শহীদুল জহিরের প্রতি আগ্রহ আমার অনেক বছর ধরেই। মূলত তিনটি কারণে সেই আগ্রহ—প্রথমত, তিনি আমার অত্যন্ত পছন্দের সাহিত্য—লাতিন সাহিত্যকে ভালোবেসেছিলেন; দ্বিতীয়ত, সচেতনভাবেই নিজের লেখায় জাদুবাস্তববাদের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তৃতীয় কারণ হলো লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করা হয়, বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরা কবে থেকে লাতিন সাহিত্য পড়তে শুরু করেছে, বাংলায় অনূদিত আমার বইগুলো কতটা সমাদৃত এবং লাতিন সাহিত্যের ছাপ বাংলা ভাষার কোনো লেখকের ওপর পড়েছে কি না। প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তববাদ বা কুহকীবাস্তবতার কথাও।
শহীদুল জহিরের পাঠ আমার শুরু হয় কথাসাহিত্যিক সাদ কামালী এবং মোজাফ্ফর হোসেনের পরামর্শে ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ দিয়ে। উপন্যাসটি শেষ করে ভালো লাগা থেকে সঙ্গে সঙ্গে স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করে ফেলি। সম্পাদনার কাজ এখন চলমান। এরই মধ্যে জানতে পারি, কবি ওবায়েদ আকাশ ‘শালুক’ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা করছেন শহীদুল জহিরকে নিয়ে। পত্রিকার জন্য আমি ‘শহীদুল জহির ও জাদুবাস্তবতা: এক ভুল পাঠের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ লিখি, সেটি প্রকাশিতও হয়। সম্প্রতি বন্ধুপ্রতিম কথাসাহিত্যিক শাহাব আহমেদ ঢাকা থেকে পত্রিকাটির একটি সংখ্যা আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। পত্রিকাটির কিছু লেখা পাঠের অভিজ্ঞতা থেকেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। এখানে বলে রাখা ভালো, ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ অনুবাদ করার সময় তাঁর বেশ কিছু গল্প পড়েছি এবং বলতে গেলে হতাশ হয়েছি। আমি ‘শালুক’ পত্রিকাটি হাতে নিয়ে সে কারণে প্রথমেই দেখতে চাচ্ছিলাম আলোচকেরা শহীদুল জহিরের গল্পকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন।
‘সোনা-মোড়া কথাশিল্প: শহীদুল জহির’ শীর্ষক প্রবন্ধটি কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হকের লেখা। তিনি লিখেছেন, ‘শহীদুলের নজর ছিল মানব-বাস্তবের দিকে। নতুন কথা কিছু নয়, লেখক অলেখক সব মানুষেরই তাই থাকে। এই বাস্তব সৃষ্ট নয়, প্রদত্ত: আকাঙ্ক্ষা অনাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়—সব সময়ই হাজির, সদাই বিদ্যমান, অস্তিত্বের, চেতনার শর্ত—সব শিল্পের শিকড় কাণ্ড শাখা-প্রশাখা ফুল ফল কাঁটা বিষের উৎস এখানেই।’
প্রবন্ধটি কোনো কিছু ‘বাতিল’ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকে লেখা নয়। ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ অনুবাদ করার সময় তাঁর বেশ কিছু গল্প পড়েছি এবং বলতে গেলে হতাশ হয়েছি। আমি ‘শালুক’ পত্রিকাটি হাতে নিয়ে সে কারণে প্রথমেই দেখতে চাচ্ছিলাম আলোচকেরা শহীদুল জহিরের গল্পকে কীভাবে ব্যাখ্যা করেন।
দারুণ! ঠিক এই জিনিসটিই খুঁজে বেড়াই যেকোনো শিল্পে, এটাই আমাকে টানে। কিন্তু ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’র বাইরে যতগুলো গল্প পড়েছি, সেগুলোতে এই উপাদান খুব কমই পেয়েছি। সেটা আমার ব্যর্থতাও হতে পারে।
জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘চেনা না-চেনাকথার কারিগর’ শীর্ষক প্রবন্ধে ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ ধরে কিছু আলাপ আছে। তবে শহীদুল জহিরের সৃষ্টি নিয়ে যা লিখেছেন, অনেক কিছুর সঙ্গেই একমত হতে পারিনি। আমার কাছে শহিদুল জহির মানেই হচ্ছে মোটাদাগে কাঠামো, ভাষা, আবরণ; ভেতরটা প্রায়ই ফকফকা। শালুকে যাঁরাই লিখেছেন, প্রায় সবাই ঠিক এই কথাটাই বারবার লিখে গেছেন।
‘শহীদুল জহিরের ভাষা ও বর্ণনারীতি’ নিয়ে লিখেছেন মোজাফ্ফর হোসেন। প্রবন্ধের টাইটেলই বলে দিয়েছে, তাঁর আলোচনার বিষয় বাহ্যিক খোলস। তবে এখানে প্রাবন্ধিকের সঙ্গে জাদুবাস্তবতার জায়গাটির প্রসঙ্গে একেবারেই বিপরীতে অবস্থান করছি।
‘ছোটগল্পে জাদুবাস্তববাদ: মারকেস থেকে শহীদুল জহির’, স্বপ্নঞ্জয় চৌধুরীর প্রবন্ধ। যদি জাদুবাস্তবতাকে কেবল অদ্ভুত বর্ণনা, আবহ বা পুনরাবৃত্ত ঘটনার উপস্থিতি দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়, তবে সেই সংজ্ঞা এতটাই বিস্তৃত হয়ে যায় যে কার্পেন্তিয়ের ও রুলফোর আগেও ‘রামায়ণ’, ‘মহাভারত’ বা ‘অ্যারাবিয়ান নাইটস’-এর মতো গ্রন্থকেও একই শ্রেণিতে ফেলতে হয়; তখন আর আলাদা কোনো সাহিত্যিক কাঠামো হিসেবে জাদুবাস্তবতার অস্তিত্ব ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন থাকে না।
উল্লিখিত প্রবন্ধগুলো পাঠ শেষ করে শালুকে প্রকাশিত শহীদুল জহিরের ‘কার্তিকের হিমে, জ্যোৎস্নায়’ শীর্ষক ছোটগল্পটি পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। সেই গল্পপাঠের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই আলোচনাটি লিখতে হচ্ছে।
কয়েক বছর পরে লাতিন আমেরিকায় এসে আমি আবার পাঠের জগতে ফিরি। এখানে এসে আমি সাহিত্যের নতুন ভূগোল আবিষ্কার করি। এই সাহিত্য-ভূগোলের রূপ ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, নির্মাণ ভিন্ন। কিন্তু ভেতরের সত্যটা ছিল পরিচিত। সেখানে মানবিক বাস্তবতা ছিল নগ্ন, কঠিন, কখনো কখনো নিষ্ঠুর।
প্রবন্ধটি কোনো কিছু ‘বাতিল’ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থেকে লেখা নয়, আমার আলাদা পর্যবেক্ষণ থেকে বিষয়টি দেখার চেষ্টামাত্র। হতে পারে আমার পাঠরুচি, ভৌগোলিক দূরত্ব, লাতিন আমেরিকার সাহিত্য কিছুটা নিবিড়ভাবে পাঠ ইত্যাদি কারণে দেখার দৃষ্টিটা আলাদা হয়েছে।
জীবনের প্রথম একুশ বছর আমি শুধু বাংলা সাহিত্য পড়েছি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, শংকর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ বাস্তববাদী ধারার লেখকদের সাহিত্যে আমি যা পেয়েছি, তা ছিল জীবন নিজেই। সেখানে ভাষা কখনো নিজের দিকে ফিরে তাকায়নি। ভাষা এগিয়েছে মানুষের দিকে। কাহিনি ছিল, সামাজিক সংঘাত ছিল, দারিদ্র্য ছিল, ক্ষুধা ছিল, রাজনীতি ছিল, আকাঙ্ক্ষা ও বেদনা ছিল। ভাষা যত রকমেরই হোক, মানুষের অভিজ্ঞতা ভাষার ভেতরে আবদ্ধ থাকেনি; বরং ভাষাই বারবার অভিজ্ঞতার ভেতরে নেমে গেছে।
জাপানে যাওয়ার পর সাহিত্যপাঠে একটি দীর্ঘ বিরতি আসে। কয়েক বছর পরে লাতিন আমেরিকায় এসে আমি আবার পাঠের জগতে ফিরি। এখানে এসে আমি সাহিত্যের নতুন ভূগোল আবিষ্কার করি। এই সাহিত্য-ভূগোলের রূপ ভিন্ন, ভাষা ভিন্ন, নির্মাণ ভিন্ন। কিন্তু ভেতরের সত্যটা ছিল পরিচিত। সেখানে মানবিক বাস্তবতা ছিল নগ্ন, কঠিন, কখনো কখনো নিষ্ঠুর। কখনো তা প্রকাশ পায় জাদুর ভেতর দিয়ে, কখনো ঘটনার অতিশায়নের মাধ্যমে, কখনো বারোক ভাষার ভাঁজে। কিন্তু শরীর ও ক্ষত কখনো অনুপস্থিত থাকে না। জাদু এসে বাস্তবতাকে ঢেকে দেয় না; বরং আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে।
এই দুই ধারার পাঠ—বাংলা সাহিত্য ও লাতিন আমেরিকার সাহিত্য আমার পাঠরুচি ও সাহিত্য সম্পর্কে বেসিক ধারণা বদলায়নি, বরং পরিপক্ব হয়েছে বলে মনে করি। এখানে কোনো ক্ষয় নেই; আছে সংমিশ্রণ। এই সংমিশ্রণ থেকেই আমি সাহিত্যকে বিচার করি।
এ অবস্থান থেকেই আমি শহীদুল জহিরকে পাঠ করার চেষ্টা করি। শহীদুল জহিরের সাহিত্যিক দক্ষতা বা গুরুত্ব নিয়ে আমার কোনো প্রশ্ন নেই। তিনি ভাষা সচেতন লেখক, নির্মাণ সম্পর্কে সতর্ক এবং নিজের লেখার কাঠামোর বিষয়ে দায়িত্বশীল—এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু তাঁকে পড়ার সময় আমার মনে হয়েছে, আমি এমন এক গদ্যের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে ভাষা গভীরভাবে সচেতন, অথচ মানবিক অভিজ্ঞতাকে শরীরীভাবে ধারণ করার ব্যাপারে ততটা উৎসুক নয়। আমার কাছে সাহিত্য কোনো ভাষাগত কসরত নয়, কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা নয়। সাহিত্য হলো এমন এক বর্ণনা-পদ্ধতি, যেখানে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা—তার জীবনযাপন, দুঃখ, ক্ষুধা, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, লজ্জা, সামাজিক সংঘাত ও ক্ষমতার চাপ—একটি ভাষিক রূপ পায়। সেই ভাষিক রূপ কখনো সরল, কখনো জটিল; কখনো বাস্তবানুগ, কখনো অতিশায়িত। কিন্তু যেভাবেই হোক, সাহিত্যের কেন্দ্রে থাকতে হয় মানুষকে এবং তার জীবিত অভিজ্ঞতাকে। ভাষা এখানে মাধ্যম, লক্ষ্য নয়।
এ কারণেই আমার কাছে শিল্পের নান্দনিকতা মানে শুধু সৌন্দর্য নয়। নান্দনিকতা হলো সেই ক্ষমতা, যার মাধ্যমে একটি লেখা পাঠককে স্পর্শ করতে পারে—শুধু মস্তিষ্কে নয়, শরীরে। ভালো নান্দনিকতা পাঠকের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে, বেদনা জাগাতে পারে, সহানুভূতি বা ক্রোধ উসকে দিতে পারে, অথবা নীরব চিন্তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারে। একটি লেখা যতই সুন্দরভাবে লেখা হোক, যদি তা পাঠকের অভিজ্ঞতাকে না নাড়ায়, যদি তা কেবল নিজের ভাষা ও কাঠামোর ভেতরেই ঘুরপাক খায়, তবে সেই সৌন্দর্য আমার কাছে অসম্পূর্ণ বলে মনে হয়।
শহীদুল জহির ভাষা সচেতন লেখক, নির্মাণ সম্পর্কে সতর্ক এবং নিজের লেখার কাঠামোর বিষয়ে দায়িত্বশীল। কিন্তু তাঁকে পড়ার সময় এমন এক গদ্যের মুখোমুখি হচ্ছি, যেখানে ভাষা গভীরভাবে সচেতন, অথচ মানবিক অভিজ্ঞতাকে শরীরীভাবে ধারণ করার ব্যাপারে ততটা উৎসুক নয়।
এখানেই আসে ‘ক্ষত’র ধারণা। এখানে ‘ক্ষত’ মানে কেবল শারীরিক আঘাত নয়; ক্ষত মানে জীবনের সেই দাগ, যা মানুষের ভেতরে রয়ে যায়—ক্ষুধার স্মৃতি, অপমান, প্রেমের ভাঙন, ক্ষমতার পীড়ন, সামাজিক বৈষম্য কিংবা ইতিহাসের চাপ। সাহিত্য যখন শক্তিশালী হয়, তখন সে এই ক্ষতকে আড়াল করে না। তাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে—কখনো সরাসরি, কখনো রূপকের মাধ্যমে, কখনো অতিশায়নের ভেতর দিয়ে।
