ফ্যাশন–সাংবাদিকতার গোড়ার উত্তাল দিন

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

তত দিনে সাপ্তাহিক বিচিত্রা আমার ঘর আর আঙিনা দুই-ই হয়ে উঠেছে। বলছি মধ্য আশির দশকের কথা। মধ্য সত্তরের দশকে যোগ দিয়েছিলাম প্রদায়ক হিসেবে, আর তা থেকে আমি নিয়মিত প্রতিবেদক। তখন বাংলাদেশে নারী সাংবাদিক ছিলেন বিরলসংখ্যক। যাঁরা করতেন, তাঁদের বেশির ভাগই বসতেন ডেস্কে। সে জায়গায় কিংবদন্তি সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর, যিনি শাচৌ নামে পরিচিত ছিলেন, আমাকে একের পর এক চ্যালেঞ্জ দিতে থাকলেন।

টিভি সমালোচনা ও অনুবাদ থেকে অল্প কয়েক দিনেই আমি প্রতিবেদনের পর প্রতিবেদন করে গেছি সমানতালে আমার পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে। তখন শাহরিয়ার কবির, মুনতাসীর মামুন, চিন্ময় মুৎসুদ্দি, কাজী জাওয়াদ, আলমগীর রহমান, চন্দন সরকার, আনু মুহাম্মদ, মাহমুদ শফিক—এঁরা সবাই যথেষ্ট পরিচিত। কিন্তু শাহাদাত ভাই এঁদের এলাকা নয়, আমার জন্য বেছে নিয়েছিলেন ভিন্ন এলাকা—আমাদের নাগরিক জীবন-যাপন, আনন্দ ও আহার, রুচি ও রাগ, পোশাক ও প্রয়োজন, শিল্প ও সংবেদন এবং নারী। মূলত যে মধ্যবিত্ত আমাদের দেশের মন ও মানসিকতা নিশ্চিত করবে, সেটিকে কেন্দ্র করে আমার ভাবনা ও চেতনাকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ দিলেন। হাতে তুলে দিলেন বিনয় ঘোষের বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ, অটোমেটিক জীবন ও সমাজ ও বাংলার সামাজিক জীবন ও ধারা

ফ্যাশন সাংবাদিকতায় শাহাদাত ভাইয়ের অবদানের কথা ভাবলে বিস্ময় জাগে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সাপ্তাহিক বিচিত্রাই ছিল অন্যতম সামাজিক মুখপাত্র। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রের সর্বশেষ খবর আর বিশ্লেষণের আঠায় আটকে ছিল এর বিপুল পরিমাণ পাঠক।

আমি মধ্যবিত্ত সরকারি চাকুরে বাবা ও রন্ধন-পটীয়সী মিতব্যয়ী মায়ের হাতে মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাস করেছি। আরও শাহরিয়ার কবিরের সহপাঠী, বিলেত পাস করপোরেট স্বামী, দুই সন্তানের মা। ভাত একটি টেপার মতো করে তিনি ধরে ফেলেছেন আমি বাড়ির সুষম খাবার ও বাচ্চাদের সাংস্কৃতিক শিক্ষা–দীক্ষা দিই, সকালে পরিজ পাতলে আর সন্ধ্যায় হলটার–নেক ব্লাউজ–শাড়িতে পার্টিতে যাই, ঢাকাই শাড়ি পরে ঢাকা কলেজে পড়াই এবং কবিতা-গল্প লিখি। এসব কিছুর কারণেই কিনা জানি না, সে সময় উক্ত বিষয়গুলোর কুটো থেকে কান্না আমি শনাক্ত করতে পারতাম।

প্রস্তৃতিপর্বে বিচিত্রা ফ্যাশন প্রতিযোগিতা ১৯৮৬
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

ফ্যাশন সাংবাদিকতায় শাহাদাত ভাইয়ের অবদানের কথা ভাবলে বিস্ময় জাগে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সাপ্তাহিক বিচিত্রাই ছিল অন্যতম সামাজিক মুখপাত্র। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ প্রতিটি ক্ষেত্রের সর্বশেষ খবর আর বিশ্লেষণের আঠায় আটকে ছিল এর বিপুল পরিমাণ পাঠক। চমৎকার কভার ডিজাইন ও অলংকরণ হতো লুৎফুল হক, মাসুক হেলাল, অলকেশ ঘোষের হাতে। বাহাত্তরের পর শাহাদাত ভাইয়ের নির্দেশনা ও তাঁর অনুসারী তরুণ দলটির কারণেই তা হয়েছিল সম্ভব। ভীষণ আধুনিক, সমাজ থেকে অনেক এগিয়ে থাকা ধ্যান-ধারণার এই মানুষটি গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে কাজ করতে পছন্দ করতেন। তৈরি করেছেন ব্যক্তিত্ব, আবহ ও আয়োজন। এর পেছনে ছিল তাঁর মুক্তিযুদ্ধ করে দেশে ফিরে আসা বিজয়ীর প্রতিশ্রুতি—দেশ গঠনের প্রয়াস। বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির উত্তরণ তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

শাহাদাত ভাইয়ের সেই সাফল্যযজ্ঞের সাথি হয়েছিলাম বলে বাংলাদেশের মানুষ আমাকেও ভোলেনি! মনে পড়ে, একদিন সম্পাদকীয় মিটিং চলছে। আমরা বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প, বিসিক, রাজশাহীর সিল্কের বিপন্ন অবস্থা নিয়ে কথা বলছি। এমন অবস্থা যে তাঁত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তাঁতিরা বাধ্য হয়ে দেশি শাড়ির বদলে ভারতীয় ছাপা শাড়ি ঘাড়ে নিয়ে বাড়ি বাড়ি ফেরি করছে। এমতাবস্থায় আমাদের কিছু করতেই হবে। এই যে আমরা স্ট্রিপ স্টোরি করছি, নিজেদের ছেলেমেয়ে ও বন্ধুবান্ধবীকে শাচৌ এবং আমার ডিজাইন করা দেশি পোশাক পরিয়ে ছবিসহ ঈদের পোশাকের ধারণা দিচ্ছি, জীবন এখন যেমন বিভাগে দেশি বস্ত্র নিয়ে তথ্য এবং যাঁরাই দেশি পোশাক নিয়ে বুটিক করছেন তাঁদের বিষয়ে লেখা নিয়ে সাড়া পেলেও আরও কিছু করতে হবে। আমি বললাম, আমরা বিচিত্রা ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা করতে পারি। এ জন্য আমাদের টিম কিন্তু তৈরি। সেই আমাদের মাইলস্টোন। তাঁর দিকনির্দেশনায় বাংলাদেশের ফ্যাশন সাংবাদিকতায় আমাদের স্বীকৃতি।

১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল ছিল সেই গড়ার সময়। ভিত তৈরির সময়। বয়নশিল্পী, কারুশিল্পী, উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলার, আত্মবিশ্বাসী করে তোলার সময়। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলারও বটে। তারপর আমাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

বস্তুত এক দিনে তা হয়নি। এ জন্য সময় লেগেছে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সাল ছিল সেই গড়ার সময়। ভিত তৈরির সময়। বয়নশিল্পী, কারুশিল্পী, উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলার, আত্মবিশ্বাসী করে তোলার সময়। মেজর ডেভেলপমেন্ট হয়েছে তখনই। অন্যদিকে ভোক্তাদেরও দেশীয় পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলারও বটে। তারপর আমাদের আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৮৬ সালেই আমরা শুরু করি সারা দেশ নিয়ে ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা। ঈদের আগে ঈদের গা থেকে গাম্ভীর্য খুলে ফেলে তাতে মনমাতানো উপকরণ জুড়ে দিলাম আমরাই। কোথায় পাবেন দেশের কাপড়, কী করে নিজে বানাবেন, কোন নির্মাতা আপনাকে আসল খাদি দেবে, কী খাবার রান্না করবেন, ঈদের ছুটিতে কোথায় বেড়াতে যাবেন, কাকে কী উপহার দেবেন, এমনকি ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন কোন বইটি নিউমার্কেট থেকে তুলে নেবেন—তা নিয়েও প্রতিবেদন করেছে আমাদের টিম। নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছিল ঈদ ফ্যাশন ও ঈদের বাজার সংখ্যা। বিচিত্রার পাঠকপ্রিয়তা দেখে তত দিনে বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিকও তখন অনুরূপ বিভাগ, বস্ত্রশিল্প ও বয়ন নিয়ে চমৎকার সব আয়োজন করতে শুরু করেছে।

প্রচ্ছদে বিচিত্রা ফ্যাশন প্রতিযোগিতা ১৯৮৬
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমাদের এ যুগান্তকারী আন্দোলনের যোটক ছিল এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী। আরিফ রহমান শিবলী, জসিম মল্লিক, করভি মিজান, এমদাদ হক, ফারিয়া হোসেন, সেলিনা চৌধুরী, সাবেরী মোস্তফা, মসিউর রহমান, লিয়াকত খোকন, মুনাওয়ার হোসাইন পিয়াল, ইস্তাম্বুল হক, ইফফাত আজিম, বিজলী হক, মনির হোসাইনসহ অনেকে। এদের কেউ কেউ আমার সরাসরি ছাত্র, কেউ তাদের বন্ধু, কেউ আমাদের পারিবারিক বন্ধুদের সন্তান। কিন্তু অসম্ভব তাদের উদ্যম। আর আমার সঙ্গে জুটে গেলেন শাহাদাত ভাইয়ের স্ত্রী ও আমার বন্ধু সেলিনা চৌধুরী। আমরা দুজন শাচৌর মুখে নামোচ্চারণমাত্র রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে আড়ংয়ের পোশাক মজুত কক্ষে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি।

নিয়মিতভাবে সাপ্তাহিক সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছিল ঈদ ফ্যাশন ও ঈদের বাজার সংখ্যা। বিচিত্রার পাঠকপ্রিয়তা দেখে তত দিনে বিভিন্ন সাপ্তাহিক ও দৈনিকও তখন অনুরূপ বিভাগ, বস্ত্রশিল্প ও বয়ন নিয়ে চমৎকার সব আয়োজন করতে শুরু করেছে।

আমাদের বিচিত্রা সহকর্মী ও বন্ধুদের সন্তানরাই এ দেশের বাংলাদেশি পোশাক বিজ্ঞাপনের প্রথম শিশু-কিশোর মডেল। সে বিপাশা ও নাতাশা হায়াত, শমী কায়সার থেকে শুরু করে ঈশিতা, সজীব, শাসা, এষাও। বিচিত্রায় ‘জীবন এখন যেমন’ বিভাগ ঘিরে এসেছে নবীন কুশীলবরা। ছবি তুলছেন শাচৌ নিজে, শামসুল ইসলাম আলমাজী, রফিকুর রহমান রেকু। মাজী বা রেকুর অন্য অ্যাসাইনমেন্ট থাকলে যাতে আমি ঠেকায় না পড়ি, তার জন্য গুরুই আমাকে ফটোগ্রাফিতেও দিয়েছিলেন হাতেখড়ি। তাতে আমি একাই বিচিত্রা ট্রাইপড নিয়ে গিয়ে হাজির হয়েছি টাঙ্গাইল শাড়ি কুটিরের মুনিরা এমদাদের বাসায়। সেখানে তোলা ছবি দিয়েই হয়েছে তাদের ঈদের বিজ্ঞাপন। নিপুনের নির্মাতা ভ্রাতৃপ্রতিম ফারুক তার গাড়ি ভরা পোশাক ও মডেল নিয়ে হাজির হয়েছে বিচিত্রা ফ্যাশন হাব আমার ধানমন্ডির ভাড়া বাড়িতে। সে বাসার লনে ছিল শামীম শিকদারের ভাস্কর্য, বেগুনি বাগানবিলাসে ছাওয়া বারান্দা আর আবদুল হাই স্যারের নিজের হাতে লাগানো অসংখ্য সাদা গোলাপের ঝাড়।

ঈদের পোশাক নিয়ে বিচিত্রায় লেখকের প্রতিবেদন
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমি বাংলাদেশি পোশাক নিয়ে এলাম বন্ধু নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর প্রযোজনায় আমার টিভি শো ‘জীবন যেমনে’ও। যার অন্যতম আকর্ষণ ছিল দেশি পোশাকের লাইভ ক্যাটওয়াক, প্রতিযোগিতা ও তাৎক্ষণিক বিচার ও পুরস্কার প্রদান। রামপুরা স্টুডিওর ছিল না ক্যাটওয়াক নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতা। শাচৌ তা এঁকে আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। তাঁর কারণেই আমাদের ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতায় টিমে যোগ দিয়েছেন রফিকুন নবী, শহিদুল্লাহ খান বাদল, নায়লা খান, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আবুল বার্‌ক্‌ আলভী, বিবি রাসেল। বিচিত্রার কারণে মডেল হয়েছেন ববিতা, চম্পা, শান্তা চৌধুরী, সাবা তানি, ফাহ্‌মিদা ও সামিনা চৌধুরী, মিনু বিল্লাহ, কায়সার হামিদ, টুটুল, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ অনেকে।

আজকের এ সমাজের উল্লেখযোগ্য বহু লেখক, সাংস্কৃতিক নেতা, শিল্পী, অভিনেতা, রাজনীতিক, সাংবাদিক, অর্থনীতিবীদ, সামাজিক উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী বিচিত্রার সাহায্য ও অনুপ্রেরণায় ঋদ্ধ হয়ে সৃষ্ট হয়েছেন। হয়েছেন ব্যক্তিত্ব। আমাদের লেখায় হয়েছেন ডিজাইনার। কেউ কেউ সুচ থেকে ফাল হয়েছেন শুধু তাঁরই বুদ্ধি পরামর্শ ও অসাধারণ নেতৃত্বের কারণে। ছড়িয়ে আছেন দেশে–বিদেশে। আমি শুধু আমার দিকটা নিয়েই বলতে পারি—বাংলাদেশের মানুষকে বাংলাদেশি লাইফ স্টাইলের প্রতি ঘাড় ঘোরাতে পেরেছিলাম আমার গুরু শাহাদত চৌধুরীর কারণেই।

এখানে একটা কথা অবশ্যই বলতে হবে। পৃথিবীর সব দেশেই ফ্যাশন উচ্চবিত্তের করায়ত্ত হলেও বাংলাদেশে তা মধ্যবিত্তের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া গেছে বিচিত্রা ও শাচৌয়ের কারণে। বিনয়ের সঙ্গে কবুল করি, সে পথযাত্রায় আমিও ছিলাম সামনের সারির এক পথিক। আমরা কয়েকজন উচ্চবিত্ত-কেন্দ্রিক ফ্যাশনের ধারাকে নস্যাৎ করে নতুন ধারার সৃষ্টি করেছিলাম। এ আমার এক বিরাট তৃপ্তি।