পঞ্চাশের দশকে আমানুল হকের সাড়া জাগানো ছবি

পঞ্চাশের দশক আমানুল হকের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে তাঁর হাত ধরে এ দেশে সৃজনশীল আলোকচিত্রের সূচনাপর্বের ভিত রচিত হয়। এই দশকের শুরুতে ‘বধূজীবনের মহড়া’, ‘গাঁয়ের বধূ’, ‘রমনার শালবন’, ‘রফিকের মাথার খুলি’ ও ‘অলস মধ্যাহ্ন’—এই পাঁচটি ছবি তাঁকে পাঠকের কাছে নিয়ে যায়। দেখা-অদেখা ছবিগুলো নিয়ে এই রচনা।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বধূজীবনের মহড়া

বিয়ের সাজে এক কিশোরী। মাথায় সীতাপাটি, গলায় রুপার তৈরি পুষ্পহার আর কানে বাহারি দুল। জল-লতার মতো সতেজ হাত দুটোতে ঢেউখেলানো বালা, তাতে বসানো সোনার ফুল। কপালের ছোট টিপটা যেন জ্বলছে মিটমিটে তারার মতো। মেয়েটির গায়ে পাতলা সুতি শাড়ি। আঁচলে সাদা আর গোলাপি রঙের নকশা আঁকা। মেয়েটি দুই হাত দিয়ে ঘোমটা ধরে আছে। দৃষ্টি ঠিক ক্যামেরার দিকে নয়; কিছুটা আনত চোখে তাকিয়ে আছে একটু অন্যদিকে। আমানুল হকের তোলা এই অনবদ্য ছবিটা ছাপা হয় ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে মাসিক দিলরুবায় [কার্তিক ১৩৫৮, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা]। ছবিটির শিরোনাম ‘বধূজীবনের মহড়া’।

দিলরুবার মুখপাতে এই ছবি দেখে আমি কিছুটা বিস্মিত হই। ভাবি, কেমন করে পঞ্চাশের দশকের রুদ্ধ সময়ে আমানুল হক এই ছবি তুলতেন? আর কোথায় পেলেন এমন মোহনীয় গয়না? ওই সময় পূর্ব বাংলায় রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারের কোনো মেয়েকে বধূ সাজিয়ে ছবি তোলা খুব স্বাভাবিক ঘটনা না। তখনকার দিনে মুসলমান মেয়েদের ঘরের বাইরেই বের হতে দেওয়া হতো না। আর তাঁদের ছবি তোলা তো তখন কল্পনারও বাইরে। ফলে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে আমি মেয়েটির পরিচয় উদ্ধারের অভিযানে নামি। জানার চেষ্টা করি ছবি তোলার পেছনের গল্প।

‘বধূজীবনের মহড়া’ ছবিটি দেখে ড. আয়শা জানান, ছবির মেয়েটি তাঁর বড় বোন আমিনা বেগম। তাঁর ডাকনাম নীরা। তাঁরা দুই বোন পিঠাপিঠি। আয়শার জন্ম ১৯৪৫ সালে। নীরা তাঁর দেড় বছরের বড়। হিসাব করে দেখা গেল, ছবিটি যখন তোলা হয়, তখন নীরার বয়স আট বছর।

ছবিটি দেখেই আমার ধারণা হয়, মেয়েটি আমানুলের পরিবার বা নিকট আত্মীয়দের কেউ হবেন। তা না হলে ওই সময়ে এমন ছবি তোলা কঠিন। ছবিটি প্রিন্ট করে আমানুলের মামাতো ভাই আবদুল মোমেন আলমাজিকে দেখাই। তিনি মেয়েটিকে চিনতে পারেন না। মোমেন জানান, ছবিটি যখন ছাপা হয়, ওই বছরই তাঁর জন্ম। শেষে ছবিটি নিয়ে এক বিকেলে গিয়ে হাজির হই আমানুলের ছোট বোন অধ্যাপক ড. আয়শা বেগমের বাসায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক। এখন থাকেন ধানমন্ডিতে। ছবিটি দেখে ড. আয়শা জানান, ছবির মেয়েটি তাঁর বড় বোন আমিনা বেগম। তাঁর ডাকনাম নীরা। তাঁরা দুই বোন পিঠাপিঠি। আয়শার জন্ম ১৯৪৫ সালে। নীরা তাঁর দেড় বছরের বড়। হিসাব করে দেখা গেল, ছবিটি যখন তোলা হয়, তখন নীরার বয়স আট বছর।

বধূজীবনের মহড়া [মাসিক দিলরুবায় প্রকাশিত, অক্টোবর ১৯৫১, কার্তিক ১৩৫৮, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, মডেল: সেলিমা]। সংগ্রহ: সাহাদাত পারভেজ

ড. আয়শার কাছে জানতে চাই, এমন মোহনীয় আর দামি গয়না ওই সময়ে কোথায় পেলেন আমানুল? আয়শার উত্তরে বের হয়ে আসে শত বছর আগে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আয়শার মায়ের নাম হাজেরা খাতুন। হাজেরার খালা তফুরন নেসা ছিলেন পরমাসুন্দরী। সিরাজগঞ্জের ধুবিলের এক বৃদ্ধ জমিদার কিশোরী তফুরনকে বিয়ে করেন বহু সোনা-গয়নার বিনিময়ে। এত সোনা-গয়না, আরাম-আয়েশ আর সুখ স্বাচ্ছন্দ্য তফুরনের মনে স্বস্তি দিতে পারে না। বুড়ো স্বামীকে তফুরন কখনো মন থেকে গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে সোনা-দানার প্রতি তাঁর কোনো মোহ ছিল না। বিশের দশকের শুরুতে যখন হাজেরা খাতুনের বিয়ে হয়, তখন তফুরন তাঁর বোনঝিকে কিছু গয়না উপহার দেন। হাজেরা খাতুন দুই মেয়ের সঙ্গে প্রায় তাঁর খালার গল্প করতেন।

ড. আয়শা জানান, নীরার পরনে যে শাড়ি, সেটি ছিল তাঁর মায়ের। মায়ের বিয়ের সময় তাঁর বাবা ডা. আবদুল হক কনেবাড়িতে শাড়িটি উপহার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। শাড়িটা পরবর্তী সময়ে মায়ের কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিলেন আয়শা। ৩০ বছর শাড়িটা তাঁর আলমারিতে ছিল। একসময় পুরোনো কাগজের মতো শাড়িটির সম্পূর্ণ জমিন ফেটে ফেটে যায়। পরে শাড়িটা কী করলেন মনে করতে পারেন না আয়শা। ১৯৬২ সালে নীরার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের সময় মায়ের গয়নাগুলো নীরাকে উপহার দেওয়া হয়।

ড. আয়শা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। আমানুলের প্রথম মডেল কিন্তু নীরা আর সেলিমা। সেলিমার পুরো নাম মোসাম্মৎ সেলিমা খান, দেখতে ছিলেন অপরূপ সুন্দরী। শাহজাদপুরের খুবই সম্ভ্রান্ত সেলিমাদের পরিবার। সেলিমার বাবা মাহমুদ আলী খান ছিলেন জজ। তাঁর দাদা মোয়াজ্জেম আলী খান ব্রিটিশদের কাছ থেকে খান বাহাদুর উপাধি পেয়েছিলেন। আয়শাদের বাড়ির একটি বাড়ি পরেই সেলিমাদের বাড়ি। সেলিমা ছিলেন তাঁর বড় ভাই ড. আহসানুল হকের সমবয়সী। দুই পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সেলিমাকে একই গয়না পরিয়ে ছবি তুলেছিলেন আমানুল। ছবিটি ছাপা হয়েছিল মাসিক ‘মাহে-নও’ পত্রিকার প্রচ্ছদে। দিলরুবার কাছাকাছি সময়ের মাহে-নও খুঁজলে ছবিটি পাওয়া যাবে বলে জানালেন ড. আয়শা।

গাঁয়ের বধূ

আমানুলের এক লেখায় পড়েছি, ১৯৫১ সালে ইউনেসকো আয়োজিত বিশ্ব আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় তাঁর ‘গাঁয়ের বধূ’ শিরোনামের ছবিটি স্থান পায় এবং ‘ওয়ার্ল্ড বেস্ট ফটোগ্রাফি’ সংকলনে ছাপা হয়। ছবিটি এখনো আমার অদেখা। ছবিটা সম্পর্কে জানতে চাই ড. আয়শা বেগমের কাছে। তিনি জানালেন, ‘গাঁয়ের বধূ’ ছবির মেয়েটির নাম সখিনা। সখিনা তাঁদের গৃহসহায়ক ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় তাঁর বাবা যখন উল্লাপাড়া ডিসপেনসারির চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত, তখন একটি মেয়ে খাবারের জন্য তাঁদের বাসায় আসেন। অনাহারী মেয়েটির মাথায় উকুনের দঙ্গল। আয়েশার মা মেয়েটিকে গোসল করিয়ে, মাথায় তেল দিয়ে ভাত খেতে দেন। এরপর মেয়েটি তাঁদের বাসায় থেকে যান। মেয়েটির তেমন কাজ ছিল না। মসলা বাটতেন আর আয়শাকে কোলে রাখতেন।

মেয়েটি কথাবার্তায় একটু অসংলগ্ন ছিলেন। আয়শার মা মেয়েটির কাছে জানতে চাইতেন, ‘তোমার বাড়ি কোথায়?’ নদী দেখিয়ে মেয়েটি বলতেন, ‘ওই পাড়ে।’ তোমার বিয়ে হয়েছিল? মেয়েটি মাথা নাড়তেন। তোমার স্বামী কী করে? মেয়েটি বলতেন, ‘উড়োজাহাজে বাতি জ্বালায়।’ মেয়েটিকে একবার তাতের শাড়ি আর পুরোনো আমলের গয়না পরিয়ে কলসি কাঁখে গ্রামীণ পরিবেশে ছবি তুললেন আমানুল। পরে ছবিটা পৃথিবীর সেরা ফটোগ্রাফির সংকলনে ছাপা হয়।

১৯৫১ সালে ইউনেসকো আয়োজিত বিশ্ব আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় তাঁর ‘গাঁয়ের বধূ’ শিরোনামের ছবিটি স্থান পায় এবং ‘ওয়ার্ল্ড বেস্ট ফটোগ্রাফি’ সংকলনে ছাপা হয়। ছবিটি এখনো আমার অদেখা। ছবিটা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, ‘গাঁয়ের বধূ’ ছবির মেয়েটির নাম সখিনা। সখিনা তাঁদের গৃহসহায়ক ছিলেন।

মেয়েটি বহু বছর ছিলেন আয়শাদের বাসায়। আয়শার ষষ্ঠ ভাই আমিনুল হক যখন চাঁদপুরে আইডব্লিওটিএতে চাকরি করতেন, তখন তাঁর যমজ মেয়ে হলো। মেয়েদের দেখাশোনার জন্য সখিনাকে পাঠানো হলো আমিনুলের বাসায়। এরপর আমিনুল বদলি হয়ে ঢাকায় এলেন। একদিন আমিনুলের মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে সখিনা নিখোঁজ হয়ে যান।

আমানুল হক ও তাঁর তিন মডেল [রাউতারা, শাহজাদপুর, ১৯৮১]। সংগ্রহ: দৃক

রমনার শালবন

কোনো রকমে ম্যাট্রিক পাস করে আমানুল ভর্তি হলেন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। পড়াশোনায় একদম মন নেই। সারা দিন পড়ে থাকেন ক্যামেরা, রংতুলি, বাঁশি আর বেহালা নিয়ে। ক্লাসে উপস্থিতি না থাকায় কলেজ থেকে তাঁকে আইএ পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করা হলো। এ খবর শুনে আমানুলের বাবা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি যোগাযোগ করলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। সেখান থেকেও অনুমতি পাওয়া গেল না।

দেশভাগ–পরবর্তী সময়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুপ্ত বাসনা নিয়ে পাবনা ছেড়ে ঢাকায় আসেন আমানুল। ঢাকায় তাঁর থাকা-খাওয়ার জায়গা নেই। শুরুর দিকে আজিমপুরে এতিমখানার মেঝেতে শুয়ে রাত কাটান। রাস্তার খোলা খাবার খেয়ে জটিল পীড়ায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে পাগলা কুকুরের কামড় খেয়ে জীবন একেবারে পর্যুদস্ত। ছোট মামা শামসউদ্দিন আলমাজির সহযোগিতায় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপমৃত্যু থেকে বেঁচে যান আমানুল। এরপর তাঁর থাকার জায়গা হলো ছোট মামার পলাশি ব্যারাকের বাসায়।

একদিন গেলেন আর্ট স্কুল দেখতে। ঢাকার রাস্তা, আর্ট স্কুল—সবকিছুই তাঁর কাছে নতুন। তখন ন্যাশনাল মেডিক্যাল স্কুলের দুটি কামরায় সাময়িকভাবে ক্লাস হতো। ঘরের মধ্যে ডানে-বাঁয়ে সারিবদ্ধভাবে বেঞ্চে বসে ছাত্ররা ক্লাস করতেন। ঘরের ভেতর হঠাৎ ঢুকে পড়েন আমানুল। দুই বেঞ্চের মাঝখানে সরু লম্বালম্বি জায়গাটুকু দিয়ে হাঁটছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আনোয়ারুল হক। অচেনা এক যুবকের উপস্থিতিতে হালকা-পাতলা গড়নের একজন বললেন, ‘তুমি এখানে কী চাও?’ আমানুল বিনীতভাবে বললেন, ‘আর্ট স্কুল দেখতে এসেছি।’ লোকটি তখন রূঢ় ভাষায় বললেন, ‘তুমি ক্লাসে ঘোরাফেরা করতে পারো না।’ লোকটার কথা শুনে আমানুলের আর্ট স্কুল দেখার সঞ্চারিত আবেগে হোঁচট লাগে। অনেক দিন তিনি আর ওই পথ দিয়ে যান না।

ঘুরতে ঘুরেতে ক্লান্ত হয়ে ওই শালবনের গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতেন। ওই সময় আমানুলের তোলা ‘রমনার শালবন’ নামে একটি ছবি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। আজাদ তখন প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। এই ছবি প্রকাশের ফলে আমানুল ঢাকার পাঠকমহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

একদিকে আর্ট স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুপ্ত বাসনা, অন্যদিকে ঢাকায় বিরূপ বাস্তবতাকে সামাল দেওয়ার চেষ্টা। ছবি তোলার খরচ আর রুটি-রুজির জন্য শুরু করলেন টাইপিস্টের কাজ। প্রতিদিন ইডেন বিল্ডিং [বর্তমানে গণপূর্ত বিভাগের ইডেন ভবন] থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে টাইপ রাইটারের কাজ করতেন। ক্যামেরাটা সঙ্গেই থাকত। পথে দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি তুলতেন। এসব মানবিক ছবি তোলার কারণেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। শিল্পাচার্য তাঁর ভেতর দেখতে পান এক বিরল শিল্পপ্রতিভা। শিল্পাচার্যের অনুপ্রেরণায়ই তিনি আর্ট কলেজে ভর্তি হন। জয়নুলই তাঁকে বোঝান—ছবি আঁকার সুফল কেমন করে তাঁর ফটোগ্রাফি–চর্চায় রসদ জোগাবে। কয়েক মাস ক্লাসের পর আর্থিক টানাটানিতে তাঁর আর আর্ট স্কুলে পড়া হয় না।

ওই সময় রমনার নয়নাভিরাম শালবন তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করত। তখনকার দিনের ছোট্ট একটা কোডাক ক্যামেরা নিয়ে সন্ধানী দৃষ্টিতে ঘুরতে ঘুরেতে ক্লান্ত হয়ে ওই শালবনের গাছে হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিতেন। ওই সময় আমানুলের তোলা ‘রমনার শালবন’ নামে একটি ছবি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ছাপা হয়। আজাদ তখন প্রকাশিত হতো কলকাতা থেকে। এই ছবি প্রকাশের ফলে আমানুল ঢাকার পাঠকমহলে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

পরিচয়ের প্রথম দিনে সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আমানুল হক [কলকাতা, ১৯৫৯]। আলোকচিত্র: নিতাই দত্ত/আমানুল হক আর্কাইভ

রফিকের মাথার খুলি

কপালে গুলি লেগে মাথার খুলি চূর্ণ হয়ে মগজ বেরিয়ে গেছে। অনেকখানি জায়গাজুড়ে মগজগুলো বকুল ফুলের মতো থোকায় থোকায় ছড়িয়ে আছে। গুমের উদ্দেশ্যে লাশটা রাখা হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটা গোপন কক্ষে। কেউ যেন সেখানে ঢুকতে না পারে, সে জন্য ছিল নজরদারিও। কিন্তু পুলিশের সতর্ক প্রহরা এড়িয়ে হাসপাতালের সেই গোপন কক্ষে ঢুকে ছবি তোলেন আমানুল হক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণে আমানুল হকের তোলা সাদাকালো বিমূর্ত ছবিটা এখন ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মবলিদানের এক অবিনাশী দলিল। সেদিন পুলিশ যে হত্যার লক্ষ্যেই ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, সেটি আমানুলের ছবিতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

ছবিটা সেই সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বায়ান্ন–পরবর্তী ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টের অভূতপূর্ব বিজয় কিংবা মুসলিম লিগের যে ভরাডুবি হয়; তার পেছনেও এই ছবির প্রচারণা বিশাল ভূমিকা রাখে। শাসকেরা চেয়েছিল একুশের প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন আহমেদের লাশটি গুম করে দিতে। কিন্তু তাতে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমানুলের ছবি। পরিণামে তাঁকে দিতে হয় কঠিন মূল্য। ছবিটি তোলার অপরাধে আমানুল পুলিশের নজরদারির লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। নজরদারি এড়াতে তিনি এখানে–ওখানে পালিয়ে থাকেন। এই ছবির জন্য ওই সময়ের এক প্রভাবশালী পত্রিকার সম্পাদকের কাছ থেকে সরাসরি পান পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি। নানা নিগ্রহের শিকার হয়ে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। শেষে পাড়ি দেন কলকাতায়।

আমানুল কেমন করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ছবিটি তুলেছিলেন, তার কাহিনি বেশ দীর্ঘ ও শ্বাসরুদ্ধকর। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রধান ঘটনাস্থল ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকা। ২৭ বছরে তরুণ আমানুল তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজে ‘শিল্পী’ হিসেবে চাকরি করতেন। ছবি তোলার পাশাপাশি মরদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ছবি এঁকে শিক্ষার্থীদের গবেষণাকাজে সহযোগিতা করতেন। ২১ তারিখ যে কিছু একটা ঘটবে, তা আগের দিনই টের পেয়েছিলেন তিনি। তাই তিনি তাঁর জাইস আইকন ক্যামেরাটি গলায় না ঝুলিয়ে ফুলহাতা হাওয়াই শার্টের ভেতর লুকিয়ে রাখেন।

রফিকের মাথার খুলি [ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২]। আলোকচিত্র: আমানুল হক/দৃক

সকাল থেকেই চারদিকে চাপা উত্তেজনা। ক্রমে বাড়ছে সেই উত্তেজনা। দুপুরের দিকে পুরোনো কলাভবন [এখন যেখানে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগ], মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণ [বর্তমানে শহীদ মিনার–সংলগ্ন স্থান] ও এর সামনের রাস্তায় পুলিশ বেপরোয়াভাবে লাঠিপেটা ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। ছাত্র-জনতাও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করছেন। বেসামাল অবস্থা। বেলা তখন তিনটা। উত্তেজনার চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে পুলিশ ছাত্রাবাস প্রাঙ্গণে ঢুকে দুই দফা গুলি চালায়। আমানুল তখন হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়ানো। উৎকণ্ঠিত হয়ে সামনে এগিয়ে যান। কয়েকজন ছাত্র একটি রক্তমাখা দেহ ধরাধরি করে নিয়ে আসছেন। ক্রোধে, ক্ষোভে একজন চিৎকার করে বলছেন, ‘ওরা গুলি করেছে, ওরা মেরে ফেলেছে।’ আহত ছেলেটির শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে ছাত্র-শিক্ষক, ডাক্তার-নার্স, মেথর-কর্মীরাও কাঁদছেন। কিছুক্ষণ পর আমানুল জানতে পারলেন, গুলিবিদ্ধ ওই তরুণটির নাম আবুল বরকত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র।

হত্যার লক্ষ্যেই ছাত্রদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, সেটি আমানুলের ছবিতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ছবিটা সেই সময়ে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। বায়ান্ন–পরবর্তী ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্ত ফ্রন্টের অভূতপূর্ব বিজয় কিংবা মুসলিম লিগের যে ভরাডুবি হয়; তার পেছনেও এই ছবির প্রচারণা বিশাল ভূমিকা রাখে।

এরপর আমানুল ছাত্রাবাস এলাকায় যান। ছাত্রবাসের বারান্দা ও বাইরে নানা জায়গায় রক্ত। একটা জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধে আছে। রক্তের ওপর ছোট্ট একটি ইশতেহার রেখে এক খণ্ড মাটির টুকরায় চাপা দিয়ে গেছেন কোনো এক অজ্ঞাত ভাষাসংগ্রামী। ব্যাপারটা আমানুলের কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ মনে হলো। শার্টের ভেতর থেকে ক্যামেরা বের করে দ্রুত ছবি তুলে জনতার কাতারে মিশে যান। মেডিকেল কলেজের বারান্দার সামনের যে মাঠ, সেখানে প্রখ্যাত সাংবাদিক কাজী মোহাম্মদ ইদরিসের সঙ্গে দেখা। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান প্রচার দপ্তরের সহকারী পরিচালক। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও গুলিবর্ষণের খবর পেয়ে তিনি জাতির এমন দুর্দিনে বিবেকের তাড়নায় ছুটে এসেছিলেন। ইদরিস সাহেব আমানুলকে বললেন, ‘একজন ছাত্রের মাথার খুলি উড়ে গেছে। তাঁর দেহটা হাসপাতালের পেছনের দিকে একটা ঘরে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। তুমি কি তাঁর ছবি তুলতে পারবে?’ শুনে আমানুলের রক্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে।

লাশ লুকিয়ে রাখার তথ্যটি ইদরিস সাহেব পেয়েছিলেন মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হালিমা খাতুনের কাছ থেকে। পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন হালিমা। ইশারায় তিনজনের কথা হলো। হালিমার পিছু পিছু রওনা হলেন আমানুল। হাসপাতালের পেছনে একটি ঘর। ঘরটি গুদামঘরের মতো। সেই ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে একটি লাশ। আমানুলের কাছে খুবই সাধারণ মানের জাইস আইকন ক্যামেরা। প্রায়ান্ধকারের মধ্যে খুব সাবধানে নিশ্বাস বন্ধ করে সীমিত শক্তির ক্যামেরায় শার্টার চাপেন। ছবি তুলেই আমানুল হাসপাতাল ছাড়েন।

বাসায় গিয়ে হারিকেনের আলোয় নিজের ডার্করুমে কয়েকটি ছবি প্রিন্ট করেন। সন্ধ্যার আগে আগে ইদরিস সাহেব আসেন আমানুলের বাসায়। তিনি তিনটি ছবি আমানুলের কাছে চেয়ে নেন। এর একটি কপি পাঠালেন দৈনিক আজাদ অফিসে। বাকি দুই কপি পাঠালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক মাজেদ খান এবং স্পোর্টস ফেডারেশনের এ এস এম মহসিন সাজুকে। দৈনিক আজাদ তখন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে। প্রখ্যাত সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন তখন আজাদের সম্পাদক। তিনি ছবিটা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নেন। রাতে ছবিটির ব্লক তৈরি করা হয়। কিছু কপি ছাপার পর শুরু হয় মালিকপক্ষের আপত্তি। রাত দুইটার পর ছবি ছাড়াই আজাদ ছাপা হয়।

অধ্যাপক মাজেদ খানকে যে ছবিটি পাঠানো হয়েছিল, সেই ছবিটির ব্লক তৈরি করে তিনি ছাত্রদের কাছে পাঠান। ছাত্ররা তাঁদের প্রচারপত্রে ছবিটি প্রিন্ট করেন। প্রচারপত্রটি পুলিশের হাতে যায় এবং পুলিশ তা বাজেয়াপ্ত করে। পুলিশ নানাভাবে ছবিটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে থাকে। তারা জানতে পারে, ছবিটি তুলেছেন আমানুল হক নামের এক ফটোগ্রাফার। পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে। তারা আজাদ অফিসে গিয়ে আমানুলের খোঁজখবর নেয়। আমানুল ছিলেন ছোটখাটো ও হালকা-পাতলা গোছের। কিন্তু পত্রিকা অফিস থেকে বলা হয়, এই ছবি যিনি তুলেছেন, তিনি দেখতে খুবই কালো, লম্বা আর মোটাসোটা।

আমানুল তখন চাকরি ছেড়ে ফেরারি হয়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ান। এ সময় তিনি তাঁর ক্যামেরাটিও হারিয়ে ফেলেন। হাতে অর্থকড়ি নেই। বাধ্য হয়ে একদিন গেলেন এক পত্রিকা অফিসে, যেখানে তাঁর ছবি ছাপা হতো। সম্মানী চাইতেই ওই পত্রিকার প্রভাবশালী সম্পাদক রফিকের ছবি তোলার অজুহাত দেখিয়ে তাঁকে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। হুমকি পেয়ে আমানুল গ্রামের বাড়িতে চলে যান। তখন আমানুলের মা হাজেরা খাতুনের কান্না আর থামে না। এক ছেলের মাথার ওপর হুলিয়া আর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে আরেক ছেলে ড. আহসানুল হক কারাগারে। আমানুলের পিঠাপিঠি ছোট ভাই আসাদুল হক তখন কলকাতায় পাকিস্তানি দূতাবাসে কর্মরত। বাবার চাপাচাপিতে আমানুল কলকাতার পাক সার্কাসে গিয়ে তাঁর এই ভাইয়ের বাসায় আশ্রয় নেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর আসাদুল হককে পাকিস্তানে বদলি করা হয়। তখন আমানুল ঢাকায় ফিরে আসেন।

ঢাকায় এসে আমানুল ওঠেন তাঁর বড় ভাই আজমল হকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩/এফ ফুলার রোডের বাসায়। মুক্তিযুদ্ধের অনিশ্চিত সময়ে আমানুল ভাষা আন্দোলনের নেগেটিভ তাঁর ভাবি লুৎফা হকের কাছে রাখেন। লুৎফা হক তাঁর ট্রাংকে শাড়ির ভাঁজে নেগেটিভ লুকিয়ে তালা দিয়ে রাখেন।

অলস মধ্যাহ্ন

মাঝদুপুরে রাস্তার ধারে অলস সময় কাটাচ্ছেন তিনজন ছিন্নমূল নারী। কম্পোজিশনের খাতিরেই হয়তো এক নারীর পুরো শরীর ছবিতে রাখা হয়নি। মাঝখানে যিনি হাঁটু উঁচিয়ে পেছনমুখ করে বসে আছেন, তাঁর মাথায় উকুনের দঙ্গল। দুই হাত দিয়ে তিনি উকুন ছাড়াতে ব্যস্ত। তাঁর এলোমেলো চুলে বিলি কাটছে এক নেংটা শিশু। আরেকটি শিশু নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে তাঁর নরম কোলে। পাশের নারীটি বসে আছেন পা বিছিয়ে। তাঁর পায়ের ওপরও আরেকটি ঘুমন্ত শিশু। দুপুরের আহার শেষে খাওয়ার জন্য পান বানাচ্ছেন। ১৯৫২ সালের কোনো এক দিনে কলকাতা রেলস্টেশনের কাছে এই ছবিটি তোলেন আমানুল হক। ওই বছর কলকাতার প্রগতিশীল ত্রৈমাসিক নতুন সাহিত্যর শারদীয় সংখ্যার [অক্টোবর-ডিসেম্বর ১৯৫২, কার্তিক-পৌষ ১৩৫৯] মুখপাতে ‘অলস মধ্যাহ্ন’ শিরোনামে ছবিটি ছাপা হয়। এই ছবি ছাপা হওয়ার পর দুই বাংলার শিল্পমহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়। সবাই বলাবলি করতে থাকেন, কে এই আমানুল হক? ওই সময় ছবিটি যাঁকে বেশি নাড়া দেয়, তিনি বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। সত্যজিৎ ছবিটিকে মানবিক সংবেদনশীলতার প্রতিনিধিত্বশীল চিত্র হিসেবে অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন। ছবিটিকে তিনি বিশ্বসেরা ফরাসি আলোকচিত্রী হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁর আলোকচিত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। ১৯৫৯ সালে সত্যজিতের সঙ্গে আমানুলের পরিচয়। এক রোববার সকালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমানুল হাজির হন সত্যজিতের ৩ নম্বর লেক টেম্পল রোডের বাড়িতে। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা, গায়ে চাদর জড়ানো সত্যজিৎ রায় সহজ ভঙিতে উঠে দাঁড়িয়ে ‘আসুন’ বলেই বসতে বললেন। সুভাষ বাবু আমানুলকে তাঁর ছবি দেখানোর ইঙ্গিত করলেন। ছবি দেখাতে শুরু করলে সত্যজিৎ আমানুলের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আপনার ছবি তো আমি আগেই দেখেছি।’ সুভাষ বাবুর কথামতো কাচে বাঁধানো ‘অলস মধ্যাহ্ন’ ছবিটা সত্যজিতের হাতে তুলে দিলেন। ফ্রেমটি কোলে তুলে নিয়ে ছবিটির দিকে স্থির তাকিয়ে থাকেন সত্যজিৎ।

অলস মধ্যাহ্ন [কলকাতা, ১৯৫২]। আলোকচিত্র: আমানুল হক/দৃক

ওই সময় টাইম ম্যাগাজিনে চোখ রেখে সত্যজিৎ–সম্পর্কিত বিশেষ রচনা পড়ছিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এই দুই মনীষার কয়েকটি ছবি তুললেন আমানুল। এরপর বললেন, ‘আমি কি আপনাদের সঙ্গে একটি ছবি তুলতে পারি?’ অনুমতি পেয়ে সোফার পেছনে উবু হয়ে দাঁড়ালেন। সত্যজিৎ বললেন, ‘ওখানে না, আমাদের মাঝখানে এসে বসুন।’ কয়েকবার বললেন। কিন্তু আড়ষ্টতা কাটাতে না পেরে আমানুল পেছনেই দাঁড়ালেন। এখন কে তুলবেন ছবি? সত্যজিতের পাশেই ছিলেন তাঁর সহকারী পরিচালক নিতাই দত্ত। তিনি চট্টগ্রামের মানুষ; ভাষা আন্দোলনের একজন দেশত্যাগী কর্মী। আমানুল তাঁর হাতে দিলেন ক্যামেরাটা। কলকাতার চোরাই বাজারে মাটিতে বসা এক বিক্রেতার কাছ থেকে ৭০ টাকায় কিনেছিলেন ক্যামেরাটা। সত্যজিতের বাসায় যাবেন বলে ক্যামেরায় লোড করেছিলেন সাদাকালো আগফা ফিল্ম। বহুবছরের পুরোনো ক্যামেরার শাটার রিলিজ বাটনে চাপ দিতেই আমানুল বলে উঠলেন, ‘নিশ্বাসটা একটু বন্ধ করুন মিস্টার দত্ত।’ আমানুলের এই প্রগলভয়তায় সবাই একটু ইতস্ততবোধ করলেও হো হো করে হেসে উঠলেন সত্যজিৎ।

এর কয়েক মাস পরের ঘটনা। সত্যজিৎ একদিন আমানুলকে বললেন, ‘আপনাকে একটি ছবি দেখাব।’ আমানুল বললেন, ‘মুভি না স্টিল?’ সত্যজিৎ বললেন, ‘স্টিল।’ মেঘগম্ভীর কণ্ঠটা একটু নিচে নামিয়ে বললেন, ‘এমন একজন ফটোগ্রাফারের ছবি দেখাব, যাঁর মতো পৃথিবীতে কেউ জন্মায়নি; কোনো দিন জন্মাবেও না—হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ!...আপনি আমাকে যে ছবিটি দিয়েছেন, ঠিক ওই রকম।’ আমানুল তখনো ব্রেসোঁর নাম জানতেন না। সত্যজিৎ বললেন, ‘ব্রেসোঁ আমাকে খুব স্নেহ করেন।’

সত্যজিতের জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাঁর বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত থাকতেন আমানুল। তাঁর মৃত্যুর পর দেশ-বিদেশের অসংখ্য বিখ্যাত ব্যক্তির যে শোকবার্তা আসে, সেগুলোর মধ্যে বিশেষ লেখাটি ছিল ব্রেসোঁর। ব্রেসোঁ লিখেছেন, ‘সত্যজিৎ রায়ের মৃত্যুতে দুঃখ ও কান্নার সাথে আনন্দও আছে। আনন্দ এই অর্থে যে তিনি তাঁর মহৎ শিল্পের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষের জন্য অমূল্য উপহার রেখে গেছেন।’

ডিসাইসিভ মোমেন্টের রূপকার হেনরি কার্তিয়ের ব্রেসোঁ মারা যাওয়ার পর ফরাসি প্রেসিডেন্টের মন্তব্য, ‘ব্রেসোঁ শুধু ফরাসিদের নয়, ব্রেসোঁ সারা পৃথিবীর।’