বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রাডোকে বলি, ‘আপনের আন্দাজ নাই মিয়া? এই চিপা গলিতে এত বড় গাড়ি ঢুকাইলেন ক্যান? দাগ লাগার ভয় থাকলে গাড়ি শোরুমেই রাইখেন, রাস্তায় বাইর হইলে এমন দাগদুগ লাগবই! আর এই যে গাড়ি থামায়া ব্যস্ত রাস্তায় কলহ করতেছেন, তাতে কত মানুষ পথে আটকা পড়ছে, দেখছেন! এইটা বোঝার মতো সামান্য জ্ঞানটুকুও কি নাই আপনেদের?’

এসব বলার জন্য মুখও খুললাম। আর তখনই ঘটল ব্যাপারটা, কথা বলতে গিয়ে টের পেলাম মুখ দিয়ে ‘অ-অ-গ-গ-’ ছাড়া কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। একটু ঘাবড়ে গেলাম আমি। জোর করে চেষ্টা করলাম কিছু বলতে। কিন্তু এবারও ‘উ-উ-উ’ ছাড়া আর কোনো ধ্বনি বের হলো না। কারণ, জিহ্বাটা যেখানে থাকার কথা ছিল, সেখানে নেই। অথচ সকালেও তো ছিল, কিছুক্ষণ আগেও হয়তো ছিল।

আমি গাড়ির ভিড়ে, শব্দের জঞ্জালে, নিশ্চল বসে থেকে ঘামতে থাকি। কখন যে বাইক আর প্রাডোর ঝগড়া থেমেছে, কখন সবকিছু সচল হয়েছে আর আমি স্রোতের টানে মেশিনের মতো মোটরসাইকেল চালিয়ে অফিসে এসেছি, জানি না। মাথায় দুঃশ্চিন্তা–দুর্ভাবনার ঝড় নয়, একসঙ্গে সাইক্লোন টর্নেডো–সুনামি বইছে। বুক ধড়ফড় করছে। গলা শুকিয়ে কাঠ। সকালবেলা যে মানুষ খোলা জবানে ঘর থেকে বের হলাম, এক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই মানুষের জবান বন্ধ! এটি কি বিশ্বাসযোগ্য?

নিজের ডেস্কে বসে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে স্থির হয়ে বসে ঘটনাটা ভাবার চেষ্টা করলাম। জিহ্বা কখন, কোন ফাঁকে মুখ থেকে বেরিয়ে গেল, তা–ও তো টের পেলাম না! এখন যদি বসের কামরা থেকে ডাক আসে! আর আমি তার কোনো কথার জবাব দিতে না পেরে এমন বোবা হয়ে থাকি! ভাবতে গিয়ে আবার ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে পকেটে হাত ঢুকালাম, কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামা ঘাম মোছার জন্য রুমাল বের করতে। আর তখনই হাতে ঠেকল নরম, আঠালো, ভেজা ভেজা কিছু একটায়। দুই আঙুল দিয়ে ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এসে দেখি আমার জিভ মহাশয়। মুখগহ্বরের কাছে নিতেই তিনি একঝটকায় তার নিজস্ব জায়গায় পুনঃস্থাপিত হয়ে চুপচাপ বসে রইলেন, যেন কখনোই কোথাও যাননি তিনি। তাকে যে রিমান্ডে নিয়ে নিখোঁজ হওয়া বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করব, সে ব্যবস্থাও তো নেই। যাক, আপাতত যে ফেরত এসেছেন, সেটাই স্বস্তি!

