‘আশা’ এক দীর্ঘ মহাকাব্য, ব্যর্থতা যার মুখবন্ধ

অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘নিজের কাজের ওপর বিশ্বাস রাখা জরুরি। আমরা হয়তো ভবিষ্যৎ দেখতে পারি না, কিন্তু আমাদের কাছে “অতীত” আছে। সেই অতীত আমাদের কাজের নানা ধরন, মডেল, তুলনামূলক ধারণা, নীতি ও অনুপ্রেরণার রসদ দেয়। সেখানে সাহসিকতা, মেধা আর ধৈর্যের অগণিত বীরত্বগাথা রয়েছে। আর রয়েছে সেই গভীর আনন্দ, যা কেবল মহৎ কোনো কাজের মাধ্যমেই পাওয়া যায়। এসব সম্পদকে সঙ্গী করেই আমরা আগামীর নতুন সম্ভাবনাগুলোকে আঁকড়ে ধরতে পারি এবং আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে পারি।’

৯ বছর আগে দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় বিশিষ্ট কলামিস্ট রেবেকা সোলনিট তাঁর একটি জ্ঞানগর্ভ প্রবন্ধের সমাপ্তি টেনেছিলেন এই অনুচ্ছেদ দিয়ে। গভীর ও দীর্ঘ চিন্তাভাবনার মধ্য দিয়ে সোলনিট গুরুত্বের সঙ্গে জোর দিয়েছিলেন ‘আশা’ রাখতে, তা এই জন্য নয় যে এটি আমাদের এমন কিছু দেয়, যা আমরা স্বপ্নে দেখতে অভ্যস্ত, বরং আশা হলো মানুষের এক অবোধ্য অভ্যন্তরীণ তাগিদ, যা মানুষ তখনই অনুভব করে যখন সে নিজেকে উপলব্ধি করে একগাদা প্রতিশ্রুতির জমিনে, যার আকাশ একরাশ কালো সংকটের মেঘে ঢাকা। সেই মেঘ শুধু জমিন নয়, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মতো রাশি রাশি আকাঙ্ক্ষাকে গ্রাস করে।

একদা খ্যাতনামা ফরাসি ঐতিহাসিক ফার্নান্দ ব্রদেল ইতিহাসের ধীর-বিবর্তনশীল প্রকৃতির ওপর জোর দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোকে রূপদানকারী কিছু মৌলিক অদৃশ্য উপাদানগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। ব্রদেল জলবায়ু, ভূগোল, ভূতত্ত্ব ও কিছু শর্তহীন প্রাকৃতিক চলকের প্রভাবকে চিহ্নিত করেছেন, যা পরিবর্তনের গতিপথকে প্রভাবিত করে এবং যা কেবল ইতিহাসের কোনো এক পর্যায়ে এসে উপলব্ধি করা যায়। অথবা একে জার্মান দার্শনিক হেগেলের মিনার্ভার কাহিনির সেই বিখ্যাত দার্শনিক রূপকের মাধ্যমেও বোঝা যেতে পারে, যেখানে বলা হয়েছে, ‘মিনার্ভার প্যাঁচা কেবল গোধূলির আগমনেই তার ডানা মেলে।’ ব্রদেলের মতো হেগেলও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের ঘটনা-বাহুল্যের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা কেবল তাঁর নিজস্ব আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমেই অনুধাবন করা সম্ভব। সোলনিট যেমনটা বলেছিলেন, আমরা ভবিষ্যৎ জানি না এবং আমরা ভবিষ্যৎকে কেবল তখনই জানতে পারি, যখন তা আর ভবিষ্যৎ হিসেবে থাকে না।

অন্য কথায়, যেকোনো বিষয়ের ভবিষ্যৎ রূপটিই সর্বদা অধরা থেকে যায়। হেগেল যেমনটি ইতিহাসের দর্শনের ওপর তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতামালায় উল্লেখ করেছিলেন, তত্ত্ব (আকাঙ্ক্ষা) ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধানই হলো ইতিহাসের মূল চালিকা শক্তি। এই দুইয়ের মধ্যে সর্বদা রয়ে যায় এক ব্যবধান, ফাটল, পার্থক্য। আর এটিই সেই যৌক্তিকতার ভিত্তি গড়ে তোলে, যা ইতিহাসের ইঞ্জিনকে চালিত করে। হেগেলের মতে, বাস্তবতা সব সময় যুক্তিসংগত। কারণ, বাস্তবতা বড়ই ঐতিহাসিক।

হেগেল হয়তো অতিরিক্ত মাত্রায় বিমূর্ত ছিলেন এবং তাঁর বিপরীতে মার্ক্সসহ সে যুগের বহু বিখ্যাত চিন্তাবিদ ইতিহাসের সাধারণ গতিপথকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মূর্তভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন, যাতে মানুষ একে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখতে পারে। কিন্তু এই বিন্দুতে এসে হয়তো হেগেলই সঠিক ছিলেন যে আমরা যত বেশি বিশুদ্ধ সত্যকে জানতে চাইব, তত বেশি বিমূর্ততার মুখোমুখি হব। তাই মূর্ত বা বাস্তব ইতিহাস জানার পরিধির মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখাই শ্রেয় হবে, যা সোলনিটের মতে, আমাদের অন্তত একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্বেষণে আরও বেশি সক্রিয় হতে শেখাতে পারে।

একবিংশ শতাব্দীতে, বিশেষ করে গত দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, বিশ্বজুড়ে বহু স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এগুলোর কোনো কোনোটি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল, আবার কোনোটি ছিল বৈশ্বিক কোনো ঘটনা কিংবা নিপীড়ন, অন্যায় ও নানাবিধ দাবিদাওয়া-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া। এই আন্দোলনগুলোর সব কটি সফল হয়নি, এমনকি যেগুলো সফল হয়েছিল, সেগুলোও সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু তারপরও এই আন্দোলনগুলো কেবল তাদের সাফল্য বা চূড়ান্ত ফলাফলের মাপকাঠিতে মূল্যায়নযোগ্য নয়।

আমরা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, ঠিক যেমনটি আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলো দাঁড়িয়ে ছিল। একদিক থেকে আজ আমরা যা কিছু প্রত্যক্ষ করছি, তার অনেক কিছুই একেবারেই নতুন; আবার অন্যদিক থেকে অনেক কিছুই পরিবর্তনাতীত রূপেই রয়ে গেছে। আমাদের নিজেদের সামাজিক বাস্তবতাকে পশ্চিমা সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে তুলনা করার একটি স্বাভাবিক প্রবণতা আমাদের মধ্যে কাজ করে। এটি অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা যে বিষয়টি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই, তা হলো যে সমাজগুলোকে আমরা সাধারণত আদর্শ বা মডেল হিসেবে ধরে নিই, সেগুলোর বিবর্তনের ইতিহাসকে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না। গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সমান অধিকার ও নাগরিক অধিকারের প্রসঙ্গে আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে একটি আদর্শ দেশ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখাই।

কিন্তু এই উল্লেখযোগ্য সামাজিক অর্জনগুলোর উৎস খতিয়ে দেখার প্রবণতা আমরা দেখাই না। এগুলো হঠাৎই আকাশ থেকে পড়েনি কিংবা এমনি এমনি আসেনি। এমনকি এগুলো স্রেফ প্রযুক্তিগত বা বৈজ্ঞানিক অর্জনও ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের আন্দোলনের এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর দেশটির প্রাণকেন্দ্রে নাগরিক অধিকার আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আর কেবল ষাটের দশকের নাগরিক অধিকার আন্দোলনই নয়, ১৯৬০ সাল থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন দাবি, সংকট, ধারণা ও অধিকার আদায়ের ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রে অসংখ্য আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল। সোলনিট তাঁর দীর্ঘ প্রবন্ধে তৎকালীন এমন কিছু বাস্তব আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরেছেন, যা কেবল মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকেই গড়ে তোলেনি, বরং যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে খোদ আন্দোলনের ধারণাকে নতুনভাবে রূপদান করেছিল।

সোলনিটের মূল বক্তব্যই ছিল ‘আশা’ নিয়ে, তবে তা কোনো অলীক স্বপ্ন বা অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা হিসেবে নয়, বরং আশা হলো অনুপ্রেরণার সেই যোগসূত্রের এক অনিবার্য ফসল, যা যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন মহাদেশ, দেশ ও প্রজন্মের চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। আর একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একটি ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানের দুই বছর পর পেছনে ফিরে তাকিয়ে আমার মনে হয়, আমরা এখনো সেই গৌরবময় অতীত থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণার সূত্রগুলোকে বহন করে চলেছি।

আশার সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও জড়িত থাকে। কর্মপরিকল্পনাহীন আশা কোনো আশা নয়, তা কেবলই এক বিভ্রম। আর এই বিভ্রম মানুষকে হয় চরমপন্থার দিকে ঠেলে দেয়, না হয় তীব্র শূন্যতাবাদকে ডেকে আনে। প্রকৃত আশা গড়ে ওঠে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও কার্যকর কর্মতৎপরতার ওপর ভিত্তি করে। প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষ্যে পরিচালিত আন্দোলন কখনো ব্যর্থ হয় না। সত্যিকারের সক্রিয়তা ও আশার জগতে ‘ব্যর্থতা’ কেবলই একটি অর্থহীন বা অকার্যকর শব্দমাত্র। আমরা যদি বিগত দশকের দিকে তাকাই, তবে দেখতে পাব যে বাস্তব কিছু পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন দেশ-মহাদেশজুড়ে মানুষের শক্তিশালী সাড়া ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। বিপুল সামষ্টিক তৎপরতা ছিল।

একবিংশ শতাব্দীতে, বিশেষ করে গত দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত, বিশ্বজুড়ে বহু স্বতঃস্ফূর্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। এগুলোর কোনো কোনোটি সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নিয়েছিল, আবার কোনোটি ছিল বৈশ্বিক কোনো ঘটনা কিংবা নিপীড়ন, অন্যায় ও নানাবিধ দাবিদাওয়া-সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিক্রিয়া। এই আন্দোলনগুলোর সব কটি সফল হয়নি, এমনকি যেগুলো সফল হয়েছিল, সেগুলোও সব সময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারেনি। কিন্তু তারপরও এই আন্দোলনগুলো কেবল তাদের সাফল্য বা চূড়ান্ত ফলাফলের মাপকাঠিতে মূল্যায়নযোগ্য নয়।

কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস সেন্টারের গ্লোবাল প্রটেস্ট ট্র্যাকারের তথ্যানুযায়ী এই মুহূর্তে বিশ্বের ৩১টি দেশে কোনো না কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলছে। বিগত এক বছরে ১৬টি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে এমন দেশগুলোতে, যেগুলো আজও পরাধীন। একচিলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ যে দেশের মানুষগুলোর আকাঙ্ক্ষামাত্র। এই আন্দোলনগুলোর গোড়া আছে, দাবি আছে, আছে আকাঙ্ক্ষা, আছে ভবিষ্যৎ।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে যে আন্দোলনগুলো শুরু হয়েছিল, সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত এবং নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত। অধিকাংশই ছিল রাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতিমালার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। তিউনিসিয়া, মিসর ও আলজেরিয়ার আন্দোলনগুলোকে শুরুতে অরাজনৈতিক বলে মনে হলেও সেগুলোকে কি আসলেই অরাজনৈতিক হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়? মানুষ যখন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন সেটি কোনো অরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়; বরং তা গভীরভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবেই গণ্য হয়। নাগরিক অধিকার-সংশ্লিষ্ট প্রতিটি আন্দোলনই মূলত একেকটি রাজনৈতিক আন্দোলন। আর এই আন্দোলনগুলোর পরিবর্তনমুখিতাই সেগুলোকে আর বেশি রাজনৈতিক রূপ দিয়েছিল।

অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে রাজনৈতিক সংগ্রামের এই ধারা বিশ্বজুড়েই দেখতে পাওয়া যায়। ২০১১ সালে স্পেনের ‘১৫-এম’ আন্দোলন ‘প্রকৃত গণতন্ত্র’-এর দাবি তুলেছিল। ২০১৩ সালে একটি নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ইস্তাম্বুলের গেজি পার্কের গাছ কেটে ফেলার প্রতিবাদে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। যদিও আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল গাছ কাটার প্রতিবাদ দিয়ে, তবে জনসাধারণের উন্মুক্ত স্থানের সুরক্ষায় এত বড় আকারের একটি প্রতিবাদ মূলত নাগরিক অধিকারেরই বিষয় এবং স্বভাবতই তা রাজনৈতিক। একইভাবে ২০১৪ সালে হংকংয়ের ‘আমব্রেলা মুভমেন্ট’ ছিল চীনের এমন কিছু নীতিমালার প্রতিক্রিয়া, যা স্থানীয়দের নির্বাচনী অধিকারকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। এমনকি ২০১৮ সালে গ্রেটা থুনবার্গের হাত ধরে শুরু হওয়া বৈশ্বিক জলবায়ু আন্দোলনও রাজনৈতিক। কারণ, মানুষের বেঁচে থাকা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ নিশ্চিতকারী নীতিমালাগুলো নাগরিক অধিকারেরই মৌলিক ভিত্তি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই স্বতঃস্ফূর্ত গণ–অভ্যুত্থানগুলো বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানো অব্যাহত রেখেছে। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে সুদানের জনগণ ওমর আল-বশিরের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দাবিতে জেগে উঠেছিল। এর কিছুকাল পরেই বেলারুশের নাগরিকেরা একটি কারচুপিপূর্ণ ও অবৈধ নির্বাচনের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসে। করোনা মহামারি চলাকালীন জর্জ ফ্লয়েডের নির্মম মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রে এক বিশাল নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। একইভাবে ২০১৯ সালে চিলির সরকারের বিরুদ্ধেও গণবিক্ষোভের ঢেউ আছড়ে পড়েছিল এবং ফ্রান্সের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশেও মাখোঁ সরকারের জ্বালানি নীতিমালার বিরুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ প্রতিবাদে শামিল হয়েছিল। অন্যদিকে ইরাক ও লেবাননের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে মানুষ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। আর একেবারে সাম্প্রতিক সময়ে আমরা শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ২০২৪ সালে সংঘটিত জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সাক্ষী হয়েছি। শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণের নেতৃত্বে সংঘটিত বাংলাদেশের এই আন্দোলন সফলভাবে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে, যে সরকারটি তিনটি জাতীয় নির্বাচন কারচুপি করার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় টিকে ছিল। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস সেন্টারের গ্লোবাল প্রটেস্ট ট্র্যাকারের তথ্যানুযায়ী এই মুহূর্তে বিশ্বের ৩১টি দেশে কোনো না কোনো ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলন চলছে। বিগত এক বছরে ১৬টি আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে এমন দেশগুলোতে, যেগুলো আজও পরাধীন। একচিলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বাদ যে দেশের মানুষগুলোর আকাঙ্ক্ষামাত্র। এই আন্দোলনগুলোর গোড়া আছে, দাবি আছে, আছে আকাঙ্ক্ষা, আছে ভবিষ্যৎ।

বেনিয়ামিনের সমসাময়িক আরেকজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন আন্তোনিও গ্রামসি। ভাইকে লেখা একটি চিঠিতে বিপ্লব নিয়ে ধ্রুপদি বিশ্লেষণের শেষে বলেছিলেন, ‘আমি বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে একজন হতাশাবাদী, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির দিক থেকে একজন আশাবাদী।’ তৎকালীন সময় নিয়ে তাঁর সূক্ষ্ম ও আপসহীন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ একদিকে যেমন তাঁকে নিঃসন্দেহে বিংশ শতাব্দীর এক স্মরণীয় তাত্ত্বিকে পরিণত করেছিল, তেমনি তাঁকে সে সময়ের নির্মম, অমানবিক, ভয়াবহ এবং প্রায় অপরিবর্তনীয় বাস্তবতাকে মেনে নিতেও বাধ্য করেছিল। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তির মধ্যে এমন কী ছিল, যা তাঁকে আশাবাদী করে রেখেছিল?

আমরা বলতে পারি যে উল্লিখিত অধিকাংশ আন্দোলনই তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে অসমর্থ হয়েছে বা হবে, কিন্তু আমরা কি আসলেই এটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে এই আন্দোলনগুলোর কোনো ফলাফল নেই? এই আন্দোলনগুলো কি গভীর কোনো তাৎপর্য বহন করে না? এগুলো কি প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য কোনো অনুকূল ভিত্তি বা শর্ত তৈরি করেনি? আমার মনে হয়, পরিবর্তন নিয়ে কথা বলার আগে আমাদের খোদ ‘পরিবর্তন’–সম্পর্কিত নিজস্ব ভাবনাগুলোকে নতুন করে ভাবার দরকার আছে। যেকোনো ‘ফলাফল’ বা ‘প্রভাব’ উপলব্ধি করার যে ধরন বা পদ্ধতি, তা নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবার প্রয়োজন। সোলনিটের ‘আনুষঙ্গিক সুফল’ ধারণার সূত্র ধরে আমি বলব যে এই প্রতিটি আন্দোলন ও সামাজিক সক্রিয়তার একটি ধীর-বিবর্তনশীল সুফল রয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যক্ষ বা অনুভব করা যায় না।

