default-image

গ্রামের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ভাঙাচোরা সড়ক। খটখটে শেয়ালডাঙা মৌজার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় যেখানে বড় একটা বাঁক নিয়েছে রাস্তাটা, ঠিক সেখানটায় প্রামাণিকদের বাড়ি। পথের ধারেই। গ্রামের লোকেরা বলে ‘কলুবাড়ি’।

বাহিরবাড়ির উঠানে বিষণ্ন মনে বসে আছে কলুবাড়ির হারু প্রামাণিক। পাশে তাদের ঘিয়েরঙা আদুরে বিড়ালটা। নাম রূপসী। কী যেন এক ভীষণ মসিবতে পড়েছে হারু। কয়েক দিন ধরেই কেমন যেন মনমরা, অস্থির, উসখুস। কিন্তু কাউকে কিছু বলছেও না মুখ ফুটে।

বিড়ালের পা ধরে বসে থাকলে নাকি কেটে যায় কোনো কোনো বালা-মসিবত। রূপসীর দুই পা ধরে তাই ঝুঁকে বসে আছে হারু। আর হারুর বউ চামচে করে দুধ তুলে দিচ্ছে রূপসীর মুখে। চামচ চেটে চেটে দুধ খাচ্ছে রূপসী, চেহারাটা অবশ্য বানিয়ে রেখেছে বেশ ভাবগম্ভীর। মাঝেমধ্যে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে মুখটা বাড়িয়ে জিব দিয়ে চেটে দিচ্ছে হারুর দাড়িওয়ালা গাল। ঘাসের চোখা ডগায় ফুটে থাকা শিশিরের মতো জ্বলজ্বল করছে কয়েক ফোঁটা দুধের কুচি, হারুর খোঁচা খোঁচা দাড়িতে। পাশের ঘানিঘরে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ঘুরেই চলেছে ঘানি। টুপ...টুপ...টুপ করে ঝরছে শর্ষের তেল। ঘানির এক প্রান্তে বাঁধা কালো রঙের একটি বলদ। চোখে ঠুলি লাগানো। কলুর বলদ।

বিজ্ঞাপন

মির্জাপাড়ার সামাদ মির্জা ভাঙানোর জন্য দিয়ে গেছে ৩০ কেজি রাইশর্ষে। গ্রামে শর্ষেপেষা মেশিন বসেছে দুটি। সেসব রেখে কলুবাড়ির শর্ষের তেল পছন্দ অনেকেরই। ঘানিতে ভাঙানো তেলের স্বাদই আলাদা। কি ভর্তা-ভাজি, কি তরকারি, কি মুড়িমাখা, কি গায়ে মাখা—সবকিছুতেই চাই কলুবাড়ির তেল। গ্রামের গবাদিপশুরও প্রিয় এই কলুবাড়ির খইল। বিশেষ করে হারু প্রামাণিকের তৈল-খইল দুই-ই বেশ জনপ্রিয়। সন্ধ্যাবেলায় এসে নিয়ে যাবে সামাদ। এর মধ্যে হারুর বউ সরিয়ে রাখবে কিছু তৈল-খইল, তেলেসমাতির মতো মসৃণ উপায়ে। টেরও পাবে না সামাদ। সামাদ কেন, সামাদের ইগলদৃষ্টি-বউটিও না।

বহু দূরের কামারপুকুর গ্রাম থেকে অনেক দিন পর বেড়াতে এসেছে এক অতিদূরসম্পর্কের কুটুম, কয়রাচোখা, পরনে মলিন কোঁচকানো কাপড়চোপড়; অসহায়, বিধ্বস্তপ্রায় চেহারা। এসেছে ছোট ছোট দুটি মা মরা ছেলেকে নিয়ে। শুকনো মুখ, কাঠি কাঠি হাত-পা ছেলে দুটির। মাস দুয়েক হলো গত হয়েছে ওদের মা। ছেলে দুটি হারুকে মামা মামা বলে ডাকছে। মামা কীভাবে? মাথা নিচু মুখচোরা স্বভাবের হারু প্রামাণিকের সঙ্গে একসময় প্রেম ছিল ওদের মায়ের। সেই সূত্রে হারু ওদের মামা। মায়ের সঙ্গে প্রেম, তাই মামা। আর মায়ের সঙ্গে বিবাহ, তাই বাবা।এমনিতেই হারুর মন বিক্ষিপ্ত, তার ওপর বাড়িতে অতিথি। কী খাওয়াবে, ভাবছে সেটাই। ঘরে মাছ, মাংস, ডিম—কিছুই নেই। আজ তো হাটবারও না। বুধবারে অবশ্য হাট বসে একটা, তিন ক্রোশ দূরের সেই চন্দনপুরে। কে যাবে এখন অত দূরে? তা ছাড়া টাকাও নেই হাতে। তাহলে?

হারুদের ভেতর বাড়ির উঠানের এক পাশে পানিভর্তি বড়সড় একটি চৌবাচ্চা, অন্য পাশে দুটি গোল মাটির চাড়ি, সুন্দর করে সেট করা। সেখানে খেতে দেওয়া হয় কলুর বলদদের। মজাদার সব খাবার। পানিতে থকথকে করে মাখা খইল, ভুসি, কুচি কুচি করে কাটা খড় আর বিচিত্র সব ঘাসপাতা—দূর্বা, ভাদাইল, বিন্ন্যা, বারমুডা, উলু, কাশ, হাতিঘাস, আখের পাতা, কলাপাতা, ধনচে পাতা—যখন যা পাওয়া যায়। ওরা এসব খায় আর একান্ত বাধ্য সুবোধ পোষ্যপুত্রের মতো নির্বিকার ঘানি টেনে যায় সারাটা জীবন। তাতেও কি স্বস্তি আছে? কখনোবা অতর্কিতে এসে হামলা করে খুরফোলা রোগ! কিংবা কখনোবা গোয়ালঘরের খুঁটি ধরে হালকা সিল্যুয়েট মূর্তির মতো এসে দাঁড়ায় পার-শিমলার নবু মুচি, কালীসন্ধ্যাবেলায়, কলাপাতায় মোড়ানো বিষের পুঁটলি হাতে। সবার অলক্ষ্যে কখন যে খাইয়ে দেবে সেই কলাপাতার প্যাকেট, আর পরের দিন অপেক্ষা করতে থাকবে সিঙ্গিমারি বিলের ধারের গো-ভাগাড়ে গিয়ে।

হারুদের সেই জলভরা চৌবাচ্চা। যখনই কিছু পয়সা হয় হারুর হাতে, একসঙ্গে বেশ কটি জ্যান্ত গজার মাছ কিনে এনে ছেড়ে দেয় চৌবাচ্চায়। খইলের সঙ্গে ধানের কুঁড়া, গমের ভুসি মিশিয়ে গজারের জন্য বানায় উপাদেয় খাবার। খাবারও দেয় প্রচুর। দেখতে দেখতে নধরকান্তি হয়ে ওঠে একেকটা মাছ, দু-চার সপ্তাহের মধ্যেই। গজার খুব প্রিয় কলুদের। গজার মাছ রান্নায় তেল-মসলা লাগে বেশ। কলুবাড়িতে তো তেলের অভাব নেই, অবশ্য আজকাল মসলারও অভাব নেই। বেশ কয়েক মাস হলো আরও একটি ঘানি বসিয়েছে হারু। বিশেষ ধরনের ঘানি। তাতে গুঁড়া করা যায় হলুদ, মরিচ, জিরা, ধনে, মৌরি—সবই। আর হারুর বউয়ের রান্নার হাত তো...লা জবাব!

আজ কোনো মাছও নেই চৌবাচ্চায়। ওহ, মাত্র একটা বোধ হয় আছে, হঠাৎ মনে পড়ল হারুর বউয়ের। বউ উঠে যেই রান্নাঘরের দিকে যেতে নিয়েছে, এমন সময় একটা পোষা গোল্লা কবুতর উড়ে এসে বসল বউয়ের কাঁধে। বাকুম বাকুম করে কী যেন একটা কথা বলে ফড়ফড় করে উড়ে গেল আবার। বেশ কিছুক্ষণ পর এক বানর লাফাতে লাফাতে এসে বসল হারুর বাঁ পাশটায়। ট্যারা চোখে একবার তাকাল রূপসীর দিকে। তারপর ক্যাচম্যাচ করে কী যেন কী একটা জানান দিয়ে চলে গেল ফের।

হঠাৎ চৌবাচ্চা থেকে লাফ দিয়ে উঠানে এসে পড়ল গজার মাছটা। চটাস চটাস করে এগিয়ে গেল উঠানের কোণে শজনেগাছটার দিকে। গাছ থেকে নেমে এল কলুদের সেই লালমুখো বাস্তুবানর। সঙ্গে সঙ্গে টিনের চাল থেকে কবুতরটাও উড়ে এসে বসল বানরের কাঁধে। বানর ঝুঁকে পড়ে কী যেন শুনে নিল গজারের কাছ থেকে। শুনেই দৌড়ে গিয়ে উঠল সোনালুগাছের ডালে। তারপর ডাল থেকে ডালে ঝুলে, দোল খেতে খেতে চষে বেড়াল গাছগাছান্তর। সোনালু থেকে শজনে, শজনে থেকে ছাতিম, ছাতিম থেকে পীতরাজ, পীতরাজ থেকে শেওড়াগাছে ছড়িয়ে দিল গজার মাছের কাছ থেকে শোনা সেই বার্তা। অবশ্য এসব করতে গিয়ে শাখামৃগ নিজেই ভুলে গেল সে বার্তার কথা। কিন্তু কবুতরটা ভোলেনি। সে-ই এসে খবরটা দিয়ে গেল হারুর বউকে। পরে যখন মনে পড়ল বানরের, লাফাতে লাফাতে সে-ও চলে এল হারুর কাছে।

বিজ্ঞাপন

বউ যাওয়ার পরপর হারুও গেল বাড়ির ভেতরে। গিয়ে দ্যাখে, বাস্তুবানর আর বাস্তুকবুতরের খবর সঠিক। গজার মাছটা উঠান থেকে লাফ দিয়ে আবার চৌবাচ্চার ভেতর। জ্যান্তে-মরা হয়ে ভেসে আছে পানির উপরিভাগ থেকে একটু নিচে। নিঃসাড়। দু-চারটি বুদবুদ উঠছে মাত্র। বুদবুদ দিয়ে পাঠাচ্ছে সংকেত, বলছে, বাড়িতে অতিথি এসেছে, আমি এখন দেহত্যাগ করতে চাই, স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে। প্রতীক্ষা করছি অধীর আগ্রহে, আমার এই নশ্বর দেহটা আজ চলে যাক অতিথিসৎকারে, প্রকৃতির খাদ্য হয়ে আজ মিশে যেতে চাই প্রকৃতিতেই।

আশপাশের গাছগাছালি, ঘুঘু-কবুতর, বানর-বেজি, গরু-বকরি, এমনকি শেওড়াগাছের ভোলাভালা বাস্তুভূত—সবার মধ্যে রাষ্ট্র হয়ে গেছে গৃহগজারের এই অন্তিম অভিপ্রায়। সে-ও বেশ কিছুক্ষণ আগে। এখন সে খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে ফুলের হালকা গন্ধ বয়ে বেড়ানো পড়ন্ত বিকেলের খেয়ালি হাওয়ায়, ইটভাটার চিমনি ঠিকরে আসা উদ্দেশ্যহীন আলোকরেখায়, একা একা ভাসতে থাকা রাশপাতলা এক পালকের এলোমেলো নিরুদ্দেশ সঞ্চারপথে, আর পশ্চিম আকাশে ইতস্তত ফুটে থাকা বিজলিভরা লালচে-গোলাপি মেঘে মেঘে। দূরদূরান্তের গ্রামগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ছে সেই সংবাদ, আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাওয়া আসরের আজানের সুরের সঙ্গে মিশে। আজ গজার মাছের ইচ্ছামৃত্যুর দিন, আজ তার দেহসৎকারের মাধ্যমে সাধিত হবে অতিথিসৎকার।

সবাই জেনে গেছে সে কথা, শুধু দূর থেকে আসা মা মরা দুটি শিশু আর তাদের বিধ্বস্ত বাবা জানতে পেরেছে কি না, বোঝা গেল না।

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন