প্রেতপুরীতে রাম: ভারতীয় অনুপ্রেরণার উৎস

অনুবাদ: ফারুক মঈনউদ্দীন

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মাইকেলের সারগ্রাহী বহুমুখী মনোভাবের কারণে তাঁর রচনাকর্মে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণা খুঁজে পাওয়া এবং তা দেখানোর ব্যাপারে অতি উৎসাহী ছিলেন প্রশংসাকারী ও সমালোচনাকারী—উভয় ধরনের সমালোচকেরা। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’–এ ইউরোপীয় প্রভাব আছে বটে। নিজের লেখা চিঠিপত্রের মধ্যেই গর্বের সঙ্গে কিছু উৎসের কথা আমাদের বলে ফেলেছেন মাইকেল। অষ্টম সর্গ সম্পর্কে রাজনারায়ণ বসুর কাছে তিনি লেখেন: ‘মেঘনাদের ষষ্ঠ ও সপ্তম সর্গ শেষ করিয়াছি, এখন আগাইতেছি অষ্টম সর্গ লইয়া। শ্রী রামকে আরেকটি এনিয়াসের ন্যায় তাহার পিতা দশরথের নিকট প্রেতপুরীতে পাঠাইতে হইবে।’ এখানে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে এ রকম চিঠির কারণেই আলোচকেরা মাইকেলের মহাকাব্যে ইউরোপীয় বৈশিষ্ট্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন, উপেক্ষা করেছেন সামগ্রিকভাবে কাব্যটির শৈল্পিক উৎকর্ষ, অবমূল্যায়ন করেছেন তাঁর রচনায় উপস্থাপিত ভারতের নিজস্ব মহাকাব্যিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়াসটিকেও।

অধ্যাপক টি ডব্লিউ ক্লার্ক তাঁর ‘মেঘনাদবধ কাব্য, অষ্টম সর্গ: প্রেতপুরীতে অবতরণ’ প্রবন্ধের শুরুতেই কাব্যটির ‘ভারতীয়তা’কে গৌণ করে লক্ষণীয়ভাবে তুলে ধরেন কবির উদ্ভাবনীশক্তিকে। আমাদের জন্য ভার্জিলের ‘ইনিড’-এর নির্দিষ্ট অংশের বিস্তারিত বর্ণনা দেন ক্লার্ক, যেখানে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’–এর অষ্টম সর্গের বিশেষ কিছু বিষয় সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। দান্তের ‘ইনফার্নো’ এবং মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি জানান যে বহু ক্ষেত্রে এগুলোও স্পষ্টতই মাইকেলের বর্ণনার অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তবে কিছুটা অতি উৎসাহে ক্লার্ক ইউরোপীয় উৎসের বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করেন, যেগুলো মূলত ভারতীয় ভাষ্যের ভেতর থাকা পূর্বঘটনা। যেমন প্রেতপুরীতে রামের অভিযান একটি রাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ক্লার্ক লেখেন, ‘এনিয়াস এভাবে সময়ের সীমাবদ্ধতায় ছিলেন না, তবে দান্তে ছিলেন; আর দত্ত তো “হ্যামলেট” পড়েছেন, যেখানে রাজকীয় ভূত রাতের প্রবহমান প্রহরকে অবজ্ঞা করার সাহস পায়নি।’ কথাটা সত্য, কিন্তু কৃত্তিবাসের বাংলা রামায়ণও একটা তুলনামূলক শর্ত হিসেবে এক রাতের সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল আখ্যানের মধ্যে: সূর্যকে অবশ্যই হনুমানের বগলের নিচে লুকিয়ে রাখতে হবে, যাতে সকাল হতে না পারে। এই লেখার পরের অংশেও উল্লেখ থাকবে প্রসঙ্গটি। এরপর আমি ঘটনাক্রমে ক্লার্কের কিছু ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা করব। আরও নির্দিষ্টভাবে দেখাতে চেষ্টা করব মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’র সবচেয়ে ‘বিজাতীয়’ অষ্টম সর্গ এবং ভারতীয় উৎস কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ ও কাশীরাম দাসের ‘মহাভারত’-এর মধ্যে ধারাবাহিকতার মাত্রা। অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ও সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রেতপুরী পাঠকদের দেখানোর জন্য শেষোক্ত দুটি গ্রন্থ থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করে, সেসব উপরিউল্লিখিত ইউরোপীয় বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন মাইকেল।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (২৫ জানুয়ারি ১৮২৪-২৯ জুন ১৮৭৩)
প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

‘রামায়ণ’-এর একটা পর্বে রাবণের সবচেয়ে সেরা ছেলে ইন্দ্রজিৎ নামে পরিচিত মেঘনাদকে হত্যা করার কাহিনি ঘিরে মাইকেলের মহাকাব্যটি ৯ সর্গে বিস্তৃত। এটি শুরু হয় রাক্ষস বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে মেঘনাদের পুনর্নিয়োগ এবং শেষ হয় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। ষষ্ঠ সর্গে লক্ষ্মণ মেঘনাদকে হত্যা করেন। পুত্রের মৃত্যুতে বিষাদগ্রস্ত হয়ে ক্রুদ্ধ রাবণ নিজেই চলে যান যুদ্ধক্ষেত্রে—রাম, লক্ষ্মণ, বিভীষণ ও তাঁদের দলের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। সপ্তম সর্গের শেষে রাবণের ছোড়া শেলের আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে পড়ে যান লক্ষ্মণ। অষ্টম সর্গ শুরু হয় প্রিয় অনুজের প্রতীয়মান মৃত্যুতে রামের বিলাপ দিয়ে। আমাদের তিনি জানান, যে স্ত্রীর কারণে এই যুদ্ধের আরম্ভ, সেই স্ত্রীর চেয়ে তিনি বেশি ভালোবাসতেন এই ভাইকে।

এ পর্যন্ত সবকিছুই বাল্মীকির সংস্কৃত ‘রামায়ণ’ এবং কৃত্তিবাসের মধ্যযুগের বাংলা ভাষ্যের মহাকাব্যটিতে উপস্থিত। এখানে এসে মধুসূদনের মহাকাব্যটি তাঁর এই দুই পূর্বসূরির কাছ থেকে কিছুটা সরে যায়। তবে যা-ই হোক, রামের কাহিনির তিনটি আখ্যানেই পরবর্তী বিষয়টা ছিল লক্ষ্মণের পুনরায় বেঁচে ওঠা। মাইকেলের অষ্টম সর্গের প্রায় পুরোটাই এ বিষয়ে রামের প্রয়াসে নিবেদিত—এ রকম একটা পর্ব (লক্ষ্মণের পুনরুজ্জীবন) বাল্মীকি ও কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ গ্রন্থেও পাওয়া যায়, তবে ভিন্নভাবে।

বাল্মীকির ভাষ্যে ঘটনাটি বরং খোলামেলা, অন্ততপক্ষে বিশদ সংস্করণে। রাবণকে পরাজিত না করা পর্যন্ত আহত ভাইয়ের জন্য প্রলম্বিত শোকপ্রকাশ স্থগিত রেখেছিলেন রাম। কাজটা সমাধা হওয়ার পর লক্ষ্মণের জন্য বিলাপ শুরু করেন তিনি, এমনকি এমনও বলেন যে যদি জানতেন তাঁর প্রিয় ভাইকে হারানোর মতো ক্ষতি হবে, তাহলে কখনোই স্ত্রীকে উদ্ধারের চেষ্টা করতেন না।

বাল্মীকির বিপরীতে কৃত্তিবাসের পরবর্তী ধারায় মাইকেল আখ্যানটিকে দীর্ঘায়িত করেন এখানে। অথচ যেখানে কৃত্তিবাস কাহিনিটিকে বিস্তৃত করেন হনুমানের বেশ কয়েকটি বীরত্বপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে, সেখানে প্রেতলোকে রামের অভিযানের বর্ণনা যুক্ত করেন মাইকেল। এ পর্যায়েও কাহিনির ক্রিয়াকলাপের মূল উপজীব্য হচ্ছে লক্ষ্মণের নবজীবন প্রাপ্তি।

এ সময় বানর বৈদ্য সুষেণা রামকে সান্ত্বনা দেয়। সে নিশ্চিত করে বলে যে পুরোপুরি মারা যাননি লক্ষ্মণ। এরপর হনুমানের দিকে ফিরে তাকে গন্ধমাদন নামের পাহাড়ের দক্ষিণচূড়ায় জন্মানো আরোগ্য বৃক্ষ বিশল্যকরণী এবং আরও তিনটি গাছ আনতে নির্দেশ দেয়। সেই পাহাড়ে পৌঁছে হনুমান বুঝতে পারে যে (অন্য তিনটির কথা বাদ দিলেও) তার পক্ষে বিশল্যকরণী গাছ চিনে নেওয়া সম্ভব হবে না। ভুল গাছ নিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য পুরো গন্ধমাদন পাহাড়টিকে তুলে লঙ্কায় নিয়ে যায় হনুমান। সুষেণা প্রকৃত ঔষধি গাছটি চিনতে পেরে তুলে নিয়ে চূর্ণ করে, তারপর সেই ঔষধ লক্ষ্মণের নাসারন্ধ্রের মুখে লাগিয়ে দেয়। ওষুধটি শ্বাসের সঙ্গে টেনে নিয়ে আবার জেগে ওঠেন আহত লক্ষ্মণ। ভাইকে সুস্থ অবস্থায় পেয়ে আবেগে গলে কাদা হয়ে যান রাম। লক্ষ্মণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সত্যই আমার জীবন কিংবা সীতা কিংবা বিজয় অর্থহীন (তোকে ছাড়া)।’ অপুরুষোচিত আবেগের জন্য বড় ভাইকে তিরস্কার করে লক্ষ্মণ তাঁকে পরামর্শ দেন যাতে সেদিন সূর্যাস্তের আগেই রাবণকে পরাজিত করেন তিনি। যুদ্ধ শুরু হয় আবার।

কৃত্তিবাসের ভাষ্যে লক্ষ্মণের পুনর্জীবন ঘিরে ঘটনার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে বেশ বড় পরিসরে—ফলে সামগ্রিকভাবে কাহিনির মধ্যে আরও জোরদার হয়েছে বিষয়টি। রাবণকে পরাজিত করেন রাম, এরপর সমস্ত মনোযোগ ফেরান আহত ভাইয়ের দিকে, কোনো লজ্জা না করে প্রকাশ্যে দুঃখ করে বলেন, ‘রাজ্যধনে কার্য্য নাই নাহি চাই সীতে;/ সাগরে ত্যজিব প্রাণ তোমার শোকেতে।’ এসব কথা যথেষ্ট কঠিন এবং এক অর্থে (লক্ষ্মণও আমার সঙ্গে একমত হবেন আমি নিশ্চিত) একজন সম্মানিত স্বামীর পক্ষে উচ্চারণ করার মতো একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। তবে প্রিয় ভাইয়ের প্রতীয়মান মৃত্যুতে রাম উন্মাদপ্রায়, এ–জাতীয় মর্মান্তিক ভাষা তাঁর মানসিক অবস্থাকেই তুলে ধরে। বৈদ্য সুষেণাকে লক্ষ্মণের জীবন বাঁচানোর জন্য মিনতি করেন রাম। সুষেণা রামকে সান্ত্বনা দেয় এবং হনুমানকে পাঠায় গন্ধমাদন নামের পাহাড় থেকে একটা বিশেষ ঔষধি বৃক্ষ আনার জন্য (এখানে বাংলা ভাষ্যে কেবল বিশল্যকরণীর উল্লেখ আছে)। কৃত্তিবাসের বর্ণিত পাহাড়ে নয়টি চূড়ার কথা বলা হয়েছে (বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ছয়টির), প্রতিটির রয়েছে পরিচিত বৈশিষ্ট্য: প্রথমটিতে রয়েছে শঙ্করের (শিব) আস্তানা; শশধরা (চাঁদ) ওঠে দ্বিতীয়টি থেকে; আরেকটি তিন কোটি গন্ধর্বের বাসস্থান; আরেকটির ওপর জন্মায় শাল পিয়াল তরু, অন্যটিতে বিচরণ করে বাঘ আর সিংহের পরিবার, বর্ণিত সর্বশেষটিতে রয়েছে এক খরস্রোতা নদী, সেটির দুই তীরে রয়েছে শ্যামল ঔষধি বৃক্ষের অরণ্য। সেখানে বিশল্যকরণী নামের যে গাছটি পাওয়া যাবে, সেটির বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে: স্বর্ণরঙের লতা, নীল রঙের ফুল আর ফল, পিঙ্গলবর্ণের পাতা আর লাল রঙের ডাঁটা। সুষেণা হনুমানকে বলে যে সূর্য ওঠার আগেই ঔষধি বৃক্ষ নিয়ে ফিরতে হবে তাকে, তা না হলে নিশ্চিত মারা যাবেন লক্ষ্মণ। হনুমানকে হাহা হুহু নামের গন্ধর্ব এবং তাদের সম্মোহনী ক্ষমতার কাছ থেকে সাবধান থাকতে বলে সুষেণা। রাম আরও একবার হতাশা ব্যক্ত করেন যে এই অভিযানে সময় লাগবে ১৮ বছর, কিন্তু হনুমান তাঁকে নিশ্চিন্ত করে, তারপর নিজের শরীরকে বিশাল করে নিয়ে উড়াল দেয় আকাশে।

