ধ্বংসের দশকে মানবিক চোখ

অতীত পাঠের অনেক ধরনের উপায় রয়েছে। তারিখ, দলিল, স্মৃতিচারণ বা বিবরণীর মধ্য দিয়ে যেমন, আবার এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে যাদের সমস্ত ভার, আবেগ ও বাস্তবতা সবচেয়ে সংক্ষেপে ধারণ করে কেবল একটি আলোকচিত্র। সময়ের সীমানা ভেদ করে টিকে থাকা এসব ছবির পেছনে থাকে একাধিক গল্প। এই ধারাবাহিকের প্রতিটি পর্বে আমরা তুলে ধরব এমনই কোনো বিশ্ববিখ্যাত আলোকচিত্রের অন্তরঙ্গ ইতিহাস।

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ বা মহামন্দা ছিল আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই বিপর্যয়কে প্রায়ই ১৯৩০ সালের বিপর্যয় হিসেবে আখ্যা দেওয়া হলেও বাস্তবে এটি ছিল একটি পূর্ণ দশকব্যাপী চলা সংকট, যা বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামো, রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছিল। শুরু হয়েছিল ১৯২৯ সালে এবং চলেছে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত। এই আর্থিক মন্দা শিল্প, কৃষি, বাণিজ্য, রাজনীতি এবং সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে এক অভূতপূর্ব ধস নামিয়ে আনে। লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে, অসংখ্য ব্যাংক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কের ধারণা নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত হতে শুরু করে। এই সংকট আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার জন্ম দেয় এবং অর্থনীতিতে সরকারের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত হয়।

সূচনা হিসেবে সাধারণত ১৯২৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার ধসকে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু এই পতন ছিল আসলে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসাম্য ও কাঠামোগত দুর্বলতার ফল। ১৯২০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক শিল্পোৎপাদন, সহজ ঋণপ্রাপ্তি ও শেয়ারবাজারে জল্পনামূলক বিনিয়োগের ফলে একধরনের কৃত্রিম সমৃদ্ধির আবহ তৈরি হয়েছিল। মানুষ ধার করে সেই টাকায় শেয়ার কিনছিল। সবকিছুর উৎপাদন বাড়ছিল অথচ সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। ফলে বাজারে পণ্যের আধিক্য তৈরি হলেও সেগুলো কেনার মতো ক্রেতা কমছিল। সমাজে বিরাজমান ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি শেয়ারবাজারকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে এবং সামান্য আস্থার অভাবে ভয়াবহ ধস নামে।

১৯২৯ সালের অক্টোবরে শেয়ারবাজার ভেঙে গেলে সংকট দ্রুত অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিনিয়োগকারীরা সর্বস্ব হারায়। ভোগব্যয় হঠাৎ কমে যায়, ফলে সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্পোৎপাদনে। কারখানাগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়। ফলে একদিকে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয় এবং অন্যদিকে বেকারত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ আরও কম খরচ করতে শুরু করে, যা আবার ব্যবসা-বাণিজ্যকে আরও সংকুচিত করে। এভাবে একটি আত্মবর্ধনশীল দুষ্টচক্র তৈরি হয় এবং অর্থনীতি নিজেই নিজের ভেতর ধসে পড়তে থাকে।

১৯৩০-এর দশকে, যখন আমেরিকান স্বপ্ন ভেঙে চূর্ণ হয়ে ধুলার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল, তখন খুব কম মানুষই সেই সময়ের আত্মাকে ডরোথিয়া ল্যাংয়ের মতো গভীরভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন। ডরোথিয়া ল্যাং তাঁর আরামদায়ক স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন মহামন্দার নির্মম বাস্তবতা ক্যামেরায় ধারণ করতে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের পথে। আলোকচিত্রী: ডরোথিয়া ল্যাং

এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তোলে তৎকালীন ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রে কোনো আমানত বিমাব্যবস্থা ছিল না। ফলে একটি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেলে সাধারণ মানুষের সঞ্চয় সম্পূর্ণ খোয়া যেত। ব্যাংকের এমন ব্যর্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে যায়। সবাই একযোগে ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে ছুটে যায়। যার ফলে বহু স্বাভাবিক ঝুঁকিহীন ব্যাংকও নগদ অর্থের অভাবে কার্যক্রম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। ১৯৩০-এর দশকে প্রায় ৯ হাজার ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। এর সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে। মহামন্দা কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। সরকারের নীতিগত ভুল এটিকে বৈশ্বিক সংকটে পরিণত করে। ১৯৩০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকার স্মুট-হলি শুল্ক আইন (স্মুট-হলি ট্যারিফ অ্যাক্ট) পাস করে বিদেশি পণ্যের ওপর উচ্চ কর আরোপ করে, যাতে দেশীয় শিল্প রক্ষা করা যায়। কিন্তু ফল হয় উল্টো। অন্যান্য দেশও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে কমে যায়। বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই সংকোচন বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে একটি বিশ্বব্যাপী মন্দার রূপ দেয়।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ অর্থনীতিকে চাঙা করার বদলে অর্থের জোগান কমিয়ে দেয়। স্বর্ণের মান (গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড) রক্ষার জন্য সুদের হার বাড়ায়। ফলে বাজারে টাকার সংকট আরও তীব্র হয়। মূল্যপতন বা ডিফ্লেশন দেখা দেয় এবং ঋণগ্রহীতাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। সরকার তখন বাজেট ঘাটতি কমাতে কর বাড়ায় ও ব্যয় হ্রাস করে, যা সংকটকালে জনগণের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে।

একটি কুঁড়েঘরে বসবাসরত এক দরিদ্র আমেরিকান পরিবার, ১৯৩৬। আলোকচিত্রী: ডরোথিয়া ল্যাং

এই সব সম্মিলিত কারণে ‘দ্য গ্রেট ডিপ্রেশন’ শুধু একটি অর্থনৈতিক ঘটনা নয়; বরং একটি সভ্যতাগত ধাক্কায় পরিণত হয়। এই অভিজ্ঞতা থেকেই নিউ ডিলের মতো নীতির জন্ম হয় এবং আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের ভূমিকা নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৩০-এর দশকে, যখন আমেরিকান স্বপ্ন ভেঙে চূর্ণ হয়ে ধুলার সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল, তখন খুব কম মানুষই সেই সময়ের আত্মাকে ডরোথিয়া ল্যাংয়ের মতো গভীরভাবে ধারণ করতে পেরেছিলেন। ডরোথিয়া ল্যাং তাঁর আরামদায়ক স্টুডিও ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন মহামন্দার নির্মম বাস্তবতা ক্যামেরায় ধারণ করতে। সেই যাত্রার ফলেই জন্ম নেয় বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আইকনিক ছবি ‘মাইগ্র্যান্ট মাদার’।

ডরোথিয়া ল্যাং ১৯২০-এর দশকে সান ফ্রান্সিসকোতে একজন সফল পোর্ট্রেট আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর স্টুডিওতে মূলত সমাজের সচ্ছল ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ ছবি তুলতে আসত। কিন্তু ১৯২৯ সালের পর অর্থনৈতিক বিপর্যয় যখন শহরের রাস্তায় নেমে আসে, তখন ল্যাংয়ের স্টুডিওর জানালার বাইরের দৃশ্য দ্রুত বদলে যেতে থাকে। তিনি প্রতিদিন দেখতে পান বেকার মানুষের দীর্ঘ রুটি-লাইনের সারি, অনাহারে ক্লান্ত মুখ, আর আশাহীন অপেক্ষা। দৃশ্যগুলো তাঁর ভেতরে একধরনের নৈতিক অস্বস্তি তৈরি করে। তিনি উপলব্ধি করেন, সুশোভিত পোর্ট্রেট আলোকচিত্র তোলার চেয়ে এই সময়ের ‘সত্য’ ডকুমেন্টেশন বেশি জরুরি।

ডরোথিয়া ল্যাং। ছবি: সংগৃহীত

ফলে ল্যাং স্টুডিও ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। শুরুতে কোনো সরকারি দায়িত্ব বা প্রকল্পের অংশ হিসেবে নয়, বরং নিজের তাগিদেই তিনি বেকার শ্রমিক, ভবঘুরে মানুষ ও রুটি-লাইনের দৃশ্য ধারণ করতে থাকেন। তিনি আলোকচিত্রকে ব্যবহার করেন সময়ের সাক্ষী হিসেবে। তাঁর এই প্রাথমিক কাজগুলোতে মানবিক সহানুভূতি ও সংযত দৃষ্টিভঙ্গি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে তা দ্রুত বুদ্ধিজীবী ও গবেষকদের নজরে আসে।

এমন পর্যায়ে ল্যাংয়ের সঙ্গে পরিচয় ঘটে অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী পল টেলরের। টেলর গ্রামাঞ্চলের কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর মহামন্দার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছিলেন। পাশাপাশি তিনি ল্যাংয়ের ছবিতে পরিসংখ্যানের বাইরে থাকা এক জীবন্ত বাস্তবতা দেখতে পান। টেলর ল্যাংকে শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে গ্রাম ও কৃষিপ্রধান অঞ্চলে নিয়ে যান। ল্যাং বুঝতে পারেন যে মহামন্দার প্রকৃত রূপ শুধু শহরের বেকারত্বে নয়, বরং গ্রামীণ কৃষকদের ধ্বংস, ভূমিহীনতা ও মাইগ্র্যান্ট জীবনের মধ্যেও নিহিত।

ডরোথিয়া ল্যাং ১৯২০-এর দশকে সান ফ্রান্সিসকোতে একজন সফল পোর্ট্রেট আলোকচিত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর স্টুডিওতে মূলত সমাজের সচ্ছল ও অভিজাত শ্রেণির মানুষ ছবি তুলতে আসত। কিন্তু ১৯২৯ সালের পর ল্যাংয়ের স্টুডিওর জানালার বাইরের দৃশ্য দ্রুত বদলে যেতে থাকে।

পল টেলরের মাধ্যমে ল্যাংয়ের কাজ পৌঁছে যায় রয় স্ট্রাইকারের কাছে, যিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ফার্ম সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য বিভাগ পরিচালনা করতেন। স্ট্রাইকারের লক্ষ্য ছিল আলোকচিত্রের মাধ্যমে সাধারণ আমেরিকানদের সামনে দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা এবং নিউ ডিল কর্মসূচির জন্য জনসমর্থন তৈরি করা। ল্যাংয়ের ধারণ করা আলোকচিত্রের ভাষা স্ট্রাইকারের এই লক্ষ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। ফলে তিনি ফার্ম সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেরর আলোকচিত্রী হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

এই নিয়োগের মাধ্যমে ডরোথিয়া ল্যাংয়ের ব্যক্তিগত সহানুভূতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চল, কৃষিশিবির ও মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকদের আবাসস্থলে ঘুরে ঘুরে ছবি তুলতে শুরু করেন। তাঁর ক্যামেরা মহামন্দাকে আর কেবল একটি অর্থনৈতিক সংকট হিসেবে নয়, বরং এক দীর্ঘ মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে তুলে ধরে। তিনি নিজে হয়ে ওঠেন সময়ের নীরব সাক্ষী।

আলোকচিত্রী: ডরোথিয়া ল্যাং

১৯৩৬ সালের মার্চ মাসে, এক মাসব্যাপী ক্লান্তিকর দায়িত্ব শেষে ল্যাং ক্যালিফোর্নিয়ার নিপোমোর কাছে প্রবল বৃষ্টির মধ্যে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে তিনি একটি সাইনবোর্ডে লেখা দেখেন ‘মটরশুঁটি সংগ্রাহকদের শিবির’। অগ্রাহ্য করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তিনি প্রায় বিশ মাইল এগিয়ে যান। কিন্তু এক অদ্ভুত অস্থিরতা তাঁকে ফিরে যেতে বাধ্য করে। ফলে ফিরে গিয়ে সেখানে তিনি দেখেন একটি অস্থায়ী তাঁবুতে গাদাগাদি করে থাকছে একটি পরিবার। শীতের তুষারে ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। কাজ নেই, খাবার নেই।

ল্যাং ধীরে ধীরে এগিয়ে যান এক নারীর কাছে। তার নাম ফ্লোরেন্স ওয়েন্স থম্পসন। ল্যাং ছয়টি ছবি তোলেন, প্রতিটি ফ্রেমে একটু করে কাছে আসেন। শেষ ছবিটিই ইতিহাসে অমর হয়ে আছে ‘মাইগ্র্যান্ট মাদার’ নামে। তিনি মহিলাটির কাছে অবস্থা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, চারপাশের জমি থেকে পাওয়া সবজি আর শিশুদের ধরা পাখি খেয়েই তারা বেঁচে আছে।

ডরোথিয়া ল্যাংয়ের মাইগ্র্যান্ট মাদার আলোকচিত্রটি তাঁর বিষয়বস্তুর মতোই সংযত, নীরব ও গভীর। কোনো অতিরঞ্জিত আবেগ, নাটকীয় আলো কিংবা দৃশ্যমান দারিদ্র্যের প্রদর্শন নেই। ল্যাং ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মাঝারি ক্লোজআপ ফ্রেম বেছে নিয়েছেন, যাতে পরিবেশ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বাদ পড়ে এবং দর্শকের মনোযোগ বাধ্যতামূলকভাবে নারীর মুখের দিকে কেন্দ্রীভূত হয়। এই ফ্রেমিং দর্শককে ছবির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকতে দেয় না; বরং তাকে মানবিক সংকটের খুব কাছাকাছি এনে দাঁড় করায়। দারিদ্র্য এখানে কোনো ভৌগোলিক বা সামাজিক পটভূমি নয়। আলোকচিত্রটি একটি মুখ, একটি দৃষ্টি, একটি মানসিক অবস্থা।

ছবিটি ত্রিভুজাকার কম্পোজিশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা পাশ্চাত্য চিত্রকলার এক ক্ল্যাসিক কাঠামো। কেন্দ্রে বসে থাকা মা, দুই পাশে কাঁধে ঝুঁকে থাকা দুই শিশু এবং নিচে কোলে ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে এই ত্রিভুজ আকৃতি গঠিত হয়েছে। এই বিন্যাস অজান্তেই দর্শকের মনে রেনেসাঁ যুগের ‘মাদোনা ও শিশু’ চিত্রকাঠামোর স্মৃতি জাগায়।

ছবিটির গঠন লক্ষ করলে বোঝা যায়, এটি একটি ত্রিভুজাকার কম্পোজিশনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা পাশ্চাত্য চিত্রকলার এক ক্ল্যাসিক কাঠামো। কেন্দ্রে বসে থাকা মা, দুই পাশে কাঁধে ঝুঁকে থাকা দুই শিশু এবং নিচে কোলে ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে এই ত্রিভুজ আকৃতি গঠিত হয়েছে। এই বিন্যাস অজান্তেই দর্শকের মনে রেনেসাঁ যুগের ‘মাদোনা ও শিশু’ চিত্রকাঠামোর স্মৃতি জাগায়। ফলে ছবিটি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানের দলিল হয়ে না থেকে মাতৃত্ব, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের এক চিরন্তন প্রতীকে রূপ নেয়।

মায়ের মুখভঙ্গি এই ছবির আবেগীয় কেন্দ্রে অবস্থান করে। তিনি কাঁদছেন না, আর্তনাদ করছেন না, কিংবা সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়েও নেই। তাঁর দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ, যেন একটি অজানা ভবিষ্যতের দিকে। গালে ঠেকানো হাতটি কোনো নাটকীয় অঙ্গভঙ্গি নয়, বরং এটি দীর্ঘ চিন্তা, দুশ্চিন্তা ও ক্লান্তির এক নীরব চিহ্ন। এই সংযত অভিব্যক্তিই ছবিটিকে শক্তিশালী করে তোলে। ল্যাং এমন একটি মুহূর্ত বেছে নিয়েছেন, যেখানে যন্ত্রণা বিস্ফোরিত নয়, বরং জমাট বেঁধে আছে, যেন বহুদিন ধরে বহন করা এক বোঝা।

মাইগ্র্যান্ট মাদার। আলোকচিত্রী: ডরোথিয়া ল্যাং

শিশুদের মুখ আড়াল করে রাখাও একটি অত্যন্ত সচেতন আলোকচিত্র কৌশল। দুই শিশু মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে রেখেছে, ফলে তারা আলাদা কোনো ব্যক্তিসত্তা হিসেবে চিহ্নিত হয় না। তারা হয়ে ওঠে সর্বজনীন। এই সময়ের সব অনাহারী, অসহায় শিশুর প্রতীক। বিপরীতে, মায়ের মুখই একমাত্র পূর্ণাঙ্গভাবে দৃশ্যমান পরিচয়। এই আলোকচিত্রের মাধ্যমে ল্যাং দারিদ্র্যের ব্যক্তিগত কাহিনিকে একটি সামষ্টিক মানবিক প্রতীকে উন্নীত করেন। মা এখানে কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি গোটা প্রজন্মের দায়িত্ব ও উদ্বেগের মুখ।

আলো ব্যবহারের দিক থেকেও ছবিটি চরম সংযমের উদাহরণ। কোনো কৃত্রিম আলোর ব্যবহার নেই। আকাশ হতে নেমে এসে তাঁবুর ভেতরে ঢুকে পড়া নরম প্রাকৃতিক আলো মুখের ভাঁজ, হাতের রুক্ষতা ও পোশাকের জীর্ণতাকে স্পষ্ট করে তোলে। কিন্তু কোথাও কোনো নাটকীয় ছায়া তৈরি করে না। এই আলো সৌন্দর্য নির্মাণের জন্য নয়, বরং বাস্তবতাকে তুলে ধরে। ফলে ছবিটি করুণ হয়ে ওঠে না, আবার নান্দনিক সৌন্দর্যের মোড়কেও ঢেকে না গিয়ে একটি নিখাদ সত্যের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।

ক্যামেরার পার্সপেকটিভও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ল্যাং আলোকচিত্রের সাবজেক্টের চোখের সমান উচ্চতায় ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। তিনি ওপর থেকে তাকিয়ে করুণা আরোপ করেননি, আবার নিচ থেকে তাকিয়ে মাকে বীরত্বের প্রতিমূর্তিও বানাননি। এই সমতল দৃষ্টিভঙ্গি ছবিটির নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে। ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের মধ্যকার দূরত্ব ঘোচানোর একটি চেষ্টা তৈরি করে। একজন মানুষ আরেকজন মানুষের দিকে তাকাচ্ছে, ঠিক সেই স্তর থেকে যেখানে সহানুভূতি জন্ম নিতে পারে।

ল্যাং পরিস্থিতির জরুরি গুরুত্ব বুঝে ছবিগুলো দ্রুত সান ফ্রান্সিসকো নিউজে পাঠান। আলোকচিত্রের প্রভাব বিস্তার হয় তাৎক্ষণিক। ফেডারেল সরকার নিপোমো শিবিরে ২০ হাজার পাউন্ড খাদ্য পাঠায় অনাহার ঠেকাতে।

মাইগ্র্যান্ট মাদার আলোকচিত্রটি কোনো চরম দৃশ্য নয়। না মৃত্যুর, না অনাহারের কোনো চূড়ান্ত মুহূর্ত। বরং আলোকচিত্রটি এক দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবস্থাকে ধরে রেখেছে। অনিশ্চয়তার ভেতর আটকে থাকা সময়কে ধরে রেখে একটি চিরস্থায়ী ঐতিহাসিক দলিলে পরিণত করেছে।