আজাদ রহমানের ভালোবাসার মূল্য

আমি তখন সিনেমার পোকা। সত্তরের দশক। গুলিস্তান বিল্ডিংয়ের ছোট্ট মুভি থিয়েটার 'নাজ'-এ মুক্তি পেল শাদাকালো সিনেমা 'এপার ওপার'। সময়কাল ১৯৭৫।
পত্রিকা মারফৎ আগেই জেনেছিলাম নতুন একজন নায়িকার আগমন ঘটতে যাচ্ছে 'এপার ওপার'-এর মাধ্যমে। নায়ক-নায়িকা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও ছবির নামটি ছিল যথার্থ। নায়ক সোহেল রানা ঢাকা অর্থাৎ এপারের আর নায়িকা সোমা মুখার্জি ওপার অর্থাৎ কলকাতার। ছবির পরিচালক মাসুদ পারভেজ আর সোহেল রানা যে একই ব্যক্তি, সেটাও আমার জানাই ছিল। সোহেল রানা থাকেন ঠাঁটারিবাজার-লাগোয়া বিসিসি রোডে। আর আমি ওয়ারী হেয়ার স্ট্রিটে। হাঁটাপথের দূরত্ব। নিজের মহল্লার নায়ক বলে ছবিটার ব্যাপারে আলাদা একটা আকর্ষণও কাজ করছিল আমার ভেতরে। কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত চরিত্র 'মাসুদ রানা'র মাধ্যমে নায়ক সোহেল রানার অভিষেক ঘটলেও আমার প্রথম মুগ্ধতা কেড়ে নেন তিনি 'এপার-ওপার'-র মাধ্যমেই।
নাজ ছিল ঢাকার সবচে খুদে সিনেমা হল। সিটসংখ্যা বড়জোর শ খানেক। নবাবপুর স্কুলের ছাত্র ছিলাম বলে গুলিস্তান আর নাজের টিকিট সংগ্রহ করা আমার জন্যে সহজ ছিল। অধিকাংশ টিকিট ব্ল্যাকার তখন আমার চেনাজানা, চেহারার সুবাদে। নিয়মিত দর্শক পরিচয়ের বাইরে নবাবপুর স্কুলের ছাত্র বলে ওরা আমাকে খানিকটা খাতিরও করত। সুতরাং সিনেমা সুপারডুপার হিট হলেও সামান্য কিছু বাড়তি টাকা দিয়ে টিকিট জোগাড় করে ফেলতাম যে কোনো শোয়ের।
প্রথম ছবি 'মাসুদ রানা'য় ড্যাশিং ইমেজের নায়ক সোহেল রানা দর্শকের সপ্রশংস দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হলেও দ্বিতীয় ছবি 'এপার-ওপার'-এ খুব মামুলি ডিজাইনের পাজামা আর একটা ফতুয়া টাইপ জামা পরা সোহেল রানা বাজিমাত করে ফেললেন। ঢাকার ছবির দর্শকরা সাদরে তাঁকে গ্রহণ করলেন। আমি মুগ্ধ হলাম তাঁর হাসিতে। এই রকম মিষ্টি হাসির অধিকারী নায়ক আমাদের কি দ্বিতীয়টি আছে? নেই। 'এপার-ওপার'-এ নায়ক হিসেবে সোহেল রানার খুব স্বাভাবিক অভিনয় দেখে আমি রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ঢাকার অন্য নায়কেরা তখন উচ্চমাত্রার উচ্চকণ্ঠ ঢিঁশ্যুম-ঢুঁশ্যুম অভিনেতা। যাত্রার ঢঙে সংলাপ প্রক্ষেপণে অভ্যস্ত। এই ছবিতে সোহেল রানা আবির্ভূত হলেন নতুন ম্যানারিজমে, একটি সফট ইমেজ নিয়ে। এ রকম ইমেজ ১৯৭৫ সালের ছবিতে তখন অকল্পনীয় ছিল। বলা চলে 'এপার-ওপার'-এর মাধ্যমে রোমান্টিক সোহেল রানা জয় করে নিলেন বিপুলসংখ্যক সিনেমাপ্রিয় মধ্যবিত্ত বাঙালির হৃদয়।
'এপার-ওপার'-এর গল্পটি এমন কোনো আহামরি ধরনের ছিল না। আজারবাইজানের উপকথা 'আলী ও আসমা' থেকে আখ্যানটি ধার করা। শেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকা দুজনই মারা গেলে ছবির দর্শকেরা সেটা ভালোভাবে নেয় না—এমনটাই দস্তুর ছিল। কিন্তু এই ছবির বিয়োগান্ত শেষ দৃশ্যটা দর্শক লুফে নিল। শেষ দৃশ্যে নায়ক-নায়িকা দুজনই ডেড। ছবি হিট। আর ছবির চাইতে হিট হল ছবির গান।
নাজ সিনেমা হলে বসে ছবিটা দেখার সময় দুটো গান আমাকে দারুণ রকম চমকে দিয়েছিল। গানের কথা সুর আর মিউজিক কম্পোজিশন এক কথায় দুর্ধর্ষ! এর একটি 'ভালোবাসার মূল্য কত' আর দ্বিতীয়টি 'মন সঁপেছি আমি কারও মনের আঙিনায়'।
প্রথমটির গায়ক আজাদ রহমান আর দ্বিতীয়টির আবদুল জব্বার। আজাদ রহমান 'এপার-ওপার'-এর সংগীত পরিচালক।
'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটির কথা ফজল-এ-খোদার। 'মন সঁপেছি'-এরও। আমাকে তখন পেয়ে বসেছিল 'ভালোবাসার মূল্য কত'।
দিনরাত করোটির ভেতরে বারবার বহুবার 'গুঞ্জরিয়া ওঠে' গানটি। ১৯৭৫ সালে বাংলা ছবির ভিএইচএস কিংবা ডিভিডি পাওয়া যেত না। তখন কোনো ছবির কোনো গান আমাকে একবার পেয়ে বসলে সেই ছবিটি আমি বারবার দেখতাম। 'এপার-ওপার'-ও দেখতে হলো কয়েকবার। কতবার? কম করে হলেও পাঁচ-ছবার তো হবেই। স্কুলের টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে সেই টাকায় সিনেমা দেখতাম। আর সিনেমা দেখতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। প্রতিটা ক্রেডিট লাইন (টেলিভিশনে যাকে আমরা টেলপ বলতাম) মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করতাম। এমন কি অপটিকস হাসান মুদ্রণ, পরিস্ফুটন ইউসুফ আলী খান খোকা পর্যন্ত। তো 'এপার-ওপার' ছবিতে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বিখ্যাত আবদুল জব্বারের পাশাপাশি আজাদ রহমান নামের একজন নতুন শিল্পীর নামও ঝলমল করে উঠল পর্দাজুড়ে। 'ভালোবাসার মূল্য কত' শোনার সময়ই বুঝতে পারছিলাম, এটা কোনো চেনাজানা পরিচিত কণ্ঠ নয়। সিনেমায় আগে কখনোই শুনিনি তাঁর গান। আহা রে, কী অপূর্ব ব্যাতিক্রমী কণ্ঠ এই শিল্পীর! বারবার বহুবার দেখলাম 'এপার-ওপার' ছবিটা শুধু দুটো গানের জন্য, বিশেষ করে 'ভালোবাসার মূল্য কত'।
আমার জীবনযাপনের অংশ হয়ে উঠল এই গান। গুনগুন করে গাই। মুড ভালো থাকলে এবং আশপাশে কেউ না থাকলে গলা ছেড়ে গাই। এই ঘটনার প্রায় তিন দশক পর যখন আমি অনিশ্চিত জীবনে প্রবেশ করে এই দেশ সেই দেশ ঘুরেটুরে কানাডায় এসে থিতু হলাম, তখনো এই গানটা আমাকে ছেড়ে যায়নি। ইউটিউবে আমার অ্যাকাউন্টে গানটা জমা রেখেছি। প্রায়ই শুনতে থাকি এক নাগাড়ে প্রিয় কণ্ঠশিল্পী আজাদ রহমানের 'ভালোবাসার মূল্য কত' সেই গান।
'এপার-ওপার'-এর ওই গানটি গায়ক আজাদ রহমানকে জনপ্রিয়তা এনে দিলে তিনি একের পর এক চলচ্চিত্রে গাইতে থাকেন নানান রঙের নানান ঢঙের গান। 'দস্যু বনহুর' ছবিতে আজাদ রহমানের গাওয়া 'ডোরা কাটা দাগ দেখে বাঘ চেনা যায়/ বাতাসের বেগ দেখে মেঘ চেনা যায়/ মুখ ঢাকা মুখোশের এই দুনিয়ায়/ মানুষকে কী দেখে চিনবে বলো' লোকের মুখে মুখে ফিরতে শুরু করল। 'গুনাহগার' ছবিতে গাইলেন 'লোকে আমায় কয় গুনাগার'। এটাও হিট।