কদিন পর বউকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছি। সন্ধ্যাবেলা। সেদিন ছিল আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। কষ্টে সৃষ্টে জমানো টাকা দিয়ে বউকে একটা ডায়মন্ডের নাকফুল কিনে দিয়েছি, বউ আমার জন্য দেখেশুনে সবুজ সমুদ্র রঙের পাঞ্জাবি কিনেছে, সেই নাকফুল আর পাঞ্জাবি শপিং ব্যাগে নিয়ে, পানসি রেস্টুরেন্টে চাইনিজ খেয়ে লেকের পাড় ঘেঁষে মৃদুমন্দ হাওয়ায় গরিবের রোমান্টিক রিকশা ভ্রমণ যেমন হয়, খুব সুখী সুখী ভঙ্গিতে তেমন স্মৃতিচারণ হচ্ছিল আমাদের প্রথম দেখার দিনগুলো, প্রথম ঝগড়া, প্রথম অভিমান ইত্যকার নানা প্রসঙ্গ। এর মধ্যেই কখন খেয়াল করিনি খটাশ করে রিকশার চেইন পড়ে গেল একটা অন্ধকারমতো জায়গায় আর রাস্তা ফুঁড়ে দুজন ছায়ামানব—হাতে ছুরি বা খুরের মতো অস্পষ্ট কিছু একটা—আমাদের দুজনকে ঘিরে ধরে চাপা গলায় আমার মানিব্যাগটা চাইল একজন, আরেকজন টান দিল বউয়ের হাতে রাখা শপিং ব্যাগে, যেখানে কিছুক্ষণ আগে কেনা সাধের নাকফুল আর শখের পাঞ্জাবি জড়াজড়ি করে শুয়ে আছে। ঘটনাটি ঘটতে সময় নিল মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ওরা মিলিয়ে যেতেই বউ গলা ছেড়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল, ‘হায় হায়, আমার সব নিয়ে গেল গো...।’ আমিও মুখ খুললাম সমান জোরে চিৎকার করতে অথবা ওকে সান্ত্বনা দিতে, কিন্তু মুখ খোলাই সার, ‘অ-অ-গ-গ’ ছাড়া কোনো শব্দই বেরোল না মুখ দিয়ে। বুঝলাম, সুযোগ বুঝে জিহ্বা বাবাজি আবার পালিয়েছে। তাড়াতাড়ি প্যান্টের পকেট হাতড়ালাম, গতবারের মতো যদি এবারও একই জায়গায় লুকিয়ে থাকে! কিন্তু বৃথাই হলো সেই আশা! দুই পকেটই শূন্য। বউ কান্না সামলে বলল, ‘চলো, এক্ষুনি থানায় যাব।’

আমি মাথা ঝাঁকিয়ে কোনোমতে বললাম, ‘অ-অ-অ-অ’।

উত্তেজনায় আমার নির্বাক দশা খেয়াল করল না বউ। ওই রিকশা নিয়েই থানায় গেলাম আমরা। ফ্রন্ট ডেস্কে বসা ডিউটি অফিসার সব শুনে ক্লান্ত নিরাসক্ত গলায় বললেন, ‘বুঝেছি, ছিঁচকে ছিনতাইকারীর কাজ। এদের ধরা বড্ড মুশকিল। এরা এক এলাকায় ছিনতাই করে অন্য এলাকায় পালিয়ে যায়। তা আপনারা মামলা করাবেন, না জিডি?’

বউ এবার আমার কাছে পরামর্শ চাইল, ‘কী করা যায়, বলো তো!’

আমার মাথায় তখন শুধু হারানো জিহ্বার চিন্তা, অনেক কিছুই বলতে চাইলাম, কিন্তু মুখ দিয়ে অর্থহীন কিছু ‘অ অ গ গ’ শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোল না। এবার বউও বেশ ঘাবড়ে গেল। জিডি–মামলা বাদ দিয়ে আমাকে নিয়ে ছুটল ডাক্তারের কাছে। পরিচিত ডাক্তার। দেখেশুনে বলে দিল, ‘তীব্র আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সাময়িক ব্রেকডাউন ঘটেছে। বাসায় নিয়ে বিশ্রামে রাখুন। ঠিক হয়ে যাবে।’

বিশ্রামে আছি। আর মনে মনে পিণ্ডি চটকাচ্ছি ফেরারি জিহ্বার। ব্যাটা কোথায় ঘাপটি মেরে বসে আছে কে জানে! বউকে কাগজে লিখে জানালাম, ‘ঘরের কোণা–কানচি, ড্রয়ার–ট্রয়ার খুঁজে দেখো তো, জিহ্বাটা কোথায় লুকিয়ে আছে।’ বউ খুঁজবে কী, উল্টো আমাকে বইয়ের ভাষায় বোঝাতে শুরু করল, ‘দেখো, জিহ্বা তোমার মুখের একটি অঙ্গমাত্র। এর কোনো চেতনা নেই। মুখের সঙ্কোচন–প্রসারণের মধ্য দিয়ে এটা কাজ করে আর সেটা হয় ব্যক্তির ইচ্ছা অনুযায়ী। ফলে জিহ্বা পালিয়ে গেছে—এটা ভাবা বোকামি। এসব ভাবনা বাদ দিয়ে বরং তুমি একটু ঘুমাও।’

