বন্ধ হয়ে যাওয়া ৬ নম্বর বাস ও ইলিয়াসের গল্প

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

আমার দেখা শহর ঢাকার ভেতরে চলা সবচেয়ে বড় একতলা বাস ৬ নম্বর রুটের সব বাস। এ–জাতীয় বাসে চড়েছি আগে, তার বেশ কয়েক বছর পরে পড়েছি কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস রচিত ছোটগল্প ‘প্রেমের গপ্পো’। এরপর যতবারই বাসের গায়ে লেখা দেখেছি ‘৬ নম্বর রুট’, ততবারই মনে পড়েছে ইলিয়াসের এই গল্প। আর গল্পখানি পাঠে তো এসেই পড়ে এই বাসের প্রসঙ্গ। যেখানে গল্পের প্রধানতম চরিত্র জাহাঙ্গীরের ভাষ্য আমরা পাই এভাবে:

‘—গড়িগুড়ির গুলি মারি, স্লামালেকুম—খোদা হাফেজ কইয়া করাইয়া একবারে ছয় নম্বর বাস ধরছি, জিন্দেগিতে আর বনানী যাই নাই।’

কখনো গল্পে, কখনো উপন্যাসে পুরান ঢাকার মানুষের যাপন-চিত্র তুলে ধরেছেন ইলিয়াস। যেখানে বিগত শতকের ষাট-সত্তর-আশির দশকের নগরজীবনকে পাই আমরা। কিন্তু পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মানুষের ভাষাগত তফাত কেবল নয় মনস্তত্ত্বের ফারাক, তাদের মিথস্ক্রিয়ায় কী ঘটতে পারে—এসব যেন মেলে ‘প্রেমের গপ্পো’ গল্পখানিতে। বিশালদেহী ৬ নম্বর রুটের বাস ধরে কি ইলিয়াস একাল ও সেকালের ঢাকার মহামিলন ঘটাতে চেয়েছেন? অথবা বিপরীত কিছু: পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার বৈশিষ্ট্য যে আলাদা, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছেন। সেটা পাঠক হিসেবে যা পাতে নেব, সেই স্বাধীনতা অবশ্যই আমাদের আছে। স্বয়ং লেখক থাকলে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যেত। অমরত্বের কারুকাজ ভরা সাহিত্য রেখে তিনি তো আছেন ওপারে।

অবশ্য এই গদ্যের গন্তব্য আখতারুজ্জামান ইলিয়াস নন, তাঁর গল্পও নয়। আমরা বরং থাকি ৬ নম্বর বাসে। এই রুটের প্রথম যাত্রা হয়েছিল কবে নাগাদ? ইলিয়াস ‘প্রেমের গপ্পো’ রচনা করেন ১৯৭৯ সালে। লেখক মুম রহমানের এক গদ্য মারফত জানা গেল এ তথ্য। এর মানে, ১৯৭০-এর দশকের শেষার্ধ্বে অবশ্যই ঢাকার রাজপথে সচল ছিল এই রুট। ষাটের দশকে তা কী ছিল? ‘বাংলার দুষ্প্রাপ্য ছবি ও কথা’ নামে ফেসবুক গ্রুপে ছবি দিয়ে এমন তথ্যই দিয়েছেন কানিজ ফাতেমা ঝর্না নামের একজন। ২০২৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি সেখানে লিখেছেন:

‘১৯৬০–এর দশকে কতটা আধুনিক ছিল এই বাস, তা কি এখন কেউ বিশ্বাস করবে?

‘ঢাকা শহরে ৬ নং মতিঝিল বনানী ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডের বাসে চড়ে নাই, এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। বলা যেতে পারে, এই গাড়ি চড়েই ঢাকা শহর চেনা শুরু অনেকের। অথচ এখন নানান সার্ভিসের ব্যানারে এই ৬ নং সার্ভিসটা তেমন দেখাই যায় না।’

ষাটের দশকে ৬ নম্বর বাস মধ্যবিত্তের চলাচলে যে অন্যতম ভরসা ছিল, এই লেখা থেকে সেই ধারণা কিন্তু পাওয়া যায়। এ হিসেবে আমরা সাক্ষী মানতে পারি সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অলোক বসুকে। ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট তাঁর ফেসবুক পোস্টের একাংশ তুলে দিলেই হয়ে যায়। তিনি লিখেছেন:

কখনো গল্পে, কখনো উপন্যাসে পুরান ঢাকার মানুষের যাপন-চিত্র তুলে ধরেছেন ইলিয়াস। যেখানে বিগত শতকের ষাট-সত্তর-আশির দশকের নগরজীবনকে পাই আমরা। কিন্তু পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার মানুষের ভাষাগত তফাত কেবল নয় মনস্তত্ত্বের ফারাক, তাদের মিথস্ক্রিয়ায় কী ঘটতে পারে

‘আপনি যদি কখনো ৬ নম্বর বাসে না চড়ে থাকেন, তাহলে নিজেকে ঢাকার গর্বিত নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিতে কুণ্ঠিত হবেন। হ্যাঁ সে এক ঐতিহাসিক বাস রুট। পীর জঙ্গী মাজার, কমলাপুর থেকে গুলশান–বনানী রুটে চলাচল করত। করত বললাম এ জন্য যে এখন আর চলে কি না জানি না। ঢাকার মধ্যবিত্তের গন্ধ লেগে ছিল এই বাসে।’

বিগত আড়াই দশকে আমার দেখায় সেই চরিত্র আর পাইনি। নতুন শতকে এসে মধ্যবিত্তের গন্ধ কমতে শুরু করেছে এই রুটের বাসে। তখন ৬ নম্বর বাসযাত্রী মানে নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, হতদরিদ্রদের ভিড়। বিশেষত শহরের ব্যস্ত সময়ে এই বাসভর্তি মানুষ আর মানুষ। ভেতরে দাঁড়িয়ে ধরার মতো রডও খালি নেই। দরজায় পর্যন্ত ঝুলে থাকা যাত্রী। এই ভিড়েই আবার ভিক্ষুক, হকার, পকেটমার—রকমারি মানুষ। চালককে সহায়তার পাশাপাশি হেলপার একটু পরপরই হেঁকে উঠছেন, ‘পকেট সাবধান, মানিব্যাগ সাবধান।’ তবু কখন যে কার মোবাইলটা নিয়ে চোখের পলকে চম্পট দিয়েছে কেউ। সেটা অবশ্য মুঠোফোন যুগের কেচ্ছা।

সততই যা ছিল, তা হচ্ছে: নারী আসন নিয়ে বচসা, জানালার কাচ কার পাশে কতটুকু ফাঁকা থাকবে এ নিয়ে তর্ক, হাফ পাস (ভাড়া) নিয়ে শিক্ষার্থী বনাম কন্ডাক্টরের রোজকার বাহাস—এমন নানা ঘটনা নিয়ে চলতে থাকে বাস। তবু কমতি নেই যাত্রীর। এই বাস যে কাউকে ফেরায় না। এ যেন টাইটানিক জাহাজের স্থল সংস্করণ। তবে অভিজাত নয়, প্রতিদিন হাজার হাজার অনভিজাত মানুষের গল্প নিয়ে আসা-যাওয়া করে গুলশান-বনানী থেকে গুলিস্তান-মতিঝিল রুটে। আদতে যার এক প্রান্ত পীর জঙ্গী মাজার, আরেক প্রান্ত কুড়িল বিশ্বরোড। আকার-চেহারা-চলনে কলকাতার ট্রামের কথাও মনে পড়বে ৬ নম্বর বাসে চড়লে।

ঢাকার নগরের অন্যান্য রুটের বাসের সঙ্গে এর আরেক তফাত হচ্ছে, সামনে ও পেছনে দুই দরজা দিয়ে ওঠানামার সুযোগ। ভাড়া আদায়ও দীর্ঘকাল দুজন কন্ডাক্টর করে আসছিলেন। এই রীতিতে বদল আসে ২০১৩-২০১৪ সালের দিকে। তখন বাসে আগুন ধরানো, পেট্রল নিক্ষেপের সহিংস রাজনীতি চলছিল। এটা প্রতিরোধের অংশ হিসেবে নিরাপত্তা প্রশাসনের নির্দেশে ৬ নম্বর রুটের বাসগুলোর পেছনের দরজা বন্ধের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নেওয়া হয়। তখন ভাড়া আদায়ের কর্মীও একজনে নেমে আসে। ফলে দিঘল বাসে যাত্রীদের ওঠানামায় নতুন এক বিড়ম্বনা তৈরি হয়।

জাতীয় জীবনের আরও একটি বড় বিপর্যয়ের প্রভাব ছিল এই রুটে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা করে উগ্রবাদীরা। এতে নিহত হন ২০ জনের বেশি মানুষ। রাজধানীর অভিজাত এই এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে তখন নতুন করে ভাবতে শুরু করে প্রশাসন। তাদের নির্দেশনায় ৬ নম্বর রুটের বাসের জন্য গুলশান ২ ও ১–এ চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। প্রগতি সরণি দিয়ে বাড্ডা হয়ে গুলশান ১ থেকে মহাখালীর দিকে চলতে বাধ্য হয় বাসটি। সেই সুযোগে গুলশানে চালু হয় তুলনামূলক অবস্থাসম্পন্নদের জন্য দুই প্রতিষ্ঠানের এসি বাস—ঢাকা চাকা ও গুলশান চাকা। এগুলোর রুটের বিস্তার বারিধারা, বনানী, গুলশান, তেজগাঁও লিংক রোড অবধি। ঢিমেতালে আর গরিবি হালতে তারপরও সচল ছিল ৬ নম্বর রুটের গুটিকয় বাস। সেবাও মন্দ ছিল না। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই নগরের পরিবহনসেবার চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই দিয়েছিলাম ফেসবুক পোস্ট। যেখানে লিখেছিলাম:

বিগত আড়াই দশকে আমার দেখায় সেই চরিত্র আর পাইনি। নতুন শতকে এসে মধ্যবিত্তের গন্ধ কমতে শুরু করেছে এই রুটের বাসে। তখন ৬ নম্বর বাসযাত্রী মানে নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, হতদরিদ্রদের ভিড়। বিশেষত শহরের ব্যস্ত সময়ে এই বাসভর্তি মানুষ আর মানুষ।

‘নতুনবাজার-বাড্ডা-গুলশান-মহাখালী-ফার্মগেট/সাতরাস্তা-মগবাজার-গুলিস্তান-মতিঝিল এই রুটে চলাচলত ৬ নম্বর বাসটি লোকাল। সিটিংয়ের চিটিংবাজি নেই তাদের। আকারে বিশাল। ভাড়া কম। নিজেদের মতো হেলেদুলে চলে তারা। একই সঙ্গে অনেক যাত্রী ধারণ করে। কোনো প্রতিযোগিতায় নেই। ঢাকা শহরে এ ধরনের বাস ও রুট চাই। অথচ হচ্ছে উল্টোটা। লোকাল বাস তো উঠেই যাচ্ছে। ছোট আকারের সিটিং বাসের সংখ্যা বাড়ছে। সঙ্গে বাড়ছে নৈরাজ্য।’

এরপর তুরাগ-বালু-বুড়িগঙ্গায় অনেক জল গড়ায়, আমাদের শহরে দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করে ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা। কারও কাছে যেগুলোর আদুরে নাম—বাংলার টেসলা। তত দিনে নগরে এসে যায় মেট্রোরেলও। এসবের আলোচনার ব্যস্ততায় হারাতে থাকে ৬ নম্বর রুটের বাস। আমাদের অজান্তেই থেমে যায় শেষ বাসটিও। কিন্তু ঠিক কবে থেকে তার চাকা থেমে যায়, তা ঠিকঠাক স্মরণ করতে পারি না আমরা। শরণাপন্ন হই ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী মোহাম্মদ জোবায়ের মাসুদের। তাঁর ভাষ্যমতে, চব্বিশের আগস্টের পটপরিবর্তনের পরও ৬ নম্বর রুটে গোটা ছয়েক বাস চলাচল করত। কিন্তু আয় খুব বেশি ছিল না। তাই মালিকেরা একটা সময় এগুলো বন্ধ করে দেন। বাসের বডি অনেক বেশি পুরোনো হওয়ায় নতুন কোনো রুটে ঠেলে দেওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। তাই রিসাইকেল হতে ভাঙারি দোকানই হয় শেষ ভরসা, এটুকুই জানাতে পারলেন ঢাকার পরিবহন নেতা এই কাজী সাহেব।

চব্বিশের পটপরিবর্তন এবং ৬ নম্বর রুটের অবসান—কোনো যোগসূত্র মেলানো যাচ্ছে? এটা অজ্ঞাত কিছু নয় যে পরিবহন নেতা হতে, বাস ব্যবসা করতে, রুট নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্ষমতার সঙ্গে একটা ‘দহরম-মহরম’ ব্যাপার থেকেই যায়। একটি সরকারের পতন একটি বাস রুটের পতন ত্বরান্বিত করে দিয়ে গেল তাহলে?

‘কোনো রাজনীতি নেই, শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার চাপসহ নানা কারণে লোকসানে থাকায় ৬ নম্বর রুট অচল হয়ে পড়েছে’, জোর দিয়েই বলছেন বাসমালিক নেতা কাজী মোহাম্মদ জোবায়ের মাসুদ। তাই রাজনীতির আলাপটা না হয় থাকুক, আমরা ফিরে যাই বরং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পে। কারণ, শেষে এসেও ‘প্রেমের গপ্পো’ আমাদের স্মরণ করাতে পারে ৬ নম্বর বাস। যেখানে ইলিয়াস ছোটগল্পেও যেন কিছুটা বিশদ:

‘আরেক দিন খালেক ভাই আর কাউকে, না তাকে নয়, বলছিল, “আরে ওরা বাড়িতেই প্র্যাকটিস করে। গুলশানে বিরাট বাড়ি, সব রকম খেলার অ্যারেঞ্জমেন্ট আছে।”—তা কোন্ বাড়ি, কার বাড়ি, কত নম্বর রোড, কত নম্বর প্লট—কিছুই জানে না। দাঁড়াবে কোথায়?—সুতরাং অ্যাবাউট টার্ন।—দুই নম্বর মার্কেটের সামনে ছয় নম্বর বাস; এই বাসে করেই না জাহাঙ্গীর পালিয়ে গিয়েছিলো ওর নাছোড়বান্দা প্রেমিকার বাড়ি থেকে। সুতরাং এই বাসের পেছনে সে ভেস্পা চালায়। বাস যেখানে দাঁড়ায়, সেও একটু দাঁড়ায়। কিন্তু পুরনো এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এসে ধৈর্য থাকে না। বাসটাকে ওভারটেক করে চলে যায়।’

অতীতকে ওভারটেক করে বা ছাড়িয়ে এগোতে হয়—সামনে তাকাতে হয় আমাদের। সেভাবেই ৬ নম্বর রুটের বাসকেও ভুলে যাচ্ছি আমরা। কেবল মাঝেসাঝে স্মৃতিকাতর করবে ‘প্রেমের গপ্পো’। কেননা ইলিয়াসের গল্পখানি থেকে হারাবে না কোনো দিন ৬ নম্বর রুটের বাস।