি: সংগৃহীত

দ্বিতীয় গল্প ‘দ্য থ্রি ডে রেইন’ গল্পটাতেও নিক নামের আড়ালে থাকেন হেমিংওয়ে, কিন্তু মার্জ নামটি ব্যবহার করেছেন কোনো ছদ্মনাম না দিয়ে। উল্লেখ্য, লুসি মার্জোরি বাম্পের ডাকনাম ছিল মার্জ। এই নামটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে দুটি গল্পেই।

এক বৃষ্টির দিনে নিক আর বিল দুই বন্ধু বনভূমির ভেতর নিকদের কটেজে গিয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। তাদের দীর্ঘ আড্ডার একপর্যায়ে বিল নিককে বলে যে মার্জের ব্যাপারটা চুকিয়ে ফেলে ভালো কাজ করেছে ও। নিক হালকাভাবে সায় দেয়। বিল বলে, নিক যদি ওকে বিয়ে করত, সারা ক্ষণ ওদের সঙ্গে সেঁটে থাকতে হতো ওকে, প্রতি রোববার ডিনার খেতে হতো ওদের বাড়িতে। তবে ব্যাপারটা ঠিকভাবেই সামাল দিয়েছে নিক। মার্জোরির মা একটা বিরক্তিকর মহিলা। একসময় ওরা যখন ঝড়ের মধ্যে শিকারে বের হয়, ততক্ষণে মার্জোরির ভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে একধরনের স্বস্তি বোধ করে নিক।

‘দ্য এন্ড অব সামথিং’ গল্পে মার্জোরির সঙ্গে নিকের ছাড়াছাড়ির বিষয়টাই ছিল প্রধান, কিন্তু ‘দ্য থ্রি ডে রেইন’-এ মার্জোরিকে নয়, বরং তাঁর মাকে সত্যিকার অর্থে খুব হেয় করে দেখানো হয়েছে। নিকের ভেতর ছিল মার্জোরির জন্য একধরনের দুঃখবোধ ও বিরহের ভাব। গল্পের নিকের ভেতরের এই অনুশোচনায় বোঝা যায়, পিপ-পিপ টু হেমিংওয়ে বইয়ে উল্লেখ করা মার্জোরির কাছে লেখা হেমিংওয়ের চিঠির ভাষা থেকে, ‘সবকিছু বোঝা গেলে অনেক কিছুকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।’ এটা যেন জীবনানন্দের ভাষায়, ‘সব ভালোবাসা যার বোঝা হল, —দেখুক সে মৃত্যু ভালোবেসে।’

মার্জোরির মায়ের প্রতি হেমিংওয়ের বিরূপ মনোভাবের মূল কারণের একটা সূত্র পাওয়া যায় বইটিতে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে যেভাবে দেখি, গল্পের এই মার্জ নিশ্চিতভাবে সত্যিকারের আমি নই। আমরা বিয়ের কোনো পরিকল্পনা করছিলাম না। আমাদের বিচ্ছেদের পেছনে আমার “বদমেজাজি” মায়ের কোনো ভূমিকা ছিল না। আসলে ব্যাপারটা ছিল ঠিক উল্টো। হেমিংওয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ায় আমার মা বরং খুশিই হয়েছিলেন। তিনি জানতেন যে আমি তাঁর তুলনায় যথেষ্ট পরিপক্ব ছিলাম না।’

গল্পটিতে মার্জোরির মাকে যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন হেমিংওয়ে, তাতে মার্জোরির ধারণা হয় যে তিনি মহিলাকে সত্যিই অপছন্দ করতেন। অপছন্দের কারণটা তিনি জানতে পারেন বহু বছর পর। তাঁর মা জানিয়েছিলেন যে একবার হেমিংওয়ে একান্ত আলাপে তাঁদের বিয়ের কথা তুলেছিলেন। তাঁর মা বলেছিলেন যে তাঁর মেয়েটি বিয়ের জন্য তখনো যথেষ্ট বড় হয়নি, কমপক্ষে কলেজ পার হতে হবে ওকে। সেই আলাপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হওয়ার জন্য মার্জোরির সম্ভাবনা বিষয়ে হেমিংওয়ের কৌতূহল। তাঁর মা জানিয়েছিলেন যে ঠাকুরমা মারা যাওয়ার আগে সম্পত্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা তাঁর মেয়ের নেই। মার্জোরির ধারণা, ঠাকুরমার সম্পত্তিতে তাঁর উত্তরাধিকারের বিষয়ে কোনো গুজব শুনেছিলেন হেমিংওয়ে। লেখালেখি করার সময় অন্য কোনো পেশা না থাকায় অর্থের প্রয়োজন ছিল তাঁর, মার্জোরিকে বিয়ে করলে সেটি সুলভ হতে পারত। বইটি থেকে জানা যায়, ১৯১৯ সালে হেমিংওয়ে তিন মাসের জন্য পেটোস্কিতে আসেন, যাতে এখানে বসে গল্প লিখে সেগুলো প্রকাশ করে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেন। সেখানে ইভা পোটার নামের এক বিধবার বাড়ির একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন তিনি। সে সময় তাঁর পাঠানো প্রায় সব লেখাই প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফেরত আসত। ফলে সব সময় অর্থকষ্টে থাকতে হতো তাঁকে। এ সময় একাকী বোধ করলে কিংবা ঘরে খাবার না থাকলে মার্জোরির ঠাকুরমার বাড়িতে গিয়ে হাজির হতেন তিনি।

দুটি গল্পে তাঁর চরিত্র তুলে আনার জন্য হেমিংওয়ের ওপর মার্জোরি বাম্পের ক্ষোভ অমূলক ছিল না। পরবর্তী সময়ে মার্জোরির মামাতো ভাই ইতিহাসবিদ উইলিয়াম ওহলে হর্টন বে এলাকার ইতিহাস লিখতে গিয়ে হেমিংওয়ে সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার সুযোগ ছাড়েননি। তিনি লেখেন, ‘মানুষ হিসেবে হর্টন বে এলাকায় হেমিংওয়ে খুব বেশি পছন্দের ছিলেন না। প্রকৃতপক্ষে তাঁর জীবন্ত কল্পনা দিয়ে স্থানীয় ভদ্র সম্প্রদায়ের বিরক্তি উৎপাদন করেছেন তিনি।’

গল্পে কৈশোরোত্তীর্ণ নিকের প্রথম শারীরিক অভিজ্ঞতা হয় হেমলক বনের ভেতর ট্রুডি গিলবি নামের এক আদিবাসী মার্কিন মেয়ের সঙ্গে। হেমিংওয়ে পরিবারের ওয়ালুন লেকের বাড়িতে হেঁশেল সামলানোর কাজ করত প্রুডেন্স বোলটন নামের এক আদিবাসী মেয়ে। এই নারীই তাঁর কৌমার্য ভঙ্গ করেছিল বলে জানা যায়।

যুদ্ধ থেকে ফেরার পর (১৯১৯) হেমিংওয়ে পেটোস্কিতে এসে এক বোর্ডিং হাউসে থেকেছিলেন কিছুদিন। সেই বাড়ির মালিকের মেয়ে স্মরণ করতে পারেন, মার্জোরিই ছিলেন একমাত্র মেয়ে, যাঁর সঙ্গে হেমিংওয়ে ঘুরে বেড়াতেন, বাকি সময়গুলোতে একটা নির্জন ঘরে বসে সারাক্ষণ টাইপরাইটারে লিখতেন। এলাকার অন্য বাসিন্দাদের মতে, মার্জকে সব সময় পাহারার মধ্যে রাখা হতো, তবে হেমিংওয়ে ওর ব্যাপারে প্রায় দিওয়ানা ছিলেন। পেটোস্কি হাইস্কুলের শিক্ষকদের কেউ কেউ মনে করতে পারেন যে মার্জোরির অপেক্ষায় ওর স্কুলের আশপাশে ঘুরঘুর করতেন হেমিংওয়ে। জীবনিকার কনস্ট্যান্স চ্যাপেলের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, মার্জোরি ও বিল দুজনই হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তবে বিল চাইতেন না হেমিংওয়ে এই মেয়েকে বিয়ে করুক।

প্রকৃতপক্ষে ইতালির রণাঙ্গনের পর্বটা বাদ দিলে কৈশোরোত্তীর্ণ হেমিংওয়ের জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য পর্ব (১৯১৫-২১) কেটেছে হর্টন বের প্রাকৃতিক পরিবেশে। এখানে ঘটে তাঁর প্রথম প্রেম এবং প্রথম নারীসঙ্গ লাভের অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতার ওপর একাধিক গল্প লিখেছেন তিনি। ‘দ্য এন্ড অব সামথিং’ এবং ‘দ্য থ্রি ডে রেইন’ ছাড়াও ‘আপ ইন মিশিগান’, ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’, ‘সামার পিপল’, ‘টেন ইন্ডিয়ানস’—গল্পগুলো হর্টন বের পটভূমিতে তাঁর প্রথম জীবনে আসা নারীদের নিয়ে আত্মজৈবনিক বলে প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত। পেইন্টাররা যে রকম দ্রুত কিছু স্কেচ করে রাখেন, হেমিংওয়েও কিছু পরিচিত চরিত্রের স্কেচ লিখে রেখেছিলেন ছোট ছোট অধ্যায়ে। তেমনই একটা চরিত্র ছিল পলিন রো। সেই সংক্ষিপ্ত চরিত্রচিত্রণে তিনি লেখেন, ‘(হর্টন) বেতে পলিন ছিল আমাদের দেখা একমাত্র সুন্দরী মেয়ে। গোবরগাদায় সোজা বেড়ে ওঠা চটপটে কোমল পদ্মের মতো।... মা-বাবা মারা যাওয়ার পর ব্রুজেট পরিবারে আসে ও।... সে সময় আর্ট সিগন্যাল সন্ধ্যায় ব্রুজেটদের বাড়িতে আসতে শুরু করে।... রাতের খাওয়ার পর পলিনকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়। প্রথম দিকে সে আর্টকে ভয় পেত, ওর মোটা ভোঁতা আঙুল, ওর গায়ে হাত রেখে কথা বলার অভ্যাস—এসব কারণে আর্টের সঙ্গে যেতে চাইত না ও। কিন্তু বুড়ো ব্রুজেট ওকে নিয়ে মজা করত।’ পলিনের বড় বড় চোখে ভয় থাকত, তবু সেই গোধূলিবেলায় ওকে আর্টের সঙ্গে যেতে হতো। সূর্যাস্তের সুন্দর দৃশ্য দেখিয়ে আর্টকে সে বলত, কী সুন্দর। আর্ট বলত যে ওখানে সূর্যাস্ত নিয়ে কথা বলতে আসেনি ওরা। তারপর এক হাতে ওকে জড়িয়ে ধরত। শেষ প্যারায় হেমিংওয়ে লেখেন, ‘কিছুদিন পর প্রতিবেশীদের কয়েকজন অভিযোগ করে, তারপর ওরা পলিনকে সংশোধন স্কুলে পাঠিয়ে দেয়। আর্ট কিছুদিন সরে থাকে, তারপর ফিরে এসে জেনকিনসদের এক মেয়েকে বিয়ে করে।’

পলিন রোকে নিয়ে তাঁর এই রেখাচিত্র পড়লে স্পষ্ট হয় যে ‘আপ ইন মিশিগান’ গল্পটির ভিত্তি রচিত হয়েছিল পলিন রো চরিত্রকে ঘিরেই। গল্পের লিজ কোটস চরিত্রের আড়ালে যে বাস্তবের পলিন রো ছিল, তার সম্পর্কে প্রতিবেশীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পলিনকে সংশোধন স্কুলে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ থাকলেও মূল গল্পে বিষয়টি নেই। লেখক কোনো কারণ না জানালেও ধারণা করা যায় যে পলিনের সঙ্গে আর্ট সিমন্ডসের সম্পর্কই ছিল অভিযোগের মূল কারণ এবং তার অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের কারণে তাকে সংশোধন স্কুলে পাঠানো হয়েছিল।

ফ্রান্সেস কোটস
ছবি: সংগৃহীত

হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের সংস্পর্শে আসা নারীদের আরেকজনকে পাওয়া যায় ‘ফাদারস অ্যান্ড সন্স’ গল্পে। এই গল্পের নিকের বাবার সঙ্গে হেমিংওয়ের বাবার চারিত্রিক বেশ মিল পাওয়া যায়। বাবাকে নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে তাঁর, কিন্তু তাঁকে চেনেন এমন অনেক মানুষই তখনো বেঁচে... তাই তাঁর মধ্যে গল্পের অনেক উপাদান থাকা সত্ত্বেও লিখতে পারছেন না তিনি। গল্পে কৈশোরোত্তীর্ণ নিকের প্রথম শারীরিক অভিজ্ঞতা হয় হেমলক বনের ভেতর ট্রুডি গিলবি নামের এক আদিবাসী মার্কিন মেয়ের সঙ্গে। হেমিংওয়ে-গবেষকদের মতে, হেমিংওয়ে পরিবারের ওয়ালুন লেকের বাড়িতে হেঁশেল সামলানোর কাজ করত প্রুডেন্স বোলটন নামের এক আদিবাসী মেয়ে। এই নারীই তাঁর কৌমার্য ভঙ্গ করেছিল বলে জানা যায়।

নিক অ্যাডামস সিরিজের ‘টেন ইন্ডিয়ানস’ গল্পেও বাস্তবের প্রুডেন্স বোলটনকে প্রুডেন্স মিচেল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে প্রুডেন্সকে ভালোবাসে নিক, তবে সবার কাছে অস্বীকার করে সেটা। আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের শ্বেতাঙ্গ আমেরিকানরা নিচু চোখে দেখে, ওদের মতে কোনো আদিবাসী মেয়ের উচিত নয় শ্বেতাঙ্গ যুবকের সঙ্গে সম্পর্ক করা। অন্য এক যুবকের সঙ্গে প্রুডেন্সের সম্পর্ক আছে, পিতার কাছ থেকে এ তথ্য জানার পর ওর অবিদ্ধতায় ব্যথিত ও ভগ্নহৃদয় নিক কাঁদে।

হেমিংওয়ে ১৯১৮ সালে ইউরোপ রওনা হওয়ার কয়েক মাস আগে প্রুডেন্স আত্মহত্যা করেছিলেন। এ সময় আবিষ্কৃত হয়, তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন তিনি। অনাগত সেই সন্তানের পিতা কে ছিলেন, সেটা নিয়ে দ্বিমত আছে। পিটার গ্রিফিনের মতে, সেই লোক ছিলেন এক ফরাসি-কানাডিয়ান করাতি রিচার্ড রাসেল। তবে কনস্ট্যান্স চ্যাপেল মন্টগোমারির বিস্ফোরক তথ্যমতে, আত্মহত্যা করার সময় প্রুডেন্সের অনাগত সন্তানের বাবা হেমিংওয়ে ছিলেন বলে গুজব আছে।

ফ্রান্সেস কোটসের কাছে রক্ষিত হেমিংওয়ের স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

‘সামার পিপল’ গল্পের কেট চরিত্রটি বাস্তবে হেমিংওয়ের বান্ধবী কেট স্মিথ, পরবর্তী সময় যাঁকে বিয়ে করেছিলেন হেমিংওয়ের বন্ধু ও লেখক ডস পাসোস (১৮৯৬—১৯৭০)। গল্পটি ইন আওয়ার টাইম গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা ছিল হেমিংওয়ের, কিন্তু এটিতে নিক ও কেটের মধ্যকার যৌন সম্পর্কের মাত্রাতিরিক্ত বর্ণনার কারণে গল্পটি তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি। তা ছাড়া চরিত্রগুলোর আড়ালের বাস্তব মানুষদের কেউ কেউ তখনো বেঁচে। গল্পের নিক একটি মেয়েকে খুব পছন্দ করে, তার নাম কেট। অথচ মেয়েটির সঙ্গে সম্পর্ক অডগার নামের এক যুবকের। কেটকে প্রবলভাবে চায় নিক, তবে অডগার থাকলে নিজেকে গুটিয়ে রাখতে হয় ওর। নিকের ধারণা, কেট কখনোই অডগারকে বিয়ে করবে না। ওরা সবাই মিলে নৈশ সাঁতার কাটার পর বন্ধু বিল ওর গাড়িতে সবাইকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। নিক বাড়ি থেকে নিয়ে আসে শুকনা খাবার আর কেট নিয়ে আসে দুটো কম্বল। রাতের বেলায় হেমলক বনের নির্জনে আবার কেটের সঙ্গে বিছানায় মিলিত হয় নিক। রাতে ঘরে ফিরে বিছানায় শুয়ে নিক প্রার্থনা করে, যাতে পরদিন ভালো মাছ ধরতে পারে, ওর পরিবারের সবার যাতে মঙ্গল হয়, যাতে একজন ভালো লেখক হতে পারে ও, কেটের মঙ্গলের জন্য, এমনকি বেচারা বয়স্ক অডগারের জন্যও প্রার্থনা করে ও। এতদসত্ত্বেও গল্পটি অচ্ছুত হয়ে থাকে প্রায় ৫০ বছর। কারণ, বনের মধ্যে রাতের বেলায় দুজনের মিলিত হওয়ার রগরগে বর্ণনা সে সময়ের সংস্কারে যেকোনো বিচারে শ্লীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। সেই বর্ণনা এতটাই যৌনরসাত্মক ছিল যে দীর্ঘদিন পাণ্ডুলিপি হিসেবে অপ্রকাশিত পড়ে থাকার পর স্ক্রিবনার্স যখন এটিকে দ্য নিক অ্যাডামস স্টোরিজ সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করে, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি থেকে পাঠোদ্ধার করার সময় মুদ্রণকর্মীরা হেমিংওয়ের দেওয়া কেটির নাম ‘স্টাট’কে (stut) ‘স্লাট’ (slut—বেশ্যা) হিসেবে টাইপ করে। হয়তো গল্পের এই অংশটির সরস বর্ণনার আবহেই শব্দটি অযথার্থ মনে হয়নি তাদের; কারণ, হেমিংওয়ে যে কেটিকে ‘স্টাট’ বলে ডাকতেন, সেই তথ্য গবেষকদের জানা থাকলেও সম্পাদকদের জানা ছিল না। ধারণা করা যায়, এই মুদ্রণপ্রমাদের কারণে গল্পটির অশ্লীলতা আরও প্রকট হয়েছিল। মারাত্মক এই ভুল পরবর্তী সময় (১৯৮৭) দ্য কমপ্লিট শর্ট স্টোরিজ অব আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রকাশিত হওয়ার সময় সংশোধন করা হয়।

গল্পটির মূল পটভূমি হর্টন বে, এখানে হেমিংওয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে বিল স্মিথ ও কেটি স্মিথ নামের দুই ভাইবোনের। বিল তাঁর চেয়ে চার বছর এবং কেটি আট বছরের বড়। কেটির সঙ্গে পূর্বরাগ চলছে কার্ল এডগার নামের এক যুবকের। তবু কেটিকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন হেমিংওয়ে, সশরীরে চান তাঁকে। এই স্বপ্নকেই তুলে এনেছেন তিনি ‘সামার পিপল’ গল্পে। গল্পে কেটির নাম হয় কেট আর এডগারের নাম দেওয়া হয় অডগার। গল্পটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন কেটি বা হেমিংওয়ে কেউই বেঁচে নেই। কেটির জীবদ্দশায় গল্পটি প্রকাশিত হয়নি বলে তাঁকে মার্জোরি বা আদ্রিয়ানার মতো বিপদে পড়তে হয়নি। কেবল কেটি আর বিলই নয়, গল্পের বাকি চরিত্রগুলোর সবাইকেই সহজেই শনাক্ত করা যায়। কেটিকে হেমিংওয়ে কখনো ডাকতেন ‘বাটস্টেইন’, কখনো ‘স্টাট’। তাঁর চার বছরের ছোট ভাই হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিল স্মিথকে অন্য গল্পেও পাওয়া যায়।

দুই

হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের বান্ধবী এবং পরিচিতদের মধ্যে মার্জোরি বাম্প, পলিন রো, কেটি স্মিথ কিংবা প্রুডেন্স বোলটনের নাম বহু জীবনীকারের অনুসন্ধান ও লেখায় উঠে এসেছে, যাঁদের সবাইকে তিনি বিভিন্ন গল্পের চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু ক্যাথরিন ল্যাংওয়েল নামের আরেক তরুণীর খোঁজ পাওয়া যায়, যাঁর কথা প্রকাশ করেছেন মার্কিন সাংবাদিক ও লেখক রবার্ট কে এলডার। তিনি ছাড়া এই তরুণীর কথা একমাত্র উল্লেখ করেছেন জীবনীকার কার্লোস বেকার।

জানা যায়, হেমিংওয়ে যখন পায়ে আঘাত নিয়ে শুভ্রদেহে ইতালি থেকে ফিরে আসেন, সে সময় এই ক্যাথরিনের সঙ্গে তাঁর কিছু রোমান্টিক মেলামেশার ঘটনা ঘটেছিল। সেই সংক্ষিপ্ত সময়ের সান্নিধ্যের কথা ক্যাথরিন বলে গেছেন হেমিংওয়ের ভাই লেস্টারকে। তাঁরা দুজনে মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেস প্লেইনস নদীতে ডিঙি চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, ক্যাথরিনের বাড়িতে বসে শহর থেকে কিনে আনা ইতালিয়ান কেক খেতে খেতে নিজের লেখা নতুন গল্প পড়ে শোনাতেন তরুণ লেখক হেমিংওয়ে। স্বল্প সময়ের সঙ্গিনী ছিলেন বলে কিংবা কোনো গল্পের চরিত্রও হননি বলে হেমিংওয়ের জীবনীকারেরা এই তরুণী সম্পর্কে বিশেষ কিছু আবিষ্কার করেননি কিংবা বিশেষ গুরুত্ব দেননি বিষয়টিকে। কিন্তু জানা গেছে, ক্যাথরিনের প্রতি হেমিংওয়ে এতই ঝুঁকে পড়েছিলেন যে ইতালির যুদ্ধে তাঁর ব্যবহৃত একটা পোশাক তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু হেমিংওয়ের মা ব্যাপারটা পছন্দ করেননি বলে ফেরত নিয়েছিলেন পোশাকটি। আহত অবস্থায় ইতালির হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সেরে ওঠার পর ১৯১৯ সালের এপ্রিলে ক্যাথরিনকে পোস্ট কার্ডে হেমিংওয়ে একটা চিঠি লিখেছিলেন বলে জানান এলডার। অ্যারন ভেচ ও মার্ক কিনঞ্চুর সঙ্গে যৌথভাবে লেখা হিডেন হেমিংওয়ে: ইনসাইড দ্য আর্নেস্ট হেমিংওয়ে আর্কাইভস অব ওক পার্ক বইটির মালমসলা সংগ্রহের সময় স্বল্প পরিচিত এই তরুণী সম্পর্কে জানতে পারেন এলডার। ওক পার্ক অঞ্চলে হেমিংওয়ে সম্পর্কে একটা ধারণা প্রচলিত ছিল যে তিনি মেয়েদের ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন না, যা এলডারের অনুসন্ধানী চোখে সঠিক বলে মনে হয়নি। ওক পার্ক স্কুলের সমসাময়িক শিক্ষার্থীরা যা-ই বলুন না কেন, এলডার আবিষ্কার করেছেন যে হেমিংওয়ে তাঁর সহপাঠিনী অ্যানেথ দেভোর সঙ্গে গোপনে ডেটিং করতেন। একটা বেশ আবেগপূর্ণ কবিতাও লিখেছিলেন তাঁকে নিয়ে, তবে কবিতাটি তাঁকে দিয়েছিলেন কি না, সে সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। কবিতাটি ছিল এ রকম, ‘তোমার সঙ্গে নরকের ভেতর দিয়েও সানন্দে হেঁটে যাব আমি/ কিংবা দেব এই জীবন বিসর্জন।’

হেমিংওয়ে যখন পায়ে আঘাত নিয়ে শুভ্রদেহে ইতালি থেকে ফিরে আসেন, সে সময় ক্যাথরিনের সঙ্গে তাঁর কিছু রোমান্টিক মেলামেশার ঘটনা ঘটেছিল। সেই সংক্ষিপ্ত সময়ের সান্নিধ্যের কথা ক্যাথরিন বলে গেছেন হেমিংওয়ের ভাই লেস্টারকে। তাঁরা দুজনে মিলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দেস প্লেইনস নদীতে ডিঙি চালিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।

ধারণা করা যায়, ইতালির হাসপাতালের নার্স অ্যাগনেস কুরোওস্কির ব্যর্থ প্রেমের ক্ষতে প্রলেপ বোলানোর জন্য ক্যাথরিনের প্রতি ঝুঁকেছিলেন হেমিংওয়ে। হেমিংওয়ের জীবনের এই অজানা অধ্যায় সম্পর্কে খোঁজখবর করার একপর্যায়ে ক্যাথরিনের ছেলে পিটার ডেভিসের সাক্ষাৎ লাভ করেন এলডার। ডেভিস জানান, তাঁর মা হেমিংওয়ে সম্পর্কে কিছু বলতে চাইতেন না। তাঁর ধারণা, মায়ের নির্দেশে ক্যাথরিনের কাছ থেকে নিজের উপহার দেওয়া পোশাকটি ফেরত নেওয়ার পর বিব্রত হেমিংওয়ে তাঁকে যুদ্ধে পাওয়া তাঁর একটা মেডেল দিয়েছিলেন, কিন্তু সেটিও দীর্ঘদিনের পরিক্রমায় হারিয়ে গেছে। হেমিংওয়ের ভাই লেস্টারও তাঁর বইয়ে জানিয়েছেন, হেমিংওয়ে ইতালির রণাঙ্গনে বীরত্বের জন্য দুটো পদক পেয়েছিলেন, একটি ব্রোঞ্জ এবং আরেকটি রৌপ্যপদক। রুপারটি তিনি তাঁর এক বান্ধবীকে উপহার দিয়েছিলেন। বোঝা যায়, এই বান্ধবীটিই ক্যাথরিন। এলডারের তথ্য থেকে জানা যায়, ক্যাথরিনের সঙ্গে যখন ডেভিসের বাবা হাওয়ার্ড ডেভিসের বাগদান পর্ব চলছিল, সে সময়ও তাঁদের বাড়িতে আসা-যাওয়া ছিল হেমিংওয়ের। এমনকি তাঁদের পিয়ানোর ওপর হেমিংওয়ের একটা ছবিও থাকত।

তাঁদের দুজনের মধ্যকার রোমান্টিক সম্পর্ক কত দিন টিকে ছিল জানা যায়নি, তবে ডেভিস তাঁর মায়ের সঙ্গে একবার কিউবা ভ্রমণে গিয়েছিলেন, তখনো ফিদেল কাস্ত্রো ক্ষমতায় আসেননি। ডেভিস জানান, তাঁর মায়ের সঙ্গে হেমিংওয়ের টেলিফোন আলাপ চলেছে দীর্ঘদিন, যদিও তাঁর সঙ্গে বিখ্যাত হয়ে ওঠা এই লেখকের আর কখনোই দেখা হয়নি। ডেভিস এটাও বলেন, ‘বিশ্বাস করুন, আমার মা যে হেমিংওয়েকে বিয়ে করেননি, তাতে আমি খুশি। কী একটা উন্মাদ জীবন!’ তাঁদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হওয়ার বিশেষ কোনো কারণ জানা যায়নি, তবে ধারণা করা যায়, হেমিংওয়ে মিশিগান চলে যাওয়ার পর সম্পর্কের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছিল।

হেমিংওয়ের কলেজজীবনের আরেক বান্ধবীর খোঁজ পাওয়া যায় এলডারের সুলুকসন্ধানের সুবাদে, তাঁর নাম ফ্রান্সেস এলিজাবেথ কোটস। দুজন একই ক্লাসে পড়তেন এবং এই তরুণীর সঙ্গেও হেমিংওয়ের একটা পরিণতিহীন সম্পর্ক হয়েছিল। কোটসের নাতনি বেটসি ফেরমানোর সংগ্রহে থাকা তাঁদের দুজনের কিছু চিঠিপত্র আবিষ্কার করার পর এই সম্পর্কের ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন এলডার। মর্টার হামলায় মারাত্মক আহত অবস্থায় মিলানের রেডক্রস হাসপাতাল থেকে ফ্রান্সেসের কাছে লেখা হেমিংওয়ের চিঠি সযত্নে গচ্ছিত ছিল তাঁর (ফ্রান্সেস) নাতনি বেটসির কাছে। সেই চিঠির একটির তারিখ ছিল ১৫ অক্টোবর ১৯১৮। হেমিংওয়ে আহত হয়েছিলেন একই বছরের জুন মাসে। ধারণা করা যায়, অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে তখনো হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়নি। সুতরাং হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তাঁর মনে পড়েছিল একসময়ের সহপাঠিনী ফ্রান্সেস এলিজাবেথের কথা, যাঁর সঙ্গে কলেজে একটা সাহিত্য পত্রিকা বের করার জন্য কাজ করেছিলেন তিনি। হাসপাতালে রাতের খাবারের ট্রের উল্টো পাশে কাগজ রেখে বেয়নেটের সঙ্গে আটকানো মোমবাতির আলোতে চিঠিটি লিখছেন বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তারপর লেখেন, ‘এখন আমি ইতালীয় ভাষায় প্রেমপত্র পড়তে, বলতে ও লিখতে পারি।... কাউকে কখনো “আমার মূল্যবান সম্পদ” ডাকার মতো অবস্থায় নেওয়ার কথা ভাবিনি কখনো, কিন্তু “তেজোর আ মি” কলম থেকে বেরিয়ে গেল।’ এখানে উল্লেখ করা দরকার, ইতালীয় ভাষায় ‘মি তেজোরো’র ইংরেজি অর্থ ‘মাই ডার্লিং’। ভুল বানানে ইতালীয় ভাষায় তিনি সেটিই লিখেছিলেন ফ্রান্সেসকে।

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই সুন্দরী সহপাঠিনীর কথা তাঁর এতটাই মনে পড়ছিল যে তিনি বোন মার্সেলিনকে লেখেন, ‘ফ্রান্সেস কোটসকে ডেকে বলো যে তোমার ভাই মৃত্যুর দুয়ারে। বলবে, দয়া করে যাতে তাকে চিঠি লেখে ও, কোনো ওজর চলবে না। তাকে দিয়ে ঠিকানাটা দুবার বলাবে যাতে কোনো অজুহাত দিতে না পারে। বলবে যে ওকে ভালোবাসি আমি কিংবা যা ইচ্ছা বলবে।’

হেমিংওয়ের চিঠিগুলো কোটস যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন বলে সেগুলো থেকে বোঝা যায়, তিনিও লিখেছিলেন উদীয়মান এই লেখককে। তবে সেসব চিঠি হারিয়ে গেছে। হেমিংওয়ে তাঁর একটা চিঠির জবাবে লিখেছিলেন, ‘ভীষণ সুন্দর তোমার চিঠিটা, যত্ন করে রেখে দেব ওটা; কারণ, আমার ভেতর সব সময় একটা বিরাট আর মারাত্মক এবং তীব্র কৌতূহল ছিল, তোমার হাতের লেখা কেমন সেটা দেখা।... কিন্তু সত্যিই ফ্রান্সেস, এটা ছিল বর্ণনাতীত রকম সুন্দর একটা চিঠি...।’

বেটসি ফেরমানোর কাছে পাওয়া অন্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে মিলানের হাসপাতালের বিছানায় শোয়া হেমিংওয়ে এবং কলেজজীবনে তাঁদের দুজনের ডিজিনোকায় ভ্রমণের ছবি, পত্রিকায় ছাপা হওয়া হেমিংওয়ে-সম্পর্কিত খবর বা লেখার ক্লিপিং, তাঁর সব কটি বিয়ের সংবাদ এবং সবশেষে তাঁর আত্মহত্যার খবর। হেমিংওয়ের কলেজজীবনের একটা ছবিও সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ছিল ফ্রান্সেসের ঘরে। গবেষক এলডারকে বেটসি ফেরমানো বলেছিলেন যে তাঁর ঠাকুরমা ব্যাপারটিকে খুব বড় করে দেখাননি কখনো, দেখিয়েছেন, তাঁরা কেবলই বন্ধু ছিলেন। তাঁদের এই সম্পর্ক আরও গাঢ় হতে পারত, না-ও হতে পারত, তবে সে সময় জন গোস নামের আরেক সহপাঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন ফ্রান্সেস। হেমিংওয়ে ও হ্যাডলির বিয়ের আগের বছর তাঁরা বিয়েও করেছিলেন। ফ্রান্সেসের ভেতরেও হেমিংওয়ের প্রতি আকর্ষণ যে ছিল না, সেটি হলফ করে বলা যায় না। সুদর্শন এই উঠতি তরুণ লেখক সম্পর্কে ডায়েরিতে ফ্রান্সেস যা লিখেছিলেন, সেসব আপাতদৃষ্টিতে বিদ্রূপ মনে হলেও অগ্রাহ্য ছিল, সেটাই প্রমাণিত হয়, তা না হলে তাঁর কথা ডায়েরিতে লিখে রাখতেন না তিনি। সেখানে ফ্রান্সেস লিখেছিলেন যে হেমিংওয়ে হচ্ছেন লম্বা পায়ের ওপর পড়ো পড়োভাবে দাঁড়ানো বড়সড় বেঢপ এক... খুব কালো চুল আর লাল ঠোঁটের উপদ্রবকারী ছেলে। ধবধবে সাদা দাঁত, খুব সুন্দর ত্বকের নিচে মনে হয় রক্ত ছুটে যাচ্ছে, আর সারা মুখ লাল হয়ে উঠত এ সময়। শেষ দিকে এই অনুভূতিপ্রবণতাকে ঢাক দিতে ওর দাড়ি বিশেষ উপকারে এসেছিল। হাসলে সারা মুখ যেন ভেঙে পড়ত ওর।

হেমিংওয়ের দাম্পত্যজীবনের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে মনে হয়, তাঁর সঙ্গে নিজেকে না জড়িয়ে ফ্রান্সেস কোটস হয়তো একটা বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি নিজেও নামকরা অপেরা শিল্পী হতে পেরেছিলেন, কিন্তু তত দিনে বিখ্যাত হয়ে ওঠা হেমিংওয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের ব্যাপারে কখনোই মুখ খোলেননি। এমনকি হেমিংওয়ের জীবনীকার কার্লোস বেকারকেও দেননি বিশেষ কোনো তথ্য। তবে কার্লোস বেকারের বই থেকে জানা যায়, ফ্রান্সেস যখন জন গ্রেসের সঙ্গে নিজের প্রাক-বৈবাহিক সম্পর্কের কথা হেমিংওয়ের কাছে প্রকাশ করেন, তখন তিনি হতাশ মন্তব্য করেছিলেন যে সব ভালো মেয়ে দখল হয়ে যায়।

ফ্রান্সেসের রেখে যাওয়া কাগজপত্রের মধ্যে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে বোঝা যায়, রেডক্রসের কাজ নিয়ে যুদ্ধে চলে যাওয়ার আগে হেমিংওয়ে যখন কানসাস সিটি স্টার কাগজে কাজ করতেন, সে সময় তিনি ফ্রান্সেসের কাছে কিছু চিঠি লিখেছিলেন, যদিও সেগুলো পাওয়া যায়নি। তাঁকে লেখা মার্সেলিনের একটা চিঠিও পাওয়া যায়নি, যেখানে তিনি তাঁর ভাইয়ের যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য ফ্রান্সেসকে দায়ী করেছিলেন। তাঁর ধারণা, সে সময় ফ্রান্সেস যদি হেমিংওয়ের প্রেমের ডাকে সাড়া দিতেন, তাহলে তিনি হয়তো যুদ্ধে চলে যেতেন না।

বিয়ে হয়ে গেলেও হেমিংওয়ের সঙ্গে পত্রালাপ চালু ছিল ফ্রান্সেসের, এমনকি হেমিংওয়ের প্রথম বিয়ের পরও। হেমিংওয়ের কাছে ফ্রান্সেসের লেখা শেষ চিঠিটা ছিল ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে, সে মাসেই যে হ্যাডলির সঙ্গে হেমিংওয়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে, সেটা তখনো জানা ছিল না ফ্রান্সেসের।
ক্যাথরিন লংওয়েল
ছবি: সংগৃহীত

ফ্রান্সেসের প্রতি হেমিংওয়ের যে অনুরাগ, সেটিকে কখনোই নিরুৎসাহিত করেননি বোন মার্সেলিন। ইতালিতে ভাইয়ের কাছে লেখা এক চিঠিতে (৩ জুলাই ১৯১৮) তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার মনে হয় তুমি জেনেছ... ফ্রান্সেস কোটস আর জ্যাক গোসের মধ্যে বাগদান হয়ে গেছে। তুমি চলে যাওয়ার পরদিনই খবরটা প্রকাশ করা হয়! (বিচক্ষণ ফ্রান্সেস!)’ পরের মাসে (২৫ আগস্ট) তিনি আরেক চিঠিতে লেখেন, ‘আমার আগের চিঠিতে ফ্রান্সেস কোটস আর জ্যাক গোসের বাগদানের কথা লিখেছিলাম তোমাকে, তবে যা-ই হোক না কেন, ওকে বলব যাতে চিঠি লেখে তোমাকে। এখনো বিয়ে হয়নি ওর, তুমি জানো।’

বিয়ে হয়ে গেলেও হেমিংওয়ের সঙ্গে পত্রালাপ চালু ছিল ফ্রান্সেসের, এমনকি হেমিংওয়ের প্রথম বিয়ের পরও। হেমিংওয়ের কাছে ফ্রান্সেসের লেখা শেষ চিঠিটা ছিল ১৯২৭ সালের জানুয়ারি মাসে, সে মাসেই যে হ্যাডলির সঙ্গে হেমিংওয়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেছে, সেটা তখনো জানা ছিল না ফ্রান্সেসের। তত দিনে দ্য সান অলসো রাইজেস প্রকাশিত হয়েছে, হেমিংওয়ের প্রথম পুত্র জ্যাক ওরেফে বাম্পির বয়স তখন তিন বছর। সেই চিঠিতে ফ্রান্সেস লিখেছিলেন, ‘মাত্র তোমার দ্য সান অলসো রাইজেস পড়ে শেষ করলাম, আমার চোখের সামনে তুমি এত জীবন্ত হয়ে আছ যে বলতেই হবে, বইটা যে কী পরিমাণ উপভোগ করেছি আমি।...যত বছর যাচ্ছে, সময় তোমাকে এক আশ্চর্যজনক মানুষে পরিণত করছে—তোমাকে দেখতে পেলে খুব ভালো লাগত—এক বছরের বেশি হয়ে মার্সকে [মার্সেলিন] দেখিনি—কেউ একজন বলল, তুমি নাকি আসছ। তোমার ছেলের সঙ্গে মানাবে, এমন মুগ্ধ করার মতো সুন্দর একটা মেয়ে আছে আমার—তোমার চমৎকার হ্যাডলির সঙ্গে দেখা হলে খুব ভালো লাগবে আমার... জনও বলছে এই কথা, আমরা দুজনই তোমাদের দেখার অপেক্ষায় আছি।’ চিঠিতে এমন কথা লিখলেও ফ্রান্সেস তাঁর সঙ্গে হেমিংওয়ের ছবির ফ্রেমটার ওপর লিখেছিলেন, ‘আর্নির ছবি/ আর ২৫ বছর পর উফ্! জনকে বিয়ে করেছি বলে আমি কি খুশি!’

ইলিনয়ের ওক পার্ক ও মিশিগানের হর্টন বে এবং পেটোস্কি ছিল তরুণ হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের রোমান্স এবং নারী সংসর্গের অভিজ্ঞতার প্রথম পাদপীঠ। এখানে তিনি প্রুডেন্স, মার্জোরি, কেট, পলিন রো, ফ্রান্সেস কোটস, ক্যাথরিন প্রমুখ তরুণীর সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, সেসবের স্থায়িত্ব ছিল স্বল্পকালীন এবং শেষ হয়েছিল পরিণতিহীনভাবে। বাস্তব জীবনের এসব সঙ্গিনীর অনেকেই উঠে এসেছেন তাঁর গল্প-উপন্যাসে, কেউবা এমনকি স্বনামে। এসবের কিছু কিছু খুঁজে বের করেছেন তাঁর গবেষকেরা, অন্যদের মধ্যে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলেন মার্জোরি বাম্প। কারণ, তাঁর মেয়ে জর্জিনা একটা বই প্রকাশ করে হেমিংওয়ের তারুণ্যে এই নারীর উপস্থিতি এবং পরবর্তী সময়ে গল্পে তাঁকে বিরূপভাবে চিত্রায়ণ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলেন। এখানে উল্লেখ করা উচিত, হ্যাডলিকে বিয়ে করার পর হেমিংওয়ে যখন মধুচন্দ্রিমা কাটাতে মিশিগানের ওয়ালুন লেক অঞ্চলে তাঁদের সামার হাউসে কিছুদিন থাকতে যান, সে সময় তিনি নববিবাহিত সঙ্গীকে নিয়ে তাঁর পুরোনো বান্ধবীদের বাড়ি ঘুরে তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁরা যে তাঁর মতো একজন পাত্র হারিয়েছেন কিংবা তাঁরা যে প্রতিযোগিতায় হেরে গেছেন, সেটা দেখানোই ছিল উদ্দেশ্য। ব্যাপারটা হ্যাডলির পছন্দ হয়নি। হেমিংওয়ের আরেক বান্ধবী গ্রেস কুইনল্যানের কাছে লেখা হেমিংওয়ের কয়েকটা দীর্ঘ চিঠি পাওয়া গেলেও তাঁদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল বলে প্রমাণ নেই। জীবনীকার কনস্ট্যান্স চ্যাপেলকে হ্যাডলি বলেছিলেন যে তাঁর মনে হয়েছে মেয়েটি হেমিংওয়ের প্রেমে পড়েছিল। কুইনল্যানের সঙ্গে হেমিংওয়ের ঘনিষ্ঠতা ও যোগাযোগের গভীরতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে দ্বিধা আছে। কারণ, সে সময় তরুণ এই উঠতি লেখকের বান্ধবীদের মধ্যে গ্রেসেরও ছিল তাঁর জীবনসঙ্গিনী হওয়ার সম্ভাবনা। তাঁর কাছে লেখা চিঠিগুলোতে পাওয়া যায় হেমিংওয়ের প্রেমকাতুরে মনোভাব, যদিও গ্রেসকে তিনি বোন বলেও সম্বোধন করেছেন কোথাও কোথাও লিখেছেন ‘সব বোনের সেরা’। এই সম্পর্ক আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতার ‘হৃদয়ের বোন’-এর কথা। এই তরুণী অধরা জেনেই কি হেমিংওয়ে তাঁকে বোন সম্বোধন করার কথা ভেবেছেন? এ প্রসঙ্গে আমরা আরও স্মরণ করতে পারি, পরিণত বয়সে হেমিংওয়ে যখন খ্যাতির শিখরে, তখন সুন্দরী তরুণীদের কাউকে অবলীলায় ‘মা’ সম্বোধন করতেন তিনি। গ্রেসকে কখনো লিখেছেন ‘প্রিয় বোন লিউক,’ কখনো ‘প্রিয়তমা জি’, কখনো ‘ডিয়ার ওল্ড জি’। চিঠির শেষে কখনো লিখেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের পক্ষ থেকে ভালোবাসা,’ কখনো ‘ভালোবাসা (যা কিছু পেয়েছি আমি)’ ইত্যাদি। একটা চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমি খুশি যে তুমি একই রকম আছ, অতি প্রিয়, অতি সুন্দরী, বয়সের চেয়ে আরও পরিণত, পেটোস্কির যাদের সঙ্গে আছ, তাদের ব্যাপারে বেশ অসন্তুষ্ট (ঈশ্বরকে ধন্যবাদ)।’ তারপর ‘শুভরাত্রি পুরোনো প্রিয়তমা—অনেক ভালোবাসি তোমাকে’ লিখে শেষ করেন চিঠি। আরেকটা চিঠিতে তিনি লেখেন, গ্রেসের জন্মদিনের কথা জানতে পেরে তাঁর জন্য উপহার কিনতে গিয়ে দেখেন, তাঁর কাছে আছে মাত্র ৫৯ সেন্ট, সেটা দিয়ে স্ট্যাম্প কিনবেন নাকি তাঁকে একটা পত্রিকার গ্রাহক করে দেবেন—এসব ভাবতে ভাবতে কোনোটাই মনঃপূত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাঁরা তিন বন্ধু মিলে ওর নামে কয়েক প্রস্থ পান করেছিলেন। সেই চিঠিতে লেখেন যে গ্রেসের পঞ্চদশী হওয়া উপলক্ষে ওকে নিয়ে একটা কবিতা লিখেছেন তিনি। তারপর লেখেন, ‘ভাবলাম, তুমি মনে করবে কবিতা লেখা খুব একটা বোকার মতো কাজ, তাই ওটা আর পাঠাইনি তোমাকে।’ সেই চিঠিতে তিনি আরও লেখেন যে তিনি কতখানি ব্যথিত যে গ্রেস আগের মতো তাঁকে আর পছন্দ করেন না। ‘কারণ, অন্য যে কারও চেয়ে অনেক বেশি পছন্দ করতাম তোমাকে, আমি আহত হই যখন শুনি যে আড়ালে আমার সম্পর্কে নানান কথা বলো তুমি।’ ২১ জুলাই ১৯২১ তারিখে লেখা চিঠিতে দেখা যায়, প্রথমবারের মতো হ্যাডলির কথা গ্রেসকে জানাচ্ছেন হেমিংওয়ে। ১৯ আগস্টের চিঠিতে হ্যাডলির সঙ্গে তাঁর বিয়ের পুরোহিত হিসেবে গ্রেসের পরিচিত যাজকদের ভেতর থেকে একজনকে নিয়োগ করার জন্য সাহায্য চেয়েছিলেন হেমিংওয়ে। সেই অনুরোধ রক্ষা করে একজনকে ঠিক করে দিয়েছিলেন গ্রেস।

ইলিনয়ের ওক পার্ক ও মিশিগানের হর্টন বে এবং পেটোস্কি ছিল তরুণ হেমিংওয়ের প্রথম জীবনের রোমান্স এবং নারী সংসর্গের অভিজ্ঞতার প্রথম পাদপীঠ। এখানে তিনি প্রুডেন্স, মার্জোরি, কেট, পলিন রো, ফ্রান্সেস কোটস, ক্যাথরিন প্রমুখ তরুণীর সঙ্গে বিভিন্ন সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন, সেসবের স্থায়িত্ব ছিল স্বল্পকালীন।

অ্যাগনেস কুরোওস্কির প্রত্যাখ্যানের পর হেমিংওয়ে তাঁর পড়শি ও কলেজজীবনের একাধিক তরুণীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন তাঁর নিজস্ব কায়দায়, সেসবের কোনোটিই পরিণতি পায়নি। তেমনই আরেকজনের দেখা পান তিনি যুদ্ধ থেকে পেটোস্কিতে ফিরে আসার পর। তাঁর নাম আইরিন গোল্ডস্টেইন, জন্মসূত্রে তাঁরা দুজন একই বয়সী, মাত্র তিন দিনের ব্যবধান। তাঁর পরিচিতদের কাছ থেকে জানা যায়, তিনি ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী এক তরুণী, যাঁর হাসি দেখলে হৃৎস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

মেরি ওয়েলশ তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, আর্নেস্ট একসঙ্গে দুজন মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তাঁর বয়স ২০ কি ২১ বছর। তাঁরা দুজনই ছিলেন অসাধারণ চমৎকার মেয়ে। মার্জোরি বাম্প আর গ্রেস এডিথ কুইনল্যান এবং হেমিংওয়ের দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী। তিনি লেখেন, ‘আর তখন তিনি খুঁজে পান তাঁর সত্যিকার প্রেম, আইরিন গোল্ডস্টেইন নামের এক ইহুদি মেয়ে... শহরের সবচেয়ে সুন্দরী রমণী।’

হেমিংওয়ে যেবার (১৯১৯) শীতের ছুটি কাটাতে পেটোস্কিতে আসেন, সে সময় আইরিন তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্ধুসহ পার্টি করেছিলেন। হেমিংওয়ের জীবনীকার কার্লোস বেকারকে আইরিন বলেছিলেন, তীব্র ঠান্ডার মধ্যে তাঁরা আগুন পোহাতে পোহাতে গল্প করেছিলেন। সে সময় ‘স্টেইন’ নামে ডাকা এই সুপুরুষ, স্বাস্থ্যবান বহির্মুখী লোকটির প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। একপর্যায়ে হেমিংওয়ে তাঁর ট্রাউজার তুলে নিজের পায়ে যুদ্ধের সময় পাওয়া ক্ষতের দাগ দেখান। টরন্টো স্টার পত্রিকায় কাজ করতে যাওয়ার আগে তাঁরা দুজন শিকাগোতে কয়েক দিন একসঙ্গে কাটিয়েছিলেন। গ্রীষ্মের ছুটিতে পেটোস্কিতে এসে কয়েক সপ্তাহ টেনিস খেলে কাটিয়েছেন তাঁরা দুজন। সে সময় একবার আইরিনের পিসিমা তাঁদের বাড়িতে খাওয়ার নিমন্ত্রণ করলে, যাওয়ার সময় খবরের কাগজে মুড়ে বিশাল এক মাছ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন হেমিংওয়ে, বলেছিলেন, তাঁর নিজের ধরা মাছ। তবে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল, বাজার থেকে কেনা মাছ ছিল ওটা।

আইরিনের সঙ্গে আরেকবার হেমিংওয়ের দেখা হয়েছিল শিকাগোতে এক বন্ধুর ভাইয়ের অ্যাপার্টমেন্টে। সে সময় তাঁকে টরন্টো স্টার পত্রিকায় ছাপা হওয়া নিজের বিভিন্ন লেখার ক্লিপিং দেখিয়েছিলেন হেমিংওয়ে। একসময় আইরিনের ওভারকোট নেওয়ার জন্য শোবার ঘরে ঢুকে বিছানায় বসে গল্প করছিলেন দুজন, তখন আচমকা হেমিংওয়ে তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। জীবনীকার কার্লোস বেকারকে আইরিন জানান যে তিনি তাঁকে ঠেকানোর চেষ্টা করে বলেছিলেন, ‘আমি এসব করি না।’ তখন হেমিংওয়ে ক্ষমা চেয়ে বিড়বিড় করে বলেছিলেন, তিনি কখনো কোনো কুমারী মেয়েকে ধর্ষণ করেননি। তারপর একসময় নিরস্ত হয়ে ক্ষমা চেয়ে আইরিনকে কোট পরতে সাহায্য করে শেষ পর্যন্ত ট্যাক্সিতে রেলস্টেশন পর্যন্ত এগিয়েও দিয়ে এসেছিলেন। সেদিনের ঘটনার পর হেমিংওয়ের সঙ্গে আইরিনের চিঠিপত্রে যোগাযোগ বন্ধ হয়নি, এমনকি হ্যাডলির সঙ্গে প্রেম পরিপক্ব হয়ে পরিণতিপ্রাপ্ত হওয়ার পরেও সেই যোগাযোগ অব্যাহত ছিল।

বহু বছর পর একদিন আচমকা পেটোস্কিতে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন হেমিংওয়ে। আইরিন তখন উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া তাঁর বাবার ডিপার্টমেন্ট স্টোরটি চালাচ্ছিলেন। তত দিনে হেমিংওয়ে চতুর্থবারের মতো বিয়ে করেছেন। স্টোরটিতে ঢুকে তাঁকে দেখে প্রায় ছুটে গিয়ে তাঁকে তুলে ধরে চুমু খান হেমিংওয়ে। এই দেখা হওয়ার দুই বছর পর তাঁকে পাঠানো জন্মদিনের শুভেচ্ছা কার্ডের জবাবে হেমিংওয়ে তাঁকে লিখেছিলেন যে পেটোস্কিতে শেষবার তাঁকে দেখার পর এমন গভীরভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন তিনি, মনে হচ্ছিল যেন বুকের ভেতরের সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেছে। তাঁর উত্তেজনা ছিল দ্রুতগতি লিফটে চড়ে ২০ তলায় উঠে যাওয়ার মতো। অটুট চমৎকার শরীরে তাঁকে একই রকম সুন্দর ও আরাধ্যা মনে হয়েছে। তাঁর চেয়ে সুন্দরী ও মোহনীয় আর কোনো নারীর সঙ্গে আগে কখনোই দেখা হয়নি তাঁর ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর দীর্ঘ দিন তাঁদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ ছিল না। খবরের কাগজে হেমিংওয়ের আত্মহত্যার সংবাদ পড়ার পর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘কীভাবে এ কাজ করলে তুমি! বলেছিলাম তোমাকে দেখতে আসব!’ পেটোস্কি এবং ওক পার্কে হেমিংওয়ের তরুণ বয়সের একটা সময় কেটেছে, যখন সমবয়সী ও কাছাকাছি বয়সের কৈশোরোত্তীর্ণ একাধিক তরুণীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। সেসব সম্পর্কের পাত্রীদের এবং অন্যদেরও তিনি নামে-বেনামে চিহ্নিত করেছেন সমসাময়িক বিভিন্ন গল্পে। নিক অ্যাডামস সিরিজের গল্পগুলো সেই ঘরানার। নিজের লেখকজীবনের ভিত্তি তৈরি করার জন্য তাঁর এই প্রবণতার বিষয়ে এসব জায়গার অনেকেই অসন্তুষ্ট ছিলেন তাঁর ওপর। এ কারণেই বোধ করি তিনি পরবর্তী সময়ে আর কখনোই হর্টন বে এলাকায় যাননি। এ কথা নিশ্চিত, হেমিংওয়ের পরবর্তী জীবনের দাম্পত্য সমস্যা, বিচ্ছেদ ও বিবাহবহির্ভূত পরনারীচর্চা প্রত্যক্ষ করে প্রথম জীবনের নারীরা বিশ্বখ্যাত লেখকটির সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির জ্বালা ভুলে গিয়েছিলেন। কেবল প্রথম যৌবনেই নয়, পরবর্তী বিবাহিত জীবনেও একাধিক নারীর সঙ্গে যুগপৎ সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছিলেন হেমিংওয়ে। ইতালির হাসপাতালে আহত অবস্থায় অ্যাগনেস কুরোওস্কির সঙ্গে গভীর সম্পর্কে জড়ানোর আগে ও পরে দেখা যায় তাঁর এই যুগপৎ সম্পর্কের প্রবণতা। মার্জোরি বাম্প, কেট স্মিথ, গ্রেস কুইনল্যান, আইরিন গোল্ডস্টেইন, পলিন রো, ফ্রান্সেস কোটস, ক্যাথরিন ল্যাংওয়েল প্রমুখের সঙ্গে যেমন বিবাহ-পূর্ব সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন তিনি, বিয়ের পরও হ্যাডলির বর্তমানে পলিন ফেইফার, পলিনের সঙ্গে বিবাহিত অবস্থায় জেন ম্যাসন এবং তারপর মার্থা গেলহর্ন, আবার মার্থার সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির আগেই মেরি ওয়েলশের সঙ্গে প্রেম ও পরবর্তী সময়ে চতুর্থ পত্নী হিসেবে ঘর বাঁধা—জীবনপঞ্জির বড় অংশজুড়ে আছে হেমিংওয়ের এ রকম নারী সংসর্গের তথ্য ও দালিলিক প্রমাণ।

প্রথম যৌবনে আরও কিছু তরুণীর নাম জীবনীকারদের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, তবে সেসবের কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, তাঁর জীবনে আসা নারীদের প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক একসময় তিক্ততায় পর্যবসিত হয়েছিল, যার একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল প্রথম পত্নী হ্যাডলি, যাঁর সঙ্গে কেটেছে তাঁর বিবাহিত জীবনের ছয় বছর। প্রতীয়মান হয়, সম্পর্কগুলোর এ রকম পরিণতির জন্য দায়ী ছিল মাতৃশাসিত শৈশবের অপ্রিয় অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠা হেমিংওয়ের অস্থির জীবনযাপনপ্রণালি।

প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৩’ থেকে উদ্ধৃত