শরৎচন্দ্র কি কোয়ারেন্টিনে ছিলেন

>'শ্রীকান্ত' উপন্যাসে কোয়ারেন্টিনের চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। কিন্ত তিনি কি কোয়ারেন্টিনে ছিলেন? সেই প্রশ্নকে নতুন করে সামনে আনা হয়েছে এই লেখায়।

করোনা প্রতিরোধের পন্থা হিসেবে কোয়ারেন্টিন আজ দুনিয়াজুড়ে খুব বেশি আলোচিত। পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষ আজ কোয়ারেন্টিনে। 'কোয়ারেন্টিন' আমাদের কাছে এই করোনাকালে খুবই পরিচিত একটি শব্দ। তবে এই শব্দটি কি বাঙালির কাছে একেবারেই নতুন?

বাস্তবতা হচ্ছে, বাঙালির কাছে কোয়ারেন্টিন একেবারে নতুন কিছু নয়। আজ থেকে এক শ বছর আগে কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কোয়ারেন্টিন নিয়ে গল্প ফেঁদেছেন। নানা সূত্রে এটি এখন অনেকেই জানেন হয়তো।


এবার চলুন, আমরা শরৎচন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস 'শ্রীকান্ত'র দ্বিতীয় খণ্ড খুলে বসি। রাজলক্ষ্মী ওরফে পিয়ারীবাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে শ্রীকান্ত তৎকালের বার্মা যাচ্ছেন। তখন সেখানে প্লেগের প্রকোপ। তাই কোয়ারেন্টিনে থাকার নিয়ম। চতুর্থ পরিচ্ছেদে শরৎচন্দ্র লিখছেন:
'পরদিন বেলা এগার-বারটার মধ্যে জাহাজ রেঙ্গুনে পৌঁছবে; কিন্তু ভোর না হইতেই সমস্ত লোকের মুখচোখে একটা ভয় ও চাঞ্চল্যের চিহ্ন দেখা দিল। চারিদিক হইতে একটা অস্ফুট শব্দ কানে আসিতে লাগিল, কেরন্টিন্। খবর লইয়া জানিলাম, কথাটা Quarantine: তখন প্লেগের ভয়ে বর্মা গভর্নমেন্ট অত্যন্ত সাবধান। শহর হইতে আট-দশ মাইল দূরে একটা চড়ায় কাঁটাতারের বেড়া দিয়া খানিকটা স্থান ঘিরিয়া লইয়া অনেকগুলি কুঁড়েঘর তৈয়ারী করা হইয়াছে; ইহারই মধ্যে সমস্ত ডেকের যাত্রীদের নির্বিচারে নামাইয়া দেওয়া হয়। দশদিন বাস করার পর তবে ইহারা শহরে প্রবেশ করিতে পায়।'


জাহাজের চিকিৎসক শ্রীকান্তকে একান্তে ডেকে জানাচ্ছেন যে তার একটা চিঠি নিয়ে আসা উচিত ছিল। কারণ, সঙ্গনিরোধ কষ্টের। চিকিৎসক বলেন, 'এরা মানুষকে এত কষ্ট দেয় যে কসাইখানার গরু-ছাগল-ভেড়াকেও এত কষ্ট সইতে হয় না।'

শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬—১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮)
শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় (১৫ সেপ্টেম্বর ১৮৭৬—১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮)

সেখানে যাওয়ার জন্য কুলি পাওয়া যায় না। সব জিনিস কাঁধে বইতে হয়। সরু সিঁড়ি দিয়ে ওঠা-নামা করতে হয়। রোদের মধ্যে যেতে হয় অনেকটা পথ। এমন বর্ণনা শুনে শ্রীকান্তের কপালে চিন্তার ভাঁজ। তিনি ভয় পেয়ে বিকল্প খুঁজছিলেন। চিকিৎসক ঘাড় নেড়ে জানালেন, না। ফলে কোয়ারেন্টিন অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল। উপন্যাসের এই পর্যায়ে এসে শরৎচন্দ্র লিখছেন:
'বেলা এগারটার সময় Quarantine-এর কাছাকাছি একটা ছোট স্টীমার আসিয়া জাহাজের গায়ে ভিড়িল। এইখানি করিয়াই নাকি সমস্ত ডেকের যাত্রীদের সেই ভয়ানক স্থানে লইয়া যাইবে। জিনিসপত্র বাঁধা-ছাদার ধুমধাম পড়িয়া গিয়াছে। আমার তাড়া ছিল না, কারণ ডাক্তারবাবুর লোক এইমাত্র জানাইয়া গেছে, আমাকে আর সেখানে যাইতে হইবে না। নিশ্চিন্ত হইয়া যাত্রী ও খালাসীর চেঁচামেচি দৌড়ঝাঁপ কতকটা অন্যমনস্কের মত নিরীক্ষণ করিতেছিলাম, হঠাৎ পিছনে একটা শব্দ শুনিয়া ফিরিয়া দেখি, অভয়া দাঁড়াইয়া।'
মূলত অভয়া এই দ্বিতীয় খণ্ডের অধিকাংশ স্থান দখল করে আছে। অসুস্থ হলে অভয়া তাকে সুস্থ করে তোলে। শ্রীকান্তের কোয়ারেন্টিনে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু অদৃষ্টের করসাজি বোঝার সাধ্য কারও নেই। শ্রীকান্তকে ছেড়ে অভয়া কিছুতে কোয়ারেন্টিনে যাবেন না, 'আমি বরং জলে ঝাঁপিয়ে পড়ব, তবু কিছুতেই এমন নিরাশ্রয় হয়ে ও জায়গায় যাব না।' যারা শরৎচন্দ্রের লেখার সঙ্গে পরিচিত তারা জানেন, তাঁর সম্পদ এই আবেগ। যার মাধ্যমে তিনি কঠিন বিষয় সহজ করে তোলেন, অনেক অসম্ভবকে করে তোলেন সম্ভব। ফলে আত্মাহুতির হুমকির পর শ্রীকান্তের পক্ষে আর অভয়াকে একা ফেলে যাওয়া শোভন দেখায় না। নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে তিনি যখন ছোট স্টিমারে উঠলেন, তখন ডাক্তার ডেকের ওপর থেকে চিৎকার করে হাত নেড়ে যেতে নিষেধ করলেন, 'ফিরুন, ফিরুন—আপনার হুকুম হয়েচে... আমিও হাত নাড়িয়া চেঁচাইয়া কহিলাম, অসংখ্য ধন্যবাদ, কিন্তু, আর একটা হুকুমে আমাকে যেতেই হচ্ছে।' এই কথাবার্তা চলার মধ্যেই ডাক্তারের চোখ পড়ল অভয়ার ওপর । তিনি মুখ টিপে হাসলেন এবং বিষয়টি অনুধাবন করতে পারলেন।


পঞ্চম পরিচ্ছেদের শুরুতেই শরৎচন্দ্র লিখেছেন, 'কেরেন্টিন্‌-কারাবাসের আইন কুলিদের জন্য—ভদ্রলোকের জন্য নয়।' এই একটি বাক্যই যথেষ্ট সেকালের সমাজ বোঝার জন্য। আর শুধু সেকাল বলি কী করে? এ কালেও তো যাদের টাকা আছে, তারা সমাজে যে নানা সুবিধা পান, তা আমরা অহরহ দেখি। এমনকি টাকার জোরে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা অপরাধ করেও পার পেয়ে যান।