রোদের ঘ্রাণ

পঞ্চাশ দশকের ঢাকা, ছবি ওয়াকার খান আর্কাইভ
পঞ্চাশ দশকের ঢাকা, ছবি ওয়াকার খান আর্কাইভ

১. রস

আমাদের ছোটবেলায় বাংলাদেশ গ্রামের পরিচয়টা ঝেড়ে ফেলে প্রাণপণে শহর হয়ে ওঠার চেষ্টা করছিল। শেষে এটা একটা অপরিকল্পিত, ঘিঞ্জি, বস্তিতে পরিণত হয়েছে, যেখানে শহর আর গ্রামের অসুবিধাগুলোর সব কটি আছে কিন্তু সুবিধাগুলো উধাও হয়ে গেছে। অবধারিতভাবে শৈশব আর কৈশোরের হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সময়ের পরিপার্শ্বটাও কালের গর্ভে মিলিয়ে গেছে। ক্রমক্ষয়মাণ জীবনের দমবন্ধ দিনগুলোতে হঠাৎ হঠাৎ শৈশব-কৈশোরের রোদ তার ঘ্রাণ নিয়ে আর বাতাস তার রং নিয়ে হাজির হয়। সেই ঘ্রাণ আর রং ভাসিয়ে নিয়ে যায় বর্তমান জীবনের সব অপ্রাপ্তি, ব্যর্থতা আর অপূর্ণতাকে।


শীতকাল এলে কোনো কোনো সকালে কাঁধে বাঁশের বাঁকে দুই-দুই চারটে মাটির কলসে খেজুরের রস নিয়ে 'গাছি' হাজির হতেন। আমাদের বাড়িকে কেন্দ্র করে কয়েক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের বৃত্ত আঁকলে তার মধ্যে রস আহরণ করা যাবে, এমন কোনো খেজুরগাছ ছিল না। তিন বাড়ি পরে সুরবানু খালাদের বাড়ির উঠানে একটা খেজুরগাছ ছিল বটে, তবে তার ডালভর্তি বাবুইয়ের বাসা ছিল, কিন্তু তার কাণ্ডে কখনো মাটির হাঁড়ি ঝুলতে দেখিনি। বড়রা বলতেন গাছির রস মোটেও খেজুরের রস নয়, বরং চিনি বা গুড়ের জল।


বড়দের কথা আংশিক সত্য ছিল, কারণ, তখনো ১০০% ভেজাল দেওয়ার মতো নীচতা আমাদের গ্রাস করেনি। আসল খেজুরের রস কেমন হয়, সেটা আমাদের জানা ছিল না। ফলে গাছির খেজুরের রসকেই আমাদের কাছে আসল রস বলে মনে হতো। শহরের বাইরে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে, চন্দ্রা, শালনা, রাজেন্দ্রপুর বা শালবন বিহারে বনভোজনে গেলে যেসব গাছি রসের কলস নিয়ে হাজির হতো, তাদের রস বরং আমাদের গাছির রসের চেয়ে পানসে মনে হতো। যাঁরা খেজুরের রস পান করেছেন, তাঁরা জানেন এর গন্ধ, স্বাদ, জিবে-মুখে অনুভূতি একেবারেই ভিন্ন। পৃথিবীর কোনো পানীয় দিয়ে শীতের সকালে খেজুরের রস পানের অনুভূতিকে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।


আমাদের শৈশব-কৈশোরে সন্ধ্যা হতে না-হতে চারপাশে বাদুড় ওড়াওড়ি করতে দেখা যেত। ছোটখাটো থেকে শুরু করে বেশ ধাড়ি বাদুড়ের চিৎকারে সন্ধ্যার আকাশ চিরে যেত। আমরা সমস্বরে একটা অর্থহীন ছড়া বলতাম—


বাদুড় বাদুড় টিক্কা বাদুড়
যদি খাস পাতা
কাটব তোর মাথা
বাদুড় বাদুড় টিক্কা বাদুড়
যদি খাস থোড়
কাটব তোর ধড়
বাদুড় বাদুড় টিক্কা বাদুড়
যদি খাস কলা
কাটব তোর গলা


বাদুড় দেখলে আমার গা ঘিনঘিন করত। বাদুড় আশপাশের কলা আর পেয়ারাগাছের ফল চুষে খেয়ে যেত। গাছের তলায় বাদুড়ের বমি পড়ে থাকত। সেটা দেখলে নাড়িভুঁড়ি উলটে আসতে চাইত। তখন বাদুড় আর চামচিকার এত উপদ্রব থাকলেও তাদের দ্বারা বাহিত কোনো রোগের কথা শুনিনি। বাদুড়বাহিত নিপাহ্ ভাইরাস হয়তো তখনো ছিল, কিন্তু তার পরিচয় জানতে পারিনি। নিপাহ্ ভাইরাসের আবির্ভাবের ফলে ব্যক্তিগতভাবে আমার যা ক্ষতি হয়েছে, তা হচ্ছে শীতকালে খেজুরের রস পানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া।


গত পঁচিশ বছরে কোনো গাছিকে খেজুরের রস নিয়ে আমাদের পাড়ায় আসতে দেখিনি। তবে এর মধ্যে শহরের বাইরে তাদের দেখা পেয়েছি, কিন্তু নিপাহ্র ভয়ে আর রস পান করা হয়নি। তবু শীতকালে কোনো কোনো সকালে যখন চারপাশ গাঢ় কুয়াশায় ঢেকে যায়, সকাল সাড়ে নয়টায়ও বাসার সামনের স্ট্রিট লাইটগুলো জ্বলতে থাকে আর তাতে রাস্তাটাকে অপার্থিব জগতে যাওয়ার একটা সুড়ঙ্গ বলে মনে হয়। তখন মাথায় টুপটাপ করা ঝরা শিশির মুছতে মুছতে জিবে-তালুতে খেজুরের রসের স্বাদ পাই, নাকে তার মাদকতাময় সুবাস পাই। শীতে মিইয়ে পড়া শরীরের কোষে কোষে খেজুরের রসের সঞ্জীবনী ছড়িয়ে পড়ে। নিপাহ্র ভয়ে নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া খেজুরের রস চিরতরে হারিয়ে যাওয়া শৈশব-কৈশোরের রোদের মতো তার ঘ্রাণ নিয়ে আর বাতাসের মতো তার রং নিয়ে হাজির হয়। সেই ঘ্রাণ আর রং অধঃপতিত জীবনের সব সীমাবদ্ধতাকে মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

২. বাতাসের রং

পুরনো ঢাকা, শিল্পী: সুলতান ইশতিয়াক
পুরনো ঢাকা, শিল্পী: সুলতান ইশতিয়াক

আমার পথের দিশা ঠিক থাকে না। যেমন আনারকলি মার্কেট থেকে মৌচাক মার্কেটের পেছন দিক দিয়ে এগিয়ে আমি কখনো মূল রাস্তায় পৌঁছাতে পারি না। কেবলই ভুলভুলাইয়ার মতো গলিগুলোতে ঘুরপাক খেতে থাকি। এভাবে কখনো এমন কোনো সরু গলিতে ঢুকে পড়ি, যেখানে দুজন মানুষ পাশাপাশি চলতে পারে না। সেখানে কাঠের সরু বেঞ্চি পেতে লোকে তেলেভাজা, মুরগির ঠ্যাং, ছোলামুড়ি খায়। আর আমি বিভ্রান্তের মতো ঘুরপাক খাই। শাঁখারিবাজারের রাস্তায় পশ্চিমমুখো চলতে গেলে কখন ঘিপট্টির গলিটা পার হয়ে যাই, বুঝতে পারি না। যখন কল্পনা বোর্ডিংয়ের কাছে পৌঁছে যাই, তখন বুঝি যে অনেকটা সামনে চলে গেছি। অবশ্য ঘিপট্টির গলির উত্তর প্রান্তটা বিভ্রান্তিকর। খুব সরু এই মাথার দিকে কোনো ঘিয়ের দোকান নেই, আছে শোলার দোকান। সেখানে কিছু মানুষ খুব নিবিষ্ট হয়ে দিনমান শোলার টোপরে কারুকাজ করে, পুজোর সাজ বানায়। হরিরামের ঘিয়ের দোকানের সাইনবোর্ডটা না দেখা পর্যন্ত বুঝতে পারি না যে আমি আসলেই ঘিপট্টি পৌঁছে গেছি। আগে দোকানগুলোতে বড় বড় স্টিলের 'কাইরা'তে ঘি থাকত, মাটির উঁচু উঁচু হাড়িতে টক দই আর এনামেলের বড় বড় থালাতে মাওয়ার মঠ থাকত। ঘি, টক দই আর মাওয়ার তিন রকমের ভিন্ন সুবাস মিলে একটা অদ্ভুত গন্ধ তৈরি করত। এখন আর স্টিলের 'কাইরা'তে ঘি থাকে না, স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ছোট-বড় বয়ামে ঘি সাজানো থাকে। উঁচু মাটির হাঁড়ির বদলে নোংরা প্লাস্টিকের বালতিভরা টক দই থাকে। আর মাওয়ার এনামেলের থালা স্টিলের থালা হয়ে গেছে। যেমন কল্পনা বোর্ডিং থেকে শুকলালের বিরিয়ানির দোকানের দিকে যেতে হাতের ডান দিকের মিষ্টির দোকানগুলোর অমৃতির কাঠের খাঞ্চা আর ছানা-সন্দেশের কাঁসা-পেতলের পলকাটা থালা স্টিলের থালা হয়ে গেছে! ঘিপট্টির অদ্ভুত ঘ্রাণটার রেশ পাটুয়াটুলীর ঘড়ি-চশমা-গানের দোকানগুলো পর্যন্ত থেকে যায়, যেমন আগে দয়াগঞ্জের রাস্তা ধরে যেতে থাকলে অধ্যক্ষ মথুর বাবুর শক্তি ঔষধালয় থেকে ভেসে আসা স্বর্ণসিন্দুর, মকরধ্বজ, চ্যবনপ্রাশ আর মৃতসঞ্জীবনী সুরার মিলিত সুবাস শরৎগুপ্ত রোড পর্যন্ত থেকে যেত। আমি প্রতিবার নর্থব্রুক হল রোড ধরে প্যারীদাস রোডে যেতে গেলে প্রথমে ভুলে পাতলা খান লেনে ঢুকে পড়ি, তারপর শুধরে আবার সামনে যেতে যেতে প্যারীদাস পার হয়ে জুবিলী স্কুল পর্যন্ত চলে গেলে হুঁশ হয় যে আবারও ভুল করেছি। অবশ্য একবার প্যারীদাসে ঢুকে গেলে হাতের বাঁ দিকের শ্রীশ দাস লেনটা চিনতে ভুল হয় না। তখন ঠিক ঠিক বিউটি বোর্ডিংয়ে পৌঁছে যাই। প্রতিবার বিউটি বোর্ডিংয়ে গিয়ে দেখি, এরা আগের চেয়ে আরও বেশি নোংরা, আরও বেশি অগোছালো হয়েছে, কিন্তু খাবারের দাম আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। তখন প্রতিবার মনে মনে কানে ধরি, বিউটি বোর্ডিংয়ে আর যাব না, তবু কী করে যেন আবার সেখানে যাওয়া হয়—যেমন বারকয়েক জনসন রোডের বিউটি লাচ্ছির দোকানের ব্র্যান্ড আইটেম লেবুর শরবতে পচা লেবুর স্বাদ পাওয়ায় ভেবেছি আর যাব না, তবু কী করে যেন আবার যাওয়া হয়। কেন আমি পথের দিশা হারিয়ে এই ভুলভুলাইয়াগুলোতে বারবার ঘুরপাক খাই? কেন আমি বারবার ঠকেও আবার ঠকতে যাই? আসলে আমি হারিয়ে যাওয়া রোদের ঘ্রাণ খুঁজি, মিলিয়ে যাওয়া বাতাসের রং খুঁজি। আমি জানি, সেই দিনগুলো আরও কয়েক দশক আগেই ফুরিয়ে গেছে; তবু অবুঝ মন তার খোঁজেই ঘুরে মরে। ভাঙা রাস্তা, খোলা ম্যানহোল, উপচে পড়া নর্দমা, কর্ণবিদারী উন্নয়নের শব্দ আমার চারপাশে একটা ভারী পর্দা তৈরি করে। তার ভেতরে বিহ্বল আমি ধোঁয়াটে আকাশে রোদের ঘ্রাণ শুঁকি, ধুলোয় ভরা বাতাসে তার রং মেলাতে থাকি কারকুন বাড়ী লেনে, কবিরাজ গলি লেনে, পানিটোলা রোডে।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০