ঘুমালাম। কিন্তু তাতেই কি শান্তি আছে? স্বপ্নে দেখি শত শত লাল–গোলাপি জিহ্বা আমাকে ঘিরে লকলক করছে, যেন এখনই সবাই মিলে আমাকে গিলে খাবে। এতগুলো জিহ্বার মধ্যে কোনটা যে আমার জিহ্বা, তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। সব মনে হচ্ছে একই রকম। ভুল করে অন্যের জিহ্বাকে নিজের মুখে আবার ঢুকিয়ে ফেলি কি না, ভাবতেই গা গুলিয়ে বমি পেল। এর ওপর অজস্র জিহ্বার অবিরাম কোলাহলে স্বপ্নের মধ্যেই আমার মাথাপাগল অবস্থা। আর সহ্য করতে না পেরে ঘুম ভেঙে ছটফট করে উঠে বসলাম। তৃষ্ণায় মনে হচ্ছে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। বউকে ডেকে বললাম, ‘এক গ্লাস পানি দেবে?’

‘আরে, এই তো, তুমি কথা বলতে পারছ, তোমার জিহ্বা ফেরত এসেছে।’

বউ খুশি হয়ে উঠল। হ্যাঁ, তা–ই তো, মুখের ভেতর বদমাশটার অস্তিত্ব বেশ অনুভব করতে পারছি। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল আমার। তাকে অনুনয় করে বললাম, ‘দেখ ভাই, আমাকে বিপদে ফেলে আর পালাস না। এই হুজ্জত আর ভাল্লাগে না।’

কিন্তু আমাকে নিরাশ করে হারামজাদা তৃতীয়বারও পালাল। ঘটনাটা ঘটল সম্প্রতি বাজার করতে গিয়ে। সবজি কিনতে গিয়েছিলাম। যা ধরি, তাতেই হাতে ফোসকা পড়ার মতো অবস্থা, দাম আগুনের মতো চড়া। মুখ বুজে যদ্দূর পারি কিনলাম, খেতে যখন হবেই। ফেরার পথে লেবু–শসা কিনতে গিয়েই মাথাটা গরম হয়ে গেল। পত্রিকায় পড়া জ্ঞান উগরে দিয়ে জনসমক্ষে বলতে ইচ্ছা হলো, ‘কৃষক ফসলের দাম পায় না, আর তোমরা কিনা পনেরো গুণ বেশি দরে সেটা বিক্রি করো...’

কিন্তু মুখ খোলার আগেই তো জিহ্বা উধাও। নিচু গলায় ‘অ অ গ গ’ শব্দ করে তাড়াতাড়ি দাম পরিশোধ করলাম। পাশেই ভ্যানভর্তি সবুজ তরমুজ নিয়ে বিক্রেতা আমাকে ডাকতে লাগল, ‘স্যার নিয়া যান। আপনের জন্য এক দাম ৫০ টাকা কেজি।’

মনে হলো বলি, ‘ব্যাটা, কেজি দরে কোনো দিন তরমুজ বিক্রি হয়? সারা জীবন তো পিস হিসেবেই কিনেছি। তোরা পেয়েছিস কী?’ কিন্তু মনের কথা মনেই থাকল, জিহ্বার সহযোগিতা না পেলে এসব উচ্চারণ করি কী করে? বাসায় ফিরে শার্ট–প্যান্টের পকেট ঝেড়ে তন্ন তন্ন করে খুঁজি পলাতক বস্তুটিকে। না, নেই। নেই, তো নেই-ই। শেষমেশ বহু খুঁজে তাকে উদ্ধার করা গেল কিনা আমার বউয়ের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে। আর তাতেই বাকহীন দশা থেকে মুক্তি পেলাম আমি।

সেই থেকে বড় সাবধানে থাকি। মনের সব কথা মুখে আনার চেষ্টাই করি না। আমার জীবনে মৌন এখন হিরণ্ময়। বন্ধুরা অভিযোগ করে, রাগ করে, টিটকারি দেয়। ‘আপসকামী’ ‘সুবিধাবাদী’ বলে গালিও দেয়। তাদের কথায় আমি মিটিমিটি হাসি। তোমরা যে যা–ই বলো, আমার বাপু জিব সামলে রাখতে হবে। ইচ্ছে হলেই সব জায়গায় সব কথা বললে চলবে না!

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন