বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন কি, মানুষ কেন এত পছন্দ করে সাইকো থ্রিলার? জেমস ফেনিমোর কুপার (মার্কিন ঔপন্যাসিক) ১৮২১ সালে যখন পৃথিবীর প্রথম থ্রিলার উপন্যাস স্পাই লেখা শুরু করেন, তখন নিজেও ভাবেননি এই ‍উপন্যাস একদিন ইতিহাসে জায়গা করে নেবে, তিনি নিজে ঠাঁই করে নেবেন ইতিহাসে এবং উপন্যাসটি এত জনপ্রিয় হবে।

পৃথিবীতে কত অভাবনীয় ঘটনাই না ঘটে। কুপারের ক্ষেত্রেও তা–ই ঘটেছিল। প্রকাশের পরপরই তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল উপন্যাসটি। তারপর তো উপন্যাসের জগতে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার নামে একটি ধারাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

সেই ধারার উপন্যাসের জনপ্রিয়তা এখনো বাড়ছেই। কিন্তু কেন? কী আছে এসব উপন্যাসে? ঠান্ডা মাথায় কেউ একজন খুন করে যাচ্ছে একের পর এক, মা মেরে ফেলছে নিজের সন্তানকে, বাবা রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে বিশেষ কোনো মুহূর্তে, এক পুরুষের ভেতর বাস করছে আরেক পুরুষ, দ্বৈত সত্তার দ্বন্দ্ব-সংঘাত—এই সবই তো! এই বিষয়–আশয়ের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার প্রবণতা মানুষের সহজাত বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের প্রখ্যাত গণমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার লাইফস্টাইল বিষয়ের নির্বাহী সম্পাদক বিনিতা দাওয়ার নানগিয়া।

বিনিতা বলেছেন, থ্রিলার উপন্যাসের পাতায় পাতায় থাকে ভয়, রহস্য, রোমাঞ্চ। কী থেকে কী হয়, কে জানে! আগে থেকে কিছুই অনুমান করা যায় না। আবার অপরাধেরও নানা ধরন আছে। এসব উপন্যাসে কী ধরনের অপরাধ দেখানো হবে, অনেক ক্ষেত্রে সেটিও আগে থেকে অনুমান করা যায় না। ফলে পাঠক যখন এ ধরনের উপন্যাস পড়েন, তখন একটি উত্তেজনাপূর্ণ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে যান। এ ধরনের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের লোভেই পাঠক বারবার থ্রিলার উপন্যাসের কাছে ফিরে আসেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন, যাঁরা সরাসরি অপরাধ করেন না, কিন্তু অপরাধমূলক বই পড়েন, তাঁরা অন্যদের চেয়ে বেশি সহানুভূতিসম্পন্ন মনের অধিকারী হয়ে থাকেন।

এ থেকে বোঝা যায়, সাইকো থ্রিলার উপন্যাসগুলো সহানুভূতিসম্পন্ন মনকে খুব দ্রুত স্পর্শ করতে পারে। আর যে বই মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারে, সেই বই তো জনপ্রিয় হবেই।

বিনিতা দাওয়ার বলেন, যেকোনো ধরনের সহিংসতা ও বিপর্যয়ের ব্যাপারে মানুষের মধ্যে একধরনের কৌতূহল কাজ করে। এটা তার সহজাত প্রবৃত্তি। আর থ্রিলার উপন্যাসগুলোয় যেহেতু সহিংসতার ছড়াছড়ি, তাই খুব সহজেই তা মানুষকে আকর্ষণ করে।

আমরা যখন কোনো থ্রিলার উপন্যাস পড়ি অথবা থ্রিলার চলচ্চিত্র দেখি, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের মন কোনো একটি পক্ষে অবস্থান নেয়—হয় অপরাধীর পক্ষে, নয়তো অপরাধের কারণ যে উদ্‌ঘাটন করছে তার পক্ষে। পাঠক আসলে কার পক্ষ নেবেন, সেটি নির্ভর করে লেখক আসলে কীভাবে গল্পটি বলেছেন তার ওপর। গল্পটি যদি অপরাধীর দৃষ্টিকোণ থেকে বর্ণনা করা হয়, তাহলে আমরা ওই অপরাধীর অপরাধী হয়ে ওঠার ট্রাজিক কারণগুলো জানতে পারি এবং তার প্রতি আমাদের সহানুভূতি জন্মে। আর যখন একটি গল্প সহানুভূতি আদায় করে নিতে পারবে, তখন সেই গল্প জনপ্রিয় হয়ে উঠবেই—এমনটা তো আগেই বলেছেন বিনিতা দাওয়ার।

সাইকো থ্রিলার জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, এসব গল্প মানুষের মস্তিষ্কে ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখে। যেমন এসব উপন্যাসের পাতায় পাতায় অনেক সংকেত থাকে, অপরাধের অনেক ক্লু বা নিদর্শন থাকে। পাঠক যখন উপন্যাসটি পড়েন, তখন তাঁর মস্তিষ্কে এসব সংকেত ও ক্লু খেলা করে। নানা কিছু অনুমান করতে করতে তিনি পড়া এগিয়ে নেন এবং শেষ পাতায় গিয়ে লেখক কী সমাধান দিলেন, তার সঙ্গে মিলিয়ে নেন নিজের অনুমান। যে উপন্যাস মানুষের মস্তিষ্ক নিয়ে এভাবে খেলতে পারে, সেই উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়াই কি স্বাভাবিক নয়?

