১১তম ছবি মেলা
আমানুল হক: দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান
আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র উৎসব ‘ছবি মেলা’ শুরু হচ্ছে ১৬ জানুয়ারি। এবারের উৎসবটি আয়োজিত হচ্ছে ‘পুনঃ’ থিমের আলোকে। ‘পুনঃ’ অর্থ আবার কিংবা অন্যভাবে শুরু করা। বর্তমান বিশ্ব তাকিয়ে আছে নতুন সময়ের জন্য। সেই ভাবনা থেকেই উৎসবকে সাজানো হয়েছে। এ উৎসবের বিশেষ আকর্ষণ ‘আমানুল হক : দ্য রোমান্টিক ডকুমেন্টেরিয়ান’ শিরোনামের প্রদর্শনী।
জন্মেছিলেন যমুনার উপকণ্ঠে সিরাজগঞ্জের কড্ডা গ্রামে, নানাবাড়িতে—আজ থেকে ঠিক এক শ বছর আগে কার্তিকের এক সন্ধ্যায়। জন্মের পর বাবা ডায়রিতে লিখলেন—‘৬ নভেম্বর, ১৯২৫, ২৬ কার্তিক, ১৩৩২ বঙ্গাব্দ।’ শনিবার জন্ম নেওয়া এই নবজাতকের নাম রাখা হলো ‘আমানুল হক’। ডাকনাম ‘মতি’। এই আমানুল হক জীবনভর বাংলার পথে-প্রান্তরে, নদী-খালে বজরা নাওয়ে ঘুরে ঘুরে ক্যামেরায় ধরেছেন বিপুলা জীবনের প্রতিচ্ছবি। নদী, নারী, নৌকা, জল-জমিন, আকাশ আর নদীপাড়ের মানুষের জীবন তাঁর ধ্যান হয়ে ওঠে। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের সৃজনশীল আলোকচিত্রচর্চার সূচনা পর্বের ভিত রচিত হয়।
আমানুলের দাদাবাড়ি সিরাজগঞ্জের ঘোরজান গ্রামে। বাবার চাকরিসূত্রে তাঁর শৈশব কাটে শাহজাদপুর ও উল্লাপাড়ায়। ব্রিটিশ আমলে শাহজাদপুর ছিল মহকুমা। এখন এটি সিরাজগঞ্জের একটি উপজেলা। চল্লিশের দশকে তাঁর ডা. বাবা আবদুল হক শাহজাদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র মনিরামপুরে বাড়ি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। মা হাজেরা খাতুন ছিলেন ধাত্রীবিদ্যায় প্রশিক্ষিত। ১১ ভাইবোনের মধ্যে আমানুল দ্বিতীয়। দুই বোন অবশ্য অকালপ্রয়াত। ১৯৩২ সালে শাহজাদপুর মাইনর ইংলিশ স্কুলে [বর্তমানে ইব্রাহিম গার্লস হাইস্কুল] তাঁর প্রাথমিক বিদ্যাশিক্ষা শুরু। বাড়ন্ত শৈশবে ছবি আঁকায় আকৃষ্ট হন। ছবি আঁকার হাতেখড়ি পান বাবার কাছে। ১৯৩৯ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন উল্লাপাড়া মার্চেন্ট হাইস্কুলে। অষ্টম শ্রেণিতে উঠতেই পেয়ে বসে ছবির নেশা। শাহজাদপুরে তখন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বেশ সম্প্রীতি ছিল। ওখানে তখন দুজন স্টুডিও ফটোগ্রাফার ছিলেন। একজন বীরেন সাহা, আরেকজন অতুল সাহা। বীরেন সাহাকে দেখেই ক্যামেরার প্রতি আকৃষ্ট হন আমানুল। তখন ১৯৪১ সাল।
ওই সময় হিন্দু-মুসলমানের ঘরে ঘরে পঞ্জিকা রাখা হতো। একদিন পঞ্জিকায় দেখলেন জাপানি ক্যামেরার বিজ্ঞাপন। ডাকযোগে লিখলেন, ‘এই ক্যামেরাটা আমার চাই।’ কয়েক দিন পর কলকাতা থেকে তাঁর বাসায় আসে সুন্দর একটি প্যাকেট। প্যাকেটটি খুলেই বুঝতে পারেন, এটা আসল নয়, খেলনা ক্যামেরা। মন খারাপ করে কেঁদে ফেলেন ছোট্ট আমানুল। এরপর হাতে আসে বেবি ব্রাউনি ক্যামেরা। এই ক্যামেরা দিয়েই ছবি তোলা শুরু। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে চলে যেতেন বাড়ি থেকে বহুদূরে—উল্লাপাড়ার বড়পাঙ্গাশী, সিরাজগঞ্জের কড্ডা, শাহজাদপুরের রূপপুর, পোতাজিয়া, রাউতারাসহ গহিন সব গ্রামে। সারা দিন খাওয়া হতো না। তাতে তাঁর শরীরে বাসা বাঁধে আলসার। শৈশবে অনিয়মের কারণে যে স্বাস্থ্যহানি ঘটে, তার ধকল বয়ে বেরাতে হয় সারা জীবন।
ম্যাট্রিক পাসের পর পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হলেন ঠিকই, কিন্তু ছবি তোলার নেশায় পড়াশোনার প্রতি তাঁর আর মন বসে না। এ সময় তাঁর ওপর ভর করে বেহালা বাজানোর নেশা। দেশে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর পঞ্চাশের মন্বন্তর–পরবর্তী দুর্ভিক্ষ। ওই সময় সিরাজগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় আসেন আমানুল। ঢাকার রাস্তায় দরিদ্রপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাঁর আলোকচিত্রকর্মের মূল উপজীব্য বিষয় হয়ে ওঠে। এসব মানবিক ছবি তোলার মাধ্যমেই পরিচয় হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে। শিল্পাচার্য তাঁর ভেতর দেখতে পান এক বিরল শিল্পপ্রতিভা। শিল্পাচার্যের অনুপ্রেরণাতেই তিনি ভর্তি হন ঢাকা আর্ট কলেজে। কিন্তু এখানেও তিনি মন বসাতে পারলেন না।
দেশভাগ–পরবর্তী সময়ে পরিচয় হয় প্রাদেশিক সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর সঙ্গে। তাঁর সহযোগিতায় তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিল্পী হিসেবে চাকরি পান। তখন আলোকচিত্রীদের শিল্পী বলা হতো। ছবি তোলার পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য তিনি আঁকতেন মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ছবি। কয়েক বছর পর শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। একুশের রক্তঝরা অপরাহ্ণে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাইস আইকন ক্যামেরায় তুললেন ভাষার দাবিতে প্রাণ হারানো মাথার খুলি উড়ে যাওয়া ভাষাশহীদ রফিকউদ্দিন আহমদের ছবি।
প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিস ওই দিন আমানুলের তোলা ছবিটি দৈনিক আজাদ অফিসে পাঠান। ছাপার জন্য ব্লকও তৈরি হয়। গভীর রাতে যখন ছাপা শুরু হবে তখন বাধে বিপত্তি। মালিকপক্ষের আপত্তিতে ছবিটি আর ছাপা হয় না। ছবির আরেকটি ব্লক পাঠানো হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে। ছাত্রদের প্রচারপত্রে সেটি ছাপা হয়েছিল। পরে পুলিশ এগুলো বাজেয়াপ্ত করে। আমানুলের তোলা এই ছবি ভাষা আন্দোলনের এক অবিনাশী দলিল। এই ছবির কারণে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান সরকার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
এই ছবিতেই প্রমাণিত হয়, মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে ফাঁকা গুলি নয়; বরং হত্যার উদ্দেশ্যেই ওই দিন গুলি চালানো হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই তিনি সরকারের বিরাগভাজন হন। গোয়েন্দারা তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন। গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি চলে যান আত্মগোপনে। বাধ্য হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের চাকরি ছাড়তে। ওই সময় তিনি তাঁর প্রিয় ক্যামেরাটিও হারিয়ে ফেলেন। ফলে তাঁর আয়ের পথটি বন্ধ হয়ে যায়। পালিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর যখন সঙিন অবস্থা, তখন তিনি তাঁর প্রিয় বেহালাটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। বেহালা বিক্রির সামান্য টাকা নিয়েই রওনা হন কলকাতায়।
বায়ান্ন আমানুলের জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। ওই বছর তেজগাঁও কৃষি কলেজের ফারমারস ফেয়ারে আলোকচিত্রী নওয়াজেশ আহমদ, নাইব উদ্দিন আহমদের সঙ্গে তাঁর প্রথম যৌথ আলোকচিত্র প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সেই প্রদর্শনীর রিভিউ ছাপা হয়েছিল কালচারাল জিওগ্রাফিতে। ইংল্যান্ডের ‘ফেস্টিবল অব ব্রিটেন’ প্রদর্শনীতেও প্রদর্শিত হয় তাঁর আলোকচিত্র। ওই বছরই কলকাতার প্রগতিশীল মাসিক পত্র নতুন সাহিত্যের শারদীয় সংখ্যার মুখপাতে ‘অলস মধ্যাহ্ন’ শিরোনামে ছবিটি ছাপা হয়। এই ছবি ছাপা হওয়ার পর দুই বাংলার শিল্পরসিকেরা বেশ নড়েচড়ে ওঠেন। তাঁরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করতে থাকেন—কে এই বিস্ময়কর আলোকচিত্রী?
কলকাতায় গিয়ে পরিচয় হয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। ‘পথের পাঁচালি’র কারণে সত্যজিৎ তত দিনে জগদ্বিখ্যাত। তখন ‘দেবী’ লিখছিলেন। ১৯৫৯ সালের এক রোববার সকালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমানুল হাজির হন সত্যজিতের ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে। ওই দিন আমানুল তাঁর ফ্রেমে বাঁধানো ‘অলস মধ্যাহ্ন’ ছবিটা সত্যজিতকে উপহার দেন। ছবিটা সত্যজিতের মনে ধরে। সত্যজিৎ ছবিটির অকুণ্ঠ প্রশংসা করে বিশ্বসেরা ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁর আলোকচিত্রের সাথে তুলনা করেন। এই ছবিই আমানুলকে সত্যজিতের হৃদয়ে জায়গা করে দেয়। এরপর ‘দেবী’, ‘তিন কন্যা’, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’, ‘মহানগর’, ‘পোস্টমাস্টার’, ‘নায়ক’, ‘ঘরে-বাইরে’ চলচ্চিত্র ও ‘রবীন্দ্রনাথ তথ্যচিত্র’–এর শুটিংয়ে তিনি ছিলেন সত্যজিতের একান্ত সঙ্গী। তিনি সত্যজিতকে ‘গুরু’ ডাকতেন। আর সত্যজিত তাঁকে বন্ধু ভাবতেন। সত্যজিৎ রায়ের জীবনীকার মারি সিটনের বইয়ে এসবের উল্লেখ আছে।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর কলকাতা থেকে দেশে ফেরেন আমানুল। ঢাকায় এসে উঠেন তাঁর ছোট মামা শামসউদ্দিন আলমাজির আজিমপুরের বাসায়। দেশে তখন ছয় দফার উত্তাপ। এই উত্তাপ গড়াতে থাকে উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের দিকে। সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী সময় তাঁর সংগ্রামী ক্যামেরার বিষয় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাঁর বজরার জীবন আমানুলের জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। বাবার চাকুসিূত্রে শৈশবে তিনি শাহজাদপুর সরকারি হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকতেন। এই হাসপাতালের পশ্চিমপাড়ে ছিল রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি। কুঠিবাড়ি আর হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হতো করতোয়া নদীর ক্ষীণ ধারা। শুষ্ক মৌসুমে সেই করতোয়ায় পানি থাকত না। এই কুঠিবাড়িই তাঁর শিল্পীজীবন গড়ে দেয়।
দেশে ফিরে শিকড়ের টানে আমানুল প্রায় চলে যেতেন শাহজাদপুরে, যেখানে তাঁর শৈশব পাখা মেলেছিল। রাউতারা, পোতাজিয়া ও রূপপুর গ্রামে হেঁটে হেঁটে সেখানকার মানুষ, শস্যখেত, নৌকাবাইচ আর খেলাধুলার ছবি তুলতেন। ১৯৭৬ সালে পরিচয় হয় রাউতারা গ্রামের অনাথ আলী মাঝির সঙ্গে। সেই থেকে দুই যুগেরও বেশি সময় অনাথ মাঝির তিন কক্ষবিশিষ্ট বজরায় ভেসে যমুনা, পদ্মা, বড়াল, ফুলঝুরি, হুড়াসাগর, করতোয়া, ইছামতী, কালীগঙ্গা নদী আর গাজনা বিলে ছবি তুলতেন। এই সব নদীর কাছে যেসব মানুষ থাকতেন, তাঁরাই আমানুলের ছবির বিষয় হয়ে ওঠেন। আর তাঁদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন মতিন ভাই’। তাঁর বজরা যখন গ্রামের পাশ দিয়ে যেত, তখন ছেলেপেলেরা আনন্দে চিৎকার করে বলত, ‘ফটক তোলা লাও যায়’।
শাহাজাদপুরে গিয়ে আমানুল প্রথমে উঠতেন রাউতারা জমিদারবাড়িতে, যেখানে তাঁর মামাতো বোন এলিজা খান এলি থাকতেন। কখনো কখনো উঠতেন মামাতো ভাই আবদুল মোমেন আলমাজি মনুর রূপপুরের বাড়িতে কিংবা নিজ বাড়ি রানি কুটিরে। আমানুল দেড় যুগেরও বেশি সময় এলিকে মডেল করে ছবি তুলেছেন। তার বেশির ভাগ ছাপা হতো সাপ্তাহিক বিচিত্রার বিশেষ সংখ্যার প্রচ্ছদে। নাসরিন জাহান খান উল্কা নামে ঢাকায় তাঁর এক মডেল ছিল। এ ছাড়া গ্রামের কয়েকজন অচেনা মেয়েকে মডেল করে ছবি তুলেছেন তিনি। মডেলদের পোশাক-আশাক, গয়না, সাজ—সবকিছুই নিজের পছন্দে নির্বাচন করতেন তিনি। আমানুল তাঁর মডেলদের রোমান্টিক ক্যামেরার সামনে রেখে বাংলার নারীদের একটা চিরন্তন রূপ তুলে ধরতে চেয়েছেন।
আমানুল কখনো যশের কাঙাল ছিলেন না। এসব তাঁকে স্পর্শ করত না। তবু তাঁর যশ এসেছে জোয়ারের মতো। ১৯৫৪ সালে ঢাকায় একটা সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দুনিয়ার নানা দেশে থেকে কবি-সাহিত্যিক আর সাংবাদিকেরা আসেন সেই সম্মেলনে। ওই সম্মেলনে আমানুলের শতাধিক ছবি দিয়ে ‘আমার দেশ’ শিরোনামে বিশেষ একটা প্রদর্শনী হয়। এটাই তাঁর প্রথম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি সুধীমহলে বেশ সাড়া ফেলে। তাঁর দ্বিতীয় একক প্রদর্শনী হয় ১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারী মহাসম্মেলন আয়োজনের অংশ হিসেবে। ওই সম্মেলনের উদ্যোক্তা ছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ভাসানী আমানুলকে ডাকতেন ‘শিল্পী’ বলে। ওই বছর চীনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী চৌ এনলাই পূর্ব পাকিস্তান সফরে এলে যুক্তফ্রন্ট সরকারপ্রধান আতাউর রহমান আমানুল হকের ‘আমার দেশ’ অ্যালবাম উপহার দেন।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমানুলের তোলা ‘আমার দেশ’ সিরিজের ছবি ছাপা হতো অবজারভার সানডে ম্যাগাজিন, দৈনিক পাকিস্তান সাময়িকী, মাসিক দিলরুবা, মাহেনও আর সওগাত পত্রিকায়। ইত্তেফাক আর দৈনিক সংবাদ পত্রিকায়ও ওই সময় তাঁর ছবি চাপা হতো। দেশ স্বাধীনের পর সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও পাক্ষিক বেতার বাংলার প্রচ্ছদে তাঁর তোলা ছবি নিয়মিত ছাপা হতো। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার বিশেষ আলোকচিত্রী হিসেবে বিভিন্ন দিবসে তাঁর ছবি দিয়ে পত্রিকাটির সাময়িকীর প্রচ্ছদ করা হতো। শেষ জীবনে তাঁর ছবি গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হতো দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায়। সাপ্তাহিক বিচিত্রা ও সাপ্তাহিক চিত্রালীতে লিখেছেন স্মৃতিগদ্য। একুশের তমসুক, প্রসঙ্গ সত্যজিৎ, ক্যামেরায় স্বদেশের মুখ, স্মৃতিচিত্র—এই চারটি অমর গ্রন্থের রচয়িতা তিনি। তাঁর বইগুলো ‘সাহিত্য প্রকাশ’ থেকে প্রকাশিত হয়।
ভাষা আন্দোলনে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১১ সালে একুশে পদক লাভ করেন আমানুল। তিনি ছিলেন এক নির্লোভী মানুষ। সারা জীবন অর্থের কষ্ট করে গেছেন। কখনো স্বাচ্ছন্দ্যের মুখ দেখেননি। একুশে পদকপ্রাপ্তির সময় তাঁকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা ও মোহাম্মদপুরে একটি বাড়ি দেওয়া হয়। সেই বাড়িটি ফিরিয়ে দিয়ে তিনি বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলেন, ‘এখনো অনেক মুক্তিযোদ্ধা রাস্তায় ঘুমান। আমার ঘুমাবার জায়গা আছে। তাই আমার এই বাড়ির দরকার নাই।’ বিনয়ের সঙ্গে তিনি বাড়িটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
একুশের পদক হিসেবে তিনি যে সোনার মেডেল ও সম্মাননাপত্র পেয়েছিলেন, তা তিনি দান করে গেছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। একুশে পদক ছাড়াও ২০১১ সালে ষষ্ঠ আন্তর্জাতিক ছবি মেলা আজীবন সম্মাননা, ২০১২ সালে দ্য ডেইলি স্টার সেলিব্রিটিং লাইফ আজীবন সম্মাননা, ১৯৯৯ সালে জনকণ্ঠ প্রতিভা সম্মাননা, ২০০০ সালে ভাষা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর থেকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৯ সালে পান বাংলা একাডেমির সম্মানসূচক ফেলোশিপ। ওই বছরই ঢাকার চার শ বছর পূর্তি উৎসব নাগরিক কমিটি তাঁকে ভাষাসংগ্রামী হিসেবে সম্মাননা প্রদান করে। ১৯৮৯ সালে তাঁকে বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়।
আমানুল অকৃতদার ছিলেন। তাই সারা জীবন ঘুরেফিরে ভাইবোনদের কাছেই ছিলেন। বেশির ভাগ সময় ছিলেন বড় ভাই আজমল হকের বাসায়। এ ছাড়া ছোট ভাই প্রকৌশলী নাজমুল হকের মহাখালীর বাসা ‘কোলাহল’ ও ছোট বোন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক ড. আয়শা বেগমের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় থেকেছেন অনেকটা সময়।
উপান্ত সময়ে থাকতেন শাহবাগের আজিজ কো-অপারেটিভ সোসাইটিতে, তাঁর বড় ভাইয়ের বাসায়। ওই সময় তিনি ডায়রিতে লিখেছিলেন, ‘আমার মৃত্যুর পর কোনো আনুষ্ঠানিকতার অবতারণা দয়া করে করবেন না। এই আমার অনুরোধ এবং শেষ ইচ্ছা। আমি প্রকৃতির কোলে আশ্রয় পেতে চাই।’ ২০১৩ সালের ৩ এপ্রিল ৮৮ বছর বয়সে এক মহাজীবনের যতি টানেন আমানুল। মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত তাঁর পায়ের কাছে কৃষ্ণচূড়া আর মাথার কাছে উদ্দীপ্ত লাইটপোস্ট—যেন তাঁরই চাওয়া সূর্য আর আলোর নিদর্শন।
জীবনভর সৃজনশীল আলোকচিত্রের পেছনে ছুটেছেন আমানুল হক। ক্যামেরার চোখে সমাজ ও দেশের মানুষকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেসব ছবি দিয়ে তৈরি করেছেন ‘আমার দেশ’ চিত্রমালা। তাঁর এসব ছবি এখনো তাঁর হয়ে কথা বলে।
প্রদর্শনীতে আমানুলের তোলা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচনী প্রচারণা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের নদী-নারী, গ্রামীণ জীবন আর সত্যজিৎ রায়ের নানা ছবি প্রদর্শিত হবে। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে প্রদর্শনীটি চলবে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত। এ ছাড়া আরও ৮টি প্রদর্শনীতে ১৮টি দেশের ৫৮ জন আলোকচিত্রীর কাজ উপস্থাপিত হবে। সবার জন্য উৎসবের দ্বার খোলা।