এই মানদণ্ড নিয়েই আমি শহীদুল জহিরের গল্প ‘কার্তিকের হিমে, জ্যোৎস্নায়’ পড়ি। গল্পের শুরুতেই কথকের অবস্থান স্পষ্ট। কথক সর্বজ্ঞ। সে চরিত্রদের চলাফেরা দেখে, তাদের ঘরবাড়ির ভেতর–বাইরে যাতায়াত জানে, তাদের চিন্তার ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু খুব দ্রুতই একটি সমস্যা দেখা দেয়। এই সর্বজ্ঞ কথক নিজের বক্তব্যকে বারবার দুর্বল করে দেয় ‘হয়তো’, ‘মনে হয়’, ‘হতে পারে’—এ ধরনের অভিব্যক্তির মাধ্যমে। এই অনিশ্চয়তা কোনো মানবিক সীমাবদ্ধতা থেকে আসছে না। গল্পটি উত্তম পুরুষের বয়ানে লেখা নয়। এটি কথকের ব্যক্তিগত দ্বিধা। উত্তম পুরুষের বয়ানে এই দ্বিধা গ্রহণযোগ্য। কারণ, সেখানে কথক কোনো বিষয়ে সুনিশ্চিত না–ও হতে পারে। কিন্তু এখানে কথক জানার ক্ষমতা রাখে, অথচ দায়িত্ব নিতে চায় না। ফলে পাঠকের মনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি হয়—এই কথক কী জানে, নাকি জানে না? এই অনিশ্চয়তা কোনো অস্তিত্বগত চাপ তৈরি করে না; বরং পাঠকের বিশ্বাসকে দুর্বল করে দেয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় গল্পের গতি। একের পর এক দৃশ্য আসে—পথ, ঘর, উঠান, আলো-ছায়া। দৃশ্য বদলায়, কিন্তু পরিস্থিতি বদলায় না। কোনো সংঘাত জমে ওঠে না, কোনো সিদ্ধান্ত সামনে আসে না। গল্প এগোয় না, ঘোরে। এই ঘোরাঘুরি যদি মানুষের ভেতরের কোনো ক্ষয়, চাপ বা ভাঙনের ইঙ্গিত দিত, তাহলে তা অর্থবহ হতো। কিন্তু এখানে সেই চাপ অনুপস্থিত। ভাষা আছে, আবহ আছে, কিন্তু অভিজ্ঞতার তীব্রতা নেই।
এই পর্যায়ে এসে আমি থেমে যাই। এটি কোনো পাঠ-অক্ষমতা নয়, ধৈর্যের অভাবও নয়; এটি আমার নিজস্ব পাঠরুচির সীমা, কিংবা সীমাবদ্ধতা। আমার কাছে গল্প মানে কেবল দৃশ্যের পর দৃশ্য নয়; গল্প মানে একধরনের অগ্রগতি—ভেতরের হোক বা বাইরের। যখন সেই অগ্রগতি অনুপস্থিত থাকে, তখন পড়ার প্রতি আমার টান কমে আসে।
শহীদুল জহির নিজেই স্বীকার করেছেন যে তিনি ফ্রানৎস কাফকা, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং অন্য বড় লেখকদের পড়েছেন। এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর লেখায় সেই পাঠের ছাপ স্পষ্ট—কাঠামোতে, ভাষার আচরণে, কথকের অবস্থানে। কিন্তু প্রভাব থাকা আর আত্মস্থ করা এক বিষয় নয়। কাফকার অনিশ্চয়তা অস্তিত্বগত; তা চরিত্রের অজানা অবস্থান থেকে আসে। গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের অতিশায়ন অলংকার নয়; তার নিচে থাকে শরীর, ক্ষমতা, ক্ষুধা ও মৃত্যু। সেই অভিজ্ঞতাগুলো তিনি ধার নেননি; ভেতর থেকে লিখেছেন।
এই গল্পে আমি সেই ভেতরের প্রয়োজনটি অনুভব করেছি। এখানে কাঠামো আছে, কিন্তু কাঠামো কোনো অভ্যন্তরীণ চাপ থেকে জন্ম নিয়েছে বলে মনে হয় না। ভাষা নিজেই নিজের বিষয় হয়ে উঠেছে। মানুষের ভেতরের সংকট সেখানে পুরোপুরি ঢুকতে পারেনি।
এ কারণেই আমার কাছে এই লেখা কাফকা বা মার্কেসের ধারাবাহিকতা নয়, বরং তাঁদের প্রভাবের একটি বাহ্যিক প্রতিফলন বলে মনে হয়েছে। ভেতরের যেটা সবচেয়ে মূল্যবান—ভয়, ক্ষত, অনিবার্যতা; তা এখানে অনুপস্থিত।
শেষ করি, আবারও আমার অবস্থানকে পরিষ্কার করে, এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য শহীদুল জহিরকে খাটো করা নয়। তিনি অনেক বড়মাপের লেখক। কিন্তু আমি পাঠক হিসেবে সাহিত্যের কাছে ভাষার সৌন্দর্যের চেয়েও বেশি কিছু প্রত্যাশা করি। চাই মানুষের ভেতরের ক্ষত, চাপ ও অনিবার্যতা। আমি শহীদুল জহিরের গল্প পড়তে গিয়ে প্রায়ই সেটার অনুপস্থিতি টের পেয়েছি। এখানেই শহীদুল জহিরের লেখার সঙ্গে আমার নতুন এক বোঝাপড়া তৈরি হয়।