বিনিতা দাওয়ার বলেছেন, যেকোনো গল্প বা উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ার আরেকটি মৌলিক উপদানের নাম টুইস্ট। ভেবে দেখুন, থ্রিলার উপন্যাসের পাতায় পাতায় থাকে নানা মোচড়, নানা বাঁকবদল। একটু পরপর টুইস্ট। পাঠক যখন এসব টুইস্ট পড়েন, তখন তাঁর কী হয়? মনোচিকিৎসকেরা বলছেন, কেউ যখন থ্রিলার উপন্যাস পড়েন, তখন তাঁর শরীরে অ্যাড্রেনালিন নামক হরমোন নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে মানুষের মস্তিষ্কের যে অংশটি সাধারণত উদ্দীপ্ত হয় না, সেটিও উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে। এটি এমন একধরনের রাসায়নিক উপাদান, যা আনন্দ, উচ্ছ্বাস, ভালো লাগা কিংবা মন খারাপ ও বিষাদের মতো অনুভূতির প্রতি আসক্তি তৈরি করে। বিনিতা বলেছেন, ‘সুতরাং থ্রিলার উপন্যাস পড়ার সময় আপনি রোলার কোস্টারে না উঠেও রোলার কোস্টারের অনুভূতি পান।’

থ্রিলার উপন্যাস পড়ার সময় অনেক উদ্বেগ, ভয়, ক্রোধ, বিভ্রান্তি এবং প্রচুর উত্তেজনা শেষে আমরা আসলে কী পাই?

একটি সুখী, সুন্দর, নৈতিক সমাপ্তি। অনেক সময় একটি ভালো থ্রিলার উপন্যাসের শেষ পৃষ্ঠা পাঠককে আবেগশূন্য করে ফেলে। পরবর্তী কয়েক মুহূর্ত তিনি আর কিছু ভাবতে পারে না। একধরনের অবশ করা অনুভূতি তাঁকে ঘিরে ধরে। থ্রিলার উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ার এটিও একটি কারণ।

খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, সেই উপন্যাসই জনপ্রিয় হয়, যেটি একটানে পড়ে ফেলা যায়; কিংবা যে উপন্যাস পাঠককে বিরতি দেয় না, শেষ না করা পর্যন্ত স্বস্তি দেয় না। থ্রিলার উপন্যাস পাঠককে এ ধরনের বিরতিহীন অস্বস্তি দেয়। শিকাগোর এক চিকিৎসক ও লেখক উয়ো জাং কিম বলেছেন, ‘পড়ার ব্যাপারে আমি একটি নিয়ম মেনে চলি। সেটি হচ্ছে, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার পড়ি শুধুই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে। কারণ, এ ধরনের উপন্যাস এক বসায় শেষ না করে ওঠা যায় না। হঠাৎ কোনো কর্মময় দিনে যদি ভুল করে থ্রিলার পড়া শুরু করি, তাহলে বিপদের অন্ত থাকে না। তখন কাজ ফাঁকি দিয়ে নয়তো রাতের ঘুম নষ্ট করে বইটি শেষ করতে হয়।’

থ্রিলার উপন্যাস জনপ্রিয় হওয়ার কারণ সম্পর্কে দারুণ একটি কথা বলেছেন জনপ্রিয় মার্কিন লেখক জিন হ্যানফ কোরেলিটজ। ২০২০ সালে প্রকাশিত কোরেলিটজের বই ইউ শুড হ্যাভ নো দশ লাখের বেশি বিক্রি হয়েছে। বইটি অবলম্বনে এইচবিও চ্যানেল সিরিজ তৈরি করেছে, যেখানে অভিনয় করেছেন প্রখ্যাত হলিউড অভিনেত্রী নিকোল কিডম্যান। সেই জিন হ্যানফ কোরেলিটজ বলেছেন, ‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস মানুষকে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারে। এ ছাড়া গল্পের নায়ক যখন নানা ধরনের অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সফলতার পরিচয় দেয়, তখন সেই সফলতা পাঠকের নিজের সফলতা বলে মনে হয়।’

জিন হ্যানফ কোরেলিটজ বলেছেন, ‘মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপাদান হলো ক্লাইম্যাক্স ও সুন্দর একটি পরিসমাপ্তি। থ্রিলার উপন্যাস টিকেই থাকে এর শেষ পৃষ্ঠার ওপর নির্ভর করে। শুরু থেকে নানা ধরনের সমস্যা ও সংকট তৈরি করতে করতে উপন্যাস এগিয়ে যায় এবং শেষ পৃষ্ঠায় সব সমস্যার একটি অকল্পনীয় সমাধান দেয়। এটিই এ ধারার উপন্যাসের জনপ্রিয়তার মূল কারণ।’

সুতরাং সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত হচ্ছে এই—রহস্য, রোমাঞ্চ, ভয়, উদ্বেগ, সন্দেহ, কৌতূহল, সংকট, সমস্যা, সমাধান ইত্যাদি বিষয়ে জানার আগ্রহ মানুষের আদিম এবং সহজাত প্রবৃত্তি। আর এই সব সহজাত প্রবৃত্তি নিয়ে থ্রিলারলেখকেরা অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে এবং মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনার মাধ্যমে খেলতে পারেন। তাই পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ বারবার মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলারের কাছে ফিরে আসে। আর তাই পৃথিবীজুড়েই সাইকো থ্রিলারের এত জনপ্রিয়তা।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, সাইকোলজি টুডে, মিডিয়াম ও গ্রাজিয়া ম্যাগাজিন

গল্প থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন