‘বাড়ি আছে, মানুষটা নেই’

শ্যামলীর বাসায় টেবিলে লিখছেন কবি শামসুর রাহমান। ২০০০ সালের ১ জানুয়ারি
ছবি: সৈয়দ জাকির হোসেন

বাড়িতে ঢুকতেই একরাশ ছবির মুখোমুখি—নানা বিভঙ্গে দেখা দিল কবির মুখ। শ্যামলীর ১ নম্বর সড়কের ৩/১ সাদা রঙের বাড়িটি সবার কাছে ‘কবির বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত। কবির ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে একতলার সিঁড়ি ভেঙে আমরা যখন দোতলায় শামসুর রাহমানের লেখার ঘরে ঢুকলাম, তার আগে আবারও একগুচ্ছ ছবি অভ্যর্থনা জানাল আমাদের। ছবিগুলো নয়, যেন অভ্যর্থনা জানালেন স্বয়ং শামসুর রাহমান। তাঁর নানা সময়ের হাসিমাখা ছবিগুলো এতটাই জীবন্ত।

কবির লেখার ঘরে প্রবেশের পর দেখা মিলল কড়ই কাঠের সেই গদিওয়ালা চেয়ার আর টেবিল, পুরোনো দিনের আভিজাত্য এখনো ঝলমল করছে তাতে। টেবিলটি এখন অবশ্য দস্তরখানে ঢাকা। কবির জীবদ্দশায় এ টেবিল ছিল অনাবৃত, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়’–এর মতো বলিষ্ঠ পঙ্‌ক্তিমালার জন্য জাগ্রত। এই টেবিল–চেয়ারে বসেই কবিদের প্রিয় ‘রাহমান ভাই’ একদা লিখেছিলেন কালজয়ী অজস্র কবিতা।

শ্যামলীর ১ নম্বর সড়কে শামসুর রাহমানের এই বাড়ি ‘কবির বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত
ছবি: আশরাফুল আলম

ছোট্ট লেখার ঘরটি এখনো রয়েছে অবিকল। টেবিল–চেয়ার আছে আগের জায়গায়, তার বিপরীতে খাটটিও রয়েছে ঠিকঠাক। বইয়ের শেলফগুলোও অবিকৃত। নতুন আসবাব বলতে ঘরে ঢুকেছে একটি ওয়ার্ডরোব আর একটি ছোট্ট টেলিভিশন। তবে এই দুই সংযোজন কবির ঘরটিকে খুব বেশি বদলাতে পারেনি। এই ঘর, টেবিল–চেয়ার এখনো যেন স্থির হয়ে আছে সেই ২০০৬ সালে।

শামসুর রহমানের বাড়ির প্রবেশ মুখে রয়েছে কবির ছবি
ছবি: প্রথম আলো

এখনই হয়তো ঘরে এসে টেবিল–চেয়ারে বসে লিখতে শুরু করবেন কবি, তাঁর সাদা চুল উড়বে শরতের কাশফুলের মতো—এমন কল্পনা করতে করতে আমাদের চোখ ততক্ষণে শামসুর রাহমানের লেখার ঘরের চারধারে ঘুরছে। টেবিলের ওপর তাঁর একাধিক চশমা, ওই তো ল্যান্ডফোনটি শামসুর রাহমানের সময়ে যেভাবে ছিল, দেখতে পাচ্ছি রয়েছে সেভাবেই। ৪৮১১...আট ডিজিটের কবির সেই নম্বরে এখনই কি ফোন আসবে, আর তাতে থাকবে নতুন কোনো কবিতার জন্য সম্পাদকের তাগাদা?

লেখার ঘরে ছিল কবির বইপত্রের সংগ্রহ। বইগুলো এখনো আছে একই রকম
ছবি: প্রথম আলো

লেখার ঘরে ঘুরে ঘুরে আমাদের সঙ্গ দিচ্ছেন কবির পুত্রবধূ টিয়া রাহমান। টেবিলের ওপরে থাকা ল্যান্ডফোনে হাত রেখে তিনি বললেন, ‘আব্বুর সময়ে যে ফোনসেট ছিল, এটা সেটা নয়। তাঁর মৃত্যুর পর সেটটির বদল হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারে আব্বুর অনীহা ছিল, ল্যান্ডফোনেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন তিনি। এখন আর সেভাবে ফোন আসে না। আসলে বাড়ি আছে, মানুষটা নেই।’

টিয়ার কথা শুনে আমাদের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল!

২০০৬ সালের ৩ আগস্ট নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে এই ঘর থেকেই হাসপাতালে গিয়েছিলেন শামসুর রাহমান। আর চলে গেলেন ১৭ আগস্ট, ১৪ দিন হাসপাতালবাসের পর, ৭৭ বছর বয়সে। ‘আব্বু হাসপাতালে যেতেই চাননি। বলেছিলেন, মরলে এ ঘরেই মরব।’ এই এক টুকরো কথা বলে টিয়া মেলে ধরলেন স্মৃতির ঝরোকা, ‘ঘুমের সময় ছাড়া এ ঘরেই সারা দিন থাকতেন আব্বু।

শামসুর রাহমানের সেই লেখার টেবিল। কবি যে টেবিলে লিখতেন এখন সেখানে শোভা পায় তাঁর ছবি। পাশে রয়েছে কবির চশমা
ছবি: আশরাফুল আলম

আড্ডা দিতে ভালোবাসতেন। তাঁর বন্ধু রশীদ করিম আর কায়সুল হক যেদিন আসতেন, সেদিন আব্বুকে পায় কে! আব্বু এই চেয়ারে বসেন, আর তাঁরা পাশের খাটে...আড্ডায় আড্ডায় কীভাবে যে দিন কেটে যেত! এখন সেভাবে কেউ আর আসে না, আসবেই–বা কেন, আব্বুর কাছে তাদের চাহিদা ছিল, এখন তো তিনি নেই।’

সেই বসতবাটিতে কবি এখন নেই বটে, কিন্তু ঘরদোরের সর্বত্রই এখনো প্রবল পরাক্রমেই হাজির শামসুর রাহমান। আজ তাঁর মৃত্যুদিনেও তাই মনে হয়, শ্যামলীর ছায়াঘেরা বাড়িটির ভেতরে, চেয়ার–টেবিলে বসে হয়তো এখনই তিনি ‘বাড়িটা’ কবিতা লিখতে শুরু করবেন আবারও: ‘বাড়িটা গভীর রাতে দেখেছিল বৃষ্টিপাত। ওর গায়ে বর্ষার তুমুল ছাট, খুব/ হিসহিসে হাওয়া ক্রমাগত ক্ষ্যাপাটে ছোবল মারে...।’