মাতৃভাষার জন্য আপন প্রাণ উৎসর্গ করে বাঙালি হৃদয়ে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন রফিক উদ্দিন আহমদ। ভাষা আন্দোলনের বইপত্রে তাঁর দুটি ছবি দেখা যায়। রফিকের যে ছবি তুলে আমানুল হক খ্যাতি লাভ করেছিলেন, এই ছবিটা তার থেকে ভিন্ন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্ট্রেচারে রাখা রফিকের মরদেহ। গুলিবিদ্ধ মাথা থেকে মগজ বের হয়ে আছে। বক্স ক্যামেরায় তোলা সাধারণ কম্পোজিশনের একটি সাদাকালো ছবি। কিন্তু এই ছবির অন্তর্নিহিত বাণী এত তীক্ষ্ণ যে তা দেখে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী নড়েচড়ে বসে। এই ছবি ছাপার ব্যাপারে তারা আপত্তি জানায়। প্রেস সেন্সরশিপের কারণে ১৯৫২ সালে ছবিটি ছাপা সম্ভব হয়নি। পরের বছর একুশের বিশেষ সংখ্যায় সাপ্তাহিক ইত্তেফাক ছবিটি প্রকাশ করে।
ওই বছর ভাষাশহীদদের স্মরণে পূর্ব বাংলা ছাত্রলীগ একটি লিফলেট ছাপে। লিফলেটে ইত্তেফাক-এর ছবিটি হুবহু প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত বশীর আলহেলালের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ও ২০০৪ সালে নিমফিয়া পাবলিকেশন থেকে সি এম তারেক রেজার একুশ: ভাষা আন্দোলনের সচিত্র ইতিহাস (১৯৪৭-১৯৫৬) গ্রন্থেও একই ছবি ছাপা হয়। ১৯৯১ সালে সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় আবদুল মতিন ও আহমদ রফিকের ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য। এই গ্রন্থে ছাপা হয় রফিকের মূল ছবি। অন্য প্রকাশনাগুলোয় ছাপা হওয়া ছবিটি ছিল ক্রপ করা।
ভাষা আন্দোলন-সংক্রান্ত উল্লিখিত গ্রন্থগুলোয় এই ছবির বিস্তারিত বর্ণনা আছে। কিন্তু এই ঐতিহাসিক ছবিটি কে তুলেছেন—কোনো গ্রন্থেই তার উল্লেখ নেই। সাত দশকের বেশি সময় কোনো গবেষক বা ঐতিহাসিকের পক্ষে এই গুণী আলোকচিত্রীর নাম খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। তিন বছরের চেষ্টায় ইতিহাসের মলিন পৃষ্ঠা খুঁড়ে পাওয়া যায় এই আলোকচিত্রীর নাম-পরিচয় ও ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিশাল অবদানের কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্ট্রেচারে শহীদ রফিকের ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী মীজানুর রহমান।
ঐতিহাসিক ছবিটি কে তুলেছেন—কোনো গ্রন্থেই তার উল্লেখ নেই। সাত দশকের বেশি সময় কোনো গবেষক বা ঐতিহাসিকের পক্ষে এই গুণী আলোকচিত্রীর নাম খুঁজে বের করা সম্ভব হয়নি। তিন বছরের চেষ্টায় ইতিহাসের মলিন পৃষ্ঠা খুঁড়ে পাই এই আলোকচিত্রীর নাম-পরিচয় ও ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিশাল অবদানের কথা।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে মীজানুরের সাহসিকতার একঝলক খুঁজে পাই আসিফ নজরুলের ‘সংবাদ চিত্রগ্রাহকদের স্মৃতি: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজ’ শিরোনামের প্রবন্ধে। প্রবন্ধটি ছাপা হয় ১৯৯০ সালের ২০ এপ্রিল সাপ্তাহিক বিচিত্রার ঈদ সংখ্যায়। দেশভাগ-পরবর্তী সময়ে যে কয়জন নক্ষত্র মানবের হাত ধরে এ দেশের ফটোসাংবাদিকতার গোড়াপত্তন হয়, মীজানুর তাঁদের অন্যতম। নিভৃতচারী ছিলেন বলে বর্তমান সময়ে তিনি অনেকটাই অনালোকিত। একুশের রক্তঝরা দিনে ছবি তোলার মাধ্যমে মীজানুরের চিত্রসাংবাদিকতা জীবনের শুরু। এর আগের বছর তিনি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে সহসম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী।
২১ ফেব্রুয়ারিতে ১০ জন ১০ জন করে ছাত্রমিছিল যখন গণপরিষদের দিকে রওনা হয়, তখন এই আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে মীজানুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের গেটের কাছে অবস্থান করছিলেন। তাঁর হাতে বক্স ক্যামেরা। পুলিশের গুলি শুরু হলে ছাত্রমিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। প্রাণভয়ে সবাই বিক্ষিপ্তভাবে ছুটোছুটি করতে থাকে। পুলিশ যখন ছাত্রাবাসে ঢুকে গুলি চালায়, তখন মীজানুরের পাশেই ছিলেন রফিক। রফিকের মাথায় গুলি লাগার পর ছাত্ররা তাঁকে ধরাধরি করে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। জরুরি বিভাগেই রফিকের মরদেহের ছবিটি তোলেন মীজানুর। ছবিটি প্রিন্ট করে জমা দেন ইত্তেফাক অফিসে। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর চাপে ইত্তেফাক ছবিটি প্রকাশ করেনি।
পরবর্তী সময়ে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক-এর ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হন। ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল [বিপিআই]-এর সম্পাদক ও প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৫ সালে বিপিআই ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা [বাসস] একীভূত হলে তাঁকে বাসসের বাণিজ্যিক সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য গ্রন্থে ছাপা হওয়া ছবিটির ক্যাপশনে লেখা হয়—‘বাহান্নর প্রথম শহীদ রফিকউদ্দিন।’ ছবির ক্রেডিট লাইনে ডা. হুমায়ূন কবির হাইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ঘটনার বর্ণনা পড়ে প্রতীয়মান হয়, ডা. হুমায়ূন কবির হাই আসলে ছবিটির সংগ্রাহক। ১৯৫২ সালে হুমায়ূন কবির হাই ঢাকা মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এই বইয়ে হুমায়ূন কবির হাইয়ের ভাষ্যও লিপিবদ্ধ আছে। গুলিবিদ্ধ রফিক উদ্দিন সম্পর্কে তাঁর জবানবন্দি—‘বিকেল তিনটার দিকে হোস্টেলের গেটের কাছে একজনকে [আবুল বরকত] গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছি। আর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া একজন শহীদের লাশ আমরা প্রথমে ইমার্জেন্সিতে, পরে এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায় নিয়ে আসি। তার একটা ফটো নেওয়া হয় এবং সে ফটোর কপি আমার কাছেও ছিল। পরবর্তীকালে তা ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়।’ আহমদ রফিক উল্লেখ করেন, মাথায় গুলিবিদ্ধ শহীদ রফিক উদ্দিনের এই আলোকচিত্র তাঁর সংগ্রহেও ছিল। কিন্তু ১৯৫৪ সালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে ছবিটি হারিয়ে যায়।
ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য গ্রন্থে গুলিবিদ্ধ রফিক সম্পর্কে তখনকার ঢাকা মেডিকেলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মশাররফুর রহমান খানের বক্তব্যও লিপিবদ্ধ আছে। মশাররফুর রহমান খানের জবাববন্দি—‘তখন বেলা ঠিক কয়টা মনে নেই, হঠাৎ কয়েকটা আওয়াজ। তাকিয়ে দেখি একটি তরুণ হোস্টেলের মাঝখানের রাস্তায় পড়ে গেছে। ওর পা-দুটো দক্ষিণ দিকে, মাথা উত্তর দিকে। ছুটে গিয়ে দেখি ওর মাথায় গুলি লেগেছে। ব্রেইনটা ছিটকে পড়েছে। কয়েকজন ছুটে যায় স্ট্রেচার আনতে। দুই হাতে ব্রেইনটা তুলে ওর পাশে রাখি। আমি, হুয়ায়ূন হাই, মুর্শেদ এবং আরো দুই একজন মিলে ওকে ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাই, পরে এনাটমি হলের পেছনের বারান্দায়।’
তিন বছরের চেষ্টায় ইতিহাসের মলিন পৃষ্ঠা খুঁড়ে পাওয়া যায় এই আলোকচিত্রীর নাম-পরিচয় ও ভাষা আন্দোলনে তাঁর বিশাল অবদানের কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্ণে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে স্ট্রেচারে শহীদ রফিকের ছবিটি তুলেছিলেন আলোকচিত্রী মীজানুর রহমান।
ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গ্রন্থে বশীর আলহেলাল উল্লেখ করেন, ‘স্ট্রেচারের উপর মাথার খুলি উড়ে যাওয়া এক শহীদের লাশের ছবি আমরা কোথাও কোথাও মুদ্রিত দেখি।’ এই গ্রন্থে সাপ্তাহিক নতুন দিন [ঢাকা, দ্বিতীয় বর্ষ, ১৬-১৭ সংখ্যা, ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭]-এর একটি প্রতিলিপি ছাপা হয়। নতুন দিন পত্রিকায় ছাপা হওয়া ছবির পরিচয়ে বলা হয়, ‘ভাষা আন্দোলনের অন্যতম বীর শহীদ। পুলিশের গুলিতে রফিকের মাথার খুলি উড়িয়া গিয়াছে।-[ব্লক দৈনিক ইত্তেফাক-এর সৌজন্যে]।’ নতুন দিন-এর ক্যাপশন পাঠে বোঝা যায়, রফিকের ছবির ব্লকটি ইত্তেফাক থেকে প্রাপ্ত। এই ব্লকটিই তাঁরা তাঁদের ১৯৫৭ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশ করে।
ইতিহাসের আবিলতা থেকে মীজানুর রহমানকে উজ্জ্বল আলোতে আনতে ইত্তেফাক-এর বেশ কয়জন প্রবীণ ফটোসাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁরা মীজানুরের কথা স্মরণ করতে পারলেও তাঁর পরিবার এখন কোথায় আছে—এ সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে পারেন না। পরে ইত্তেফাক গ্রুপের ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউনেশন-এর সাবেক আলোকচিত্রী এ কে এম মহসীন স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, মীজানুরের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে। গাজীপুর প্রেসক্লাবের কয়েকজন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানাতে পারি, ভাষাসংগ্রামী মীজানুর ছিলেন গাজীপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা। সাংবাদিক আতাউর রহমানের কাছে পাই মীজানুরের বড় ছেলে শাহরিয়ার জিয়াউর রহমানের ফোন নম্বর।
১ ফেব্রুয়ারি ওয়ারীতে গিয়ে শাহরিয়ারের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। জানতে চাই, শহীদ রফিকের ছবির মূল নেগেটিভ কোথায়? শাহরিয়ার শোনালেন এক দুঃখজনক ঘটনা। তাঁরা থাকতেন ২৮ বনগ্রাম লেনের একটি বাড়িতে। ১৯৭৪ সালে মীজানুর বাড়িটি সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নিয়েছিলেন। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করে ঢাকা দক্ষিণের এক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা। একদিনের মধ্যেই বাড়ি থেকে তাঁদের উচ্ছেদ করা হয়। সেই সময় মীজানুরের তোলা অনেক ঐতিহাসিক ছবি-নেগেটিভ ও পেপার কাটিং নষ্ট হয়ে যায়।
মীজানুরের ব্যক্তিগত বিষয় জানতে চাই শাহরিয়ারের কাছে। বললেন, ‘বাবা যেদিন মারা যান এর পরদিন ইত্তেফাক-এ তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী ছাপা হয়।’ পিআইবির আর্কাইভ ঘেঁটে সেই পত্রিকা বের করি। পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, মীজানুরের জন্ম ১৯৩১ সালে গাজীপুরের টঙ্গী উপজেলার গাজীপুরা গ্রামে। স্কুলে পড়ার সময়ই জয়দেবপুরের এক স্টুডিও ফটোগ্রাফারের কাছে ছবি তোলা শেখেন তিনি। ১৯৫১ সালে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এ সহসম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। কিন্তু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। আন্দোলনের ছবি তুলতে তুলতে ফটোগ্রাফিই তাঁর কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রাজনৈতিক ছবি তুলে তিনি সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৬৪ সালের রিপোর্টিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তী সময়ে তিনি দৈনিক ইত্তেফাক-এর ক্রীড়া সম্পাদক ও প্রধান প্রতিবেদক হন। ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল [বিপিআই]-এর সম্পাদক ও প্রশাসক নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৫ সালে বিপিআই ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা [বাসস] একীভূত হলে তাঁকে বাসসের বাণিজ্যিক সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০০৩ সালের ১৮ জুলাই প্রয়াত হন বাংলাদেশের এই বরেণ্য আলোকচিত্রী।