আমীরুল ইসলাম: শৈশবের জগতে ফিরে যাওয়ার মানুষটা

আমীরুল ইসলাম (১৯৬৪-২০২৬)।

সহজ ব্র্যাকেট। ব্র্যাকেটে ৬২ বছরের হিসাব।

দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস, হার্টের সমস্যা, চোখের সমস্যা—সবকিছুর অবসান ঘটিয়ে মৃত্যু হয়ে গেল আমীরুল ইসলামের। এটা কী হলো?

শামীম ভাই (ইমতিয়ার শামীম) মেসেজ দিয়েছে, ‘ধ্রুব, এইটা কী হলো! আমাদের গালাগালি করার আর তারপরেই শৈশবের জগতে ফিরে যাওয়ার মানুষটা হাওয়া হয়ে গেল!

‘বেমালুম হাওয়া। এই মানুষটাকে আমরা আর কোনো দিন দেখব না! আর কোনো তুমুল হইহল্লা নাই, হা হা হাসির হররা নাই পৃথিবীর কোথাও? নিরর্থক শূন্যতা শুধু, একটা মানুষ আর পৃথিবীতে নাই।’

শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম। প্রয়াত সাইফুর রহমান ও আনজিরা খাতুন দম্পতির দ্বিতীয় পুত্র। কবি ও শিশুসাহিত্যিক হাবীবুর রহমানের ভ্রাতুষ্পুত্র—এটা এখানে বিশেষভাবে এ জন্য উল্লেখ করলাম যে শিশুসাহিত্যিক হিসেবে আমীরুল ইসলামের দিগদর্শন ধ্রুবতারা ছিলেন তাঁর এই পিতৃব্য।

নির্ভেজাল শিশুসাহিত্যিক। বহুপ্রজ। আমীরুল ইসলাম সম্ভবত তিন শতাধিক বই লিখে রেখে গেছেন। দাবা থেকে গণিত থেকে হেঁশেল, বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন, লেখালেখিতেও প্রকাশ ঘটেছিল তার। ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাসের বাইরেও বিচিত্র বিষয় নিয়ে ছোটদের জন্য লিখেছেন। বিজ্ঞান, গণিত, ভ্রমণ, জীবনী, অনুবাদ, নাটক, গান, খেলাধুলা, স্মৃতিগদ্য, গদ্যছড়া—এমন কত কী! উইকিপিডিয়ায় বা বাংলাপিডিয়ায় নিশ্চয়ই এসব তথ্য আছে।

প্রথম বই ‘খামখেয়ালি’। ছড়ার বই। প্রথম বইয়ের জন্যই কনিষ্ঠতম শিশুসাহিত্যিক হিসেবে অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার পেয়ে গিয়েছিলেন আমীরুল ইসলাম। পরবর্তীকালে শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পদক পান ২০০৬ সালে। আরও পদক ও পুরস্কার পেয়েছেন জীবনে। সে হিসাব দিয়ে কী হবে এখন?

আমাদের সম্পর্ক ছিল। ইমতিয়ার শামীমের একটা উপন্যাস আছে ‘আমরা হেঁটেছি যারা।’ সেইমতো আমরা একসঙ্গে হেঁটেছি। অনেক দিন ধরে, অনেক বছর ধরে। আমরা সব সময় ‘আমরা’ই ছিলাম, তেড়েফুঁড়ে উঠে আমাদের কেউ কখনোই ‘আমি’ হয়ে ওঠে নাই। সেই আমাদের গালাগালি করার আর শৈশবের জগতে ফিরে যাওয়ার মানুষ ছিল আমীরুল ভাই।

সেই আমীরুল ভাই নাই। আমরা আছি!

যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা

বোন দিল ভাইকে ফোঁটা

আমীরুল ইসলাম (১৯৬৪-২০২৬)।
ছবি লেখকের সৌজন্যে

আমীরুল ভাইকে কেউ একবার ভাইফোঁটা দিয়েছিল। শামীম ভাই, তারা (শওকত আলী তারা) ভাই, আমি তখন একসঙ্গে থাকি ৩৬৮ এলিফ্যান্ট রোডে। কপালে চন্দনের ফোঁটা, হাতে বাঁধা মাঁদার ফুল রঙের রাখি, প্রসন্ন আমীরুল ভাই ৩৬৮–তে উপস্থিত হয়েছিল সেই সন্ধ্যায়।

বিচিত্র বিষয়ে আগ্রহ যেমন ছিল, তেমন ছিল আমীরুল ভাইয়ের অগাধ পাণ্ডিত্য। পূর্ণবয়স্ক কিছু মানুষকে শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পাণ্ডিত্য লাগে। জ্ঞান লাগে। কাণ্ডজ্ঞান লাগে। সঙ্গে মানবিক কিছু ত্রুটিও লাগে। আমীরুল ভাই ছিল সেই সম্পূর্ণ প্যাকেজ। আমরা পেয়েছিলাম, হারিয়ে ফেললাম!

তিন শতাধিক বই আমীরুল ইসলামের, আমি কটা বইয়ের প্রচ্ছদ করেছি? আড়াই শতাধিক।

সর্বশেষ আমীরুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো কোন দিন? মাস হয় নাই। মনির ভাই (প্রকাশক মনিরুল হক) আর আমি সেদিন চ্যানেল আই অফিসে গিয়েছিলাম। আমীরুল ভাইয়ের কার্যালয়। চ্যানেল আইয়ের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিল আমীরুল ভাই।

আমীরুল ইসলাম ও ধ্রুব এষ
ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আমীরুল ভাইয়ের ডাকনাম টুলু। বন্ধুদের ‘টুইলা’। আমারও বন্ধু হলেও বড় ভাই। আমি কখনো টুইলা ডাকার প্রশ্নই ওঠে না। তবে একবার বেশ কিছুদিন ধরে দেখা নাই, আমি একটা ছড়া বানিয়েছিলাম :

‘টুইলা রে টুইলা

কত দিন দেখা নাই

তোরে গেছি ভুইলা’

সেই ভুইলা যাওয়া কি সম্ভব? যার সঙ্গে একবার অন্তত দেখা হয়েছে আমীরুল ভাইয়ের, সে কখনো ভুলতে পারবে এই বিশ্বভরা-প্রাণ-মানুষটাকে? আশ্বিন আমীরুল ভাইকে দেখেছে কতবার? দুই-তিনবার। আশ্বিন এখন থাকে চীনে, পড়াশোনা করে। সেই আশ্বিন মেসেজ দিয়েছে, ‘আমীরুল ভাই কি হাওয়ায় মিলায় যাবে?’

শামীম ভাইয়ের মেসেজের উত্তর দিই নাই। আশ্বিনের মেসেজের উত্তর দিই নাই। The Answer is কি Blowing in the wind?

সেই হাওয়াতেই?