যে লাখ লাখ মানুষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দী করা হয়েছিল, তাঁদের কেউ প্রাণ হারিয়েছেন গুলিতে, কেউ অনাহার বা নির্যাতনে, কেউ হারিয়ে গেছেন গ্যাস চেম্বারের অন্ধকারে। সেই ভয়াবহ ইনফার্নো পেরিয়ে আজও পৃথিবীজুড়ে ভীষণভাবে ‘উপস্থিত’ একা এক না-থাকা কিশোরী। তার নাম অ্যানলিজে মারি ফ্রাঙ্ক, যে অ্যান ফ্রাঙ্ক হিসেবেই বেশি খ্যাত।
১২ জুন। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো যুদ্ধ শুরুর দিন নয়, কোনো সাম্রাজ্যের উত্থান বা পতনের দিনও নয়। তবু দিনটি মানবসভ্যতার স্মৃতিতে বিশেষভাবে খোদাই হয়ে আছে। ১৯২৯ সালের এই দিনে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে জন্ম নিয়েছিল অ্যান ফ্রাঙ্ক, যে পরে হয়ে ওঠে যুদ্ধের বিরুদ্ধে মানবতার শক্তিশালী কণ্ঠস্বর।
১৯৪২ সালের ১২ জুন ত্রয়োদশ জন্মদিনে অ্যান উপহার পেয়েছিল একটি লাল-সাদা চেককাটা ডায়েরি। সে জানত না, এ ডায়েরিই একদিন তাকে ‘অমরতা’ দেবে। তবে অ্যান তো অমর হওয়ার জন্য লেখেনি। সে লিখেছিল বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা থেকে, অদম্য জীবনপিপাসায়।
আমস্টারডামের একটি গোপন আশ্রয়স্থল—যা পরে ‘সিক্রেট অ্যানেক্স’ নামে পরিচিত হয়, সেখানেই পরিবারসহ আত্মগোপনে ছিল অ্যান। জানালার ওপাশে তখন যুদ্ধ, বর্ণবাদ আর ফ্যাসিবাদের উন্মত্ততা। সেই দমবন্ধ পরিবেশে বসে সে তার ডায়েরিকে কাল্পনিক বন্ধু ‘কিটি’ বলে সম্বোধন করত এবং প্রতিদিনের জীবন, উদ্বেগ, ভালোবাসা ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন তাতে লিখে রাখত।
১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে, সম্ভবত ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে, যখন বসন্তের আগমনী ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে, সেই সময় জার্মানির বের্গেন-বেলজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের তীব্র শীত আর টাইফাস রোগে নিভে যায় অ্যানের জীবনপ্রদীপ। মারা যায় তার বড় বোন মার্গটও। পরিবারের মধ্যে শুধু বাবা অটো ফ্রাঙ্ক বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন। যুদ্ধ শেষে তিনিই অ্যানের ডায়েরি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
অ্যানের ডায়েরিকে আমরা শুধু এক ইহুদি কিশোরীর ব্যক্তিগত স্মৃতিকথা হিসেবে পড়ি না। এটি মানবতার এক অসাধারণ দলিল। তার লেখায় যেমন আছে কৈশোরের স্বাভাবিক কৌতূহল, প্রেম, আত্ম–অন্বেষণ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, তেমনি আছে এমন এক সময়ের নির্মম বাস্তবতা, যখন মানুষের জন্মপরিচয়ই তার ‘অপরাধ’ হয়ে ওঠে।
অ্যানের ডায়েরির সবচেয়ে আলোচিত বাক্যগুলোর একটি: ‘সবকিছুর পরও আমি বিশ্বাস করি, মানুষের হৃদয়ের গভীরে কল্যাণবোধ বিদ্যমান।’ বাক্যটি পড়লে আজও বিস্মিত হতে হয়। চারদিকে যুদ্ধের বিভীষিকা, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, প্রতিদিন গ্রেপ্তার হওয়ার আতঙ্ক—এসবের মধ্যেও এক কিশোরী মানুষের প্রতি আস্থা হারায়নি।
কিন্তু আশা সব সময় মানুষকে রক্ষা করতে পারে না, ইতিহাস তাই বলে। ১৯৪৪ সালের ৪ আগস্ট গেস্টাপো বাহিনী সিক্রেট অ্যানেক্সে হানা দেয়। অ্যান ও তার পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের বিভিন্ন ক্যাম্পে পাঠানো হয়।
১৯৪৫ সালের শুরুর দিকে, সম্ভবত ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাসে, যখন বসন্তের আগমনী ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে, সেই সময় জার্মানির বের্গেন-বেলজেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের তীব্র শীত আর টাইফাস রোগে নিভে যায় অ্যানের জীবনপ্রদীপ। মারা যায় তার বড় বোন মার্গটও। পরিবারের মধ্যে শুধু বাবা অটো ফ্রাঙ্ক বেঁচে ফিরতে পেরেছিলেন। যুদ্ধ শেষে তিনিই অ্যানের ডায়েরি প্রকাশের ব্যবস্থা করেন।
১২ জুন তাই ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়। এটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। এমন এক কিশোরীর জন্মদিন, যে পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় বেঁচে ছিল মাত্র ১৫ বছর; কিন্তু রেখে গেছে অনন্ত এক প্রশ্ন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে শিশুরা আজও যুদ্ধের মধ্যে বড় হয়ে উঠছে, তাদের গল্পও কি একদিন অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরির মতো মৃত্যুর পর পড়তে হবে? নাকি তার আগেই আমরা ইতিহাস থেকে কিছু শিখব?
অ্যান ফ্রাঙ্কের জন্মদিনে তাই প্রশ্ন জাগে—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেই বিপুল মানবিক বিপর্যয় থেকে আমরা আসলে কতটা শিক্ষা নিয়েছি?
আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যুদ্ধ চলছে। আজও শিশুদের শৈশব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে গুলিগোলা ও বোমার আঘাতে। আজও অসংখ্য মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে, শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিচ্ছে, হারাচ্ছে স্বজন-পরিজন। গাজা, সুদান, ইউক্রেন, কঙ্গো, মিয়ানমার কিংবা বিশ্বের অন্য কোনো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল—নাম ভিন্ন হলেও যন্ত্রণা প্রায় একই।
টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সংবাদপত্রের পাতায় যখন ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে থাকা কোনো শিশুর মুখ দেখি, তখন অ্যান ফ্রাঙ্কের কথা মনে পড়ে। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যাগুলোর একটি ‘হলোকাস্ট’। সেই ভয়াবহ স্মৃতি কি তবে শুধু জাদুঘরের কাচপাত্র আর স্মৃতিস্তম্ভে সাজিয়ে রাখার জন্য? নাকি সেই ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়—যেকোনো জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অমানবিকতা, বর্ণবাদ, বর্ণবৈষম্য বা নির্বিচার হত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াই মানবতার সারকথা?
অ্যান ফ্রাঙ্ক কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার লিখে যায়নি। সে রেখে গেছে একটি কিশোরী মনের অকৃত্রিম ভাষ্য। সেই ভাষ্যের গভীরে লুকিয়ে আছে এক সহজ অথচ গভীর সত্য—মানুষের জীবন তার পরিচয়ের চেয়ে বড়, ঘৃণা আর যুদ্ধের চেয়ে বড়।
১২ জুন তাই ক্যালেন্ডারের একটি সাধারণ তারিখ নয়। এটি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করার দিন। এমন এক কিশোরীর জন্মদিন, যে পৃথিবীর আলো-হাওয়ায় বেঁচে ছিল মাত্র ১৫ বছর; কিন্তু রেখে গেছে অনন্ত এক প্রশ্ন। পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে শিশুরা আজও যুদ্ধের মধ্যে বড় হয়ে উঠছে, তাদের গল্পও কি একদিন অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরির মতো মৃত্যুর পর পড়তে হবে? নাকি তার আগেই আমরা ইতিহাস থেকে কিছু শিখব?
হাসান ইমাম: কবি, সাংবাদিক
