default-image

চার্লি চ্যাপলিন চেয়েছিলেন, ঘুমের ঘোরেই তাঁর মৃত্যু হোক। রাশেদ ফারাজীর বাসনা এক-আধটা স্বপ্ন দেখা। নতুন কিছু দৃশ্য রচিত হোক। সিনেমা হবে। কিন্তু আক্ষেপ, ঘুমিয়ে সে কিছুই দেখে না।

রাতের রাস্তায় দূরপাল্লার বাস চলছে। নানা ভঙ্গিতে ঘুমিয়ে থাকা যাত্রীরা দুলছে। একটা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙে রাশেদের। গায়ের সাথে লেপ্টে থাকা বাচ্চা সামলে নিয়ে ভীষণ বিরক্ত হয় রাশেদ। পাশের যাত্রীর ঘুম ভাঙায়। বাচ্চাটার কোল বদল হয়। লালায় শার্ট ভিজিয়ে ফেলছে শয়তানের বাচ্চা! এই বাচ্চার দোহাই দিয়েই ব্যাটা জানালার পাশে দখল নিয়েছে। পাক্কা ৪০ মিনিট পরের আরেকটা বাসে উঠেছিল রাশেদ, ড্রাইভারের ঠিক পেছনে জানালার দিকে। রাতের চলন্ত রাস্তা নেশা ধরায়। বাড়তি কিছু এস্তেমালের দরকার নেই।

হাসপাতালের করিডরে সারি সারি রোগী। এর মাঝে শুয়ে থাকা নিজেকে আবিষ্কার করে খুব অবাক হয় রাশেদ। নভোচারীর মতো পোশাকে কয়েকজন তার দিকে এগিয়ে এল। বিস্ময়ে তার চোখ বুজে আসে। মাস্ক, পিপিই পরা নার্স-আয়াদের কথা শোনা যায়, ‘অক্সিজেন নাই, আমরা কী করব। বেচারার সাথেও কেউ নাই, আনজুমান মুফিদুল...।’

বিজ্ঞাপন

আজব তো, আমি কি মরে গেছি নাকি! দাফন-কাফনের কথা আসছে কেন? মাইলের পর মাইল নাড়ার আগুনে পুড়ছে নড়াইল টু যশোরের ল্যান্ডস্কেপ। সাদা আলখেল্লা পরা দীর্ঘ চুলের এস এম সুলতান বেজার মুখে ট্রাক্টরে সওয়ার হয়েছেন। গাড়ি নষ্ট হলো। ঢাকাগামী লাস্ট বিমান ধরতে এখন ওই নছিমনই ভরসা! কিন্তু বিমানবন্দর কত দূরে, রাশেদ তা ঠিক ঠাওর করতে পারে না। তখন সেলফোন যুগ ছিল না যে গুগল করবে। ঘর্ঘর শব্দে তার ঘুম ভাঙে। ভোরের হাওয়ায় ঠান্ডা লাগে, কেমন যেন শীতল একটা অনুভূতি হয়। ভালো লাগে রাশেদ ফারাজীর। সমস্ত বাসযাত্রী বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ড্রাইভার, সে-ও ঢলে পড়েছে তন্দ্রায়! মুহূর্তে ব্রিজ ভেঙে শূন্যে উঠে গেছে বাস। সুবহে সাদিকের নীল আকাশে উড়ছি বাসসুদ্ধ আমরা সবাই। চরাচরে নিঃসীম শূন্যতা। এর মধ্যে হঠাৎ কাচ ভাঙার শব্দ। তারপর ফুটে ওঠে আহত আদিম এক যৌথ চিৎকার। কোনো স্বপ্নদৃশ্য নয়, বাস্তব।

রাশেদ ফারাজীর জীবনে এমনটাই ঘটেছে বহুকাল আগে। ঘটেছে কি? কপালগুণে তার প্রেম হয়েছে। বধূর পাশে শুয়ে বাচ্চার বেড়ে ওঠা দেখা হয়েছে...দেখা হয়েছে আরও আরও কিছু। কিন্তু কী মুশকিল, এ ঘুম থেকে বের হতে না পারলে এরা তো আমাকে কবরেই শুইয়ে দেবে! চিরকালই আমি অলস, ঘুমকাতুরে। বাঁচতে হলে আলসেমি ছাড়তে হবে। এই যে ভাই, শুনছেন...আওয়াজ কারও কানেই যায় না। শালার মরার ঘুম কেন ভাঙছে না আমার! খুব করে চাইছি, বাবা এসে কানটা ধরে বিছানায় বসিয়ে দেন। মাথায় হাত রেখে মা ডাক দেন, ‘ওঠ ফারাজী, অনেক বেলা হইছে বাবা।’ ইশকুলের ঘণ্টার শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়াই। ঘণ্টার অনুরণন থামার আগেই পৌঁছাতে চাই! শেষমেশ এই ঘুমই কাল হলো। ওভারডোজ না, ক্রসফায়ার না, লিভারসিরোসিস না, গুম না, খুনও নয়; স্রেফ ঘুম। আর এখন নিয়তির মতো বেজেই চলেছে একটা অ্যাক্সিডেন্টের দৃশ্য। উল্টানো ট্রাকের চাকা ঘুরছে। অ্যালুমিনিয়ামের বিশাল কনটেইনারগুলো গড়িয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে হাইওয়ের বাঁকে। কালো পিচের রাস্তায় দুধের নহর। সাদা মসলিনে মিশে যাচ্ছে ভ্যানচালকের থেতলে যাওয়া হাড়–মাংস–ঘিলু...।

নিকুচি করি, দৃশ্যের নিকুচি করি। কেউ আমাকে জোরছে লাথি কষে ঘুমটা ভাঙিয়ে দাও। নাহ্‌, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না! হচ্ছেই না। ঘুমের ঘোরেই সেলফোন হাতড়াই। ফেসবুকে ঢুকে দেখি, সব ঠিকঠাক। যাক বাবা, এই যাত্রায় বাঁচা গেছে! কিন্তু এসব কী? ফেসবুকের বন্ধুরা আমার সাথে ছবি আপলোড দিচ্ছে ক্যান? বুকটা ধক করে ওঠে। অ্যাঁ, তাহলে আমি আর নাই! কেবল ছবি?

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন