আলোকচিত্র
উনসত্তরের প্রতিবাদী পথশিশু
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের এক আইকনিক সাদাকালো মিছিলচিত্র ঘিরে বহুদিনের বিশ্বাস, বিভ্রান্তি আর অনুচ্চারিত প্রশ্নের ভেতর দিয়ে এই লেখাটি এগিয়েছে। পথশিশুটির উঁচু মুষ্টি যেমন রাজপথের উত্তাপ বহন করে, তেমনি ছবিটির জন্মকাল, প্রকাশ-ইতিহাস ও ঘটনার বাস্তব প্রেক্ষাপট নিয়ে তৈরি হওয়া ধোঁয়াশাও সামনে এসেছে অনুসন্ধানের আলোয়।
একটি সাদাকালো ছবি আমাদের আবেগকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে যাঁরা বেড়ে উঠেছেন, তাঁরা জানেন কী অসাধারণ শক্তি জুগিয়েছিল ছবিটি। উনসত্তরের উত্তাল রাজপথে খালি গায়ে মুষ্টিবদ্ধ হাত উঁচিয়ে স্লোগান দিয়ে চলেছে এক পথশিশু, পেছনে বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ। মিছিলের সামনে থাকা ওই পথশিশুর নেতৃত্বে যেন বঞ্চিত মানুষেরা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এগিয়ে চলছে। শিশুটির পরনে চার পকেটের হাফপ্যান্ট, গেঞ্জিটা কোমরে বাঁধা। কণ্ঠে স্বৈরতন্ত্রের কবর রচনার হুংকার। দৃঢ় চোয়ালে অগ্নিস্পর্ধী সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ। পাঁজরগুলো যেন তিরের ফলার মতো শরীরের ভেতর থেকে বের হয়ে আসতে চায়। মিছিলের অগ্রভাগে থাকা অপ্রতিরোধ্য শিশুটি সেদিন সবার নজর কেড়েছিল। ছবিটি পরবর্তী সময়ে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের আইকনিক ছবিতে পরিণত হয়। এই ছবি আমাদের সংগ্রামী অতীতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। শিশুটির চোখ-মুখের ভাষা মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়নের কথা। ছবিটির দৃশ্যভাষা এতই শক্তিশালী যে এর অন্তর্নিহিত বাণী এখনো মানুষের মনে শিহরণ জাগায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আহ্বান জানায়।
অনেকেই মনে করেন, এই ঐতিহাসিক ছবি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তোলা এবং হাইকোর্টের সামনে ছাত্রদের মিছিলে স্লোগানরত অবস্থাতেই শিশুটিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শেষ বয়সে আলোকচিত্রী নিজেও এক তথ্যচিত্রে এমনটিই বলেছেন।
এই ছবির স্রষ্টা রশীদ তালুকদার। তিনি তখন দৈনিক সংবাদের নিজস্ব আলোকচিত্রী। রশীদ তালুকদারের এই ছবি কেমন করে মানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরি করল তা জানতে কৌতূহলবোধ করি। কয়েক বছর ধরে ছবিটি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালাই। এ ছবি নিয়ে আগেও লিখেছি। অনেকেই মনে করেন, এই ঐতিহাসিক ছবি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি তোলা এবং হাইকোর্টের সামনে ছাত্রদের মিছিলে স্লোগানরত অবস্থাতেই শিশুটিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শেষ বয়সে রশীদ তালুকদার নিজেও এক তথ্যচিত্রে এমনটিই বলেছেন। শিশুটি ঠিক কবে, কোথায়, কীভাবে মারা গেল—বিস্তারিত জানতে বাংলা একাডেমি ও বাংলাদেশ জাতীয় আর্কাইভসে গিয়ে ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত সব দৈনিক পত্রিকার ফাইল ঘাঁটি। খুঁজি এর প্রকৃত তথ্য। কিন্তু কোনো পত্রিকায় এ ছবি কিংবা শিশুটির মৃত্যুর সংবাদ না পেয়ে হতাশ হই। উনসত্তরের রক্তঝরা দিনে যেখানে গুলি আর মৃত্যুর সংবাদে পত্রিকার পৃষ্ঠা ভরা, সেখানে ঢাকার হাইকোর্ট ও শিক্ষা ভবনের মাঝামাঝি জায়গায় প্রকাশ্য দিবালোকে ছাত্রদের মিছিলে গুলির ঘটনা ঘটবে আর পত্রিকায় এক লাইনও ছাপা হবে না—বিষয়টি রহস্যময় লাগে। ঘোরলাগা বিস্ময়ে আমি আরও ১১ বছরের পত্রিকার ফাইল খুঁজি। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এ হত্যাকাণ্ডের কোনো সংবাদ আমি অন্তত পত্রিকার পাতায় খুঁজে পাইনি।
১৯৬৯ সালে কিন্তু প্রতিবাদী পথশিশুর ছবিটি ছাপা হয়নি। ছবিটি প্রথম ছাপা হয় ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদের বর্ষপরিক্রমা ক্রোড়পত্রে। ক্রোড়পত্রের আট কলাম শিরোনাম ছিল—‘সংগ্রামে সংঘাতে আর উত্তরণের জয়গানে মুখরিত অবিস্মরণীয় ১৯৬৯’। ক্রোড়পত্রে সারা বছরের যে ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়, তাতেও শিশুটির মৃত্যুর কথা উল্লেখ নেই। ক্রোড়পত্রে দুই কলামজুড়ে ভার্টিক্যাল ছবিটির নিচে লেখা হয়, ‘মুক্ত করো ভয়/ আপন মাঝে শক্তি ধরো/ নিজেরে করো জয়।’ এর পর থেকে প্রতিবছর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে দৈনিক সংবাদ প্রথম পৃষ্ঠায় গুরুত্বের সঙ্গে ছবিটি প্রকাশ করে। রশীদ তালুকদার ১৯৭৫ সালে সংবাদ ছেড়ে দৈনিক ইত্তেফাকে যোগ দেন। এরপর ইত্তেফাকও প্রতিবছর ২৪ জানুয়ারি ছবিটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে। তাই মানুষ ভাবে, ছবিটি বোধ হয় ওই দিনই তোলা।
উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি বুঝতে ২৪ জানুয়ারির রক্তাক্ত ইতিহাস পাঠ করা জরুরি। ছাত্রসমাজের ১১ দফা মুক্তিসনদকে সামনে নিয়ে উনসত্তরের ২০ জানুয়ারি দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে পূর্ব বাংলা ও তার রাজধানী ঢাকা। এর ধারাবাহিকতায় ২৪ জানুয়ারি কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে ঢাকার রাজপথে নামে জনতার ঢল। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গমালাকেও ম্লান করে দেয় সেদিনের জনসমুদ্রের বিক্ষুব্ধ ঊর্মিদল। অধিকার-সচেতন জনতার হুংকারে কেঁপে ওঠে অত্যাচারীর আসন। সেই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য গর্জে ওঠে স্বৈরাচারের রাইফেল। বুলেটের আঘাতে রাজপথে ঝরে পড়ে কয়েকটি প্রাণ। শহীদের লাশ নিয়ে রাজপথে মিছিলের ঢল নামে। কারফিউ জারির মাধ্যমে জনতাকে নিবৃত্ত করার সর্বশেষ প্রয়াসকে ব্যর্থ করে দিয়ে রাতের নৈঃশব্দ্যকে প্রকম্পিত করে মুক্তিপাগল মানুষ। এর কয়েক দিন পর জনতার অদম্য আন্দোলনের মুখে অত্যাচারী সরকারকে বিদায় নিতে হয়। সমাধি রচিত হয় আইয়ুব-মোনায়েমের রাজত্বের।
ওই দিন মতিউর ও রুস্তমের লাশ পড়েছিল সেক্রেটারিয়েটের সামনের রাস্তায়। জনতা লাশ দুটো উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। লাশ শনাক্তকরণ ও মৃত্যুসনদ সংগ্রহের পর শবদেহ নিয়ে মিছিল আসে পল্টন ময়দানে।
২৪ জানুয়ারি ছিল পূর্ণ দিবস হরতাল। ঢাকায় সেক্রেটারিয়েটের ভেতর থেকে পুলিশ দুই দফা গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে মারা যান ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউশনের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমান মল্লিক ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার মন্দিরাপাড়া হাইস্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সৈয়দ রুস্তম আলী। অপর হত্যাকাণ্ডটি ঘটে মতিঝিলে, সরকার–সমর্থিত পত্রিকা দ্য মর্নিং নিউজ ও দৈনিক পাকিস্তান অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার সময়। এরই প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ জনতা ‘আইয়ুব নগর’-এর নাম পাল্টে দেয়। মানুষ ফার্মগেটের কাছে আইয়ুব নগরের নামফলক তুলে সেখানে বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখে ‘শেরেবাংলা নগর’। তারা শাহবাগের কাছে মুসলিম লীগের অফিসেও আগুন দেয়। এসব ঘটনায় রাতে জারি করা হয় কারফিউ। পত্রিকা অফিসগুলোতে পাঠানো হয় প্রেসনোট।
ওই দিন মতিউর ও রুস্তমের লাশ পড়েছিল সেক্রেটারিয়েটের সামনের রাস্তায়। জনতা লাশ দুটো উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায়। লাশ শনাক্তকরণ ও মৃত্যুসনদ সংগ্রহের পর শবদেহ নিয়ে মিছিল আসে পল্টন ময়দানে। মিছিলের ওপর দিয়ে উড়তে থাকে একটি সবুজ রঙের হেলিকপ্টার। ক্ষুব্ধ জনতা তখন আকাশের দিকে জুতা উঁচিয়ে ধরে। পল্টন ময়দানের জানাজা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। পুষ্পবৃষ্টিতে দুই শহীদের খাটিয়া ভরে যায়। জানাজা শেষে লক্ষাধিক শোকাতুর মানুষ শব দেহ নিয়ে ইকবাল হলের [বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল] উদ্দেশে শোভাযাত্রা শুরু করে। পরদিন ২৫ জানুয়ারি দৈনিক সংবাদের প্রথম পৃষ্ঠায় শহীদ মতিউর ও রুস্তমের মুখের ছবি ছাপা হয়। ছাপা হয় হতাহতদের পরিচয়—নাম, বাবার নাম, বয়স, পেশা, কার-কোথায়-কীভাবে গুলি লাগে—তার বিস্তারিত বিবরণ। গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন যত হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে, তার পুরো বিবরণ পত্রিকাগুলোতে লিপিবদ্ধ আছে। বলা দরকার, ছাত্রদের পাশাপাশি সাংবাদিক সমাজও স্বাধিকার আদায়ের এ সংগ্রামে শামিল হয়েছিলেন। ফলে উনসত্তরের কোনো ঘটনা তাঁদের চোখে আড়াল হওয়ার কথা নয়।
তখন কারফিউ উঠে গেছে, কিন্তু দাবানল থামেনি। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র ইউনিয়নের একটি ছোট্ট মিছিল পল্টন থেকে শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছিল। তখন কয়েকটি পথশিশু মিছিলের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
রশীদ তালুকদারের যে মিছিলচিত্র নিয়ে এত আলোচনা, সেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক ও মুক্তিযোদ্ধা অজয় দাশগুপ্ত। ১৯ বছর বয়সী অজয় দাশগুপ্ত তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র ও ছাত্র ইউনিয়নের কর্মী। তাঁর কাছে এই ঐতিহাসিক মিছিলচিত্র সম্পর্কে জানতে চাই। স্মৃতি হাতড়ে অজয় দাশগুপ্ত বললেন, ছবিটি ২৪ জানুয়ারি তোলা নয়। ২৪ জানুয়ারির হরতাল ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। অন্য কোনো দিনের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। ছবিটি তোলা হয় এই হরতালের ৩-৪ দিন পর। তখন কারফিউ উঠে গেছে, কিন্তু দাবানল থামেনি। ওই দিন দুপুর ১২টার দিকে ছাত্র ইউনিয়নের একটি ছোট্ট মিছিল পল্টন থেকে শহীদ মিনারের দিকে যাচ্ছিল। তখন কয়েকটি পথশিশু মিছিলের মধ্যে ঢুকে পড়ে। মিছিলটি শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলের সামনে থাকা ওই প্রতিবাদী শিশুটির চেহারাও তাঁর স্পষ্ট মনে আছে। অজয় দাশগুপ্ত জানালেন, ওই দিন তাঁদের মিছিলে কোনো গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটেনি।
রশীদ তালুকদারের তোলা বাংলাদেশের গণ-আন্দোলনের আইকনিক ছবিটি নিয়ে এই যে এত ধোঁয়াশা, এত ভ্রান্তি কিংবা অস্পষ্টতা—এর আবিলতা দূর করতে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি মফিদুল হকের শরণাপন্ন হই। উনসত্তরে তিনি ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের একজন নিবেদিত কর্মী। আমার প্রশ্নের জবাবে মফিদুল হক বললেন, ‘উনসত্তরে ছবিটি ছাপা হয়েছে কি না মনে পড়ে না। তবে ছবিটি আইকনিক হয়েছে উনসত্তরের পরে। সময়ই আসলে আইকনিক হওয়া না হওয়া নির্ধারণ করে। সংবাদমূল্যের বিচারে তখন হয়তো ছবিটি ছাপা হয়নি। সংবাদপত্র সব সময়ই মেজর ইভেন্টকে হাইলাইট করে। ছবিটির অন্তর্নিহিত বাণী অনেক শক্তিশালী। কম্পোজিশন, কনটেন্ট ও ডিসাইসিভ মোমেন্ট—সব মিলে রশীদ তালুকদারের তোলা ছবিটি মানুষের কাছে প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে পরবর্তী সময়ে সংবাদপত্রের পাতায় বারবার ছাপা হয়েছে ছবিটি। ইতিহাস আসলে এভাইে লেখা হয়।’
রশীদ তালুকদার বেঁচে থাকলে তাঁর কাছে জানতে চাইতাম, এ ঘটনার পরের যে দৃশ্য তার নেগেটিভ কোথায়? কেন তখন পত্রিকায় ছবিটি ছাপা হলো না? পরবর্তী সময়ে প্রতিবাদী শিশুটির কী হলো? কেন শিশুটির পরিচয় আড়ালে থেকে গেল? গুলিতে মারা গেলে তাঁর সমাধি কোথায় হলো? কিংবা পুলিশ লাশ ছিনিয়ে নিয়ে গেলে আন্দোলনকারীদের মাঝে তাৎক্ষণিক কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল? এখন এসব জানার আর কোনো উপায় নেই। কারণ, রাষ্ট্রের অন্যমনস্কতায় এক নীরব অভিমান নিয়ে ২০১১ সালের ২৫ অক্টোবর অন্যলোকে পাড়ি জমান বাংলাদেশের মিছিলচিত্রের এই অনন্য রূপকার।