চার শব্দের গ্রাফিতি যেভাবে আসাদের পতন ডেকে আনল

সম্প্রতি স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়েছে সিরিয়া। ২০১১ সালে বাশারবিরোধী এই সংগ্রাম শুরু হয়েছিল স্কুলপড়ুয়া ছাত্রদের একটি গ্রাফিতির মাধ্যমে। এরপর দীর্ঘ এক যুগের এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শামিল হয়েছেন কবি–লেখক–শিল্পীরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ঘেঁটে লিখেছেন সালেহ ফুয়াদ

শিল্পীর চোখে মুয়াবিয়া ও তার চার শব্দের গ্রাফিতি। ২০১১ সালে দক্ষিণ সিরিয়ার দারা শহরে নিজেদের স্কুলের দেয়ালে বন্ধুদের নিয়ে ১৪ বছরের মুয়াবিয়া লিখেছিল, ‌‌‌‘এবার আপনার পালা ডাক্তার’। পরে মুয়াবিয়ার সেই গ্রাফিতি ছড়িয়ে পড়ে সিরিয়ার আনাচকানাচে, তেমনি একটি গ্রাফিতিছবি: সংগৃহীত

২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ১৪ বছরের মুয়াবিয়া বন্ধুদের নিয়ে তার স্কুলের দেয়ালে লিখল একটি মামুলি বাক্য। ‘এরপর আপনার পালা, ডাক্তার’! স্প্রে দিয়ে লেখা মাত্র চারটি আরবি শব্দ যে আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরের শাসনক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দেবে, তা কে ভেবেছিল। সিরিয়ার দারা শহরের মুয়াবিয়া বা তার বন্ধুরা কেউই জানত না, তাদের এই সামান্য গ্রাফিতি দেশটিতে ডেকে আনবে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ এবং মুক্তি। 

সীমাহীন দুর্নীতি, বেকারত্ব আর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০১০ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে আরবে জনক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। শুরুটা হয় তিউনিসিয়ায়। এরপর তা আরব বসন্ত হয়ে লিবিয়া, মিসর, ইয়েমেন, বাহরাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তিউনিসিয়ায় ২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক বেন আলীর বিরুদ্ধে শুরু হয় জনতার সংগ্রাম। ২৮ দিনের টানা আন্দোলনে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর ২৪ বছরের শাসনের পতন হয়। একই বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি ইয়েমেনের জনতা প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহর পদত্যাগের ডাক দেয়। এর এক বছর পর ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ২২ বছরের টানা ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাঁকে। ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ মিসরের তাহরির স্কয়ারে স্মরণকালের বড় সমাবেশ ঘটে। সেদিনই টানা ৩০ বছরের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন ঘটান জনতা। এ সময় লিবিয়াতেও আরব বসন্তের ছোঁয়া লাগে। বিপ্লব সেখানে সহিংস গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। ২০ অক্টোবর বিদ্রোহীদের হাতে মোয়াম্মার গাদ্দাফির নির্মম মৃত্যু হয়। গাদ্দাফি ছিলেন লিবিয়ার ৪২ বছরের দুর্দান্ত প্রতাপশালী এক শাসক। 

সেই দিনগুলোতে টেলিভিশন খুললেই দেখা যেত আরব অঞ্চলের এসব আন্দোলন ও শাসকদের পতনের খবরাখবর। এগুলো দেখে দেশে দেশে নিষ্ঠুর শাসনে নিষ্পেষিত মানুষের সাহস বাড়ছিল। বিশেষত আরব দেশগুলোতে। মানুষ কথা বলার সাহস পাচ্ছিল। শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধ—সবার মধ্যে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছিল। তেমনই স্কুলপড়ুয়া একদল শিশু, যাদের প্রতিদিনের কাজ ছিল সকালবেলা উঠে হোমওয়ার্ক করা, স্কুলে যাওয়া আর খেলাধুলা করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা—স্বৈরশাসক হটানোর এই উচ্ছ্বাস তাদেরও স্পর্শ করে। একদিন নিজেদেরই স্কুলের কাছের একটি পুলিশ স্টেশনে হয়রানির শিকার হয় তারা। ক্ষোভে আক্রান্ত এই শিশুরা সিদ্ধান্ত নেয় কিছু একটা করার।

যেভাবে হলো সূচনা 

টেলিভিশনে আরব বসন্তের খবর দেখতে দেখতে আন্দোলনের স্লোগানগুলো ওই শিশুদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। সিদ্ধান্ত নেয়, তারাও স্কুলের দেয়ালে কয়েকটি স্লোগান লিখবে। স্প্রে নিয়ে কয়েকটি বিপ্লবী স্লোগান লিখেও ফেলে। এর মধ্যে একটি বাক্য তারা লেখে নিজেদের মতো করে। সেটি ছিল চারটি শব্দ—‘ইজাক আলদাওর ইয়া দাকতোর।’ অর্থাৎ এবার আপনার পালা, হে ডাক্তার। এই ডাক্তার মানে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল–আসাদ। যিনি ২০০০ সালে পিতার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন। চিকিৎসক পুত্র বাশারের পিতা হাফিজ আল–আসাদ দেশটি শাসন করেছেন ১৯৭১ সাল থেকে আমৃত্যু। 

মুয়াবিয়াদের এই গ্রাফিতি প্রশাসনের নজরে পড়ে। কোনোরকমে রাতটা পার হয়। ভোর চারটায় মুয়াবিয়াদের দরজায় টোকা পড়ে। পুলিশ দেখে হিসাব মেলাতে পারে না বাড়ির কেউ। হাতকড়া পরিয়ে দাগি অপরাধীর মতো মুয়াবিয়াকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। মুয়াবিয়ার মা-বাবা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়েন। সেদিন ভোরে দারা শহরের আরও অনেকগুলো বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। তুলে নিয়ে যায় স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোরদের। এরা সবাই মুয়াবিয়ার বন্ধু। থানায় নিয়ে চালানো হয় নির্যাতন। মুয়াবিয়ার এক বন্ধুর আঙুল ভেঙে দেয় পুলিশ। জোরজুলুমের মুখে শিশুরা স্বীকার করে স্কুলের দেয়ালে তারাই সরকারবিরোধী কথা লিখেছে। তারপরও তাদের মুক্তি মেলে না। এক মাস তাদের বন্দী রাখা হয়। 

এই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, সামান্য গ্রাফিতির কারণে তাদের ওপর নেমে আসবে এমন নির্যাতন। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়বে ভয়ংকর যুদ্ধ। শিশু-কিশোরদের এই বন্দিসময়ে জেলখানার বাইরে দারা শহরের মানুষ নিয়মিত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন। এই বিক্ষোভে ঢুকে পড়েন গোয়েন্দারা। তালিকা করে ধরপাকড় চালান। ২০১১ সালের ১৮ মার্চ একটি মিছিলে নির্বিচার গুলি চালালে চারজনের মৃত্যু হয়। এতে বিক্ষোভের তেজ আরও বাড়ে। একপর্যায়ে সরকারের উচ্চপদস্থ লোকেরা এসে শহরের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়ে শিশুদের ছেড়ে দেয় সরকার। এক মাস পর শিশুরা মুক্ত হয়ে বাইরে এসে যখন দেখতে পায় তাদের জন্য পুরো শহর লড়াই করেছে, তখন তাদের মনোবল বেড়ে যায়। দেয়ালে লেখা সেই শব্দগুলো মনে পড়ে তাদের। 

সূতিকাগার দারা শহর

কিন্তু বাশার আল–আসাদের সরকার এই সময়ে আরেকটি মারাত্মক ভুল করে বসে। শিশুদের ছেড়ে দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার ভেতর তারা দারার প্রাচীন ও বিখ্যাত ওমারি মসজিদে অভিযান চালায়। মসজিদ চত্বরে বিস্ফোরণ ঘটালে সাধারণ মানুষ প্রাণভয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ২৫ এপ্রিল সোমবার ভোরে দারা শহরে প্রবেশ করতে থাকে সেনাবাহিনীর ভারী ভারী ট্যাংক-কামান। বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, কেবল টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়ে শহরটিকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। বাইরে থেকে ঘিরে রাখা হয় শহরটি। 

১০ দিনের জন্য দারা শহর অবরুদ্ধ করে বাশারের বাহিনী। এ সময় প্রতিবাদ জানাতে পরিবারের সঙ্গে বিক্ষোভে শামিল শিশু হামজা আলীকে তুলে নিয়ে যান সেনারা। নৃশংস নির্যাতনের পর ১৩ মে শিশুটিকে মেরে ফেলেন তাঁরা। অসংখ্য নির্যাতনের সঙ্গে তার বুকে পাওয়া যায় তিনটি বুলেটের দাগ। এই ঘটনা মানুষকে আরও বেশি উসকে দেয়। বাশার আল–আসাদও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ অব্যাহত রাখেন। এর মধ্য দিয়েই জর্ডান সীমান্তের কাছে দক্ষিণ সিরিয়ার দারা অঞ্চল হয়ে ওঠে আসাদবিরোধী অভ্যুত্থানের সূতিকাগার। বাশার আল–আসাদের প্রথম হারও হয় এই শহরে। 

দ্রুতই দেশি-বিদেশি শক্তির নিষ্ঠুর খেলার মাঠে পরিণত হয় পুরো সিরিয়া। দীর্ঘ সংঘাতে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে প্রায় ১২ মিলিয়ন মানুষ। এর মধ্যে প্রায় ছয় মিলিয়ন মানুষ এখন শরণার্থী অথবা বিদেশে আশ্রয়প্রার্থী। সিরিয়া বলতে এখনো চোখের সামনে ভাসে পুতুলের মতো শিশু আয়লান কুর্দির সমুদ্র কিনারের বালুতে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা। এ বছরের ৮ ডিসেম্বর রোববার বাশার আল–আসাদের চূড়ান্ত পরাজয় হয়েছে। হওয়ারই কথা ছিল। কারণ, স্কুলপড়ুয়া মুয়াবিয়াকে তিনিই ঠেলে দিয়েছিলেন ফ্রি সিরিয়ান আর্মিতে।

বাশারকে আদোনিসের চিঠি

দারার শিশুদের তুলে নিয়ে নির্যাতন আর জনগণের ওপর নির্বিচার বলপ্রয়োগের বিপরীতে খুব দ্রুতই সংগঠিত প্রতিরোধ শক্তি তৈরি হয়। ২০১১ সালের ২৯ জুলাই তৈরি হয় ফ্রি সিরিয়ান আর্মি। বাশার আল–আসাদের সশস্ত্র বাহিনী ত্যাগ করে দলটি তৈরি করেন কর্নেল রিয়াদ আল–আসাদ। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল আন্দোলনকারী ও বেসামরিক লোকদের রক্ষা করা। এরপর সারা দেশে সামরিক-বেসামরিক অনেক সংগঠন প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। সশস্ত্র এসব আন্দোলনের সমান্তরালে এগিয়ে চলে আরেক আন্দোলন। শিল্পী-সাহিত্যিক, লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এই আন্দোলনের প্রধান যোদ্ধা। 

আরব বিশ্বের জীবিত সেরা কবিদের অন্যতম আদোনিস। পশ্চিম সিরিয়ার লাতাকিয়ায় জন্ম নেওয়া আদোনিস সমসাময়িক আধুনিকতাবাদী আরবি কবিতার প্রধান পুরুষ। নিজেকে গান্ধীবাদী বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, আরব বিশ্বের কবি ও শিল্পীদের রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার ঐতিহাসিক প্রবণতা রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, সংগ্রাম সব সময় সশস্ত্র হতে হবে, তা নয়। ভিন্নভাবেও মানবাধিকার, ফিলিস্তিনের মুক্তি, ঔপনিবেশিকতা, আরব স্বৈরতন্ত্র এবং বৃত্তবন্দী মৌলবাদী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে সৃষ্টিশীল মানুষেরা ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর মতে, যা কিছু বৈপ্লবিক, লেখক–শিল্পীরা সব সময় তার সঙ্গে থাকবেন। তবে তাঁরা বিপ্লবীদের মতো হবেন না। একই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁরা বিপ্লবীদের ভাষায় হুবহু কথা বলবেন না বা কাজ করবেন না।

২০১১ সালের জুন মাসে আদোনিস বাশার আল–আসাদকে একটি খোলা চিঠি দেন। লেবাননের সংবাদপত্র আল-সাফির–এ প্রকাশিত সেই চিঠি তিনি লিখেছিলেন সিরিয়ার ‘একজন নাগরিক হিসেবে’। চিঠিতে সিরিয়াকে একটি নৃশংস পুলিশি রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণনা করে, তিনি ক্ষমতাসীন বাথ পার্টিকে রক্তক্ষয়ের জন্য দায়ী করেন। বাশার আল–আসাদকে রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করার আহ্বান জানান। খুব দৃঢ়ভাবে আদোনিস তাঁকে সতর্ক করে দেন এই বলে যে ‘একটি সম্পূর্ণ জাতিকে আপনি বন্দি করতে পারবেন না।’ প্রতিরোধ আন্দোলনের শুরুতেই আদোনিস যে বিপ্লবীদের পক্ষ বেছে নিয়েছেন, তার চিঠির ভাষাই তা বলে দেয়। তবে তাঁর ভাষা বিপ্লবীদের ভাষার মতো হুবহু নয়। আদোনিসের মতো বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত ব্যক্তিত্বের এই চিঠি লড়াইয়ের শুরুতেই বাশারকে দুনিয়ার কাছে খলনায়কে পরিচিত করতে সহায়তা করে। অন্যদিকে সিরিয়ার লেখক-শিল্পীরাও এই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার একটি ভিন্ন রকম ভাষা পান। 

প্রতিরোধের অন্য ধারা গ্রাফিতি

গ্রাফিতি এমন একটি শিল্প, যার মাধ্যমে ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের মনোভাব শান্তিপূর্ণ ও শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করা যায়। নিজের চিন্তার প্রকাশ ও অন্যের ভেতরে তা ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পধারাটিই সিরিয়ায় সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের সমান্তরালে সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। এর শুরুটা দারার একটি স্কুলের দেয়ালে ১৫ জন শিশুর আঁকা গ্রাফিতি দিয়ে হয়েছিল। এরপর এই গ্রাফিতিই হয়ে ওঠে আরেকটি যুদ্ধের মাঠ। 

সারা দেশের দেয়াল নিয়ে গ্রাফিতি আঁকিয়ে আর বাশার আল–আসাদের প্রশাসনের মধ্যে চলতে থাকে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। শিল্পী ও আন্দোলনকারীরা দ্রুত কোনো দেয়ালে সংগ্রাম-স্বাধীনতার কথা অথবা আসাদকে তীব্র ব্যঙ্গ করে কোনো স্লোগান লিখে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে। সরকারি বাহিনী তার চেয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে আসে সেই গ্রাফিতি মুছে ফেলতে। তারপর খোঁজ শুরু হয়, আঁকিয়েদের গ্রেপ্তার করতে। শেষমেশ না পেরে গ্রাফিতি করার স্প্রে বেচাকেনার ওপর বিধিনিষেধ নেমে আসে। পরিচয়পত্র ও হলফনামা ছাড়া স্প্রে কেনা যায় না সিরিয়ায়। মজার কথা হলো, এরপরও সিরিয়ার অনেক শহরের অলিগলিতে ‘স্প্রেম্যান’ হিসেবে অসংখ্য গ্রাফিতিশিল্পী টিকে রয়েছেন। 

নিজের তৈরি গ্রাফিতির সামনে মুয়াবিয়া। এখন তিনি ফ্রি সিরিয়ান আর্মির একজন
ছবি: সংগৃহীত

কিশ মালিকের রাজাবন্দী বা চেকমেট

রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে সিরিয়া যখন জর্জরিত, তখন সামনে এলো কিশ মালিক। আরবি শব্দ ‘কিশ মালিক’ মানে রাজাবন্দী বা চেকমেট। সিরিয়ার নির্দয় রাজা বাশার আল–আসাদের যে আর মুক্তি নেই, তা মনে করিয়ে দিতেই এই অভিনব নাম নেয় এই সংগঠন। উত্তর সিরিয়ার আলেপ্পো শহরের তরুণেরা ২০১১ সালের মার্চের শুরু থেকেই কাজ করছিলেন। তাঁদেরই সংগঠন কিশ মালিক। এর প্রধান কাজ সিরিয়ার হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে আনা। জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টিতে এরা সক্রিয় ভূমিকা রাখে। 

শহরের দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা তাদের আরেকটি অন্যতম কাজ। ব্রিটেনের বিশ্বখ্যাত গ্রাফিতিশিল্পী বাংকসি থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা এই কার্যক্রমের নাম দিয়েছে ‘বাংকসি সিরিয়া’। যুদ্ধহীন সিরিয়ার স্বপ্ন দেখা সাধারণ মানুষের কথা ও চিত্র তারা দেয়ালে দেয়ালে এঁকে দিয়ে যায়। বেশির ভাগ লেখাই থাকে ইংরেজিতে। চেষ্টা থাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে আসার। গ্রাফিতি দিয়ে স্বাধীনতার চিন্তা ছড়িয়ে দিতে চায় তারা। 

‘বাংকসি সিরিয়া’র আঁকা একটি গ্রাফিতিতে দেখা যায়, বক্তৃতা দিচ্ছেন বাশার আল–আসাদ। পেছনে এক হাতে ডিম ছুড়তে উদ্ধত, আরেক হাতে মুঠোফোন নিয়ে এক কিশোর বলছে, ‘এই যে ডিমবালক, ঠিক করতে কি অসুবিধা হচ্ছে এরপর কে? এটি হয়তো (বুঝতে) সহায়তা করবে।’ এদের আরেকটি গ্রাফিতিতে লেখা রয়েছে, ‘আসাদ জয়ী হয়েছেন এবং তিনি শরণার্থীদের ফিরে আসতে সিরিয়ায় স্বাগত জানিয়েছেন; তাদের নিরাপত্তার আর্ন্তজাতিক গ্যারান্টিসহ। আপনি কি এই কথা বিশ্বাস করেন? এটি এপ্রিল ফুল।’

শুধু সিরিয়ার দেয়াল নয়; বিভিন্ন ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে গ্রাফিতি এবং আরেক শিল্পমাধ্যম কার্টুন। ‘ফ্রিডম গ্রাফিতি উইক সিরিয়া’ শিরোনামের একটি ক্যাম্পেইন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 

বাশার আল–আসাদের সীমাহীন ক্ষমতার প্রয়োগ সিরিয়াকে যে খেলার মাঠে পরিণত করেছে, সেখানে রাজার পতন হয়েছে নিশ্চিত। জনগণের মুক্তি মিলেছে কি না, তা হয়তো দ্রুতই পরিষ্কার হবে। তবে যেকোনো পরিস্থিতিতে শিল্প–সংস্কৃতির সমৃদ্ধ জনপদ সিরিয়া সশস্ত্র সংগ্রামের সমান্তরালে শিল্পিত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ আন্দোলনও যে অব্যাহত রাখবে, তা নিশ্চিত। 

সূত্র: গার্ডিয়ান, আল-আখবার, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, আল-জাজিরা ও ফ্রিডম গ্রাফিতি উইক সিরিয়া