ইতিহাস আমাদের দেখিয়েছে যে মহৎ কোনো উদ্দেশ্য থেকে জন্ম নেওয়া কোনো প্রচেষ্টাই কখনো বৃথা যায় না। আবার একই সঙ্গে পশ্চিমা আলোকায়নের প্রতিটি অঙ্গীকারই কিন্তু সময়ান্তরে ঘোর অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। কিংবদন্তি জার্মান চিন্তাবিদ ভাল্টার বেনিয়ামিন তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘থিসিস অন দ্য ফিলোসফি অব হিস্ট্রি’তে যেমনটা বলেছেন, ‘সভ্যতার এমন কোনো দলিল নেই, যা একই সঙ্গে বর্বরতারও দলিল নয়। এ ধরনের দলিল যেমন বর্বরতা থেকে মুক্ত নয়, তেমনি এটি এক মালিকের কাছ থেকে অন্য মালিকের কাছে স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকেও বর্বরতা দিয়ে কলুষিত করে।’ আবার এই একই মানুষ অবক্ষয়ের মধ্যেও নতুন সৌন্দর্য খুঁজে নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। ব্যর্থতা ও হতাশার চরম মুহূর্তে স্মৃতির ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কিংবা বহু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের লক্ষ্যের পতনের মধ্যেও বেনিয়ামিন আমাদের পরামর্শ দিয়েছিলেন এই সবকিছুকে কেবল এক ভয়ংকর পতন হিসেবে না দেখতে, বরং এই পুরো বিষয়টিকে একধরনের পরিত্রাণের উপায় হিসেবে গ্রহণ করতে।

বেনিয়ামিনের সমসাময়িক আরেকজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ ছিলেন আন্তোনিও গ্রামসি। ভাইকে লেখা একটি চিঠিতে বিপ্লব নিয়ে ধ্রুপদি বিশ্লেষণের শেষে বলেছিলেন, ‘আমি বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে একজন হতাশাবাদী, কিন্তু ইচ্ছাশক্তির দিক থেকে একজন আশাবাদী।’ তৎকালীন সময় নিয়ে তাঁর সূক্ষ্ম ও আপসহীন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ একদিকে যেমন তাঁকে নিঃসন্দেহে বিংশ শতাব্দীর এক স্মরণীয় তাত্ত্বিকে পরিণত করেছিল, তেমনি তাঁকে সে সময়ের নির্মম, অমানবিক, ভয়াবহ এবং প্রায় অপরিবর্তনীয় বাস্তবতাকে মেনে নিতেও বাধ্য করেছিল। কিন্তু তাঁর ইচ্ছাশক্তির মধ্যে এমন কী ছিল, যা তাঁকে আশাবাদী করে রেখেছিল? গ্রামসির এই ‘ইচ্ছাশক্তি’ আসলে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে এক অবিচল ও সক্রিয় অঙ্গীকারকে নির্দেশ করে, এমনকি যখন বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

পরিস্থিতি যা–ই হোক না কেন, হতাশার কাছে নতিস্বীকার না করে অবিরাম কাজ করে যাওয়া এবং পরিবর্তন আনার এক দৃঢ়সংকল্পই হলো সফলতার মুখবন্ধ। কাজেই গ্রামসির আশাবাদ, কেবল কিছু বাধাবিপত্তিকে উড়িয়ে দেওয়া বা অস্বীকার করা নয়, বরং সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করার এক সচেতন সিদ্ধান্ত। আর আজ দেশের ভেতরের বিপুল অনতিক্রম্য সামাজিক-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি এক বৈশ্বিক সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আমাদের আসলে আশাবাদী হওয়া প্রয়োজন। সাফল্যের প্রচলিত মাপকাঠিতে আমাদের ব্যর্থতার কথা মনে রেখেও বয়ানের লড়াইয়ে আমাদের এক দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। সোলনিটের আশার পথ, বেনিয়ামিনের পরিত্রাণের প্রয়াস, কিংবা গ্রামসির অবিচল ইচ্ছাশক্তি—যা-ই হোক না কেন, আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার মধ্যকার কঠোর ব্যবধানকে স্বীকার করেই আমাদের সেই অপরিহার্য ব্যর্থতাকে উপলব্ধি করতে হবে, যা প্রকৃত আশার পথ সুগম করে; যা এক দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের আশা।