অন্য এক আলোয় দেখা শহীদুল্লা কায়সার

শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লা কায়সারকে নিয়ে এই স্মৃতিচারণায় মতিউর রহমান ফিরে গেছেন রাজনীতিক, সাংবাদিক ও কথাশিল্পী—তিন সত্তায় দীপ্ত এক মানুষের কাছে। সহযোদ্ধা ও সহকর্মীর চোখে ধরা পড়েছে শহীদুল্লা কায়সারে জীবনসংগ্রাম, তাঁর উপন্যাস সংশপ্তক–এর অন্তর্লীন অঙ্গীকার, আর ১৪ ডিসেম্বরের সেই অন্ধকার সন্ধ্যার অনিবার্য ট্র্যাজেডি।

শহীদুল্লা কায়সারের ৯৯তম জন্মদিনে আর্কাইভ থেকে তুলে আনা হলো প্রায় ২৩ বছর আগে ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত—ব্যক্তিগত স্মৃতি, রাজনৈতিক ইতিহাস ও সাহিত্যিক মূল্যায়নের সংমিশ্রণে গড়া এই লেখাটি।

শহীদুল্লা কায়সার ও মতিউর রহমানের প্রতিকৃতি: মাসুক হেলালগ্রাফিকস: প্রথম আলো

চৌদ্দ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী দিবস বা ষোলো ডিসেম্বর বিজয় দিবস সমাগত হলে শুধু নয়, বলতে গেলে, সারা বছর ধরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের মহান শহীদদের, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের কথা মনে পড়ে। মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডা. আলীম চৌধুরী, সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লা কায়সার, ডা. ফজলে রাব্বি, আনোয়ার পাশা প্রমুখের নাম। তাঁদের মধ্যে যাঁদের সঙ্গে পরিচয় ছিল, কিছু কাজ করার সুযোগ হয়েছিল, যাঁরা সেই ষাটের দশকে আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, সেই সব ব্যক্তিত্বের মধ্যে শহীদুল্লা কায়সার হলেন অন্যতম। তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু আজও মেনে নিতে পারিনি। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের উত্থান-পতনের নানা ঘটনায় তাঁর অনুপস্থিতি বুকের মধ্যে বড় বেশি করে বাজে।

আমাদের শহীদ ভাই, শহীদুল্লা কায়সারকে আমরা চিনি–জানি ষাটের দশকের প্রায় শুরু থেকেই। সরাসরি কবে কখন পরিচয় হয়েছিল, সে কথা এখন আর মনে নেই। তবে দৈনিক সংবাদ অফিসে যাওয়া-আসার সুবাদেই পরিচয় হয়। তার পর থেকে তাঁর কাছে গেছি নানা কাজে। কখনো ছাত্রসংগঠনের কোনো কাজে, একুশে সংকলনের জন্য গদ্য বা কবিতা চাইতে বা অন্য কোনো কাজে। সদা হাস্যমুখে আমাদের সব অনুরোধ-আবদার কবুল করেছেন। তখন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অতটা সাহস করে বেশি কথা বলতাম না। তারপরও তাঁর সহজাত হাসিখুশি ভাবটা আমাদের বড় সহায় ছিল। তাঁর অফিসে, তাঁর বাসায় নানা সময়ে কাজ নিয়ে গেছি। সব সময় পেয়েছি সেই একই সহাস্য আমন্ত্রণ, সহজিয়া পরিবেশ।

আমরা যখন ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হই, সেই ১৯৬১ সালের শুরুতে, তখন তিনি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী। ‘শহীদ ভাই’ সম্পর্কে এটুকু আমরা জানতাম যে তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা ছিলেন তিনি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

যাঁরা সেই ষাটের দশকে আমাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, সেই সব ব্যক্তিত্বের মধ্যে শহীদুল্লা কায়সার হলেন অন্যতম। তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যু আজও মেনে নিতে পারিনি। বিগত তিন দশকে বাংলাদেশের উত্থান-পতনের নানা ঘটনায় তাঁর অনুপস্থিতি বুকের মধ্যে বড় বেশি করে বাজে।

মনে পড়ে, ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহীদুল্লা কায়সারের বৃহৎ উপন্যাস সংশপ্তক প্রকাশের পরপরই বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। অবশ্য এর আগেই তিনি আমাদের দেশের একজন প্রধান ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। প্রথম উপন্যাস সারেং বউ তাঁর জন্য জাতীয় সম্মান নিয়ে আসে। সাহিত্যজগতে শহীদুল্লা কায়সারের আকস্মিক আবির্ভাব সে সময় অনেককেই বিস্মিত করেছিল; কারণ এর আগপর্যন্ত আমাদের কাছে তাঁর প্রধান পরিচয় ছিল গোপন কমিউনিস্ট পার্টির একজন নেতা এবং সাংবাদিক (তখন তিনি দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক) হিসেবে। মনে পড়ে, সে সময়ে ঢাকার প্রগতিবাদী মহলে তাঁর এই সাফল্য বেশ উৎসাহ সৃষ্টি করেছিল। আর সংশপ্তক উপন্যাসের নায়ক বিপ্লবী জাহেদের চরিত্রের মধ্যে আমরা অনেকেই শহীদুল্লা কায়সারকে খুঁজে পেতে চেষ্টা করেছিলাম। নায়ক জাহেদ অনেক কথা বলেছেন, যেগুলোকে মনে হয়েছে শহীদুল্লা কায়সারের হৃদয়ের আবেগের কথা, ভালোবাসার কথা। শহীদুল্লা কায়সারের এই বৃহৎ উপন্যাস সংশপ্তককে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মী ও লেখক রণেশ দাশগুপ্ত ‘মহাকাব্যিক’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

সংশপ্তক যখন বের হয়, তখন বইয়ের নামের অর্থ আমাদের অনেকের কাছে অজানা, দুর্বোধ্য ছিল। সংসদ-এর বাংলা অভিধানে সংশপ্তক শব্দের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায়, যুদ্ধে জয়লাভ অথবা মৃত্যু এরূপ শপথকারী সৈন্য। আর প্রগতিবাদী চিন্তাবিদ কাজী আবদুল ওদুদের ব্যবহারিক শব্দকোষ অভিধানে সংশপ্তক শব্দের অর্থ বলা আছে, ‘মহাভারতে বর্ণিত অমিত বিক্রম সেনাদল—আমরা এই স্থানেই থাকিয়া যুদ্ধ করিব’ এমন যাদের প্রতিজ্ঞা। একটিমাত্র শব্দ দিয়ে কয়েক দশক বিস্তারিত গণ–অভ্যুদয়মূলক একটি বিরাট উপন্যাসকে প্রতীকে উপস্থাপন করেন শহীদুল্লা কায়সার, যার মর্মকথা আমৃত্যু মুক্তিসংগ্রাম। এ বইটি তিনি উৎসর্গ করেছিলেন ভবিষ্যতের বংশধরদের হাতে। এখন মনে হয়, শহীদুল্লা কায়সারের জীবনসংগ্রাম, মৃত্যু পরিপূর্ণভাবে প্রতিফলিত তাঁর এই মহৎ উপন্যাসে। সংশপ্তক, ‘যুদ্ধে জয়লাভ অথবা মৃত্যু’ কিংবা ‘আমরা এই স্থানে থাকিয়া যুদ্ধ করিব’ এই জীবনতৃষ্ণা সতত সঞ্চারিত ছিল শহীদুল্লা কায়সারের হৃদয়ে।

শহীদুল্লা কায়সার (১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯২৭—১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১)
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের বিজয়ের উষালগ্নে আমাদের শহীদ ভাইকে ১৪ ডিসেম্বর কারফিউর মধ্যে বাসা থেকে তুলে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল স্বাধীনতাবিরোধী খুনি আলবদর গোষ্ঠী। শহীদ হয়েছেন তিনি। স্বাধীনতাকে পাওয়ার জন্য যে দিনটির তিনি অপেক্ষা করছিলেন, সে সময় তাঁকে দেওয়া হয়নি। আজও আমাদের মধ্যে এ দুঃখবোধ প্রচণ্ড যে মাত্র সামান্য কিছুটা সময়ের জন্য তিনি এবং তাঁর মতো অনেকেই বাংলার ঘরে ঘরে আমাদের স্বাধীনতার উত্তোলিত বিজয় পতাকা দেখে যেতে পারেননি। এই দুঃখবোধ মেনে নিয়েও বলা যায়, মুক্তিসংগ্রামীদের জন্য দুটি পথই থাকে, জয়লাভ অথবা মৃত্যু। রক্তাক্ত এই প্রান্তরে এর যেকোনো একটি মালা গলায় তুলে নিতে হয়, সেটা আগে থেকেই নির্ধারণ সম্ভব নয়, কেউ বিজয় সরণি দিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে যান, আবার কেউ আগামী দিনের বংশধরদের হাতে দায়ভাগ তুলে দিয়ে রেখে যান মৃত্যুহীন জীবনের স্বাক্ষর। আমরা শহীদুল্লা কায়সারকে পাই মুক্তিসংগ্রামীদের দ্বিতীয় দলে।

তারপরও আমাদের মধ্যেই এ জিজ্ঞাসা বড় হয়ে দেখা দেয়, শহীদুল্লা কায়সারের মৃত্যু, তাঁর শহীদ হয়ে যাওয়া কি অনিবার্য ছিল; কোনোভাবেই কি মুখোশধারী হত্যাকারীদের হিমশীতল হাত থেকে তাঁকে রক্ষা করা, তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো পথ ছিল না? কেন মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তিনি অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে থেকে গেলেন? কেন সেদিন (১৩ ডিসেম্বর) কায়েতটুলির বাসস্থান থেকে বের হয়েও আবার ফিরে এসেছিলেন? এ রকম প্রশ্নগুলো আজও আমাদের মধ্যে বারবার উদিত হয়। আমরা জানি, ১৯৬৮ সালের পর থেকে শহীদুল্লা কায়সার সরাসরি রাজনৈতিক জীবন থেকে নিজেকে একটু দূরে সরিয়ে এনেছিলেন। সে বছর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির গোপনভাবে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি ছিলেন না। তিনি এ রকম ইচ্ছাই ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৫১ সাল থেকেই তিনি এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সদস্য ছিলেন। তারপরও আমরা জানি, তিনি নানাভাবে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নানা কাজে যুক্ত ছিলেন।

তবে এটাও আমরা দেখেছি যে ষাটের দশকের শেষভাগে আফ্রো-এশীয় গণসংহতি পরিষদ বা সোভিয়েত মৈত্রী সমিতির একজন প্রধান ব্যক্তি হিসেবে এর বহুমুখী কাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত বিপ্লবের পঞ্চাশতম বার্ষিকীতে সংকলন গ্রন্থ প্রকাশ এবং পল্টনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মূল দায়িত্ব তিনি পালন করেছিলেন। সমগ্র অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট তিনি তৈরি করেছিলেন। গানও লিখেছিলেন ‘আমি স্পার্টাকাস...’।

রক্তাক্ত এই প্রান্তরে এর যেকোনো একটি মালা গলায় তুলে নিতে হয়, সেটা আগে থেকেই নির্ধারণ সম্ভব নয়, কেউ বিজয় সরণি দিয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে যান, আবার কেউ আগামী দিনের বংশধরদের হাতে দায়ভাগ তুলে দিয়ে রেখে যান মৃত্যুহীন জীবনের স্বাক্ষর। আমরা শহীদুল্লা কায়সারকে পাই মুক্তিসংগ্রামীদের দ্বিতীয় দলে।

শহীদুল্লা কায়সারের পরিচয় জানতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় তিনি বাম-চিন্তাধারার রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন। এর পর থেকে তিনি আর থেমে থাকেননি, মেনে নেননি কোনো পরাজয়। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে বিএ অনার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। দেশ বিভক্ত হওয়ার পর ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি এই ডিগ্রি আর নিতে পারেননি। কারণ, ইতিমধ্যে তিনি সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। এর সঙ্গেই শুরু হয়ে যায় তাঁর আত্মগোপন আর জেলজীবন। আত্মগোপন অবস্থায় থেকেই শহীদুল্লা কায়সার বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে এক উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছিলেন। সে জন্য সেই পঞ্চাশের দশকেই সকলের অত্যন্ত প্রিয় মানুষ হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর শহীদ ভাই গ্রেপ্তার হয়ে যান। প্রায় চার বছর পর জেল থেকে মুক্তি পান। তারপর শহীদুল্লা কায়সারের সাংবাদিক-জীবনের সূত্রপাত ঘটে সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের মধ্য দিয়ে। সেটা ছিল ১৯৫৬ সাল। এখানে কিছুদিন কাজ করার পর ১৯৫৮ সালে সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক সংবাদে। সে বছরই সারা দেশে সামরিক আইন জারি হলে তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়। ১৯৬২ সালের ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেল থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। জেল থেকে বের হয়ে এসেও তিনি সংবাদেই কাজ করেছেন। ধীরে ধীরে এর সব দায়িত্ব, ঝুঁকি এবং বিড়ম্বনা বহন করেছেন। শেষের দিকে সংবাদের প্রায় সব দায়িত্ব তাঁর ওপর এসে পড়েছিল। তিনি সত্যিকার অর্থে হয়ে উঠেছিলেন দৈনিক সংবাদের প্রাণকেন্দ্র। প্রকাশ্যে সাংবাদিকতার পাশাপাশি গোপন কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে তিনি বহু রাজনৈতিক কাজ করেছেন। পাকিস্তানের শাসনামলে তিনি মোট আট বছর কারাবাস করেছেন।

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলের চার বছর কারাগারে আটক জীবন শহীদুল্লা কায়সারের। সে সময় তাঁর হঠাৎই সাহিত্যজীবনের শুরু বলা যায়। তাঁর কথায় বলা যায়, ‘অন্ধ কুঠুরিতে অসহ্য নিঃসঙ্গতায় কখন যে হঠাৎ কলম তুলে নিয়েছিলাম হাতে, এখন সেটা স্মরণ করতে পারি না। আর কেন যে হঠাৎ উপন্যাস লেখার দুর্মতি হলো আমার তাও বুঝি না।’ তবে এর আগে (১৯৫৫) চট্টগ্রাম জেলে থাকার সময়ও তিনি কিছু গল্প লিখেছিলেন। ’৬২ সালে জেল থেকে বের হয়ে তিনটি বই প্রকাশের পরই আমরা তাঁকে পেয়ে যাই একজন পূর্ণাঙ্গ কথাশিল্পী হিসেবে। বলা যায়, এ ছিল এক বিস্ময়কর রূপান্তর। বিভিন্ন পুরস্কারসহ জাতীয় স্বীকৃতিও তিনি পেয়ে যান। জীবনসংগ্রামের নতুন ক্ষেত্রে তাঁর এই সাফল্যকে তিনি সহজভাবেই নিয়েছেন। কোনো রকম হইচই বাধিয়ে ফেলেননি; যেমনটা আজকাল প্রায়শই নজরে আসে আমাদের।

মতিউর রহমান (১৫ এপ্রিল ১৯৪৬)
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

জেলের বাইরে দৈনিক সংবাদ আর সাংবাদিক-জীবনের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চাও অব্যাহত ছিল শহীদুল্লা কায়সারে। উপন্যাস ছাড়াও গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, পুস্তক সমালোচনাসহ অনেক কিছুই তিনি লিখেছেন। প্রকাশ করেছেন, আবার অনেক কিছুই থেকে গেছে অপ্রকাশিত। দেরিতে হলেও শহীদুল্লা কায়সারের সমগ্র রচনাবলি বের করেছিল বাংলা একাডেমি। চার খণ্ডে সমাপ্ত ১৭৪৬ পৃষ্ঠার সমগ্র রচনাবলিতে রয়েছে ছয়টি উপন্যাস (একটি অসমাপ্ত), একটি রম্যরচনা (রাজবন্দীর রোজনামচা), একটি ভ্রমণকাহিনি (পেশোয়ার থেকে তাসখন্দ), দুটি নাটক, ২২টি ছোট-বড় গল্প, অনেকগুলো কবিতা, প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং পত্রগুচ্ছ। রচনাবলিতে অন্তর্ভুক্ত লেখা ছাড়া তাঁর আরও লেখা আছে, যেগুলো নামে বা বেনামে বেরিয়েছে সংবাদে। শহীদুল্লা কায়সার শুধু নন, যেকোনো একজন মানুষের জন্য এই পরিমাণ কাজ কম নয়; অন্তত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

অতীতে একটি প্রশ্ন আমাদের মধ্যে অনেক সময়ই আলোচিত হতো, কিছুটা নেপথ্য বা প্রকাশ্যে থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম বা সাংবাদিকতার মাধ্যমে, নিজের কথা তুলে ধরার এত সুযোগের পরও শহীদুল্লা কায়সার কেন সাহিত্য, উপন্যাস, গল্প আর কবিতার দিকে ঝুঁকিলেন? সেটা কি শুধু অন্ধ কুঠুরিতে অসহ্য নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য? নাকি গল্প-উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাদের মুখে তাঁর জীবনাদর্শকে আরও বিস্তৃত ক্ষেত্রে, সমাজের আনাচকানাচে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যই এক নতুন পথ সন্ধানে বের হয়েছিলেন তিনি? এ প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর আমরা এখন পাব না। তবে একটি কথা বলা যায়, তিনি সাহিত্যের পাতায় জীবন-অন্বেষণে বের না হলে আমরা নিশ্চিতভাবে ভীষণ ক্ষতিগ্রস্ত হতাম, আমাদের জীবনও আরও ছোট গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়ত। অন্য কিছুর জন্য না হলেও শুধু এ জন্যই আমরা তাঁর কাছে চিরঋণী থাকব।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানা মোড় পরিবর্তনের ঘটনায় আমরা শহীদুল্লা কায়সারের অভাব অনুভব করেছি গভীরভাবে, বারেবারে; কিন্তু তিনি নেই, তবে তাঁর উপন্যাস-গল্পের অবিস্মরণীয় মানুষগুলো রয়েছে, যারা এ দেশের অমর জনগণের প্রতিনিধি, মানবদরদি, সংগ্রামী প্রতিনিধি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের পুরো সময়কালই শহীদ ভাই ঢাকায় ছিলেন। বিভিন্ন পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়ের বাসায় ঘুরে ঘুরে তিনি দিন অতিবাহিত করেছেন। আবার ফিরে এসেছেন তাঁর প্রিয় কায়েতটুলির বাসায়। আত্মীয়স্বজন বা রাজনৈতিক বন্ধুদের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাননি। মে এবং সেপ্টেম্বর মাসে দুবার তাঁর চলে যাওয়া ঠিক হলেও তিনি ঢাকাতেই থেকে গেছেন। হয়তো কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তবে জানা যায়, সেই ৯ মাস তিনি মোটেই স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। সব সময় চিন্তিত থাকতেন। তাঁর সেই হাসিখুশি ভাবটি আর ছিল না। এ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের জন্য, মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে নানা কাজ করেছেন। তবে এ সময়েও তাঁর সাহিত্যচর্চা, উপন্যাস রচনার কাজ চলেছে। স্ত্রী পান্না কায়সারের লেখা থেকে জানতে পারি, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত লড়াই শুরু হলে তিনি আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে থাকেন, তাঁকে হাসিখুশি দেখা যায়। নতুন করে সংবাদ বের করার পরিকল্পনায় মেতে ওঠেন। এমন সময় শত্রুপক্ষের দিক থেকে চরম হামলার সময় ঘনিয়ে আসে, বন্ধুরা তাঁকে সাবধান করেন। তাঁর জন্য নিরাপদ গোপন আশ্রয়স্থলও ঠিক করেন। তাঁরা অপেক্ষা করতে থাকেন; বারো, তেরোই ডিসেম্বর চলে যায়। শহীদুল্লা কায়সার যাননি সেখানে। তেরোই ডিসেম্বর দুপুরে স্ত্রী আর মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে একবার বের হয়ে পড়েন গোপন আশ্রয়স্থলের দিকে। কিন্তু মধ্যপথে জহুর মামার (জহুর হোসেন চৌধুরী) সঙ্গে গল্প করে ফিরে আসেন মায়ের কথা মনে করে, স্ত্রীর কথা ভেবে। ফেরার কিছুক্ষণ পরই শহরে কারফিউ বলবৎ হয়ে যায়। স্ত্রী পান্না কায়সারকে কথা দিলেন, পরদিন চৌদ্দ ডিসেম্বর কারফিউ উঠে গেলেই তিনি চলে যাবেন। শহীদ ভাই তৈরি থাকলেন। কিন্তু সেদিন আর কারফিউ উঠল না। আর সেই দিন সন্ধ্যায় আলবদর গোষ্ঠীর সদস্যরা শহীদ ভাইয়ের বাসায় ঢুকে পড়ে। এর পরের ঘটনার চিত্র আমরা পান্না কায়সারের বর্ণনা থেকে জেনে নিতে পারি। তিনি তাঁর মুক্তিযুদ্ধ: আগে ও পরে গ্রন্থে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তা এ রকম: কিছুক্ষণ পরে তিন-চারজন লোক গটগট করে ওপরে উঠে এল। ওদের সকলের মুখ কালো কাপড়ে বাঁধা। ব্ল্যাকআউটের কারণে ঘরে মোমবাতি জ্বলছিল। ঠাওর করা যাচ্ছিল না কিছুই। ঘরে ঢুকেই ওরা একবার চারদিকে তাকাল। তখন ওপরে ছিল শহীদুল্লা ও চাচাআব্বা। শহীদুল্লার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম কী?’ ‘আমার নাম শহীদুল্লা কায়সার।’ ওর গলা দিয়ে যেন তখন আগুন ঝরছিল। শহীদুল্লা ওর নাম বলার সঙ্গে সঙ্গে রাজাকারগুলো ওর হাত টান দিয়ে বলল, ‘চলুন আমাদের...সঙ্গে।’ শুনে আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম।

তারপর ওরা টানতে টানতে শহীদুল্লা কায়সারকে নিয়ে যাচ্ছে, স্ত্রী পান্না কায়সার এক হাত ধরে টেনে ধরে রাখতে চেষ্টা করছেন। রাজাকারদের ধাক্কায় পান্না কায়সার ছিটকে পড়ে গেছেন সিঁড়িতে। আবার বোন বেবী এসে তাদের বড়দাকে ধরে রেখেছে। ওরা টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে শহীদুল্লা কায়সারকে। তিনি আরও জোরে বোনের হাতটা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন; কিন্তু পারেননি, হাতটা ছুটে যায়। ওই বাড়িপ্রিয় মানুষটিকে ওরা নিয়ে যায়। কেউ আটকাতে পারেনি। হত্যাকারীরা তাঁকে জিপে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়।

তারপর শহীদুল্লা কায়সারের আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতার ঠিক আগে শহীদ হলেন শহীদুল্লা কায়সার। আমরা জানি, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও সে ভাগ্যকেই মেনে নিয়েছেন, এমন ঘটনা আমাদের দেশেও বিরল নয়। বলা যায়, শহীদুল্লা কায়সার সে পথই বেছে নিয়েছিলেন। হতে পারে তাঁর মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব ছিল, কোনো নতুন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দ্বিধা ছিল কিংবা মা আর স্ত্রী-সন্তান পরিবারের অন্যদের মায়া কাটিয়ে আলগা হয়ে উঠে আসতে পারেননি তিনি। যেটাই সত্য হোক না কেন, তাঁর কর্মবহুল ও বর্ণাঢ্য জীবনের সেটাই হয়তো ছিল অমোঘ নিয়তি। হিন্দু পুরাণ মহাভারতে যে সংশপ্তক সেনার উল্লেখ আছে, তাদের ললাটেও যেমন অঙ্কিত ছিল মৃত্যুর পাঞ্জা।

স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নানা মোড় পরিবর্তনের ঘটনায় আমরা শহীদুল্লা কায়সারের অভাব অনুভব করেছি গভীরভাবে, বারেবারে; কিন্তু তিনি নেই, তবে তাঁর উপন্যাস-গল্পের অবিস্মরণীয় মানুষগুলো রয়েছে, যারা এ দেশের অমর জনগণের প্রতিনিধি, মানবদরদি, সংগ্রামী প্রতিনিধি—এই মানুষগুলো আছে আমাদের সঙ্গে, চলমান জনগণের সঙ্গে। আর এ কথা তো দুনিয়াজুড়ে নতুন মাত্রা নিয়ে সামনে আসছে যে মানুষের প্রতি দরদই মানবতার আসল রূপ। এ দরদই ছিল শহীদুল্লা কায়সারের মধ্যে বিপুল পরিমাণে। সে জন্য আমাদের শহীদ ভাই, শহীদুল্লা কায়সার সকলের এত প্রিয় ছিলেন।

শহীদুল্লা কায়সারের একমাত্র কন্যা শমী কায়সার। বাংলাদেশের একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তার স্মৃতিতে বাবা অনুপস্থিত। কারণ, সেই ভয়ংকর ১৪ ডিসেম্বর তার বয়স হয়েছিল মাত্র ১ বছর ১১ মাস। শমী ১৯৯৬ সালে ১ ফেব্রুয়ারিতে লিখেছিল স্মৃতিকথা বাবার কথা। তা করতে গিয়ে শমী বাবার অনুপস্থিতির যন্ত্রণা ব্যক্ত করার পাশাপাশি বাবার বন্ধুদের স্মরণ করেছে, যাদের সান্নিধ্য তার ভেতরের শূন্যতা কিছুটা হলেও লাঘব করে। শমী প্রথমেই স্মরণ করেছে কমরেড ফরহাদের কথা। শমী স্মরণ করে শহীদ ভাইয়ের বন্ধুদের কথা, মঞ্জুর চাচা, গজনবী আংকেল, রোকেয়া আন্টি, ফরিদা আন্টি, শিল্পী কামরুল হাসান, নাট্যকার মামুনুর রশীদ প্রমুখদের। তারপরও কি শমী শান্ত হতে পেরেছে? তাই তো ‘বাবার কথা’র শেষে গিয়ে প্রশ্ন করেছে বিধাতার কাছে, ‘তুমি এমন নিষ্ঠুর কেন? সন্তানের বুক খালি করে কেন বাবাকে নিয়ে যাও?’ এ রকম প্রশ্ন রয়েছে আরও অনেক শহীদের সন্তানদের মধ্যে। আমরা যেন ভুলে না যাই সেই সব শহীদদের কথা।