কাহিনির এই অংশ এবং লক্ষ্মণের জীবন ফিরে পাওয়ার মধ্যে প্রায় ২৮০টি দ্বিপদী আখ্যান যুক্ত করেন কৃত্তিবাস। বর্ধিত এই প্রধান আখ্যানের মধ্যেই হনুমান সূর্যকে বগলের নিচে লুকিয়ে রাখে, যাতে গন্ধমাদন পর্বত খুঁজে নিয়ে লক্ষ্মণের জীবন রক্ষা না হওয়া পর্যন্ত সূর্যোদয় না হয়। বাল্মীকির ‘রামায়ণ’–এ যে বর্ণনা দেওয়া হয় মাত্র কয়েক পঙ্‌ক্তিতে (বিশদ সংস্করণে ছিল পাঁচটি শ্লোক)—কৃত্তিবাসের বাংলা ভাষ্যে কয়েকটি ছোট পর্বে ছিল লক্ষ্মণের বিশল্যকরণী সংগ্রহ নিয়ে কয়েক শ দ্বিপদী।

বাল্মীকির বিপরীতে কৃত্তিবাসের পরবর্তী ধারায় মাইকেল আখ্যানটিকে দীর্ঘায়িত করেন এখানে। অথচ যেখানে কৃত্তিবাস কাহিনিটিকে বিস্তৃত করেন হনুমানের বেশ কয়েকটি বীরত্বপূর্ণ কাজের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে, সেখানে প্রেতলোকে রামের অভিযানের বর্ণনা যুক্ত করেন মাইকেল। এ পর্যায়েও কাহিনির ক্রিয়াকলাপের মূল উপজীব্য হচ্ছে লক্ষ্মণের নবজীবন প্রাপ্তি। এ সময় কৃত্তিবাস ও মাইকেল—দুজনই নবজীবন লাভের বিষয়টা মুলতবি রেখে সামনে নিয়ে আসেন অন্য আনুষঙ্গিক পর্বগুলো।

সপ্তম সর্গ যেখানে থেমে গিয়েছিল, সেখান থেকে শুরু হয় ‘মেঘনাদবধ কাব্য–র অষ্টম সর্গ: রণক্ষেত্রে পড়ে আছেন মৃত্যুপথযাত্রী লক্ষ্মণ। বিষাদে ডুবে গিয়ে রামও অচেতন হয়ে পড়েন ভাইয়ের শরীরের পাশে। চেতনা ফিরে পেয়ে চিৎকার করে বিলাপ করতে থাকেন তিনি। এমন একটা শোকাবহ দৃশ্য অন্তর্ভুক্ত করেছেন বাল্মীকি ও কৃত্তিবাস দুজনই। রামের যে বিলাপের বর্ণনা মাইকেল দিয়েছেন, সেটি কৃত্তিবাসের ভাষ্যের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো, তবে পূর্বসূরির মূলসুরকে খুব কাছে থেকে অনুসরণ করেছেন মাইকেল, যদিও সেটা আক্ষরিক অনুকরণ নয় মোটেই। মাইকেলের পঙ্‌ক্তিগুলো আঁটসাঁট, ভাষা শক্তিশালী এবং তাঁর পূর্বসূরিদের লেখার তুলনায় অনেক বেশি জীবন্ত রামের চরিত্র। তবে আগের অধ্যায়ে যেমন দেখানো হয়েছে, এ দৃশ্য ‘রামায়ণ’ সাহিত্যে নতুন কিছু নয়।

রামের প্রেতপুরীতে যাত্রা যে ভার্জিলের ‘ইনিড’-এর ধাঁচে করা হয়েছে, মাইকেলের এমন দাবির সূত্রে ‘মেঘনাদবধ’-এর মায়া এবং কিউমের ‘সিবিল’-এর মধ্যে সুস্পষ্ট তুলনা টেনে এনেছেন বিভিন্ন আলোচক। উভয় নারী চরিত্রই বিশেষ শক্তির অধিকারী এবং কিছুটা অতিপ্রাকৃত, দুজনই তাঁদের সঙ্গীদের প্রেতপুরীতে নিয়ে যান নিজ নিজ পিতার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য।

কৈলাসের অবস্থান থেকে দেবী দুর্গা রামের দুর্দশা দেখতে পেয়ে স্বামী শিবের কাছে মিনতি করেন, যাতে বিপর্যস্ত এই নায়ককে সাহায্য করা হয়। (কাব্যের দ্বিতীয় সর্গে) আখ্যানে এর আগে রাম তাঁর পূজা করেছিলেন বলে তাঁকে অভয় বর দিয়েছিলেন দেবী। এবারে ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নিলে শেষ সর্গের আগেরটিতে দেখা যায় দেবী বিব্রত বোধ করছেন এবং এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে যদি তিনি লক্ষ্মণের আপাত মৃত্যুতে রামের ক্ষতিপূরণ করতে না পারেন, তাহলে খর্ব হবে তাঁর সুনাম ও বরদানের ক্ষমতা। এই আখ্যানে এবং অন্য জায়গাতেও রাক্ষস ও অন্যান্য হীন জাতের বিভিন্ন সত্তার সমর্থক হিসেবে শিবের পরিচিতি আছে। তবে এই বিশেষ ঘটনায় স্ত্রীসুলভ চাপের কাছে তাৎক্ষণিকভাবে নতিস্বীকার করেন তিনি। সীতাকে অপহরণের মাধ্যমে রাবণ নিজের ওপর ধ্বংস ডেকে এনেছেন, এই যুক্তিতে আগেই (দ্বিতীয় সর্গে) রাক্ষসদের পক্ষত্যাগ করেছিলেন শিব।

রামকে প্রেতপুরীর যমরাজ্যে তাঁর মৃত পিতা দশরথের কাছে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দেবী মায়াকে রামের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেন শিব। পিতার কাছ থেকে রাম জেনে আসতে পারবেন কী উপায়ে লক্ষ্মণকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। রামের প্রেতপুরীতে যাত্রা যে ভার্জিলের ‘ইনিড’-এর ধাঁচে করা হয়েছে, মাইকেলের এমন দাবির সূত্রে ‘মেঘনাদবধ’-এর মায়া এবং কিউমের ‘সিবিল’-এর মধ্যে সুস্পষ্ট তুলনা টেনে এনেছেন বিভিন্ন আলোচক। উভয় নারী চরিত্রই বিশেষ শক্তির অধিকারী এবং কিছুটা অতিপ্রাকৃত, দুজনই তাঁদের সঙ্গীদের প্রেতপুরীতে নিয়ে যান নিজ নিজ পিতার সঙ্গে দেখা করানোর জন্য।

যার নামের অর্থ বিভ্রম, সেই মায়া এই কাজের জন্য সবচেয়ে যোগ্য: নিজের আখ্যানের স্বার্থে এমন একটা ঐন্দ্রজালিক চরিত্র সৃষ্টি করেছিলেন মাইকেল। প্রেতপুরীতে রামকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টির মধ্যেও আছে একধরনের কুহক। মাইকেলের ভাষ্যে একটা আলাদা চরিত্র হলেও শিবের সহচরীর ভূমিকায় আবির্ভূত হন মায়া। দুর্গার প্রতিভূ হিসেবে মায়া রামকে তাঁর মৃত পিতার কাছে নিয়ে যান এবং এভাবেই সুগম করেন লক্ষ্মণের পুনর্জীবন লাভের পথ। মায়াকে না পাঠালে নিজের অভয় বরের মর্যাদা রক্ষার জন্য কাজটা দুর্গাকেই করতে হতো। এই মহাকাব্যে আগে দুবার এসেছিলেন মায়া, প্রথমবার দ্বিতীয় সর্গে এবং তারপর আখ্যানের মাঝামাঝি পঞ্চম সর্গে। দ্বিতীয় সর্গে দুর্গা ও কামদেবের মাধ্যমে নির্দেশিত হয়ে ইন্দ্রের কাছে দৈব অস্ত্রাদি পৌঁছে দিয়েছিলেন মায়া, সেসব আবার গান্ধর্বপতি চিত্ররথকে দিয়ে রামের কাছে পৌঁছানো হয়। (রামকে দেওয়া এসব অস্ত্র হচ্ছে দুর্গার সুরক্ষা-বরের অভিব্যক্তির নমুনা) পঞ্চম সর্গে লক্ষ্মণের সঙ্গে দেখা হয় মায়ার, প্রথমে স্বপ্নে স্বপ্নদেবী হিসেবে, তার পর চণ্ডী মন্দিরে স্বরূপে। লক্ষ্মণের চণ্ডী মন্দিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা পরীক্ষা করার জন্য হিংস্র সিংহ, মারাত্মক ঝড়, মন্দিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য সম্মোহনী কুমারী তরুণীদের একটা দল পাঠিয়ে কিছু ভেলকিবাজি দেখিয়েছিলেন মায়াদেবীই। এসবই করা হয়েছিল লক্ষ্মণের অজান্তে। কিন্তু লক্ষ্মণ তাঁর লক্ষ্যে অবিচলিত প্রমাণ করেন নিজেকে। মন্দিরে ঠিকই পৌঁছেছিলেন তিনি এবং পূজা সম্পাদন করেছিলেন দেবীর উদ্দেশে। তুষ্ট হয়ে দেবী লক্ষ্মণকে বুঝিয়ে দেন কীভাবে মেঘনাদকে হত্যা করতে হবে, এখানে মহামায়া ও মায়া—দুটি নামে তাঁর উল্লেখ আছে। তিনি বলেন যে লক্ষ্মণ ও তাঁর সহযোগী বিভীষণ যখন শিকারের দিকে এগিয়ে যাবেন তখন তাঁর মায়ায় ঢেকে অদৃশ্য করে দেবেন দুজনকে।

দুর্গার নির্দেশে মায়াদেবী আরও একবার মর্ত্যে এসেছিলেন অষ্টম সর্গে। তিনি রামকে বলেছিলেন যে লক্ষ্মণ বাঁচবেন—যা বাল্মীকিতে বলেছিল কেবল সুষেণা। কৃত্তিবাসে রামের বিলাপের শেষে প্রথমে দূর থেকে একযোগে বলেছিলেন দেবতারা (‘অন্তরীক্ষে ডাকি বলে যত দেবগণ।/ না কান্দ না কান্দ রাম পাইবে লক্ষণ’) এবং পরে আরও সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা পাওয়া যায় সুষেণার কাছ থেকেও। মাইকেলের আখ্যানে ভাইয়ের বেঁচে ওঠার নিশ্চয়তা দেওয়ার পর রামকে সমুদ্রে স্নান করিয়ে ধর্মীয় আচারে পবিত্র করান মায়া, এরপর বলেন, নিজস্ব কৌশলে মায়াবলে সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে রামকে যমরাজ্যের প্রেতপুরীতে নিয়ে যাবেন তিনি। সেখানে পিতার কাছ থেকে রাম জানতে পারবেন, কীভাবে লক্ষ্মণকে বাঁচিয়ে তোলা যাবে।

ওপরের পৃথিবী থেকে সুড়ঙ্গপথে পাতালের আত্মাদের জগতে অভিযানের মাধ্যম হিসেবে কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’-এর দুটি দৃশ্যের ওপর নির্ভর করেছিলেন মাইকেল, যেখানে হনুমান পাতাল অভিযানে যায়। মাইকেলের মহাকাব্যের অষ্টম সর্গে রাম পাতালে নামেননি, তিনি গিয়েছিলেন যমালয়ে, যাকে প্রেতপুরী, প্রেতদেশ, কৃতান্তনগর, যমপুরী—ইত্যাদি বিভিন্ন নামে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নগরীর বৈশিষ্ট্যসমূহ ক্লার্ক ও অন্যেরা যেরকম চমৎকারভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন, তাতে প্রকাশ পেয়েছে পূর্বোল্লিখিত ইউরোপীয় মহাকাব্যের প্রভাব। তবে মাইকেলের ব্যবহার করা কিছু নাম এবং বর্ণনামূলক বিবরণসমূহ বাংলা ‘মহাভারত’ গ্রন্থে শনাক্ত করা যায়। ক্লার্ক লেখেন, বিশেষ করে মাইকেলের প্রেতপুরীর একটা উল্লেখযোগ্য বিষয় ‘চার দুয়ার’ নেওয়া হয়েছে কাশীরামদাসের ভাষ্য থেকে, যেখানে ‘চার দুয়ার তাঁর [মাইকেলের] কাব্যের চেয়ে আরও বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে’ বলেও মনে করেন তিনি।

অন্যদিকে দুটো ভাষ্যের তুলনা থেকে এটা দেখানো যায় যে ব্যাপারটা ঠিক উল্টো: যমপুরীর সীমানা নির্ধারণ করা চার দুয়ার সম্পর্কে আরও অনেক কিছু জানান মাইকেল—যা কাশীরামদাসের কাছ থেকে কখনোই জানতে পারিনি আমরা। তবে যে প্রেতপুরীতে রামকে নিয়ে যান মাইকেল, সেটি মূলত কাশীরামদাসের মহাকাব্যের ‘শান্তিপর্ব’ অংশে দেখানো যমপুরী। এখানে অন্তঃকলহের যে যুদ্ধে কেবল পঞ্চপাণ্ডব বেঁচে গিয়েছিলেন, সেই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের জন্য অনুতপ্ত হয়ে স্বেচ্ছারোপিত প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য আমরণ অনশন করেন অনুতপ্ত যুধিষ্ঠির। ঋষি ব্যসদেব যুধিষ্ঠিরকে নিরস্ত করে বলেন যে এই শান্তি পর্বে অনেক কিছু আছে, যা শ্রোতাকে শান্ত করবে, প্রতিষ্ঠা করবে যমপুরীর বর্ণনাসহ পার্থিব ও পারলৌকিক বিষয়ের জ্ঞান।

যমপুরীর চারটি দরজা আছে। উত্তর দরজা দিয়ে ঢোকেন ধর্মাচারী ঋষি ও তপস্বীরা, যাঁরা ইহলোক ছেড়ে চলে গেছেন। পশ্চিম দুয়ার দিয়ে গেলে পাওয়া যায় সুস্বাদু খাদ্য, এখান দিয়ে যান সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ বিসর্জন দেওয়া অভিজাত যোদ্ধারা।

মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’–এ রাম এবং তাঁর পথপ্রদর্শক মায়া যমরাজ্যের কাছাকাছি গেলে তাঁদের সামনে পড়ে বৈতরণি—এই নদী পার হতে হবে তাঁদের। ক্লার্ক উল্লেখ করেন একটা নদী (কিংবা ঘূর্ণিপাক) পার হতে হয় ‘ইনিড’-এ: ‘যাত্রীদের যাত্রাপথের প্রথম প্রতিবন্ধক ছিল পানি: এক ক্ষেত্রে বৈতরণি নদী এবং অন্য জায়গায় অ্যাকেরন...দুজায়গাতেই ছিল ফুটন্ত জল।

পূর্ব দ্বারেও মজুত থাকে নানা সুখাদ্য এবং লক্ষণীয়ভাবে থাকে এক রমণীয় হৃদ, এখান দিয়ে আসেন স্বামীসহ বিশ্বস্ত স্ত্রীরা, যাঁরা মৃত্যুর পরও অনুসরণ করছেন স্বামীকে। দক্ষিণ দুয়ারের সামনে দিয়ে বয়ে যায় বৈতরণি নদী, যেসব পাপী এই নদী সাঁতরে পার হতে বাধ্য হয়, তাদের দগ্ধ করে নদীর ফুটন্ত জল। এই হতভাগ্যরা যখন নদী পাড়ি দেয়, তাদের মাথার ওপর গদা দিয়ে মারতে থাকে যমের জল্লাদেরা। অন্য তীরে ওঠার পর কৃমিপোকা খুঁটে খায় ওদের মগজ; মাংস ছিঁড়ে নেয় খ্যাঁকশিয়াল আর কুকুরের দল। দক্ষিণ দুয়ার পার হলে আছে চুরাশিটা নরককুণ্ড, যার মধ্যে দুটোর নাম কুম্ভীপাক আর মহারৌরব। তৃতীয় একটার নাম মহাকুম্ভ। (চতুর্থ নরক গহ্বরকে পরবর্তী এক জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে ‘বিষ্ঠারকুণ্ড’ নামে।)

সাধারণত যমরাজ্যের দক্ষিণ দুয়ার বজ্রকীট উপদ্রুত, কাঠ এমনকি পাথরের মধ্যেও ছিদ্র করে ফেলতে পারে এসব কীট। আরও রয়েছে মাংসভুক অশুভ পাখির দল। মানুষের পাপ-পুণ্য বিচার করেন চিত্রগুপ্ত: যারা মনিবের আদেশ অমান্য করেছে, চুরি করেছে সঞ্চিত সম্পদ, যারা ঈশ্বরের নিন্দা করেছে আর অপবাদ দিয়েছে ব্রাহ্মণদের, তাদের ছুড়ে ফেলা হয় সবচেয়ে অন্ধকার নরকে (সাধারণত)। মহাকুণ্ড, বিশেষ করে স্ত্রী ও গোহত্যাকারীদের জন্য, ব্রাহ্মণ হত্যাকারী, স্বর্ণচোর আর প্রতারণা করে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলকারীদের জন্য কুম্ভীপাক এবং যারা নিজ কন্যাকে বিক্রি করে দিয়েছে, তাদের জন্য মহারৌরব।

‘শান্তিপর্ব’জুড়ে দক্ষিণ দুয়ারের বহু উল্লেখ আছে, অন্য তিনটি দরজার কথা উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র কয়েকটি অংশে। এসব উল্লেখ করার পর ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলেন, যারা নারায়ণকে উপঢৌকন ও বলীদানের মাধ্যমে পূজা করে, ব্রাহ্মণকে গাভি দান করে এবং বিষ্ণুর মতো ব্রাহ্মণদেরও সেবা করে, তারা যমালয়ে ঢুকতে পারে পূর্ব দুয়ার দিয়ে। তৃতীয়বারের মতো উল্লেখ করা হয় একটা ছোট কাহিনি, কীভাবে নারদ বিষ্ণুর প্রকৃত চরিত্র এবং তাঁর নাম-মাহাত্ম্য বোঝার চেষ্টা করেন। ব্রহ্মার পুত্র নারদ প্রথমে যান পিতার কাছে, তিনি সংশয় প্রকাশ করে বলেন যে পুত্রের প্রশ্নের যথাযথ জবাব দেওয়া সম্ভব হবে না তাঁর পক্ষে। তাঁকে তিনি পাঠান শিবের কাছে। শিব তাঁকে বৈকুণ্ঠে পাঠান স্বয়ং বিষ্ণুর কাছে। সেখানে গিয়ে বিষ্ণু এবং তাঁর অবতারদের স্তবগান করেন নারদ। সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন যে তাঁর জন্য কী করতে পারেন তিনি। কী শিখতে চান, সেটা খুলে বলেন নারদ। তখন বিষ্ণু সঞ্জীবনীপুরীতে যাত্রার নির্দেশ দেন তাঁকে। এই নির্দেশ মেনে নারদ যান কৃতান্তর বাড়ি। সেখানে যম তাঁকে পাঠান নগরীর পশ্চিম পাড়ায়, সেখানে পাপীদের শাস্তিভোগ দেখেন তিনি। এই দৃশ্যে ভীত হয়ে যখনই নারদ বিষ্ণুর নাম ধরে ডেকে ওঠেন, শাস্তি ভোগরত হতভাগ্যদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং স্বর্গে যাত্রা করে তারা। বিষ্ণুর নাম-মাহাত্ম্যের সেই সংক্ষিপ্ত কাহিনি শেষ হলে ভীষ্ম আরেকবার ফিরে এসে আরও সরাসরি এবং কিছুটা সবিস্তার (সাতটি দ্বিপদী) যমালয়ের মনোরম উত্তর দ্বারের বর্ণনা দেন: সেখানে রয়েছে সুখানুভবের মতো বহু কিছু, সেখানে ঘুরে বেড়ায় সম্মুখযুদ্ধে প্রাণ হারানো যোদ্ধার দল, যোগীর সমাধিতে থাকার সময় দেহত্যাগকারী এবং ধর্মাচারী দ্বিজকুল।

মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’–এ রাম এবং তাঁর পথপ্রদর্শক মায়া যমরাজ্যের কাছাকাছি গেলে তাঁদের সামনে পড়ে বৈতরণি—এই নদী পার হতে হবে তাঁদের। ক্লার্ক উল্লেখ করেন একটা নদী (কিংবা ঘূর্ণিপাক) পার হতে হয় ‘ইনিড’-এ: ‘যাত্রীদের যাত্রাপথের প্রথম প্রতিবন্ধক ছিল পানি: এক ক্ষেত্রে বৈতরণি নদী এবং অন্য জায়গায় অ্যাকেরন...দুজায়গাতেই ছিল ফুটন্ত জল: aestuat [লাতিন ভাষায়] এর বিপরীতে উথলিছে [বাংলায়]। বিষয়টা দান্তের ‘ইনফার্নো’তেও একই, প্রেতলোকে ঢোকার জন্য দান্তে ও ভার্জিলকে অবশ্যই অ্যাকেরন পার হতে হয়। কিন্তু যারা দক্ষিণ দুয়ার দিয়ে কাশীরাম দাসের বর্ণিত প্রেতপুরীতে ঢোকে, তাদেরও পার হতে হয় গা ঝলসানো ফুটন্ত জলের একটা নদী।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ছবি অবলম্বনে
অলংকরণ: আরাফাত করিম

দক্ষিণ দুয়ারে বহে বৈতরণী নদী।
পাপীর শরীর দহে, পরশয়ে যদি॥
মস্তকে করয়ে দূত মূষল-প্রহার।
সাঁতারিয়া পাপী সব তাহে হয় পার॥

একইভাবে মাইকেলের বর্ণনায় আছে:  

ধর্ম্মপথগামী যারা যায় সেতুপথে
উত্তর, পশ্চিম, পূর্ব্বদ্বারে; পাপী যারা
সাঁতারিয়া নদী পার হয় দিবানিশি
মহাক্লেশে; যমদূত পীড়য়ে পুলিনে,
জলে জলে পাপ-প্রাণ তপ্ত তৈলে যেন।

(এবং পরবর্তী অংশে ‘নীরবিলে দৈববাণী, ভীষণ-মুরতি/ যমদূত হানে দণ্ড মস্তক-প্রদেশে;’ যেখানে পাপীদের গড়াগড়ি দিতে বাধ্য করা হয় রৌরবের অগ্নিময় হ্রদে।) বাংলা মহাকাব্যিক সাহিত্যে এভাবে নারকী জলের যথোপযুক্ত আদল উপস্থাপন করেন মাইকেল।

নগরীতে ঢোকার পর প্রেতপুরীর বিভিন্ন দৃশ্য দেখতে দেখতে এগিয়ে যান দুজন, শুরুতেই দক্ষিণ তোরণ। কাশীরাম দাসের ভাষ্যে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য দক্ষিণ তোরণের যেরকম বর্ণনা দেওয়া হয়েছে (অন্য তিনটি তোরণের তুলনায়), তেমনই যথেষ্ট বড় জায়গা নিয়েছেন মাইকেল। বাংলা মহাভারতের মতো দক্ষিণ দুয়ারে চুরাশিটি কূপ আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মাইকেলের বর্ণনায়, তার মধ্যে দুটোর নাম উল্লেখ করা হয়: রৌরব ও কুম্ভীপাক (কাশীরামদাসের ভাষ্যে মহারৌরব ও কুম্ভীপাক)। তবে দুটি ভাষ্যেই খুব সুনির্দিষ্ট হলেও চিত্রিত হয় পাপী এবং তাদের ক্লেশ, আর তাদের পাঠানো হয় নামহীন এক নরকে। মাইকেল কেবল দুটোর নামকরণ করেছেন, একটির পরিবর্তিত নামসহ এই দুটি নেওয়া হয়েছে বাংলা মহাভারত থেকে। মাইকেলের ভাষ্যে রৌরবে পাপীদের খেয়ে নেয় কৃমিকীট, তাদের ওপর নেমে আসে হীরার মতো শক্ত নখরসহ মাংসভুক পাখি, ছিঁড়ে নেয় তাদের নাড়িভুঁড়ি: ‘...কাটে কৃমি; বজ্রনখা,/ মাংসাহারী পাখী উড়ি পড়ি ছায়াদেহে ছিঁড়ে নাড়ি-ভুঁড়ি/ হুহুঙ্কারে!’ ‘কাটে কৃমি’কে ‘পোকায় কাটে’ হিসেবে ধরে নিয়েছেন ক্লার্ক এবং তারপর উপসংহার টানেন: ‘কীটেরা হুল ফোটায় আর হীরকদৃঢ় নখর দিয়ে পাখিরা ছিঁড়ে নেয় তাদের মাংস।’ এখানে দান্তে ও ভার্জিলের প্রতিধ্বনি আছে: ‘এবং নির্মমভাবে হুল ফোটায় বোলতা ও ভীমরুল...’ এবং ‘ভয়ংকর শকুনটি বাঁকানো চঞ্চু নিয়ে তার না খাওয়া কলিজার ঝাঁপিয়ে পড়ে।’ ভার্জিলের অনুপ্রেরণার উৎস ‘ওডিসি’ থেকে হোমারকে উদ্ধৃত করতে পারতেন ক্লার্ক, যেখানে হেডিসে [পাতাললোকে] টিটিয়সকে নির্যাতিত হতে দেখে ওডিসিয়াস, কিন্তু করেননি:

আমি দেখলাম ধরিত্রীর উজ্জ্বল সন্তান টিটিয়স পড়ে আছে ভূমিতে, তার শরীর ছড়ানো সাতাশ বিঘা জায়গাজুড়ে। দুটি শকুন দুই পাশে বসে ঝিল্লির আবরণের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে তার কলিজা।

যাহোক, ইউরোপীয় সূত্রের কাছে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ, এখানে রয়েছে কাশীরাম দাসের প্রতিধ্বনি। বাংলা ‘মহাভারত’-এর প্রেতপুরীতে বৈতরণি পার হওয়ার পর একটা তুলনাযোগ্য দৃশ্য আছে: ‘কৃমিতে মাথার খুলি খায়...’ এবং ‘বজ্রকীট পোকা আছে তাহার ভিতর/ গ্রাসে গ্রাসে পাপী বেড়ি খায় নিরন্তর।’

প্রথম দফায় ‘কাটে কৃমি’ লিখে কাশীরাম দাসের মতো প্রায় একই শব্দ ‘কৃমি’ ব্যবহার করেন মাইকেল। মহাভারতের দ্বিতীয় উদ্ধৃতাংশ থেকে হীরক কাঠিন্য (বজ্র) কিংবা কীটকে মাইকেল পরিবর্তিত করেছেন মাংসভুক পাখিদের বজ্রনখরে।

দক্ষিণ দুয়ার থেকে উত্তর দিকে যান রাম এবং তাঁর পথপ্রদর্শক। তবে উত্তর দুয়ারের দিকে রওনা হওয়ার আগে পূর্ব দুয়ারের পর কী আছে, সেটা বর্ণনা করেন মায়া:

পতি সহ করে বাস পতিপরায়ণা
সাধ্বীকুল; স্বর্গে, মর্ত্ত্যে, অতুল এ পুরী
সে ভাগে; সুরমা হর্ম্ম্য সুকানন মাঝে,
সুসরসী সুকমলে পরিপূর্ণ সদা,
বাসন্ত সমীর চির বহিছে সুস্বনে,
গাইছে সুপিকপূঞ্জ সদা পঞ্চস্বরে।
আপনি বাজিছে বীণা, আপনি বাজিছে
মুরজ, মন্দিরা, বাঁশী, মধূ সপ্তস্বরা!
দধি, দুগ্ধ, ঘৃত, উৎসে উথলিছে সদা
চৌদিকে, অমৃতফল ফলিছে কাননে;
প্রদানেন পরমান্ন আপনি অন্নদা!
চর্ব্ব্য, চোষ্য, লেহ্য, পেয়, যা কিছু যে চায়
অমনি পার সে তারে, কামধুকে যথা
কামলতা, মহেষ্বাস, সদ্য ফলবতী।

বাংলা ‘মহাভারত’-এর দুটি দ্বিপদীর প্রেরণায় চৌদ্দ পঙ্‌ক্তি নিবেদন করা হয়েছে তোরণটির বর্ণনায়:

পূর্বদ্বারখানি দেখ পরম সুন্দর।
দধি দুগ্ধ ভক্ষ্য দ্রব্য রম্য সরোবর॥
স্বামীর সহিত মরে যত নারীগণ।
স্বামী ল’য়ে পূর্ব্বদ্বারে করয়ে গমন॥

বিস্তৃত বর্ণনা বীরোচিত ভাবটির ওপর গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে আরও পরিব্যাপ্ত করে কাব্যের কাঠামোকে। ভার্জিল ও দান্তে—দুজনই পাতালে নামার সুযোগ নিয়েছিলেন জীবিত ও মৃত প্রকৃত মানুষদের তুলে আনার জন্য। ভার্জিল ও দান্তের চেয়ে আরও কিছুটা প্রথাগত মাইকেল তাঁর মহাকাব্যে জীবন থেকে চরিত্র না নিয়ে বরং চরিত্রদের জীবন দান করে বিশ্বস্তভাবে অটল থাকেন হিন্দু পুরাণের জগতে।

বর্ণনাকে ১৪০ পঙ্‌ক্তিতে ছড়িয়ে দিয়ে উত্তর দুয়ারের বিষয়ে গভীরভাবে আমাদের দৃষ্টিকে আরও বিস্তৃত করেন মাইকেল। বাংলা ‘মহাভারত’-এর উপরিউক্ত অংশের প্রথমটিতে স্বর্গীয় ঋষি ও তপস্বীরা যমরাজ্যে ঢোকেন উত্তর এবং যোদ্ধারা পশ্চিম দুয়ার দিয়ে। পরবর্তী এক অংশে নিহত যোদ্ধারা (এবং ধর্মাচারী ব্রাহ্মণ ও যোগীরা) ঢোকেন উত্তর দুয়ার দিয়ে। নির্বাচিত দ্বিতীয় উদাহরণটি অনুসরণ করে মাইকেল তাঁর যোদ্ধাদের উত্তর দুয়ারে নিয়ে যান। প্রেতলোকের অধিবাসী এই বীরোচিত শ্রেণিকে চিহ্নিত করার জন্য মাইকেল ও কাশীরাম দাসের কাব্যিক প্রয়াস প্রায় একই রকম। বাংলা ‘মহাভারত’-এর ‘সম্মুখ যুদ্ধেতে পড়ে যেই যোদ্ধাগণ/ পশ্চিম দুয়ারে যায় যমের সদন॥’ এবং ‘সম্মুখ সমরে পড়ি মরে যতজন॥...উত্তর দুয়ারে করে সে জন গমন॥’

উত্তর দুয়ার সম্পর্কে মাইকেল লেখেন, ‘এই দ্বারে, বীর, সম্মুখসংগ্রামে/ পড়ি চিরসুখ ভুঞ্জে মহারথী যত।’ আরও পরে তিনি আবারও নিশ্চিত করেন, যারা উত্তর দুয়ারের ভেতরে আছে তারা ‘সম্মুখসমরে হত রথীশ্বর যত।’ মাইকেল তাঁর মহাকাব্য শুরু করেছেন এভাবে: ‘সম্মুখ সমরে পড়ি, বীর-চূড়ামণি/ বীরবাহু, চলি গেলা যমপুরে/ অকালে...।’

এই মহাকাব্যের মূল ঘটনা, অর্থাৎ বীর মেঘনাদের অনাগত মৃত্যুর পূর্বাভাষ পাওয়া যায় মাইকেলের সূচনা পঙ্‌ক্তিগুলোতে। এ রকম পঙ্‌ক্তির প্রতিধ্বনি হয় অষ্টম সর্গে, মায়া যখন রামকে যমপুরীর উত্তর দুয়ার সম্পর্কে জানান। কাব্যটির প্রথম কয়েকটি এবং অষ্টম সর্গের পঙ্‌ক্তিগুলোতে পাওয়া যায় চূড়ান্ত পর্ব, অর্থাৎ মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পূর্বাভাষ। অল্প কিছু শব্দ দিয়ে পুরো আখ্যানটিকে একত্র করেন মাইকেল। সেই একীভূত করা শব্দগুলো নেওয়া হয়েছে বাংলা ‘মহাভারত’ থেকে।

কাশীরাম দাসের ভাষ্যে যোদ্ধাদের অংশে বিস্তারিত বিবরণ আছে সামান্য। একটি অংশে, খাবারদাবারসহ এই বর্ণনা বেশ তৃপ্তিকর। পরবর্তী এক অংশ কিছুটা বিস্তৃত, তবে এখানে একটা অঞ্চলের কথা বলা হয়, যেটা কেবল নিহত যোদ্ধাদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। (ওপরে দেখুন)

সেই অঞ্চল সম্পর্কে মাইকেলের অধিকতর বিস্তৃত বর্ণনা বীরোচিত ভাবটির ওপর গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে আরও পরিব্যাপ্ত করে কাব্যের কাঠামোকে। যেমন প্রথম সর্গে মাইকেল তাঁর কাব্যলক্ষ্মীর কাছে মিনতি করেন: ‘গাইব, মা, বীররসে ভাসি,/ মহাগীত;...।’ বীরগণ এবং বীরত্ব এই মহাকাব্যে গুরুত্বপূর্ণ—কীভাবে বীরেরা এমনকি মৃত্যুর পরেও এগিয়ে যান, সেসব আরও বেশি জানা উচিত পাঠকদের। নিহত যোদ্ধা বালী ও জটায়ুর কাছ থেকে রাম যা দেখেন ও শোনেন, তা দৃঢ়তর করে সেই বীরোচিত সুরকে: রামায়ণ উপাখ্যান অনুসারে যা কিছু আবিষ্কৃত হয়েছে লঙ্কার যুদ্ধের আগে, সেসব প্রকাশ করা হয়েছে এই সাধারণ বর্ণনামূলক কৌশলের মাধ্যমে। ভার্জিল ও দান্তে—দুজনই পাতালে নামার সুযোগ নিয়েছিলেন জীবিত ও মৃত প্রকৃত মানুষদের তুলে আনার জন্য। ভার্জিল ও দান্তের চেয়ে আরও কিছুটা প্রথাগত মাইকেল তাঁর মহাকাব্যে জীবন থেকে চরিত্র না নিয়ে বরং চরিত্রদের জীবন দান করে বিশ্বস্তভাবে অটল থাকেন হিন্দু পুরাণের জগতে।

উত্তর অঞ্চল থেকে রামকে পথ দেখিয়ে পশ্চিম দুয়ারে নিয়ে যায় জটায়ু, সেটি পেরিয়ে গেলে সেখানে ‘রাজর্ষিদলে’ বাস করেন দশরথ। বাংলা ‘মহাভারত’-এর প্রেতপুরীতে একটা অংশ আছে দেব ঋষি এবং সন্ন্যাসী ও দেব-দ্বিজগণের জন্য। দুটি অংশে দেখা যায়, তাঁরা যেখানে বাস করেন, সেখানে যেতে হয় উত্তর দুয়ার পেরিয়ে। আখ্যানের আরেক জায়গায়, পুণ্যবান মানুষেরা যমালয়ে প্রবেশ করতে পারে যেকোনো দরজা দিয়ে কিংবা কেবল পূর্ব দুয়ার দিয়ে, যা নির্ভর করে প্রকাশিত ভাষ্যের কোন সংস্করণটি গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ওপর। মাইকেলের ভাষ্যে পশ্চিম দুয়ার পার হলে বৈতরণির তীরে (নারকী নদী দক্ষিণ তোরণের দিকে সাঁতরে যাওয়া মানুষকে ঝলসে দেয়, কিন্তু একই নদী ‘পীযূষসলিলা এ ভূমে,’ অর্থাৎ যমালয়ের পশ্চিম অংশে) এক অত্যাশ্চর্য অশ্বত্থগাছের নিচে দশরথ ন্যায়ের সার্বভৌম যমের অবতার ধর্মরাজের পূজা করেন। পিতার কাছ থেকে রাম জানতে পারেন গন্ধমাদন পর্বতে জন্মায় যে সোনালি লতা বিশল্যকরণী, সেটিই বাঁচিয়ে তুলবে তাঁর ভাই লক্ষ্মণকে। (রামের পিতা স্বয়ং যমের কাছ থেকে এই তথ্য পেয়েছিলেন আগে)। দশরথ পুত্রকে নির্দেশ দেন এই ঔষধি লতা আনার জন্য, যাতে হনুমানকে পাঠানো হয় এবং সাবধান করে দেন যে পুরো কাজটি সম্পন্ন করতে হবে রাতের মধ্যেই। পিতা বলেন, মর্ত্যে এখন রাতের অর্ধেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। প্রেতপুরীতে রামের এই দীর্ঘ যাত্রায় লেগেছে অলৌকিকভাবে মর্ত্যের মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময়। এখন আমরা জানি, দশরথের নির্দেশ এবং এক রাতের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়টি এসেছে সরাসরি কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’ থেকে।

অষ্টম সর্গ শেষ হয় আহত লক্ষ্মণের পাশে রামের ফিরে আসার মধ্য দিয়ে। চূড়ান্ত সর্গ শুরু হয় পরদিনের সকালে রামের শিবির থেকে জয়ধ্বনির মধ্যে। উপদেষ্টার মাধ্যমে সান্ত্বনাতীত রাবণ জানতে পারেন যে রাতের বেলায় সম্ভবত স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটা পাহাড় এসে পৌঁছেছে লক্ষ্মণের জীবনরক্ষাকারী উপকরণ নিয়ে। পাঠক অবশ্য জানেন যে হনুমানই নিয়ে এসেছে পাহাড়চূড়াকে, যেখানে ঔষধিগুল্মটি জন্মায়। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’–এর পাঠকেরা ভালোভাবেই জানেন ধর্মাচারী রাজপুত্র রাম, তাঁর ভাই লক্ষ্মণ এবং নিবেদিতপ্রাণ মিত্র হনুমানের কাহিনি। ওষুধের প্রয়োজনীয় উপাদান বিশল্যকরণী সংগ্রহের মতো হনুমানের কিছু কৃতিত্বের কথা অন্তর্ভুক্ত করে বাল্মীকি বর্ণিত লক্ষ্মণের পুনর্জীবন লাভের দৃশ্যটিকে বিস্তৃত করেছেন কৃত্তিবাস। সঞ্জীবনী বৃক্ষটি সম্পর্কে পিতার কাছ থেকে জানার জন্য আত্মাদের যমপুরীতে রামের সাময়িক অবস্থানের কথা বর্ণনা করে একই পুনর্জীবন লাভের দৃশ্যটির ওপর জোর দিয়েছেন মাইকেল। অর্থাৎ একই সমাপ্তিতে পৌঁছার জন্য একটা ভিন্ন আখ্যান।

‘ইনিড’ এবং কিছু মাত্রায় ‘ইনফার্নো’ ও ‘প্যারাডাইস লস্ট’-এর প্রতি মাইকেলের ঋণ হ্রাস কিংবা অস্বীকার করার জন্য এই অধ্যায়ে কিছুই বোঝানো হয়নি—বরং মাইকেল নিজেই সগর্বে স্বীকার করেছেন এই ঋণের কথা, যা লিপিবদ্ধ করেছেন যোগীন্দ্রনাথ বসু থেকে শুরু করে বেশ কিছু পণ্ডিত। মাইকেলের কাব্যটিতে পাশ্চাত্য সাহিত্যের বহু বর্ণনামূলক খুঁটিনাটি খুঁজে পাওয়া যায় বটে, কিন্তু তাঁর চারদুয়ারি প্রেতলোক দৃঢ় ভিত্তিতে দাঁড়ানো কাশীরাম দাসের বাংলা ‘মহাভারত’-এর অনুমানযোগ্য আপেক্ষিক অবস্থানের ওপর। এখানে উপস্থিত কৃত্তিবাসের ‘রামায়ণ’-এর চরিত্ররা। আর সেটিকে জীবন্ত করে তোলা হয়েছে কবির নিজ কল্পনা এবং বাংলা ভাষায় তাঁর সাবলীলতা দিয়ে।

(লেখাটি ক্লিনটন বি সিলির ‘বরিশাল অ্যান্ড বিয়ন্ড’ বইয়ের প্রকাশিতব্য বাংলা সংস্করণ থেকে উদ্ধৃত।)