ডুমুরের ফুল ছবিতে গাইলেন অসাধারণ একটা গান, মাকে নিয়ে—'করো মনে ভক্তি মায়ের থাকতে হাতে দিন/ হয় না মুক্তি না শুধিলে মায়ের দুধের ঋণ/ চিড়া বলো পিঠা বলো ভাতের সমান নয়/ খালা বলো চাচি বলো মায়ের সমান নয়/ মা হলো গর্ভধারিণী/ সব দুঃখ হরণকারিনী/ সেই মায়েরে না চেনে যে সে তো অর্বাচীন'। এই গানটাও যুক্ত হলো আমার প্রিয়র তালিকায়।
আজাদ রহমান নিজে গাননি কিন্তু সুর করেছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের। স্মৃতি থেকে কয়েকটা চলচ্চিত্রের নাম এখানে উল্লেখ করি, যেগুলোর সংগীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান। ছবিগুলো তেমন মানের না হলেও গানগুলো ছিল অসাধারণ! তালিকাটা দীর্ঘ। আমি কয়েকটা বলি—'পাগলা রাজা', 'অনন্ত প্রেম', 'মাসুদ রানা', 'মায়ার বাঁধন', 'যাদুর বাঁশী' ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। 'পাগলা রাজা'য় রুনা লায়লার গাওয়া 'বনে বনে যত ফুল আছে/ মাথায় মাথায় যত চুল আছে/ তত দিন, তত দিন বেঁচে থাকো রাজার কুমার', 'মাসুদ রানা'য় আঞ্জুমান আরা বেগমের গাওয়া 'ও রানা ও সোনা, এই শোনো না/ মধুর এই রাতে আমি যে তোমারই হয়েছি দেখো না/ কিছু আজ বুঝি না হয়েছি দিওয়ানা', মাসুদ রানায় সেলিনা আজাদের গাওয়া 'মনের রঙে রাঙাব/ বনের ঘুম ভাঙাব/ সাগর-পাহাড় সবাই যে কইবে কথা', 'মায়ার বাঁধন'-এ সেলিনা আজাদ এবং এম এ হামিদের ডুয়েটে 'প্রেম যদি লুকিয়ে রাখো, তবে কেমন প্রেমিক তুমি বলো/ সুর যদি ছড়িয়ে না দাও, তবে কেমন সাধক তুমি বলো', 'যাদুর বাঁশী'তে রুনার গাওয়া 'আকাশ বিনা চাঁদ হাসিতে পারে না/ যাদু বিনা পাখি বাঁচিতে পারে না/ যাদু পাখি এক-দুজনা/ ওরে যাদু তোরে ছাড়া জীবনে কিছুই চাহি না', অনন্ত প্রেমে সাবিনা ইয়াসমিন এবং খুরশিদ আলমের ডুয়েটে 'ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি/ তুমি হলে মনের রানি/ তোমার দৃষ্টি যেন ছোবল হানে/ যখন-তখন শুধু আমার প্রাণেতে হয়ে কালনাগিনী' গানগুলো আমাকে কী বিপুল আনন্দই না দিয়েছিল! অনন্ত প্রেমে তিনি অসাধারণ একটি ধ্রুপদি গান নির্মাণ করেছিলেন 'যুগে যুগে প্রেম আসে জীবনে'।
গহীন বনের ভেতরে রাজ্জাক-ববিতার গোপন বসবাসের দিনলিপি হিসেবে চমৎকার চিত্রায়ণের সঙ্গে ব্যাকগ্রাউণ্ডে বাজছিল গানটি। অসাধারণ এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন সম্ভবত ওস্তাদ আখতার সাদমানী এবং সঙ্গে আরেকটি নারীকণ্ঠ। নারীকণ্ঠটি কি সাবিনার ছিল? নামটা ভুলে গেছি, স্মৃতি ঠিকমতো কাজ করছে না।
আমাদের চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে আজাদ রহমানকে আমরা প্রথম পেয়েছিলাম ষাটের দশকের শেষান্তে ১৯৬৯-এ 'আগন্তুক' নামের একটি চলচ্চিত্রে। অনেকগুলো শ্রুতিনন্দন গান উপহার দিয়েছিলেন তিনি এই চলচ্চিত্রে। 'আগন্তুক' ছবিতে খুরশিদ আলম নামের একজন নতুন কণ্ঠশিল্পীকে ব্রেক দিয়েছিলেন তিনি। এবং প্রথম গানেই শ্রোতাদের সমস্ত মনোযোগ কেড়ে নিয়েছিলেন খুরশিদ আলম। খুরশিদের কণ্ঠে 'বন্দী পাখির মতো মনটা কেঁদে মরে/ মুক্ত আকাশখানি কে আমার নিল কেড়ে/ ও পাহাড় ও নদী বলে দাও কী নিয়ে থাকি/ এ ব্যথা কী দিয়ে ঢেকে রাখি/ স্বর্ণ-ঈগল মন আমার অসীম আকাশে ওড়ে না আর/ ডানা তার ভেঙে গেছে ঝড়ে আঘাতে জানো না কি?' গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই গানের গীতিকার ছিলেন ডা. আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। আজাদ রহমানের সুর করা বহু জনপ্রিয় গানের গীতিকার ছিলেন এই আবু হায়দার সাজেদুর রহমান। 'কুয়াশা' ছদ্মনামে একটি রহস্য সিরিজ বই লিখতেন।
তখন ছিল রেডিওর যুগ। রেডিওতে নিয়মিত বাজত 'এ বন্দী পাখির মতো' গানটা। এই গানের মাধ্যমেই খুরশিদ আলম বিশেষ করে নায়ক রাজ্জাকের লিপের অপরিহার্য কণ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিলেন চলচ্চিত্রে। এবং দাপটের সঙ্গে তুঙ্গে অবস্থান করেছেন দশকের পর দশক। ফিল্মি গানের ময়দানে এন্ড্রু কিশোরের আগমনের পর খুব দ্রুতই অস্ত গিয়েছিল খুরশিদ আলমের একক আধিপত্য ও জনপ্রিয়তার সূর্যটা।
'এপার ওপার'-এর 'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটিই আমাকে আজাদ রহমানের মূল্য বুঝতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। এই গানটিই আজাদ রহমানের ব্যাপারে আমাকে আগ্রহী করে তুলেছিল। আমাদের চলচ্চিত্রের গান এবং আবহসংগীত আধুনিক হয়ে উঠেছে একজন আজাদ রহমানের মেধা আর মননের সমন্বয়ে। সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যের নবায়নই আধুনিকতা। আজাদ রহমান সংগীতের শাস্ত্রীয় ধারাকে বর্তমান সময়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন নিপুণ দক্ষতায়। আর তাই আমরা দেখেছি সুরস্রষ্টা আজাদ রহমানের গানে পুরোনো ও নতুন যন্ত্রানুষঙ্গের অপরূপ মিথস্ক্রিয়া। হারমোনিয়াম, তবলা, বাঁশি ও সেতারের সঙ্গে গিটার, কি-বোর্ড, পারকেশন, পিয়ানোর অপূর্ব মেলবন্ধনে আজাদ রহমান নির্মাণ করেছেন সুর ও ছন্দের মোহনীয় অর্কেস্ট্রার অভূতপূর্ব সিম্ফনি। ইলেকট্রনিক এবং অ্যাকুইস্টিকের যৌথ মূর্ছনায় আজাদ রহমান আমাদের নিয়ে গেছেন অনির্বচনীয় এক আনন্দ-বেদনার মোহনীয় ভুবনে।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ক্লাসিক্যাল মিউজিকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন (প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন) অত্যন্ত মেধাবী এই সংগীতসাধক। দীর্ঘকাল তিনি বাংলা খেয়াল নিয়ে গবেষণা করেছেন নিবিষ্টচিত্তে। তাঁর লেখা 'বাংলা খেয়াল' নামের মূল্যবান একটি গ্রন্থ দুই খণ্ডে প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। এই কিছুদিন আগেও তাঁকে দেখা গেছে বাংলা খেয়াল নিয়ে চ্যানেল আইতে 'সুর মঞ্জুরি' নামের একটি অনুষ্ঠান নিয়মিত উপস্থাপনা করতে। একটি চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেছিলেন তিনি। নাম ছিল 'গোপন কথা'। প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি ছিল ওটা। অ্যাডাল্ট ট্যাগ লাগানো ছিল বলে স্কুল লাইফে অভিসার সিনেমা হলে বহু কাহিনি ঘটিয়ে হলের ভেতরে প্রবেশ করেছিলাম। যদিও সিনেমাটা কোনো আহামরি কিছু ছিল না। এমনকি নিজের চলচ্চিত্রে দুর্ধর্ষ সুরকার আজাদ রহমানকেও পেলাম না। খুবই হতাশ হয়েছিলাম আমি।
আমার এই লেখার ফোকাস পয়েন্ট আমাদের চলচ্চিত্রের গানে আজাদ রহমান বলে বিষয়ের বাইরে যেতে পারছি না হুট করে। নইলে আজাদ রহমানের সুর করা হৃদয় আকুল করা দেশাত্মবোধক গানের কথাও বলা যেত। আমি শুধু ১৯৭০ সালে নির্মিত একটা গানের কথাই উল্লেখ করি এখানে।
সাবিনা ইয়াসমিনের গাওয়া 'জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো/ এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো/ তোমার কথায় হাসতে পারি/ তোমার কথায় কাঁদতে পারি/ মরতে পারি তোমার বুকে/ বুকে যদি রাখো আমায়/ বুকে যদি রাখো মাগো/ এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাকো' কথা, সুর আর যন্ত্রানুষঙ্গের অপরূপ সমন্বয়ে একটা কালজয়ী গানের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে আছে। গানটি শোনার সময় শ্রোতা হিসেবে প্রতিবারই চোখ ভিজে আসে আমার।
এই গানটি নিয়ে অসাধারণ একটা ঘটনা ঘটেছিল বাংলাদেশ টেলিভিশনে। ১৯৭২ সালে, দেশ স্বাধীন হবার পর বিটিভির শাদাকালো পর্দায় একটা কোরাস গান শুনে এবং দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন দর্শকেরা। নয়ীম গওহরের লেখা গানটিতে ফিরোজা বেগম, ফেরদৌসী রহমানসহ একঝাঁক সুপ্রতিষ্ঠিত প্রবীণ শিল্পী থাকলেও গানটিতে লিড দিয়েছিলেন খুবই কম বয়সী সাবিনা ইয়াসমিন। গানটি চিত্রায়ণের সময় সাবিনা ইয়াসমিনকে দাঁড় করানো হয়েছিল সবার অগ্রভাগে, আর পেছনে এক সারিতে ছিলেন বাকি শিল্পীরা।
সুরস্রষ্টা আজাদ রহমানের তুলনা নেই। অদ্বিতীয় তিনি।

আজ কানাডায় বসে আমার প্রিয় শিল্পী আজাদ রহমানকে খুব মনে পড়ছিল। আবার নতুন করে 'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটা শুনলাম একাধিকবার। একসময় মনে হলো একটু কথা বলি আজাদ ভাইয়ের সঙ্গে। গীতিকার ফজল-এ-খোদার কাছ থেকে টেলিফোন নম্বর সংগ্রহ করে কল দিলাম বাংলাদেশে আজাদ রহমানকে। বাংলাদেশে রাত তখন সাড়ে দশটা। কানাডা থেকে আমি ফোন করেছি বুঝতে পেরে খুবই খুশি হলেন তিনি। 'ভালোবাসার মূল্য কত' বিষয়ে নতুন করে দ্বিতীয়বার আমার মুগ্ধতার কথা শুনে প্রথমবারের মতোই অবাক ও খুশি হলেন আজাদ ভাই।
এর এক বছর আগে কানাডা থেকেই ফোন করে তাঁকে আমি আমার কৈশোর থেকে লালিত মুগ্ধতার ব্যাপারটা জানিয়েছিলাম। বয়স তাঁর প্রায় সত্তর। কিন্তু স্মৃতি তাঁর সতেজ এবং সজীব। তাঁর সুরারোপিত 'যাদুর বাঁশী'র গান এবং মিউজিক নিয়ে অনেক কথা বললাম। আমি এত দিন জানতাম ওই ছবিতে যাদুর বাজানো বাঁশির মূল পিসটা বাজিয়েছেন প্রখ্যাত বংশীবাদক আবদুর রহমান। আজ আজাদ ভাই বললেন, আবদুর রহমান কিছু কিছু অংশ বাজিয়েছিলেন বটে কিন্তু মূল অংশটা বাজিয়েছিলেন খবিরউদ্দিন নামের একজন শিল্পী। এমনিতে খবির অন্য কি একটা ইনস্ট্রুমেন্ট বাজিয়ে থাকেন। অবশ্য 'যাদুর বাঁশী' চলচ্চিত্রটি দেখার সময় ক্রেডিট লাইনে 'যাদুর বাঁশী'র বাদক হিসেবে আবদুর রহমানের নামটাই দেখেছিলাম আমি। এবং সেটাই আমার স্মৃতিতে গেঁথেছিল এত কাল। আজ একটা নতুন তথ্য জানা হলো।
আমার পাঠকদের আজকে একটা নতুন তথ্য দিই 'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটির বিষয়ে। এই গানটি গাইবার জন্যে আবদুল জব্বারকেই নির্বাচন করেছিলেন আজাদ রহমান। গানটির দুটি ভার্সন আছে ছবিতে। ছবির শুরুর দিকে একবার নায়ক সোহেল রানা গানটি গেয়েছেন অতি আনন্দিত চিত্তে, উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে। ছবির শেষদিকে আরেকবার গেয়েছেন বিষাদমাখা চিত্তে, বেদনার্ত কণ্ঠে। একবার হ্যাপি মুডে, আরেকবার প্যাথোজ মুডে। শিল্পী আবদুল জব্বার এই গানটির জন্যে দুবার পারিশ্রমিক দাবি করেছিলেন। দুবার পেমেন্ট না করলে জব্বার গানটি গাইবেন না বলে সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু আজাদ রহমান জব্বারকে দুবার পেমেন্ট করতে রাজি ছিলেন না। প্রযোজক সম্ভবত বাজেট সীমাবদ্ধ রেখেছিলেন নির্দিষ্ট অংকের। অতঃপর 'মন রেখেছি আমি কারও মনের আঙিনায়/ কেউ ডেকো না আমায় কেউ খুঁজো না আমায়' গেয়েই চলে গিয়েছিলেন আবদুল জব্বার। 'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটি তৈরি করে প্রযোজক-পরিচালক সোহেল রানাকে শুনিয়েছিলেন আজাদ রহমান। আজাদ রহমানের কণ্ঠে গানটি শুনে সোহেল রানাই প্রস্তাব করেছিলেন, আবদুল জব্বার না গাইলে আপনিই গেয়ে ফেলুন গানটা। আপনার কণ্ঠেও খুব ভালো লাগছে। এরপর আজাদ রহমান নিজের সংগীতায়োজনে নিজেই কণ্ঠ দিলেন। এবং আমাদের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে দুর্দান্ত এক নতুন শিল্পীর আগমন ঘটল।
এই কাহিনির দ্বিতীয় অংশটি অর্থাৎ সোহেল রানার প্রস্তাবে গানটা আজাদ রহমান গাইলেন—এটুকু আজাদ রহমান নিজেই বলেছেন আমাকে। কিন্তু কাহিনির প্রথম অংশ অর্থাৎ 'আবদুল জব্বারের ডাবল পেমেন্টের দাবি নচেৎ প্রত্যাখ্যান' ব্যাপারটি আমি জেনেছি খুবই বিশ্বস্ত একটি সূত্রে। আজাদ রহমান ভদ্রতাবশত হয়তো আবদুল জব্বারের অপ্রত্যাশিত আচরণের ঘটনাটা বলতে চাইছেন না। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমার বিশ্বস্ত সূত্রটি (গীতিকার ফজল-এ-খোদা) আমাকে সঠিক তথ্যই দিয়েছে। ধন্যবাদ প্রিয় শিল্পী আবদুল জব্বার, আপনি সেদিন বেঁকে না বসলে আজাদ রহমানের মতো অসাধারণ ব্যাতিক্রমী একজন সিঙ্গারকে আমরা পেতাম না। আর 'ভালোবাসার মূল্য কত' গানটি আজাদ রহমান ছাড়া আর কোনো কণ্ঠে এ রকম ধ্রুপদি ব্যঞ্জনা নিয়ে উপস্থিত হতো কি না সন্দেহ আছে।
প্রিয় আজাদ রহমান, আমার প্রিয় আজাদ ভাই, আপনার কাছে অনেক ঋণ আমার। আপনি আমার আনন্দ-বেদনার দীর্ঘ দিবস আর দীর্ঘ রজনীগুলোকে সোনার আলোয় ভরিয়ে রেখেছেন। আজ আমি আমার ভালোবাসার সবটুকু মূল্য দিয়েই আপনাকে প্রণতি জানাই। ১২ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরের দেশ কানাডার রাজধানী অটোয়া থেকে এই শীতের রাত্রিতে আপনাকে পাঠানো আমার উষ্ণপ্রণতিটুকু গ্রহণ করে আমাকে আরেকটু ঋণী করুন। আমাদের বাংলা গান আপনার হাত ধরে অফুরান সৌরভ ছড়াক। সেই সৌরভের গৌরবে সিক্ত থাকুক আমাদের গানের ভুবন।
[রচনাকাল অটোয়া ২৬ অক্টোবর ২০১৩]
পর্ব—০২
আজাদ রহমানের স্বপ্ন এবং স্বপ্নভঙ্গ
ওপরের রচনাটি ফেসবুকে আপলোড করার কয়েক মাস পর ২০১৪ সালের ১৮ জানুয়ারি চ্যানেল আই ভবনের পার্কিং লটে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে আজাদ রহমানের সঙ্গে আমার সঙ্গে দেখা হলো। তিনি প্রথম সারিতে একটা সোফায় বসেছিলেন। আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন। একটা দীর্ঘ আলিঙ্গনে বেঁধে বলেছিলেন—কী অসামান্য একটা লেখা তুমি লিখেছ, রিটন, আমাকে নিয়ে! আমার তো ফেসবুক নেই। আমার কন্যা পাঠিয়েছে অস্ট্রেলিয়া থেকে, 'বাবা দ্যাখো, তোমাকে নিয়ে কী সুন্দর একটা লেখা লিখেছেন লুৎফর রহমান রিটন!'
২০১৫-এর একুশের বইমেলায় বাংলাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হলো আমার স্মৃতিগদ্যের বই—টুকরো স্মৃতির মার্বেলগুলো। বইটিতে আজাদ রহমানকে নিয়ে রচিত লেখাটাও ছিল।
এক দুপুরে চ্যানেল আই অফিসে দেখা হলো আজাদ ভাইয়ের সঙ্গে। আমি 'টুকরো স্মৃতির মার্বেলগুলো'র একটা কপি উপহার দিলাম তাঁকে। বইটা পেয়ে চঞ্চল কিশোরের মতো উচ্ছ্বল হয়ে উঠলেন। সূচিপত্র দেখে লেখাটা খুঁজে বের করলেন। উল্টেপাল্টে দেখলেন। তারপর কঠিন একটা আলিঙ্গনে বাঁধলেন আমাকে, 'চলচ্চিত্রে আমার ৪০-৪৫ বছরের ক্যারিয়ার কিন্তু কোনো চলচ্চিত্র সাংবাদিকও আজতক আমাকে নিয়ে তোমার মতো এমন একটা বস্তুনিষ্ঠ লেখা লিখতে পারেননি। তোমার মতো একজন লেখক আমার সম্পর্কে এত কিছু জানে! অনেক কৃতজ্ঞতা তোমাকে রিটন!
খ।।
একটা অনুষ্ঠানে ফের দেখা হলো আজাদ ভাইয়ের সঙ্গে। তাঁর পাশের চেয়ারে এক ভদ্রমহিলা বসে আছেন। আজাদ ভাই আমাকে দেখে খুবই আনন্দিত কণ্ঠে পরিচয় করিয়ে দিলেন, 'এই যে ইনি আমার স্ত্রী।' খুব মিষ্টি করে হাসলেন ভদ্রমহিলা।
—আপনিই সেলিনা আজাদ! মনের রঙে রাঙাব?
আমার প্রশ্নে তাঁর মিষ্টি হাসিটা আরও মিষ্টি হয়ে উঠল।
—আজাদকে নিয়ে আপনার লেখাটা পড়েছি। খুব সুন্দর। আর কী চমৎকার ছড়া লেখেন আপনি!
আমি বললাম, একটি গানেই আপনি আমার খুব প্রিয় শিল্পী, আপা। কী মিষ্টি আপনার কণ্ঠ! কত দিন আপনি আর গান করেন না। আর গাইলেন না কেন আপনি?
আমার প্রশ্নের উত্তরে নিশ্চুপ সেলিনা আজাদ নিজের হাঁটুতে ডান হাতের একটা আঙুলে খুব ধীরলয়ের একটা তাল ঠুকতে ঠুকতে তাকিয়ে থাকলেন মাটির দিকে। একটিবারের জন্যেও তাকালেন না আমার উৎসুক চোখের দিকে।
গ।।
২০১৭-এর বইমেলা শেষে মার্চের প্রথম সপ্তাহে 'শ্রদ্ধায়' নামের অনুষ্ঠানটির বেশ কয়েকটা পর্বের রেকর্ডিং হলো চ্যানেল আই স্টুডিওতে। এক বিকেলের শুটিংয়ে এলেন আমার খুব প্রিয় আজাদ ভাই আর দ্বিজেন শর্মা। প্রথমে আজাদ রহমান, তারপর দ্বিজেন শর্মার সাক্ষাৎকার নিলাম। আজাদ ভাই সেদিন কী কারণে জানি না খুব বেশি বেশি বলতে চাইছিলেন তাঁর উদ্ভাবিত 'বাংলা খেয়াল'-এর কথা। একপর্যায়ে তাঁকে আমি থামাতে বাধ্য হয়েছিলাম, আজাদ ভাই, প্লিজ থাক না বাংলা খেয়াল প্রসঙ্গ। অনেক তো বললেন!
তিনি লজ্জিত হলেন, 'তোমাকে পেয়ে খুব বলতে ইচ্ছে হলো। বাংলা খেয়াল নিয়ে আমার স্বপ্নের কথা তো কাউকে বোঝাতেই পারলাম না এই দেশে!'
এবার আমি লজ্জিত হলাম।
ঘ।।

নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকেই আমাদের চলচ্চিত্রে শুরু হয়েছিল অশ্লীলতার পথে অগ্রযাত্রা। একদল অশিক্ষিত-অরুচিকর চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীর দখলে চলে গেল আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প। উদ্ভট কাহিনি, অরুচিকর সংলাপ আর অশ্লীল নৃত্য-সংগীতের দোর্দণ্ড দাপটে সুরুচি অস্ত গেল। নিম্নাঙ্গ সংগীতের জয়জয়কারে উচ্চাঙ্গ সংগীতের পুরোধা ব্যক্তিত্ব আজাদ রহমান সেখান থেকে উৎখাত হয়ে গেলেন খুব নীরবে। কেউ টেরই পেল না। কিংবা বলা চলে কেউ টের পেতে চাইলও না।
একজন আজাদ রহমান একবুক অভিমান নিয়ে সরে দাঁড়ালেন চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালকের দায়িত্ব থেকে। ১৯৯৪ সালের পর কেউ আর তাঁকে ডাকল না সংগীত পরিচালনা করার জন্যে।
গত ১৬ মে বিকেলে চলে গেছেন আজাদ ভাই সকল দায় চুকিয়ে, সমস্ত হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে।
আমাদের সংগীতভুবনের অনন্য ধ্রুপদি পুরুষ আজাদ রহমানের ভালোবাসার মূল্য আমরা চুকিয়েছি অনাদর আর অবহেলার দামে।
[অটোয়া ১৯ মে ২০২০]